প্রোফেসর শঙ্কু, তাঁর ‘বিজ্ঞান’ এবং বাঙালির বিজ্ঞানবোধ

দেবাশিস্‌ ভট্টাচার্য

 

সাহিত্যের জগতে কল্পবিজ্ঞান বোধহয় আজ আর দুয়োরানি নয়, জুলে ভার্নে থেকে এইচ জি ওয়েলস হয়ে আইজাক আসিমভ, রে ব্রাডবেরি, আর্থার সি ক্লার্কের ধারায় সে নিরবচ্ছিন্নভাবে শুধু প্রবহমানই নয়, একই সঙ্গে ক্রমোন্নতিশীলও। বৈজ্ঞানিক ও প্রাযুক্তিক জ্ঞানের অকল্পনীয় উন্নতির পরিপ্রেক্ষিতে কল্পবিজ্ঞানের এই ক্রমপরিণতিটা অবশ্যম্ভাবী, এটা না হয়ে পারে না। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যত বেশি বেশি করে নানা নতুন ধারণার জন্ম দিতে থাকবে, নানা অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলবে, ততই মানুষের কল্পনা আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে ভাবতে থাকবে, এইটা যদি সম্ভব হয়, অমুকটাই বা নয় কেন? যদি ধরেই নিই, যে অমুকটা সম্ভব, তাহলে সমাজে তার ফলটা কি দাঁড়াবে? আচ্ছা, ধরা যাক একজন মারাত্মক প্রতিভাবান বিজ্ঞানী অমুক পরিস্থিতিতে তমুক জিনিসটা আবিষ্কার করে ফেললেন, কি ভয়ঙ্কর কাণ্ডটা হবে ভাবুন তো… এ ধরনের ভাবনাচিন্তা খুবই স্বাভাবিক, যেমনটি স্বাভাবিক এসব কল্পনাকে সাহিত্যের রঙে রাঙিয়ে প্রকাশ করাটা। সুতরাং দেশে বিদেশে কল্পবিজ্ঞানের কদর বাড়ছে, লেখাও হচ্ছে প্রচুর, মান অবশ্য সবসময় সমান নয়। ভালো লেখায় টানটান সাসপেন্স থাকে, সুন্দর যুক্তিতর্ক থাকে, সমৃদ্ধ অথচ যৌক্তিক কল্পনা থাকে, কখনও কখনও নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক ধ্যানধারণার যে সমস্ত দার্শনিক তাৎপর্য আছে সেগুলো নিয়ে অত্যন্ত গভীরতা ও মননশীলতার সঙ্গে নাড়াচাড়া করা হয়। এসব লেখা যেমন মজা দেয়, এন্টারটেন করে, তেমনি আবার বৈজ্ঞানিক মূল্যবোধ ও সচেতনতা বাড়াতে পারে, প্রযুক্তি ও মানবিক সম্পর্কের নানা টানাপোড়েনকে চোখের সামনে তুলে ধরতে পারে।

এই আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিতকে মাথায় রেখে এবার একটু এই বঙ্গদেশের দিকে চোখ ফেরানো যাক। এখানেও কল্পবিজ্ঞান বহুদিন যাবৎই লেখা হচ্ছে। এখন তো এমন জনপ্রিয় লেখক কমই আছেন যিনি একটিও কল্পবিজ্ঞান লেখেননি। দুঃখের বিষয়, মান খুব কম ক্ষেত্রেই আশানুরূপ। জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে প্রফেসর শঙ্কুর গল্প বাংলা কল্পবিজ্ঞানের মধ্যে প্রথম সারিতে পড়ে, সুতরাং বর্তমান লেখাটিতে আমরা প্রফেসর শঙ্কুর গল্পগুলোর মূল্যায়ন করার চেষ্টা করব, কিন্তু তার আগে দুটো ব্যাপার পরিষ্কার করে নেওয়া ভালো।

  1. কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের আলোচনায় সত্যি সত্যি বিজ্ঞানবোধ প্রতিফলিত হয় কিনা, এবং,
  2. যদি না হয়, তাহলে মূল্যায়নের সময় আমরা কি ধরনের মাপকাঠি ব্যবহার করব?

আগের কথাটা আগে হয়ে যাক। একটা কথা সকলেই নিশ্চয় মানবেন যে, একটি সমাজে যে কল্পবিজ্ঞান জনপ্রিয় হয়, সে কল্পবিজ্ঞানে সেই সমাজের বিজ্ঞান সম্পর্কে সামগ্রিক চিন্তাভাবনা কিছু না কিছু প্রতিফলিত হয়ই। আবার, অন্যদিকে, কল্পবিজ্ঞান কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে যেমন সমাজের বিজ্ঞান-সচেতনতা বাড়িয়ে তুলতে পারে, তেমনিই পারে বিজ্ঞান ও অবিজ্ঞানকে ভীষণভাবে গুলিয়ে দিয়ে গাঢ় ধোঁয়াশা সৃষ্টি করতে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, সমাজের বিজ্ঞানমনস্কতার স্তরটি আঁচ করা বা তাকে সঠিক বা বেঠিক দিকে চালিত করা— সব ব্যাপারেই জনপ্রিয় কল্পবিজ্ঞান পর্যালোচনা করবার একটা প্রাসঙ্গিকতা অস্বীকার করা যাচ্ছে না। অবশ্য আপাতত আমরা বাংলা জনপ্রিয় কল্পবিজ্ঞান-সাহিত্যের একটিমাত্র প্রতিনিধিস্থানীয় ক্ষেত্রের মধ্যেই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখব, বিভিন্ন ব্যতিক্রমকে মেনে নিয়েই।

