পাহাড়-জঙ্গল-নদীর দেশ, তবু শুধু এতেই পূর্ণ নয় রাইমাটাং

সোহম দাস

 

‘এ তো বহুত ডেঞ্জারাস জায়গা ছিল একসময়, জানেন। এখানে তো ডাকুদের বাস ছিল। এই সব আশপাশের গ্রাম-টাম লুঠ করত। রাইমাটাং মানে কী, জানেন? রাই মানে হচ্ছে রাইজাতির জায়গা, আর মাটাং মানে ডেথ। রাইমাটাঙে আসা মানে ডেথ। আমরাও হয়ত ডাকু হতাম। হইনি, কারণ, আমার বাবা ফাইভ ক্লাস অবধি পড়েছিল। তাই আমাদেরকেও ওদিকে পাঠিয়েছে। এই আমি ব্যবসা করছি, আমার বড়দাদা আছে ব্যাঙ্গালোরে, চাকরি করে, আমার মেজদিদি আছে, সেও চাকরি করে, আমার বড়দিদির বিয়ে হয়েছে ভালো ঘরে।’

লজের দোতলায় বসে বসে এসব কথা বলছিল প্রমোদ। প্রমোদ কারকি। বছর তেইশের যুবক। এই পুরো লজটার মালিক ও নিজেই। লজের একতলাটা সিমেন্টের হলেও দোতলাটা কাঠের। দোতলার বারান্দার একটা অংশকে খানিক প্রশস্ত করে সেখানেই অতিথিদের খাওয়াদাওয়ার জায়গা। প্রথম দিন রাইমাটাং গিয়ে আমাদের বৈকালিক আড্ডা বসেছিল এখানেই। সামনে তখন বিকেলের আলো অল্প অল্প পড়তে শুরু করেছে। এসব অঞ্চলে মে-জুনের সময়েও ঝুপ করে সন্ধে নেমে যায়, অবশ্য সেই আকস্মিকতার মধ্যেও এক অদ্ভুত ছন্দময়তা থাকে। বিকেলের মরা আলোর বিষণ্ণতা, সেই বিষণ্ণতার প্রতি একটু মনোযোগ দিলেই সেই ছন্দময়তা বেশ অনুভব করা যায়।

সাংঘুরি ভানগিয়াং রেসর্ট (ছবি – সায়নী বন্দ্যোপাধ্যায়)

লজের সামনের দিকের দৃশ্য অদ্ভুত সুন্দর। কম্পাউন্ডের মধ্যেই রয়েছে একটা টলটলে জলের পুকুর, তাকে ঘিরে থাকা অযত্নের সৌন্দর্য মাখানো বাগান, আর সেসব ছাড়িয়ে বক্সা পাহাড়ের ঢাল, জঙ্গলের কালচে সজীবতা। লজের পিছন দিকেই আবার রয়েছে গ্রাম। লজটা যেন গ্রামে ঢোকার মুখে সাক্ষাৎ প্রহরী। অপার্থিব আর পার্থিবের মাঝের সেতুস্বরূপ। তবু যেন আমার মনে হল, পাহাড় আমাদের ব্যঙ্গ করছে। আমরা এই শহুরে মরবিডিটির থেকে রক্ষা পেতে দুদিনের নেশা নিতে এসেছি, তা কি সে আর জানে না। তবু তার বিশালত্বের কাছে ধরা দিতে ছুটে আসতে ইচ্ছা করে বইকি। তার মুখ ফিরিয়ে নেওয়া সত্ত্বেও ইচ্ছা করে তাকে ভালোবাসতে।

