“আমি ভয় করব না ভয় করব না…”

প্রতিভা সরকার

 

হ্যাঁ, আমি ভয় পাচ্ছি। এত ভয় পাচ্ছি, যেন এই শীতে হাড়ে ঠকঠক আওয়াজ ওঠা থেকে শুরু করে শ্বেতশুভ্রতায় দুব্বো গজানো অব্দি সব মানসচক্ষে দেখতে পাচ্ছি। ভয় পেলে রামনাম করতে হয়, ছোটবেলায় শিখেছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি ঐ নামেই আমার সমস্ত ভয়ের শুরু।

রামমন্দির ওহি বানায়েঙ্গে— এই বিপুল গর্জন, সঙ্গে বাবরি মসজিদের গাঁইতি ঠোকার শব্দ থেকে এই ভয় শুরু হয়েছিল, সেটা ধর্মের নামে মব লিঞ্চিং, মনুস্মৃতির নতুন লালনপালন, মেয়েদের ওপর নতুন নতুন নির্যাতন এবং হালে সুপ্রিম কোর্টের রামমন্দির জাজমেন্ট হয়ে অর্থনীতির গোঁত্তা খাবার ভেতর দিয়ে, এনার্সি, ক্যা আমদানির পর এমন পোক্ত হয়ে উঠেছে যে সমস্তক্ষণ মনে হচ্ছে আমি এক নিরালম্ব বায়ুভূত আত্মাগোছের কেউ, যার ভবিতব্যই হচ্ছে কোনও অবলম্বন ব্যতীত ঝুলে থাকা। যিশুর তবু দৃশ্যমান ক্রুশ ছিল, আমার মতো অজস্র মানুষ নিরন্তর অদৃশ্য ক্রুশে ঝুলে আছে, মরণান্তিক যন্ত্রণায় তাদের আর্তস্বর অব্দি রুদ্ধ। কোথাও যার কোনও সান্ত্বনা নেই।

যার দেশ নেই, ঘর নেই, স্বজন নেই, যে কর্মহীন হতভাগ্য বন্দিমাত্র সে নিরালম্ব আর্ত নয় তো কী! শুধু অসমের ডিটেনশন ক্যাম্প নয়, কাশ্মিরের কথা কি মনে পড়ে আমাদের?

অথচ আপাতদৃষ্টিতে দেখলে এর কোনও কারণ নেই। আমার পিতামহ প্রায় দেড়শো বছর আগে অবিভক্ত ভারতের বাংলাদেশের উত্তরভাগে বসতি পত্তন করেন। অদ্যাবধি তত্র আমার পিতৃকুল বর্তমান। আমার পড়াশুনা চাকুরি সবই ভারত নামে দেশে, বিবাহ ভারতীয় নাগরিকের সঙ্গে, দুটি ভারতীয় নাগরিকের মাতা আমি। জন্মসূত্রে একটি হিন্দু নাম ও পদবি বহন করি বলে এইদেশে সংখ্যাগুরু যে পরিমাণ ক্ষীর খায় আমিও নিশ্চয় তা থেকে বঞ্চিত নই। আমার নাম শুনেই তো আর কেউ বলবে না, তুমহারে লিয়ে দো হি রাস্তে হ্যায়— সিধে পাকিস্তান চলে যানা, নেহি তো কবরিস্তান!

তবু যে আমি যারপরনাই ভীত, তার কারণ কী?