এবারে দ্বিতীয় প্রশ্ন। এটি একটু বিস্তৃত আলোচনার দাবি রাখে। কেউ কেউ বলেন, শিল্প-সাহিত্যের ব্যাপারে ‘অমুক জিনিসটা করতে হবে, তমুকটা রাখা দরকার’ ইত্যাদি ধরনের ফতোয়া জারি করা বা কোনওরকম ফর্মুলা খাড়া করার চেষ্টা মাত্রই বেয়াড়া রকমের মুর্খামি। যাঁরা বলেন, তাঁরা যে পুরোটাই ভুল বলেন, এমনটা হয়ত নয়। কিন্তু এসব কথা খুব বেশি জোর দিয়ে বলার বিপদ হচ্ছে, এতে করে এই গুরুত্বপূর্ণ কথাটা বেমালুম চাপা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে যে, শিল্প-সাহিত্য একটি সামাজিক বিষয় এবং নয় নয় করেও এখানে একটা সাধারণ মাপকাঠি আছেই। সেটা বাদ দিলে সমালোচনা ব্যাপারটাই শুধুমাত্র ‘আমার ভালো লেগেছে’ বা ‘আমার ভালো লাগেনি’ এই দুই বিবৃতির যেকোনও একটিতে পর্যবসিত হয়। তাহলে এই উভয়সঙ্কটের মধ্যে একটা আপসরফা হয় কিনা দেখা যাক। আমরা বরং ‘কল্পবিজ্ঞান কীরকম হবে’-র বদলে ‘কল্পবিজ্ঞানের কী কী হওয়া চলবে না’ ধরনের নেতিবাচক মাপকাঠি ব্যবহার করে মূল্যায়নের চেষ্টা শুরু করি। তাহলে প্রশ্ন, কী কী হওয়া চলবে না? একটা লিস্ট তৈরি করে ফেলা যাক। এগুলো কিছু মূল সূত্র হিসেবে পরবর্তীকালের আলোচনায় ঘুরে ফিরে আসতে থাকবে।

সূত্র ১। বৈজ্ঞানিক ও প্রাযুক্তিক জ্ঞানের যেখানে শেষ, সেখান থেকে কল্পবিজ্ঞানের শুরু। সুতরাং বিজ্ঞান এখনও পর্যন্ত জানে না এমন তথ্য ও তত্ত্বের সমারোহ সেখানে থাকবেই। কিন্তু তা যেন বাস্তবের সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্ক-শূন্য না হয়। কাল্পনিক তত্ত্ব ও তথ্যসম্ভারে যৌক্তিক কাঠামোর অভাব থাকলে চলবে না। এমন দাবি নিশ্চয়ই করাটা  উচিত নয় যে, সব কল্পনার পেছনে নিখুঁত বৈজ্ঞানিক যুক্তি থাকবে, তাহলে তো প্রতিটা কল্পবিজ্ঞান গল্প লেখার সময়ে একটা করে নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার করতে হয়। কিন্তু অন্তত একটা আপাত গ্রহণযোগ্যতা না থাকলে খুব মুশকিল। জুলে ভার্নের সেই নটিলাস নামক সাবমেরিনের কথা বা কামানের গোলায় চড়ে চন্দ্রাভিযানের কথা ভাবুন। গল্পের মূল কল্পনাগুলো কি অসাধারণ বৈজ্ঞানিক ডিটেলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে বলুন তো? এসবের মধ্যে নানা ভুলত্রুটি থাকলেও সেগুলো খুঁজে বার করতে গেলে রীতিমত অ্যাকাডেমিক আলোচনার দরকার পরে, ইয়া পেরেলমানের ‘পদার্থবিদ্যার মজার কথা’ (বইটি বাংলা অনুবাদ এই নামেই পাওয়া যায়) নামক বইতে সেধরনের আলোচনা কিছু কিছু পাওয়া যায়। পাঠকের বিশ্বাস উৎপাদনের জন্য জুলে ভার্ন উপন্যাসের মধ্যে অঙ্ক কষতেও পিছপা হননি। কোনান ডয়েলের ‘দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ড’ও একটি চমৎকার উদাহরণ, যেখানে ব্যবহৃত হয়েছে পুরাজীববিদ্যার নানা খুঁটিনাটি তথ্য।

সূত্র ২। একবার একটি কল্পনা করে নেওয়ার পর স্ববিরোধিতা করা হলে যৌক্তিক কাঠামো নষ্ট হয়ে গিয়ে গ্রহণযোগ্যতা কমে যাবে। যেমন ধরুন, প্রথমে বলা হলো এমন একটি ওষুধ আবিষ্কার করা হয়েছে যার দ্বারা জীবদেহকে অদৃশ্য করে দেওয়া যাবে, কিন্তু পরবর্তীকালে ওই একই গল্পে দেখানো হল, ওই একই ওষুধে বাড়ি-গাড়িও অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। এধরনের ত্রুটি সযত্নে বর্জনীয়।

সূত্র ৩। গল্পে এরকম বিষয়ের অবতারণা করা হতেই পারে, যে ব্যাপারে বিজ্ঞান এখনও পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছে না, কিন্তু আজ পর্যন্ত বিজ্ঞান যা যা নিশ্চিতভাবে জানতে পেরেছে তার চেয়ে নীচুমানের তথ্য বা তত্ত্বের অবতারণা কোনও মতেই করা চলবে না। উদাহরণ দেওয়া যাক। আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী রেডিও টেলিস্কোপের সাহায্যেও মহাকাশের যে অঞ্চল ধরা পড়ে না, তারও ওপারে আপনি আপনার গল্পে কাল্পনিক মহাকাশযান নিয়ে ছুটে যেতে পারেন, সেখানে কী ঘটল বা কী দেখলেন তার সাতকাহন বর্ণনা দিতে পারেন (অবশ্যই মহাকাশ সম্পর্কে বর্তমান জ্ঞানের ভিত্তিতে), কিন্তু এমন কথা বলতে পারেন না যে, সূর্য পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে বা চাঁদে বসে বুড়ি সুতো কাটে ইত্যাদি ইত্যাদি।

সূত্র ৪। কল্পবিজ্ঞানের গল্পে অনিবার্যভাবে প্রযুক্তির কিছু ভেলকিবাজির ব্যাপার এসেই পড়ে। এতে গল্পের জৌলুস কিছুটা বাড়ে। কিন্তু এই ভেলকিবাজি যদি গল্পের মূল বৈজ্ঞানিক থিমকে অতিক্রম করে যায়, বা আদৌ কোনও বৈজ্ঞানিক থিমই যদি না থাকে তবে গল্প দাঁড়ায় না। সুপারম্যান, হিম্যান, এসব এধরনের ভেলকি-সর্বস্বতার উদাহরণ। সুতরাং, প্রযুক্তিকে কখনও বিজ্ঞানের ওপরে স্থান দেওয়া চলবে না।