সেদিন সাড়ে তিন ঘণ্টার কাছাকাছি দেরি করিয়ে ট্রেন যখন নামাল হ্যামিল্টনগঞ্জে, তখন স্টেশনটার সরল সৌন্দর্যে ক্লান্তি আর বিরক্তি উধাও। হ্যামিল্টন যে সাহেবি পদবি তা তো বোঝা শক্ত নয়, কিন্তু সাহেবের নামটি কী, তা সম্পর্কে খুঁজতে গিয়ে দুটি মত পাওয়া গেল। ভূগোলবিদ অনু কাপুরের ‘ম্যাপিং প্লেস নেমস ইন ইন্ডিয়া’ জানাচ্ছে, জায়গাটা ব্রিটিশ মেজর জেনারেল ইয়ান হ্যামিল্টনের নামে, যিনি একসময় অবিভক্ত বাংলা ও পঞ্জাব প্রদেশের ইন্সপেক্টর অফ সিগন্যালস পদে আসীন ছিলেন। আবার অন্য একটি সূত্রে, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সুপারিন্টেনডেন্ট কর্নেল রবার্ট সিম্পসন হ্যামিল্টনের নামানুসারে এই জায়গার নাম হ্যামিল্টনগঞ্জ। ডুয়ার্সের এই অঞ্চলে বেশ কয়েকটি চা-বাগান তাঁর হাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তাঁর বাংলোতে রাত কাটাতেন ভূটানের রাজা। এই সাহেবই উদ্যোগ নিয়ে একটি সাপ্তাহিক বাজার শুরু করেছিলেন, যা পরে ‘হ্যামিল্টন সাহেবের বাজার’ বা ‘হ্যামিল্টনগঞ্জ’ নামে পরিচিত হয়। তবে যে হ্যামিল্টনের নামেই হোক, তা নিয়ে এখন ছুটি-পিয়াসীদের মাথা ঘামানোর বিশেষ প্রয়োজন পড়ে না।

ছিমছাম হ্যামিল্টনগঞ্জ স্টেশন (ছবি – সায়নী বন্দ্যোপাধ্যায়)

স্টেশনটি আসলে কালচিনি ব্লকের একমাত্র স্টেশন। রাইমাটাঙের কাছাকাছি বড় শহর বলতে এই কালচিনিই। সেখান থেকেই প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহ করে নিয়ে যান রাইমাটাঙের স্থানীয় মানুষজন। কালচিনির মফস্বলি ছাপ পেরিয়ে খানিকটা এগোলেই দৃশ্যমঞ্চের পরিবর্তন ঘটতে থাকে। গ্র্যাজুয়ালি। এতক্ষণ যেসব চায়ের বাগানরা ছিল নেহাতই পার্শ্বচরিত্রে, তারাই প্রধান চরিত্রের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। পিছনে পড়ে থাকে সাদা-কালো-ধূসরের ব্যাকগ্রাউন্ড। ভাটপাড়া চা-বাগান। এখন মালিকানা ভারতীয় বেসরকারি সংস্থার হাতে। সবুজ শান্তির আড়ালে অনেক না-জানা অশান্তির গল্প, তাদের সেসব আকুতি-ফিসফাস, গাড়ির কাচ খুলে ক্যামেরা তাগ করা আমাদের কর্ণকুহরের খানিক পাশ দিয়ে চলে যায়।

এতক্ষণ যে চায়ের বাগানরা ছিল নেহাতই পার্শ্বচরিত্রে, তারাই প্রধান চরিত্রের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় (ছবি লেখকের)

রাইমাটাঙে ঢোকার মুখেই সুবিশাল চড়া। রাইমাটাং নদীর চড়া। প্রমোদ গাড়ি চালাতে চালাতে বলে, আগের রাতেও বেশ অনেকটা জল থাকায় গাড়ি এগোতে পারছিল না। আমাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন, তাই দিব্যি শুকনো খাত দিয়ে চলেছে আমাদের বাহন, প্রমোদের অতি বিশ্বস্ত সুকঠিন বোলেরো। নদীর খাতের পাশেই জঙ্গল। মেঘলা বিকেলে সেই বনের ধারেই অপ্রত্যাশিতের মতো তিন বন্ধুর পায়চারি চোখে পড়ল। জাতীয় বিহঙ্গরা আমাদের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করেই চরে বেড়াচ্ছে সেই চরের কাঁকরে। চড়া পেরিয়ে খানিক উঁচু হয়ে যাচ্ছে জমি। সেই রাস্তা দিয়ে বেশ কিছুটা গিয়ে প্রমোদের লজ। সাংঘুরি ভানগিয়াং রিসর্ট। চারিদিকে বিদ্যুৎবাহী কাঁটাতারের বেড়া। কারণটা, হাতি। মাঝেমাঝেই তাদের আবির্ভাব ঘটে আশেপাশে।

সাংঘুরি লজের বারান্দা, অদূরেই বক্সা পাহাড়ের ঢাল (ছবি – অনিকেত মিত্র)