বড় ব্যাপারগুলো সবাই জানে। খুনখারাপি ধরপাকড় অত্যাচারের কথা অনেকেই বলবেন। আমি একইভাবে বিচলিত খুব ছোট ছোট ব্যাপারের বহুমাত্রিকতায়। এইরকম দুএকটি ছোট ব্যাপার বলি।

চেন্নাইতে অ্যান্টি-ক্যা, অ্যান্টি-এনার্সি জনমত বেশ প্রবল। নিজের ঘাড়ে এসে না পড়লে দাঁত ব্যথা কী বস্তু বোঝা যায় না, অনেক তামিল শ্রীলঙ্কার রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে সর্বস্ব হারিয়ে দেশান্তরী হতে বাধ্য হয়েছে। তাদের জ্বালা জুড়োবার বদলে ক্ষতে লঙ্কাগুঁড়ো ছড়িয়েছে দেশের সরকার; ক্যা আইনে যে যে দেশ থেকে এলে নিপীড়িত মানুষ শরণার্থী বলে গণ্য হবে তার মধ্যে বাংলাদেশ নেপাল পাকিস্তান, এমনকি আফগানিস্তান আছে, কিন্তু শ্রীলঙ্কা নেই। আর তামিল মুসলমানই বা সাত পুরুষের দেশ ছেড়ে কোথায় যাবে?

স্বাভাবিকভাবেই বিরাট তেরঙ্গা পতাকা নিয়ে, হাজার কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে বিশাল প্রতিবাদ মিছিল হয়েছে। বিক্ষোভ, আন্দোলন চলছে। এই দুই আইনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে মেয়েরা, তাই তাদের অংশগ্রহণ সর্বত্র দেখবার মতো। তামিল মেয়েরাও তার ব্যতিক্রম নয়। পৌষ মাঘ মাসে ঘরের দুয়োরে সেখানে কোলাম বা আলপনা আঁকার কথা। আমাদের মতোই সাদা চালের গুঁড়োর আধিক্য সে আলপনায়। মেয়েদের মধ্যে কেউ বুদ্ধি করে ছোট এক রাস্তার ফুটপাথে এঁকেছে কোলাম, যার লতাপাতার মোটিফে জড়িয়ে আছে নো এনার্সি, নো সিএএ এই কটি কথা।

আর যায় কোথা, সকাল সকাল আলপনা দিয়ে মেয়েরা ঘরে গিয়ে ভিজে চুল শুকোতে পারেনি, শুকোয়নি কোলামের ভেজা চালগুঁড়ো, হাঁউমাউখাঁউ করতে করতে পুলিশবাহিনি হাজির। কোলাম-আঁকিয়ে চারটি অল্পবয়সী মেয়ে ও এক তরুণকে তুলে নিয়ে গিয়ে আটকে রেখেছে! বিজেপি সাপোর্টে তামিলনাড়ু সরকার চলে কিনা, তাই এত শাস্তি দেবার তাড়া। এরপর যখন ধৃতদের সাহায্য করতে দুজন উকিল গেছে, পুলিশ তাদেরকেও ধরেছে। যেন আলপনা দেওয়া মহা অপরাধ আর সেই অপরাধীদের সাহায্য করবে এত বড় সাহস বিজেপিরাজ্যে কার!

আমার ভয় করছে কারণ আমাদের কী তবে প্রতিবাদের অধিকার নেই? অহিংস এবং অভিনব উপায়ে প্রতিবাদ সরকারি ঠ্যাঙাড়ে বাহিনি আটকায় কী করে? তামিলনাড়ু কি পুলিশ স্টেট যে রাস্তায় কোলাম আঁকতেও পুলিশের পারমিশন লাগবে? এরপর তো দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে এরা খোঁজ করবে এই দুই দানবীয় আইনের কোনও সমালোচনা গৃহস্থ করছে কিনা।

কালিঘাটের পটে একসময় নানা সামাজিক সমস্যা, উল্লেখযোগ্য ঘটনা শিল্পিত রূপ পেত। ইংরেজ পুলিশ পট ভেঙেছে, পটুয়াদের ধরে নিয়ে গেছে এমন তো শুনিনি। এখনও আমাদের মুর্শিদাবাদের মেয়েরা পট দেখাবার সময় গান করে, তাতে গুঁজে দেয় ঘরেলু সমস্যা থেকে সরকারি প্রকল্প, রাজনৈতিক গুঁতো। তবে কি তাদেরও পাততাড়ি গোটাতে বলা হবে?

