অসঙ্গতির সঙ্গত — ৮ম পর্ব

হিন্দোল ভট্টাচার্য

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

‘আমাদের সোনা রুপো নেই তবু আমরা কে কার ক্রীতদাস’ লিখেছিলেন জীবনানন্দ দাশ। আজকের ভারতবর্ষে বসবাস করলে একটা কথা বোঝা যায়, যে একমাত্র ক্ষমতায় যারা থাকে, তারা ছাড়া সকলেই ক্রীতদাস। সকলেই প্রবলভাবে অপমানিত হওয়ার যোগ্য। তারা মানুষ-ই নয়, কারণ তারা ক্ষমতায় নেই। এই যে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা মানুষজন ক্ষমতার বাইরে থাকা অসংখ্য মানুষকে প্রতি নিয়ত অপমান করে চলেন, এটাই কিন্তু আজকের ভারতের সংস্কৃতি। কারণ ফ্যাসিবাদ এমন এক অন্ধকার অসুখ, যা ঢুকে গেছে আমাদের অন্দরমহলে। ফ্যাসিবাদ চিরকাল এমন-ই। সে এক ভাইরাস, যা সমাজের শরীরের মধ্যে ঢুকে সমাজের আচরণগত পরিবর্তন ঘটিয়ে ফেলে। তা না হলে ফ্যাসিস্টদের বিরোধিতা যারা করছে, তারাই বা ভিতরে ভিতরে এত ফ্যাসিস্ট কেন?

একথা অনস্বীকার্য, যে আজ, আমরা একটা গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষে বসবাস করছি না। বসবাস করছি একটি হিন্দুরাষ্ট্রে। অদ্ভুতভাবে, এমনটা কিন্তু হওয়ার কথা ছিল না। কারণ, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের প্রযুক্তি, আমাদের জীবনধারণ, আমাদের দর্শন, আমাদের ভাবনার পরিসর সমস্ত কিছুর-ই পরিধি অনেক বেড়ে যাওয়ার কথা। আমাদের জানার কথা, ধর্ম মানে কিছু উৎকৃষ্ট সাহিত্য, এমন কিছু সময়ের ইতিহাস, যেগুলি এখনও প্রতীকী পোশাকে নিজেদের আসল ন্যারেটিভকে ঢেকে রেখে আমাদের সামনে হাজির হচ্ছে। কিন্তু এটিও ঠিক, ধর্ম হল মানুষের সৃষ্টি। প্রকৃতির সৃষ্টি নয়। আধ্যাত্মিকতা জড়িত থাকে প্রকৃতির সঙ্গে। কোনও অনুশাসন কখনওই আধ্যাত্মিকতার সূত্র হতে পারে না। ঈশ্বরের ধর্ম নেই কোনও, যেমন তার কেন্দ্র নেই, পোশাক নেই, রং নেই, এমনকী তাকে মানুষের মতো দেখতেও নয়।

কিন্তু থাক, এসব তর্ক। নাস্তিকতা আস্তিকতা নিয়ে তর্কের মধ্যে জড়িয়ে গিয়ে আসল কথাগুলি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কোনও মানেই হয় না। প্রবল এক অসঙ্গতির মধ্যে আমরা পড়ে গেছি। সবচেয়ে বড় কথা, আজ সারা দেশ জানে, যে, আমরা এখন কোনও গণতান্ত্রিক দেশে বসবাস করছি না। যদি বসবাস করতাম, তাহলে এত নগ্নভাবে হিন্দু ফ্যাসিস্ট শাসকরা তাদের ফ্যাসিস্ট শাসন এত নির্বিচারে চালাতে পারত না। কিন্তু মানুষের তাতেও শিক্ষা হয়নি। চারিদিকে প্রচুর কথা শুনতে পাচ্ছি, এবার এরা একটু বুঝুক। এবার লুঙ্গিড্যান্স একটু বন্ধ হোক। ফ্যাসিজম এসে গেছে ভাই, সে এবার আপনার সামান্য বিরোধী কণ্ঠ পেলেই আপনাকে তাড়া করবে, নির্বিচারে মারবে, আর তার জন্য কোনও উত্তর পর্যন্ত দেবে না। ঠিক যেমনটা দেখা যাচ্ছে এখন উত্তরপ্রদেশে, দিল্লিতে। গৌরী লঙ্কেশ, কালবুর্গি, সুজাত বুখারিকে হত্যার সময়েই বোঝা কি যায়নি এই দিন আসছে? দেশটাকে সম্পূর্ণভাবে আম্বানি-আদানিদের হাতে বেচে দেওয়ার সময় বোঝা যায়নি? বিরোধী কণ্ঠ পেলেই তাকে রুদ্ধ করে রাখার কৌশল দেখে বোঝা যায়নি? পাকিস্তান পাকিস্তান করে চেঁচিয়ে, সন্ত্রাসবাদের জুজু দেখিয়ে কাশ্মিরে দিনের পর দিন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালিয়ে রাখার সময় বোঝা যায়নি? যখন জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, পেট্রল ডিজেল গ্যাসের দাম বাড়ছে, ওষুধের দাম বাড়ছে, শিক্ষা স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় প্রচুর সমস্যা, দেশের ৮০% জায়গায় ভালো স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই, কৃষকরা আত্মহত্যা করছেন, চাকরি নেই কোটি কোটি মানুষের, স্যালারিও কমছে, দেশের সমস্ত মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা, বেঁচে থাকার সমস্যা, সেখানে মিত্রোঁ বলছেন— মন্দির ওহি বানায়েঙ্গে। বলছেন— যারা এনআরসির বিরুদ্ধে, তাদের লাশের উপর দিয়েই এনআরসি হবে। বলছেন— বদলা নেব। বলছেন— সিএএ না চাইলে পাকিস্তান চলে যাও।