আকাশ মেঘলা। তাই ভর বিকেলকে মনে হচ্ছিল গোধূলি। গোধূলির মেজাজে চির-আলিস্যি লেগে থাকে। এই জঙ্গলের দেশে সে আলিস্যি যেন আরও জাঁকিয়ে বসতে চায়। একাই এসে বসি বারান্দায়। লনে চরে বেড়ানো মুরগি, কুকুরদের নিরীক্ষণ করতে থাকা ছাড়া আর কাজ কিছু নেই। ক্যামেরাকে আর কত খাটাব। সে-ও তো সবটা দেখতে চায়। আর ঠিক তখনই একটা বিশুদ্ধ বন্য শব্দ এসে স্তব্ধতা খণ্ডনের বেবাক স্পর্ধা দেখায়। ‘অক্কে, অক্কে, অক্কে’। এমন করে কোন পাখি ডাকে? তারপর নিজেরাই কখন যেন বুঝতে পারি, এ ডাক পাখির নয়, পাখির পূর্ববর্তী ‘বৈবর্তনিক’ ধাপের একজন প্রতিনিধির। এবং, তাঁর নামটিও এই ডাকের জন্যই পাওয়া। আর ভালো করে শুনলে ডাকটিও নাকি অক্কে নয়, বরং তক্কা। আর তা থেকেই নামটি তক্ষক, ইংরাজিতে যাকে বলা হয় গেকো। যদিও, যে বা যাঁহারা এই নামকরণ করিয়াছিলেন, তাঁহারা বর্ণপরিচয়ের সূত্রসহ শ্রীমান তক্ষকমশাইয়ের থেকে ওটা ‘অ’ না ‘ত’, সেই বিষয়ে নিশ্চিত হইয়াছিলেন কিনা, জানা নেই, ফলে আমাদের অনভ্যস্ত কর্ণে তক্কাকে আমরা ‘অক্কে’ বলিয়া চালাইলেও তাহা দণ্ডযোগ্য অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে না।

এই ‘অক্কে’-র ডাক ক্রমশই আমাদের অভ্যস্ত হয়ে আসবে। যেমন, অভ্যস্ত হয়ে আসবে প্রতিটি পুরুষ স্বজাতিকেই প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে বীরত্ব দেখাতে যাওয়া টাইগার আর তার অসুখী প্রেমিকার সদা-সান্নিধ্য। পানবাড়ি ট্রেকের রাস্তাতেও পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার গুরুদায়িত্ব তারা নিজেরাই নিয়েছিল। সেখানে স্রেফ হাফপ্যান্ট আর চটিতে তরতর করে পাহাড়ি রাস্তায় উঠে যাওয়া পঞ্চাশোর্ধ্ব প্রৌঢ় পরশুরাম কাকার পথপ্রদর্শন না থাকলেও যে আমাদের কোনও অসুবিধা হত না, তা মরিয়া প্রমাণ করতেই যেন দুই সারমেয়-যুগলের সারাটা পথ হেঁটে আসার প্রহরা।

নদীর চর ধরে ফেরা (ছবি – অনিকেত মিত্র)

পানবাড়ির উপরে দুকপাদের গ্রাম। কয়েকঘর দুকপা এখানে থাকেন। কয়েক কিলোমিটার চড়াই-উৎরাইয়ে ক্লান্ত শরীর নিয়ে এসে বসা গেল এক বাড়ির খামারে। তোংবা নামক শক্তিবর্ধক পানীয়টি এখানে অতি প্রয়োজনীয়। এটি মূলত তৈরি হয় বাজরা বা ভুট্টা থেকে। নেপালের লিংবু জনজাতির মানুষের কাছে এ পানীয় অতি পবিত্র।

প্রস্তুত হচ্ছে তোংবা (ছবি লেখকের)