সূত্র ৫। সবচেয়ে দরকারি কথাটা হল, কোনওভাবেই কোনওরকম বিজ্ঞান-বিরোধিতা করা চলবে না। ওপরে যে চারটে বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, সেগুলোও অল্পবিস্তর বিজ্ঞানবিরোধিতার মধ্যেই পড়ে, কিন্তু আপাতত ‘বিজ্ঞান-বিরোধিতা’ বলতে বিশেষ করে বৈজ্ঞানিক মূল্যবোধের সঙ্গে অধ্যাত্মবাদ, রহস্যবাদ, অলৌকিকত্ব ইত্যাদির ঘোঁট পাকিয়ে এক হচপচ তৈরির চেষ্টা, বা আত্মা, প্যারাসাইকোলজি জাতীয় জিনিসকে টেনে আনা ইত্যাদি। ফ্লাশ গর্ডন বা ম্যানড্রেকের গল্পে এধরনের বিজ্ঞানবিরোধিতার ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে। আছে অধিকাংশ বাংলা কল্পবিজ্ঞান গল্পেও, সেকথা আপাতত থাক। তবে সবসময় যে ব্যাপারটা এতখানি স্থূল হয় তা নয়। এমন অনেক গল্প আছে, যেগুলো আগের চারটি সূত্র অনুযায়ী নিখুঁত এবং উৎকৃষ্ট, কিন্তু তার মধ্যে বৈজ্ঞানিক কার্যকারণ সম্বন্ধে সন্দেহ ঘনিয়ে তোলা হয়েছে, বা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রকৃত রহস্য বিজ্ঞানের সাহায্যে আদৌ উদ্ঘাটন করা সম্ভব কিনা সে ব্যাপারে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, এবং/অথবা যুক্তি-বুদ্ধি-বিজ্ঞানের আওতার বাইরে কোনও বিরাট অলৌকিক সত্তার ইঙ্গিত করা হয়েছে।

এছাড়াও আরেক ধরনের বিজ্ঞান-বিরোধিতা আছে। সেটা হল, বিরাট বিরাট বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পেছনকার সামাজিক ও ঐতিহাসিক পরিস্থিতিকে অস্বীকার করে সমস্তটা ব্যক্তি-বৈজ্ঞানিকের ঘাড়ে চাপানো। আমরা জানি, কোনও বিজ্ঞানী যখন পৃথিবী তোলপাড় করা কোনও আবিষ্কার করেন, তখন তিনি আসলে এক মহান ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন। তার অব্যবহিত আগে দীর্ঘ সময় ধরে জমা হওয়া নানা খুঁটিনাটি উপাদান নিয়ে বিজ্ঞানের ইতিহাস এক অনিবার্য বিস্ফোরণের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। সমসাময়িক সম্ভাব্য নানা বিজ্ঞানীর মধ্যে একজন (সম্ভবত যোগ্যতম জন) সেইসব উপাদানের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে কাঙ্ক্ষিত বিস্ফোরণটি ঘটানোর বিরল কীর্তির অধিকারী হন। উপযুক্ত পরিপ্রেক্ষিত ছাড়া কোনও বড় আবিষ্কার সম্ভব নয়, এটুকু না মানলে মানুষের জ্ঞানবিজ্ঞান সবই আকস্মিক ও দৈবনির্ভর হয়ে পড়ে। আমরা মানতে বাধ্য, নিউটন সাহেব অ্যারিস্টটলের সময় জন্মালে বিশেষ সুবিধে করতে পারতেন না, তেমনি সেই বৈদিক যুগে জন্মালে আইনস্টাইনেরও মাথায় আসত না আপেক্ষিকতাবাদ।

বিমূর্ত কাউন্টারফ্যাকচুয়াল যুক্তিতর্ক পছন্দ নয়, পাথুরে প্রমাণ চান? কিচ্ছু অসুবিধে নেই, কতগুলো জানা কথা ভাল করে মনে মনে ভেবে দেখুন। নিউটন আবিষ্কৃত মহাকর্ষতত্ত্বের কথা ধরা যাক। এর ঠিক আগে সৌরজগতের সঠিক মডেল নানা বাদানুবাদ, নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে, নানা বিজ্ঞানীর নানা যন্ত্রণা ও ত্যাগস্বীকারের মধ্যে দিয়ে সর্বশেষ কেপলারের হাতে একটা সুস্থিত, সুঠাম রূপ পেয়েছে। অর্থাৎ, সৌরজগতের বর্ণনামূলক গাণিতিক মডেল পাওয়া গেছে, ভীষণভাবে দরকার পড়েছে একটি ব্যাখ্যামূলক প্রকল্পের (Explanatory Hypothesis)। সেটিই যুগিয়ে দেন নিউটন। বিজ্ঞানী হুকও একই সময়ে প্রায় একই কাজ করবার ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলেন, এবং নিউটনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক খুব একটা হার্দিক ছিল না বলে শোনা যায়। আইনস্টাইনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। মাইকেলসন ও মোর্লের পরীক্ষার অপ্রত্যাশিত ফলাফলকে ব্যাখ্যা করবার জন্য সেসময় বিজ্ঞানীমহল কোমর বেঁধে লাগেন। বহু প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়, তৎকালীন জ্ঞানের ভিত্তিতে সম্ভাব্য কোনও রাস্তাই প্রায় বাদ যায়নি। তার মধ্যে স্বনামধন্য পদার্থবিদ লোরেঞ্জ-এর গবেষণা ছিল যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য, তাঁর ব্যাখ্যাটি ভুল হলেও। যার জন্য, সনাতনী পদার্থবিদ্যার ‘গ্যালিলীয় রূপান্তরের’ (Galilean Transformation) স্থানে বর্তমানে যে অপেক্ষবাদসম্মত রূপান্তরের নীতি (Relativistic Transformation) ব্যবহার করা হয়, তার অপর নাম ‘লোরেঞ্জ রূপান্তর’ (Lorentz Transformation)। এছাড়া আইনস্টাইনের শিক্ষক মিন্‌কোভস্কি-র চতুর্মাত্রিক স্থান সংক্রান্ত গবেষণা বা রীমান কর্তৃক অ-ইউক্লিডীয় জ্যামিতির আবিষ্কার যে আইনস্টাইনকে সাহায্য করেছিল, একথা সকলেই জানেন। কিংবদন্তির নায়ক জীবতত্ত্ববিদ চার্লস ডারউইনের কথা ভাবুন। তিনি যে তাঁর পূর্ববর্তী গবেষক ল্যামার্কের বিবর্তনবাদ সংক্রান্ত ব্যাখ্যার দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন শুধু তাই নয়, অস্তিত্বরক্ষার সংগ্রামের ব্যাপারটা তাঁর মাথায় আসে ম্যালথাসের লেখা বই পড়ে। এমনকি, ওই একই সময়ে অনেকটা একই ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিলেন অপর এক প্রকৃতিবিজ্ঞানী আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস, এবং তিনিও ম্যালথাসের লেখা থেকে অনুপ্রেরণা পান!