আমার এক প্রাক্তন সহকর্মী, তিনি বিজেপির কট্টর সমর্থক। আমাকে বার্তা পাঠালেন, এভাবে দেশটার উন্নতি হবে না, যারা ভোটে জিতে এসেছে, তাদের উপর বিশ্বাস রাখো। তাঁকে প্রশ্ন করলাম, ভোটার আইডি কার্ড আমার নাগরিকত্বের প্রমাণ নয় কেন? তিনি উত্তর দিলেন— ভোটার আইডি কার্ড ভোটের সময় লাগে। তো, আমার প্রশ্ন, তাহলে যাঁর কাছে ভোটার আইডি কার্ড আছে, যিনি ভোট দিয়েছেন, তিনি নাগরিক নাও হতে পারেন, কিন্তু ভোট দিতে পারেন? উত্তর নেই। প্রশ্ন করলাম— তাহলে, প্রবাবিলিটি থিয়োরি অনুসারে, এখন দেশের সমস্ত ভোটার-ই হয় নাগরিক অথবা অনুপ্রবেশকারী? মানে, তিনি নাগরিক নাও হতে পারেন, আবার হতেও পারেন। সে বলল— হ্যাঁ। তাহলে, ভোটে জিতে যারা ক্ষমতায় আসছে, তাদের জেতাটাও হয় বৈধ নয় অবৈধ। কারণ পরিসংখ্যানকে যদি ধরি, তবে, নাগরিক যদি না হই, তাহলে ভোটার আইডি কার্ড থাকার কথা না, আর ভোটার আইডি কার্ড থাকলে আমি ভোটার। আর আমি ভোট দিলে এবং আমি নাগরিক না হলে, যাকে জেতালাম, সে বৈধ ভোটে জিতল না। সে এবার একটু ক্রুদ্ধ। আমি বললাম আরে রেগে গিয়ে তো লাভ নেই। সন্দেহ যদি বিশেষ ধর্ম বা জাতিভেদে বা এলাকাভেদে না হয়, এটা যদি দেশের সমস্যা হয়, তবে, স্বীকার করতে হবে, যে ভোটে জিতে এসে বিজেপি সকলকে নতুন করে নাগরিকত্ব দেবে এই মর্মে, যে আগের নাগরিকত্বের প্রমাণগুলি বাতিল, তাহলে সেই যুক্তিতে তাদের ভোটে জেতাও তো অবৈধ। কিন্তু তারা অবৈধ একটা ভিতের উপরে দাঁড়িয়ে নিজেরা সব পরিবর্তন করবে বলছে। কিন্তু প্রবাবিলিটি থিয়োরি অনুসারে যারা ভোটে দাঁড়াচ্ছে তারাও সন্দেহের তালিকায়। এমনকী মোদি এবং অমিত শাহ-ও। তাহলে তাঁরা এও ঘোষণা করুন, সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যাপারটিও অবৈধ। কারণ ভোটাররা নাগরিক কিনা, তাই ঠিক নেই। যিনি ভোটে দাঁড়াচ্ছেন, তিনিও তো ভোটার। অতএব… সে এবার প্রবল ক্রুদ্ধ। ‘মন্দির বানিয়েছি’, ‘সিয়াচেনে সেনারা যুদ্ধ করছে’, ‘ বীর সাভারকর’, ‘মোদি সর্বশক্তিমান’ আর শেষে ‘জয় শ্রীরাম’ টাইপ যুক্তি দিচ্ছে।

আমি তাকে পিরানদেল্লোর একটি নাটকের কথা বলতে গেলাম যেখানে একজন সব কাগজপত্র হারিয়ে ফেলেছে। সে শুনলই না। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে এতদিন পর্যন্ত আমি কি দেশের নাগরিক? বলল— না। জিজ্ঞেস করলাম— আধার কার্ড ভোটার কার্ড পাসপোর্ট তাহলে সবকিছুই ভুয়ো? বলল— হ্যাঁ। বললাম— তাহলে অসংখ্য ভোট অবৈধ। বলল— হ্যাঁ। বললাম— তাহলে তোমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতাও দুর্বল ভিতের উপর। বলল— না।