নেপালের সীমানা ছাড়িয়ে সিকিম, দার্জিলিঙেও দিব্যি ছড়িয়ে পড়েছে সাদা, টক-স্বাদের ঝাঁঝালো এই সুরা। একটা বাড়িতে একসঙ্গে অনেকে থাকেন। সকলেই ঘরের কাজ, বাইরের কাজে পারদর্শী। গৃহকর্ত্রী আর তাঁর তিন মেয়ে, তাদের স্বামীরা, দুই নাতি-নাতনি সব মিলিয়ে ভরপুর সাজানো সংসার। নাতিটির নাম কেজাং আর নাতনিটি দেবিয়া। দুই দস্যি। কেজাংয়ের দস্যিপনা হয় নিঃশব্দে, আর তেমন সপ্রতিভ দেবিয়া। ছাগল-মুরগিদের সঙ্গে আপনমনে দৌড়ে বেড়াচ্ছে, আর ছবি তুলতে গেলেই লুকিয়ে পড়া কখনও খাটিয়ার তলায়, কখনও কাঠের পাটাতনের আড়ালে। কেজাং হয়ত তখন ব্যস্ত কাঠের ছাল চেখে দেখতে। এখান থেকে আদমার প্রাইমারি স্কুল চার কিলোমিটার দূরে। প্রতিদিন আট কিলোমিটার পাহাড়ি পথে যাতায়াত করে আধুনিক শিক্ষার পাঠ নিতে যাচ্ছে এই দুই খুদে। তবে ওদের প্রকৃত শিক্ষা তো এই পর্বত-আশ্রয়েই, এই পরিশ্রমেই। পুঁথিবিদ্যা যা দিতে অপারগ।

কেজাং ও দেবিয়া (ছবি লেখকের)

সেদিনই সন্ধ্যায় আবিষ্কার করি রাইমাটাঙের অজানা এক দর্শন। সে দর্শন আকাশ-চেতনার। মেঘ কেটে গিয়েছিল সন্ধেবেলা। পরিষ্কার আকাশে তখন সৌরজগৎ তার ডালি সাজিয়ে বসে আছে। আমরা, দৈনন্দিন-ব্যস্ততার জাঁতাকলে হাঁসফাঁস করতে থাকা ভবঘুরের দল একটিবার যদি মেনে নিতে পারি আমাদের মাথার উপরেও কেউ আছে, তাহলেই দু হাত ভরে সেই ডালি উজাড় করে দেবে সে। স্পষ্ট দেখা যাবে আকাশগঙ্গার ছায়া-সড়ক, উল্কার মৃত্যুপতন, কালপুরুষের বরাভয়, সপ্তর্ষির আশীর্বাদ। ওই বিশ্বের কাছে এক নিমেষে খানখান হয়ে যায় আমাদের এই সংস্কৃতির কচকচানি, দলনা-হানাহানির খণ্ডিত ইতিহাস-তত্ত্ব, ব্যক্তিসর্বস্বতার স্পর্ধিত গর্জন। তবু কী শান্ত এ আলোর রাজ্য! আসলে, তার অহং যে সে নিজেই।

ওই বিশ্বের কাছে এক নিমেষে খানখান হয়ে যায় আমাদের এই সংস্কৃতির কচকচানি, দলনা-হানাহানির খণ্ডিত ইতিহাস-তত্ত্ব, ব্যক্তিসর্বস্বতার স্পর্ধিত গর্জন (ছবি – অনিকেত মিত্র)

একটা করে জোরালো আলো দেওয়া রয়েছে প্রতিটি বাড়িতে। বাড়ির বারান্দায় ঝুলন্ত টবে গাছ। এই ছিমছাম সাজিয়ে রাখায় অদ্ভুত মায়া জড়িয়ে থাকে। অকৃত্রিম মায়া। কোনও এক বাড়িতে ঠাকুরের নামকীর্তন হচ্ছে। আমরা সে বাড়িতে কিছুক্ষণের জন্য ঢুকি। সিংহাসনে শায়িত মাটির মূর্তি। তাকে ঘিরে উদযাপন। একটু আগেই যাকে দেখতে গিয়ে মাঝরাস্তায় স্তব্ধ হয়ে ছিলাম, সেই মহাবিশ্ব কি একটুও হাসছে না এই জড়বাদী ভাবনার সীমাবদ্ধতায়? আরও একবার তাকিয়ে দেখি তার দিকে। নাঃ, সে একইরকম শান্ত, নির্লিপ্ত। কয়েকশো কোটি বছরের সাধনা তার, সে যে ক্ষুদ্রকে তুচ্ছ জ্ঞান করতে শেখেনি।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2086 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...