আর উদাহরণ বাড়িয়ে কাজ নেই। বরং বলা যাক যে, প্রায়শই কল্পবিজ্ঞান লিখিয়েরা, বা অন্তত তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ, এসব বাস্তবতার ধারকাছ দিয়েও যান না। তাঁদের নায়ক বা চরিত্রদের বিজ্ঞানীদের ওসব পরিপ্রেক্ষিত-টরিপ্রেক্ষিত লাগে না, তারা শুধু ভয়ঙ্কর প্রতিভা দিয়েই কাজ সারে। তারা চরিত্রে কেউ দেবতুল্য, কেউ পাগলাটে, কেউ রক্তপিপাসু শয়তান, কেউ ডিটেক্টিভগিরিতে পটু, কেউ বা অধ্যাত্মবাদের মিশেল দেওয়া আধা-দার্শনিক চিন্তাভাবনায় মশগুল। তবে একটা জায়গায় সবারই খুব মিল, প্রত্যেকেই বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের চেয়ে চোখধাঁধানো নানা প্রাযুক্তিক উপকরণ তৈরির ব্যাপারে বেশি আগ্রহী, যেমন বুদ্ধিসম্পন্ন রোবট, লেসার বন্দুক, অদৃশ্য হয়ে যাবার ওষুধ, ঝাঁ-চকচকে উড়ন্ত মোটরবাইক, এই সমস্ত আর কি। অসীম প্রতিভাসম্পন্ন এইসব স্বয়ম্ভূ বিজ্ঞানীরা তাদের বিচিত্র কাণ্ডকারখানার সাহায্যে পাঠকের কাছে নিয়মিতভাবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে গুলিয়ে দিতে থাকেন। বিজ্ঞানবিরোধিতার এই অতি গুরুত্বপূর্ণ ধরনটির কথা আমাদের সবসময় মাথায় রাখতে হবে পরবর্তী আলোচনায়। মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে আর একটা মাত্র কথা বলে নিই। উপরোক্ত পাঁচটি নেতিবাচক মাপকাঠি কিন্তু আমরা যান্ত্রিকভাবে নিচ্ছি না। যেমন, এই মাপকাঠিগুলো লঙ্ঘন করলেও গল্প গ্রহণযোগ্য হতে পারে, যদি কৌতুক বা ব্যঙ্গের মেজাজে তা লেখা হয়ে থাকে, যেমন সুকুমার রায়ের ‘হেঁশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরী’— যা কিনা আদতে কোনান ডয়েলের ‘দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ড’ উপন্যাসের প্যারডি বিশেষ। সুতরাং, সব মাপকাঠিগুলোই আমরা ব্যবহার করব গল্পের মূল সুরের সঙ্গে মিলিয়ে।

ভূমিকা শেষ, এবার তাহলে শুরু করতে পারি। প্রফেসর শঙ্কুর গল্প মোটামুটি সিরিয়াস মেজাজে লেখা। প্রথম বই ‘প্রফেসর শঙ্কু’ কমিক মেজাজে লেখা হলেও পরের বইগুলোতে সে মেজাজ নেই। বিভিন্ন বই থেকে কয়েকটি গল্প আমরা আপাতত বিশ্লেষণ করে দেখব, স্থানের অপ্রতুলতার জন্যে সবগুলো গল্প আলোচনা করা সম্ভব হবে না। সত্যজিতের মৃত্যুর অনেক পরে প্রকাশিত ‘শঙ্কুসমগ্র’ সঙ্কলন নয়, এখানে ব্যবহৃত হবে অল্প কয়েকটি করে শঙ্কু-কাহিনি নিয়ে প্রকাশিত ছোট ছোট বইগুলো, যা আগে বেরিয়েছিল।