আমাদের নির্বাচিত সরকার কি তবে ঔপনিবেশিক শাসকের থেকেও নিকৃষ্ট?

আমি খুব ভয় পাচ্ছি, কারণ স্বদেশে পূজ্যতে রাজা, বিদ্বান সর্বত্র পূজ্যতে, এই আপ্তবাক্য এদেশে একেবারে মিথ্যে হয়ে যাচ্ছে। আমরা তিনপুরুষ বুনো রামনাথের বংশধর। ধনাঢ্য নই, কিন্তু নারীপুরুষ প্রত্যেকেই স্বাবলম্বী। আমার বড়পিসি এক স্কুলের হেডমিস্ট্রেস ছিলেন, আজ বেঁচে থাকলে তার বয়স একশো ছুঁইছুঁই হত। আমরা চিরকাল পণ্ডিতের পূজা করে এসেছি এবং নিজেদের যতটুকু প্রাপ্য সমাজের কাছ থেকে তা পেয়েছি। ভাবিনি কখনও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ঐতিহাসিককে খোলা মঞ্চে অপমানিত হতে দেখব, তাকে টানাহ্যাঁচড়া করে স্টেজ থেকে নামিয়ে দেওয়া হবে। ভাবিনি মিথ্যের বেসাতি এত নির্লজ্জ হবে যে অশীতিপর শীর্ণ মানুষটির ঘাড়ে রাজ্যপালের দিকে তেড়ে যাবার, মারামারি বাঁধাবার আরোপ লাগানো হবে।

কেরলের রাজ্যপাল আরিফ মহম্মদ মাইকে এনার্সি ক্যা বিরোধী আন্দোলনের সমর্থকদের পাকিস্তানি এজেন্ট বলে গালাগালি করছিলেন, তখন ৮৮ বছরের পদ্মবিভূষণপ্রাপ্ত ইরফান হাবিব উঠে দাঁড়িয়ে মঞ্চে উপবিষ্ট কান্নুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে পরিস্থিতি সামাল দেবার অনুরোধ জানান। তখনই রাজ্যপালের দেহরক্ষীরা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাকে টেনে মঞ্চ থেকে নামিয়ে দেয়। ঘটনা ঘটে ইতিহাস কংগ্রেসে উপস্থিত বহু ডেলিগেটস ও দর্শকদের সামনে। তারপরও এই গোয়েবলসীয় মিথ্যার বেসাতি যে হাবিব স্যার রাজ্যপালকে আক্রমণ করেছেন ফ্যাসিস্ট প্রবণতার কথাই বলে।

তাহলে তামিলনাড়ুর কোলাম-আঁকিয়ে মেয়ে থেকে শুরু করে পণ্ডিতকুলশ্রেষ্ঠদের অন্যতম, কারওই শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার নেই। নিপাট কর্তাভজা হওয়াই কি তবে ভারতীয়ের ভবিতব্য?

এইভাবে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে প্রকাশ্যে বলপ্রয়োগে চুপ করিয়ে দেওয়া মান্যতাপ্রাপ্ত সঙ্ঘী কালচার। যাদবপুর এইট বিতে মঞ্চে ওগড়ানো মিথ্যে কথাগুলো সেদিন শুনতে শুনতে অসহ্য লাগছিল যাদবপুরের অধ্যাপিকা দয়িতা মজুমদার এবং আরও এক মহিলার। অজান্তেই তারা ‘না’ শব্দ উচ্চারণ করা মাত্র ঝাঁপিয়ে পড়ে সঙ্ঘী মহিলা ব্রিগেড। দুই ছাত্র তাদের বাঁচাতে এসে বেদম মার খায়। এইখানে এই পশ্চিমবঙ্গে, তাও আবার যাদবপুরে যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে সঙ্ঘী পীঠস্থান উত্তরপ্রদেশে কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।