‘প্রফেসর শঙ্কু’ বইয়ের এক ‘প্রফেসর শঙ্কু ও গোলক-রহস্য’ ছাড়া কোনও গল্পেই কোনও মূল বৈজ্ঞানিক থিম নেই। কোনও গল্পে মঙ্গলগ্রহের জীবজন্তুদের পাওয়া গেছে (পুরনো আমলের কল্পবিজ্ঞান লিখিয়েদের ক্ষেত্রে ঠিক আছে, কিন্তু এখনকার জ্ঞানের পরিপ্রেক্ষিতে এটা নিশ্চিতভাবে নীচুমানের তথ্য, সূত্র তিন দেখুন), কোনও গল্পে সাধুবাবার মন্ত্রে কঙ্কাল প্রাণ পেয়েছে, দুটি গল্পে অপদেবতা-ভূতপ্রেতের উৎপাত (সূত্র পাঁচ), একটি গল্পে একটি ম্যাকাও পাখি সম্পূর্ণ কার্যকারণবিহীনভাবে মানুষের মতো বুদ্ধিমত্তা দেখিয়েছে (সূত্র এক), আর ‘প্রফেসর শঙ্কু ও চী-চিং’ গল্পে চৈনিক জাদুকর এমনই অসাধারণ সম্মোহনের খেল্‌ দেখিয়েছেন, যেরকমটা এক ম্যানড্রেক ছাড়া কেউ কোনও দিন পেরেছেন বলে শুনিনি, অন্তত স্বীকৃত কোনও সম্মোহন-গবেষক বা মনস্তত্ত্ববিদ যে তাঁদের বইতে ওরকম কিছু লিখে যাননি এটুকু নিশ্চিত (সূত্র এক এবং তিন)। ‘প্রফেসর শঙ্কু ও আশ্চর্য পুতুল’ গল্পটি তুলনায় অনেক নিখুঁত। এক বিজ্ঞানী এমন এক ওষুধ আবিষ্কার করেছেন যা ইঞ্জেকশন করলে জীবদেহ তার স্বাভাবিক আয়তনের দশ ভাগের এক ভাগ হয়ে যায়। তাই দিয়ে তিনি বিখ্যাত লোকদের পুতুল বানিয়ে ‘কালেকশন’ করতেন, এটাই তাঁর ‘হবি’। শঙ্কু কীভাবে তাঁর খপ্পরে পড়লেন এবং বেরিয়ে এলেন তাই নিয়ে টানটান গল্প। কিন্তু ওষুধটি কীভাবে কাজ করে তার একটা আপাত-গ্রাহ্য টেকনিক্যাল ডিটেলিং-এর কাজ দরকার ছিল, যা অনুপস্থিত (সূত্র এক)। এছাড়া স্ববিরোধিতাও আছে (সূত্র দুই)। ঐ ওষুধ ইঞ্জেকশন করলে মানুষ না হয় পুতুল হল, কিন্তু তার পোশাকও কিভাবে পুতুলের মাপে ছোট হয়ে যাচ্ছে? ব্যাখ্যা দূরের কথা, ব্যাখ্যার চেষ্টা পর্যন্ত নেই। ‘প্রফেসর শঙ্কু ও গোলক রহস্য’ গল্পের থিমটা কিন্তু বৈজ্ঞানিক। টেরাটম নামে একটি টেনিস বলের দ্বিগুণ সাইজের গ্রহ নিজের কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পৃথিবীতে এসে পড়েছে, সে গ্রহের বাসিন্দারা এক-একটি মারাত্মক ভাইরাস। তাদের সঙ্গে বিশেষ একটি যন্ত্রের সাহায্যে কথাবার্তা চালিয়ে শঙ্কু এসব তথ্য জানতে পারেন, এবং পৃথিবীর নিরাপত্তার কথা ভেবে তাদের শত অনুরোধ সত্ত্বেও কাচের আচ্ছাদন চাপা দিয়ে রাখেন। অবশেষে তারা অক্সিজেনের অভাবে দলে দলে মারা পড়ে। আকর্ষণীয় থিম, কিন্তু অত্যন্ত স্থূল ত্রুটিবিচ্যুতির সংখ্যা এত বেশি যে বলার নয়। গল্পটি নানা নীচুমানের তথ্যে ভর্তি (সূত্র তিন)। ওইটুকু গ্রহের মাধ্যাকর্ষণ কি প্রাণসৃষ্টির উপযুক্ত হতে পারে? মাধ্যাকর্ষণ কম বলে চাঁদেরই বায়ুমণ্ডল নেই, ঐটুকু গ্রহে কি করে অক্সিজেন থাকে? যদি বা থাকে, এত বিপর্যয়ের পরও তা ঠিকঠাক রয়ে গেল? বাইরে থেকে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে উল্কাদের মত সবশুদ্ধ পুড়ে ছাই হয়ে গেল না কেন? সেই নীচু ক্লাস থেকে ভূগোল ও বিজ্ঞানের বইতে আমাদের পাখিপড়া করানো হয়েছে, পৃথিবী সূর্যের চারধারে উপবৃত্তাকার পথে ঘোরে বলেই ঋতু পরিবর্তন ঘটে। অথচ এই গল্পে আমরা দেখলাম, টেনিস বলের দ্বিগুণ সাইজের গ্রহটিকে প্রফেসর তাঁর টেবিলে স্থিরভাবে কাচের ছাউনি দিয়ে ঢেকে রেখেছেন, এবং ল্যাবরেটরির ইলেক্ট্রিক ল্যাম্পের আলো এবং তাপ তার উপর একই দূরত্ব থেকে একটানা পড়ে চলেছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও ঋতু পরিবর্তন হতে আটকাচ্ছে না। গল্পের পরিণতিও অবৈজ্ঞানিক। কাচের ছাউনি দিলেও অক্সিজেনের অভাব হবার কথা নয়, যদি ওই গ্রহের ইকোসিস্টেম ঠিক থাকে। অতখানি মহাজাগতিক বিপর্যয়ের পর অবশ্য ইকোসিস্টেম ঠিক থাকার কথা না, কিন্তু ঋতু পরিবর্তন যখন হচ্ছে তখন নিশ্চয়ই ওটাও ঠিক আছে। সেক্ষেত্রে বাইরে থেকে অক্সিজেন সরবরাহের দরকার হবে কেন? স্বাভাবিকভাবেই একই পরিমাণ অক্সিজেনের রি-সাইক্লিং হতে থাকবে। এমন কি ইকোসিস্টেম নষ্ট হয়ে গেলেও বাকি বাতাস সমস্ত খরচ হতে দীর্ঘ সময় লাগবে। এ গল্পে অযৌক্তিক কল্পনা, স্ববিরোধিতা, নীচুমানের তথ্য সবই আছে (সূত্র এক, দুই এবং তিন)।

‘প্রফেসর শঙ্কুর কাণ্ডকারখানা’ বইতে পাঁচখানা গল্প আছে। প্রথম গল্প ‘প্রোফেসর শঙ্কু ও রোবু’। শঙ্কু মোটামুটি মানুষের মতো দেখতে একটি রোবো তৈরি করেছেন, সেটা খুব তাড়াতাড়ি অঙ্ক কষতে পারে, বিভিন্ন ভাষায় কথা বলতে ও বুঝতে পারে, আর দেখতেও পায়। অবশ্য এই দেখার ব্যাপারটায় গণ্ডগোল আছে। দেখতে হলে রোবোর চোখে দরকার ছিল লেন্স ও ফটো-ইলেক্ট্রিক সেল, কিন্তু বর্ণনা অনুযায়ী সে জায়গায় আছে দুখানা ইলেক্ট্রিক বালব, যার কাজ আলো দিয়ে অন্যকে দেখতে সাহায্য করা, কেন আছে বলা মুশকিল। অথচ বিজ্ঞানী বোর্গেল্টের তৈরি একেবারে তাঁরই মত দেখতে রোবট যখন বোর্গেল্টকে বন্দি করে শঙ্কুর কাছে বোর্গেল্টের নাম নিয়ে এল শঙ্কুর রোবটকে দেখতে, তখন বিজ্ঞানীরা কেউ না চিনলেও ঐরকম ভয়ঙ্কর ‘দৃষ্টিশক্তি’ নিয়ে শঙ্কুর রোবট তাকে ঠিক ধরে ফেলল। কেন, কীভাবে, সেসব প্রশ্ন তোলার মানে হয় না। ‘প্রফেসর শঙ্কু ও রক্তমৎস্য রহস্য’ গল্পে রক্তমৎস্যরা অন্য গ্রহের উন্নত প্রাণী, নিজেদের গ্রহে কোনও অসুবিধে ঘটায় মহাকাশযানে চড়ে পৃথিবীতে এসে সমুদ্রের তলায় গোপনে বসবাস করছে। গায়ের রং লালচে আর চেহারা মাছের মতো, তাই এই নাম। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন সমুদ্রতটে শতাধিক স্নানার্থী এদের আক্রমণে মারা যায়। আক্রমণ বলতে গলায় কামড় দেওয়া। বুদ্ধিমান প্রাণীরা (মানুষের চেয়েও, কারণ মানুষ অন্য সৌরজগতে অভিযান চালানোর অবস্থায় আসেনি) যদি গোপন থাকতে চায়, তাহলে এরকম ব্যবহার করবে কেন? তারা তো দূর থেকে প্রথমে মানুষকে স্টাডি করবে, তারপর সুপরিকল্পিতভাবে এগোতে চাইবে। এর মধ্যে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, যেমন হঠাৎ সামনাসামনি পড়ে যাওয়া, তখন আক্রমণ হতে পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে ইতর প্রাণীর মতো গলা কামড়ে ঝুলে পড়ার চেয়ে উন্নত কোনও অস্ত্র ব্যবহার করা এবং তারপর কোনওরকম সন্দেহ সৃষ্টি না করে প্রমাণ লোপের চেষ্টাটাই বেশি স্বাভাবিক হত বলে মনে হয়। রক্তমৎস্যের চেহারাটাও গুরুত্বপূর্ণ। ওই রকম চেহারা নিয়ে কি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নত হওয়া সম্ভব? হাত, পা এবং হাত-পায়ের আঙুল যথেষ্ট বিকশিত না হলে তো সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ এবং যন্ত্রনির্মাণ সম্ভবই নয়। সেখানে ঐরকম অপুরুষ্টু ‘হাত-পায়ের মতো কিছু একটা’ দিয়ে কাজ চলবে কি? গল্পে আরও দেখা যাচ্ছে, অনুবাদক যন্ত্র ‘লিঙ্গুয়াগ্রাফ’ রক্তমৎস্যদের ভাষা অনুবাদ করতে পারল না, যার মানে হচ্ছে (আমার নয়, এ ব্যাখ্যা গল্পকারের নিজের) তাদের ভাব ও ভাষা দুইই মানুষের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কী করে হয়? যারা দেশ ও কালের মধ্যে চলাফেরা ও অবস্থান করে, যারা বাঁচে এবং মরে, খাবার খায় এবং আক্রমণ করে, ভয়ও পায় আবার রাগও করে, নিজেদের মধ্যে ভাবের আদানপ্রদান করে, সমাজবদ্ধভাবে বাঁচতে জানে (সবই গল্পে আছে), তাদের ভাষার কিছু অনুবাদযোগ্যতা অন্তত থাকবেই। সবচেয়ে যেটা হাস্যকর সেটা হচ্ছে, তাদের মহাকাশযান সমুদ্রের তলার মাটিতে গেঁথে গিয়ে বিপদে পড়া, সবাই মিলে ধাক্কা দিয়ে প্রাণপণে সেটা তোলার ব্যর্থ চেষ্টা করছে, আর একটা একটা করে মরে যাচ্ছে। যারা মহাকাশযানে করে সুদূর মহাকাশ পাড়ি দেবার ক্ষমতা রাখে, ওই ভয়ঙ্কর বিপদে তারা কোনও বিস্ফোরণ না ঘটিয়ে বা যন্ত্র দিয়ে মাটিটা খুঁড়ে ফেলবার চেষ্টা না করে স্পেস্‌শিপে শরীর দিয়ে গুঁতোচ্ছে— ভাবতেই হাসিতে পেট গুড়গুড়িয়ে ওঠে (সবগুলোই সূত্র একের মধ্যে পড়বে)। ‘প্রফেসর শঙ্কু ও কোচাবাম্বার গুহা’ হল গুহাবাসী বনমানুষ জাতীয় প্রাণীর গল্প, যে পঞ্চাশ হাজার বছর ধরে বেঁচে রয়েছে এবং একা একাই অত্যাশ্চর্য সব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার করে ফেলেছে। এত দীর্ঘায়ু কীভাবে হল, বা সমাজবদ্ধভাবে না থাকলে জ্ঞানবিজ্ঞানের অগ্রগতি আদৌ সম্ভব কিনা সেসব প্রশ্ন না তুলে প্রোফেসর শঙ্কু ও বিজ্ঞানী ডামবার্টনের কথোপকথন তুলে দেওয়া যাক। এই কথোপকথন হয়েছে গল্পের একেবারে শেষে, যখন গুহায় অভিযান চালিয়ে বিজ্ঞানীদ্বয় গুহাবাসীর কথা জেনে ফেলেছেন এবং ভয়ঙ্কর ভুমিকম্পে গুহা ধ্বংস হয়ে গেলেও তাঁরা কোনও মতে ফিরে আসতে পেরেছেন।

ডামবার্টন ……… বলল, ‘পঞ্চাশ হাজার বছরের বুড়ো কেভম্যানের কথা লোকে বিশ্বাস করবে বলে মনে হয়?’
আমি হেসে বললাম, ‘যারা আমাদের পুরাণের সহস্রায়ু মুনি ঋষিদের কথা বিশ্বাস করে, তারা অন্তত নিশ্চয়ই করবে!’