এই ‘ছোট’ ঘটনাগুলোই মনে করিয়ে দেয় গৌরী-কালবুর্গি-পানেসরকে। কারণ এই প্রতিবাদ চুপ করাবার কর্কশ আওয়াজই কখনও কখনও আততায়ীর হাতের আগ্নেয়াস্ত্রের আওয়াজ হয়ে ফেটে পড়ে। মনে পড়ে যায় বন্দিশালার হিমেল লৌহকপাটের ওপারে সুধা ভরদ্বাজ আর তার সহমনস্কদের। আরটিআই অ্যাকটিভিস্টদের রেকর্ডসংখ্যক মৃত্যু ভয় দেখায়। উত্তরপ্রদেশের ব্যাপক হত্যা-ধরপাকড়, সাদাফের মতো অ্যাক্টিভিস্ট রাজনীতিকের ওপর হিংস্র অত্যাচার ভয়ে একেবারে বিকল করে দেয়।

আর তখনই শুরু হয় ভয়কাটানো বিশল্যকরণীর খোঁজ। আমরা জানতে থাকি কেরলে মুসলমান আন্দোলনকারীদের নামাজের বেলা বয়ে যায় দেখে এক হাজার বছরের পুরনো চার্চের গেট খুলে দিয়েছে যাজকের দল। শত শত নামাজ আদায়কারীর জন্য নামাজের আগে অবশ্যকর্তব্য প্রক্ষালন, তার ব্যবস্থাও হয়ে গেল ঝটপট। প্রক্ষালনের জল ঢেলে দেন চার্চের প্রধান যাজক স্বয়ং। উলঙ্গ করে অন্য সম্প্রদায়ের ধর্মীয় গুরুকে পেটানো যোগী আদিত্যনাথ জেনে যাক এই চার্চটির অনন্য দীর্ঘকালীন বৈশিষ্ট্যই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। হাজার বছর ধরে এই চার্চের ধর্মীয় শোভাযাত্রায় বংশপরম্পরায় সবার আগে পবিত্র দীপ বহন করে চলেন স্থানীয় এক হিন্দু পরিবারের সদস্যরা।

এই প্রাচীন ভারতবর্ষ, সহনশীলতার ভারত, পারস্পরিক সম্মাননের ভারতবর্ষ ধীরে ধীরে আমার ভয় কমিয়ে আনে। আমি আরও জানতে পারি জামিয়া মিলিয়ার ছাত্র আন্দোলনকারীদের আটকে রাখা হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই খবর পেয়ে এক ঘণ্টার মধ্যে কয়েক ডজন কালো কোট পুলিশ স্টেশনে পৌঁছে যায়। তারপর থেকে কয়েকশো উকিল নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রেখে চলছে যাতে ধৃত আন্দোলনকারীদের দ্রুত আইনি সাহায্য দেওয়া যায়। দিল্লি পাটনা ঔরঙ্গাবাদ লক্ষ্ণৌ মুজফফরনগর গোরখপুর বিজনর সর্বত্র প্রস্তুত সাহায্যের হাত।

ভয়-কাটানো বিশল্যকরণীর খোঁজ একবার পেয়ে গেলে বড় আনন্দ। রাম রহিম রণ, কোনও নামেরই আর দরকার পড়ে না। মিটিং মিছিলে অনেক পায়ের শব্দ ভয় কাটিয়ে ভরসা যোগায়। অনেক ছোটবেলায় শেখা গান গুনগুনিয়ে আমিও ছাত্রদের কুশপুতুল পোড়ানোতে হাজির হয়ে যাই—

আমি ভয় করব না ভয় করব না,
দুবেলা মরার আগে…

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2050 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. চারদিকে ভয়ের আবহ। রাষ্ট্রের ঠিকাদার আর তার লেঠেল গুন্ডাবাহিনী সবখানে মোতায়েন। তাও ভয় পাচ্ছি না। আপনার লেখায় ফের ঘুরে দাঁড়ানোর একটা তীব্র ইচ্ছে টের পাচ্ছি। লড়াই চলবে।

আপনার মতামত...