এ নিয়ে আর কিছু বলার দরকার নেই, পাঠকরা নিশ্চয়ই যা বোঝার বুঝে নিয়েছেন।

যেসব গল্পে অযৌক্তিক কল্পনা আকাশ ছুঁয়েছে, তাদের মধ্যে অন্যতম হল ‘সাবাস প্রফেসর শঙ্কু’ বইয়ের প্রথম গল্প ‘আশ্চর্য প্রাণী’। শয়তানি বুদ্ধিসম্পন্ন জার্মান বায়োকেমিস্ট হামবোল্ট এবং শঙ্কু ল্যাবরেটরিতে প্রাণ সৃষ্টির উপযোগী পরিবেশ কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করে একটি কাচের ফ্লাস্কের মধ্যে প্রাণের উদ্ভব এবং বিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হন। শেষের দিকে হামবোল্ট শঙ্কুকে হত্যা করে সব কৃতিত্ব একাই নিতে চায়, কিন্তু ততক্ষণে ফ্লাস্কের মধ্যে মানুষের চেয়েও উন্নত প্রাণীর আবির্ভাব ঘটেছে। সে টপ্‌ করে ব্যাপারটা বুঝে নিয়ে ফ্লাস্কের মধ্যে থেকেই মারণরশ্মি ছুঁড়ে হামবোল্টকে ঘায়েল করে। গল্পের প্রতিটা খুঁটিনাটি ব্যাপারই এত অবৈজ্ঞানিক যে কোনটা বলব আর কোনটা রাখব ভাবতে গেলে মাথা ভোঁ ভোঁ করে। প্রথম কথা, হাজার চেষ্টা করেও বদ্ধ ফ্লাস্কের মধ্যে কখনও উন্মুক্ত বিশাল পৃথিবীর পরিবেশ নিয়ে আসা সম্ভব নয়। যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নিই যে, সেই সময়কার পৃথিবীর রাসায়নিক উপাদানগুলো একেবারে সঠিক মাত্রায় ফ্লাস্কের মধ্যে রাখা হয়েছে, তাহলেও শুধু বদ্ধ পরিবেশ এবং আকার আয়তনের পার্থক্যের জন্যই বিরাট পার্থক্যের সৃষ্টি হবে। তাছাড়া পৃথিবী সদা ঘূর্ণায়মান, কিন্তু ফ্লাস্ক স্থির। ঐরকম ক্ষুদে পৃথিবীর ক্ষুদে জীবদের কিন্তু একই অভিকর্ষজ ত্বরণের মোকাবিলা করতে হবে (যেহেতু ফ্লাস্কটি পৃথিবীর ওপরে রয়েছে) এবং তরলের পৃষ্ঠটান জাতীয় নগণ্য শক্তি তাদের কাছে দৈত্যাকার হয়ে দাঁড়াবে, নরম বস্তুও ঠেকবে মারাত্মক রকম কঠিন (যেহেতু অণু-পরমাণুরা একই মাপে ছোট হয়ে যায়নি)। এসব সামলিয়ে বাঁচতে গেলে তাদের জীবনধারাই পাল্টে যাবে, ফলে ওইভাবে প্রাণ সৃষ্টি এবং বিবর্তন যদি ঘটানোও যায় তাহলেও সে ক্ষেত্রে বিবর্তনের ধারা হবে সম্পূর্ণ অন্যরকম, ওইসব প্রাণীও হবে অভূতপূর্ব, আনকোরা নতুন। কিন্তু এসব তো অনেক সূক্ষ্ম যুক্তিতর্ক। এর চেয়ে ঢের বেশি স্থূল ভুলভ্রান্তির দিকে চোখ ফেরান। পৃথিবী এবং প্রাণীজগত যদি ফ্লাস্কের মাপে ছোট হয়ে আসে, তাহলে প্রত্যেকটি প্রাণী লক্ষ লক্ষ কোটি গুণ ছোট হয়ে গিয়ে জীবাণুর সমান হয়ে যাবে। অথচ গল্পে ফ্লাস্কের প্রাণীদের খালি চোখেই দেখা যাচ্ছে, কেউ এক ইঞ্চি লম্বা, কেউ বা দু’ইঞ্চি! তাদের ক্রিয়াকলাপও দেখা যাচ্ছে। আরও আশ্চর্য, বিবর্তনের পথে গাছপালা বাদে সব প্রাণীই দেখা গেছে একটা করে। মাত্র একটা করে প্রাণী জন্মালে অস্তিত্বের সংগ্রাম, যোগ্যতমের জয়, সুবিধাজনক প্রকরণের বাছাই ইত্যাদি অর্থাৎ বিবর্তন যে যে ভাবে ঘটে সেসব কিছুই সম্ভব নয়। ফলে গল্পে বিবর্তনের নিরবচ্ছিন্নতা অনুপস্থিত। ফ্লাস্কে একটা করে বিস্ফোরণ ঘটছে আর নতুন প্রাণী জন্ম নিচ্ছে। মানুষের জন্ম ঘটেছে দারুণ নাটকীয়ভাবে। ফ্লাস্কের মধ্যে বাঁদর ঘোরাঘুরি করছিল। হঠাৎ একটা বিস্ফোরণে সমস্ত ফ্লাস্ক জুড়ে জল, মাটি বনবাদাড় চলে গিয়ে আগাগোড়া সিমেন্টের মসৃণ মেঝে এসে গেল, তাতে পায়চারি করছে একটি মানুষ। তাকে আবার দেখতে শঙ্কুর মতো। সেই যে কঠোর শ্রম ও প্রাণপণ চেষ্টার দ্বারা মানুষ হয়ে ওঠার কথা আমরা পড়েছি, পড়েছি মস্তিষ্ক ও হাতের পরস্পর-সম্পর্কিত বিকাশের কথা, সেসব তাহলে নিশ্চয়ই গল্পকথা!

আসলে, প্রোফেসর শঙ্কুর বিশ্ববীক্ষাটা অন্যরকম। জগতটা একটা নিয়ত-পরিবর্তনশীল বস্তুতন্ত্র এবং এই পরিবর্তনশীলতা নানারকম বুদ্ধিগ্রাহ্য এবং অধ্যয়নযোগ্য নিয়মের অধীন— এমনটা তিনি ভাবেন না। তাঁর কাছে জগতটা আধা-মিস্টিক, ঠিক যেন বুদ্ধিগ্রাহ্য নয়। তবুও যে তিনি নানা আবিষ্কার করেন, সেটা শুধু তাঁর প্রতিভার জোর। যার জন্য তিনি কোনও তত্ত্ব-টত্ত্বের তোয়াক্কা না করে যখন যা দরকার তাই হুটহাট বানিয়ে ফেলেন। তাঁর ডায়েরি থেকে জানা যাচ্ছে, সেসব জিনিস নাকি কোনও কারখানায় বানানো যায় না। অনেক যন্ত্রপাতি যে জন্য বানানো হয়েছে তার বাইরে কাজ করলে বা অপ্রত্যাশিত ব্যবহার করলে তিনি খুব একটা অবাক হন না, কারণ তিনি মনে মনে জানেন, অবিশ্বাস্য যে কোনও কিছু যখন তখন ঘটতে পারে। ভূত, প্রেত, ঈশ্বর, টেলিপ্যাথি, ক্লেয়ারভয়েন্স, জ্যোতিষশাস্ত্র ইত্যাদিতে তিনি গভীর আস্থা রাখেন। তিনি ইউফোর আগমনের কথা যেমন মানেন, তেমনি এও বিশ্বাস করেন, যে অতি প্রাচীনকালে পৌরাণিক যুগের মানুষ উঁচুমানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আয়ত্ত করেছিল।

নাঃ, প্রোফেসর শঙ্কুর গল্প কল্পবিজ্ঞানের গল্প নয়, এ আমাদের সমাজের নানা অলৌকিক বিশ্বাসের গল্প, মিস্টিক চেতনাসম্পন্ন মানুষের আত্মসমর্পণের গল্প। শুনেছি এসব গল্প নাকি নানা ভাষায় অনূদিত হয়ে পাশ্চাত্যের পাঠকদের কাছেও পৌঁছেছে। জনপ্রিয় হয়েছে কিনা জানি না। হলে আশ্চর্য হওয়ার কারণ নেই। সন্ন্যাসী, মহারাজা আর সাপুড়ের দেশ থেকে আমদানি করা ওরিয়েন্টাল ‘কল্পবিজ্ঞান’ হয়তো সেখানকার পাঠকদের মুখ বদলাতে সাহায্য করবে।


“যুক্তিবাদী” পত্রিকা, ১৯৯৩, দ্বিতীয় বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা, ১লা বৈশাখ বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত, অন্য শিরোনামে । ‘চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম’ আন্তর্জাল পত্রিকায় পুনর্মুদ্রিত হল কিঞ্চিৎ সম্পাদনা সহযোগে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2050 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

3 Comments

  1. বৈজ্ঞানিক মননশীলতা অভাব ওনার লেখায় / সিনেমায় আরও আছে – “সোনার কেল্লা”।

    • সে তো আছেই । তবে, ফেলুদার গল্পে তা তবু কিছু কম । শঙ্কুর দশা শোচনীয় ।

  2. বিশ্লেষক দেখলাম খুবই উদ্বিগ্ন পাছে আমরা, যারা এগুলো পড়তে ভালবাসি, সেই বোকাসোকা লোকেরা এইসব গপ্পো পড়ে বেজায় রকম অবৈজ্ঞানিক হয়ে যাই। তা ওনারা নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। ওনারা বাদে আর যারা এই ধরনের লেখা পড়েন তারা এটাকে বিনোদনমূলক লেখা বলেই পড়েন, পাঠ্যপুস্তক হিসেবে নয়।
    দ্বিতীয়তঃ, প্রোফেসর শঙ্কুর গল্প যে কল্পবিজ্ঞান নয়, তা এত পরিশ্রম, এত কালি কাগজ খরচ করে প্রমান করার প্রয়োজন ছিল না। সত্যজিৎ রায় কোথাও দাবি করেননি এগুলো কল্পবিজ্ঞান অথবা আদৌ বিজ্ঞানভিত্তিক। গলদা চিংড়ীর গোঁফ যে মারণাস্ত্রের উপাদান হয় না সে জ্ঞানটুকু লেখকের সঙ্গে সঙ্গে পাঠকেরও আছে। বিশ্লেষকের অত ব্যাকুল হবার প্রয়োজন নেই।
    বিশ্লেষক অসামান্য ধীশক্তির পরিচয় দিয়ে গল্পগুলিতে সত্যজিৎ বাবুর ভুলগুলিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন। তাঁকে অসংখ্য ধন্যবাদ। তবে আমাদের মত নির্বোধ পাঠকের কাছে ওটা ভুল নয়, পাঠকের মনের তন্ত্রীকে গল্পের সুরে বাঁধার ক্ষমতা। যে ক্ষমতা আট থেকে আশীকে বইএর পাতায় আটকে রাখে। এই ক্ষমতার জোরই কোথাও ভিনগ্রহী ফুলেদের দিয়ে মানুষের মাথা থেকে জ্ঞান বুদ্ধি শুষিয়ে নেয়, কোথাও বা প্লাস্টিসিনে বিদ্যুৎ পাঠিয়ে প্রাণ সৃষ্টি করে আবার কোথাও বা ব্ল্যাকহোলের গলায় উপগ্রহের মালা পরিয়ে এনার্জি সংগ্রহ করে। নির্দ্বিধায় স্বীকার করছি, আমরা এগুলোই পড়ি, আনন্দ পাই।
    ভুল ঠিক, সম্ভব অসম্ভবের সীমারেখা এনারা তাঁদের কলমের জাদুতে ঘুচিয়ে দিতে পারেন। আমরা সাধারন পাঠকরা এটাই চাই। বেশি বুদ্ধি।খাটিয়ে আনন্দটা নষ্ট না হয় না-ই করলাম।
    এই প্রসঙ্গে আরো একটি কথা বলতে ইচ্ছে যায়। বিশ্লেষকের কল্প গল্পের গঠনপ্রণালীতে যা জ্ঞান দেখলাম, তাতে তিনি অন্যের সমালোচনায় সম্য নষ্ট না করে নিজেই তো কিছু দৃষ্টান্তমূলক কল্প গল্প লিখতে পারেন। আমরা পড়ে বাঁচি।

আপনার মতামত...