তার পর বলল- বেশি বললে দেশ থেকে বের করে দেব।
জিজ্ঞেস করলাম কোন দেশ? বলল— ভারত। জিজ্ঞেস করলাম কোন ভারত?
বলল— হিন্দুরাষ্ট্র।
শুধু বললাম ওটা আমার দেশ না।

আসলে কোন দেশের কথা তাঁরা বলছেন? কোন দেশ? দেশ কাদের নিয়ে কী নিয়ে তৈরি হয়? দেশ কি ধর্ম জাতি কাঁটাতার দিয়ে তৈরি হয়? নাকি দেশ গড়ে ওঠে দেশের মানুষদের নিয়ে? আজ শুধু চলছে শাসকদের সকলের সামনে নগ্নভাবে সন্ত্রাস এবং ভয় দেখানোর পালা। পুলিশ মিলিটারি মানে রাষ্ট্রের হাতিয়াররা নেমে পড়েছে। ছাত্রদের উপর গুলি চালাচ্ছে নির্বিচারে। গণহত্যা চলছে উত্তপ্রদেশে। দেশের অধিকাংশ জায়গায় এখন ইন্টারনেট বন্ধ। স্বাধীনভাবে মানুষের মতামত প্রকাশের জায়গাগুলিকেই বন্ধ করে রাখার পরিকল্পনা হচ্ছে।

ছোটবেলায় আমি খুব একটা বাধ্য ছিলাম না। এখনও নই। তো, কথা না শুনলেই আমার মা ও বাবা আমাকে বলতেন, বাড়ি থেকে বের করে দেব। দরজাই খুলব না। তো, আমার তো চিরকাল ভাবা অভ্যেস। একদিন ভাবতেই বসলাম— আমাকে যদি সত্যিই বাড়ি থেকে বের করে দেয়, তবে আমি যাবটা কোথায়? তার পর ভাবলাম, আমি তো জন্ম থেকে এই বাড়িটাই দেখছি। এই ঘরেই পড়াশুনো, খেলা, এই ঘরেই এই যে আলমারির বই। আমি তো অন্য কোনও ঘরের কথা জানিই না। তো একদিন, খেলে একটু দেরি করে বাড়ি এলে, প্রচুর রাগের মাথায় মা বললেন— এবার সত্যি সত্যি বাড়ি থেকে বের করে দেব। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কিন্তু এ বাড়িটা তো আমারও। মা বলল— কী? এখন থেকে বাড়ি আমার? আর ঢুকতে যদি না দিই? আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম— কিন্তু আমাকে অন্য কোনও বাড়িতে ঢুকতে দেবে না, আর আমি তো অন্য কোনও ঘরে যাইনি কখনও। মা বলল— তাহলে কথা শুনে চল। বুঝলাম— ঘরে থাকতে গেলে, বাড়িতে থাকতে গেলে, যা বলবে শুনে চলতেই হবে। মেনে চলতে হবে নিয়ম, আইন, না হলেই বের করে দেবে। যারা বের করে দেয়, তারাই শুধু আইন বানাবে। আর সে আইন মেনে চলতে হবে। কারণ, ভয়। যদি বের করে দেয়।

মা বাবা অবশ্য বাড়ি থেকে কোনওদিন আমাকে বের করে দেয়নি। কিন্তু এই যে বাড়ি, এটা তো একটা রাজ্যে। এই যে রাজ্য, এটা একটা দেশে। আমি টের পাই সেই ভয়। যাদের ক্রমাগত বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে তোমাদের পায়ের তলার জমি নেই, মাথার উপর ছাদ নেই।

সমস্যা হল, ফ্যাসিস্টরা নিজেদের সকলের বাপ মা ঈশ্বর মায় নিয়তি হিসেবেও মনে করে। এই যেমন মোদি বললেন— আমাকে ঘৃণা করো, কিন্তু ভারতকে কোরো না। যেমন হিটলার বলেছিলেন— হেট মি, বাট ডু নট হেট জার্মানি। আশ্চর্য মিল!

কিন্তু এদের কে বোঝাবে ভারতের আদর্শ আর তোদের আদর্শ এক নয়। কে বোঝাবে, ভয় দেখিয়ে কয়েকদিন শাসন করা যায়। কিন্তু মানুষ যেদিন ভয় পাওয়ার মতো ব্যক্তিগত মায়াগুলিকে হারিয়ে ফেলবে, সেদিন কিন্তু সে ভয় দেখাবে। তখন সব মানুষকে দেশবিরোধী বা সন্ত্রাসবাদী বললে কিন্তু খেলব না। ইতিহাসের স্ক্রিপ্টেও একটা হ্যাপি এন্ডিং থাকে। তা সে এন্ডিং যত রক্তপাতের মধ্যে দিয়েই আসুক না কেন!

রক্তপাতের রাজনীতি অনেকেই চান না। আমরা কেউই চাই না। কিন্তু অসঙ্গতির জায়গাটি হল, ফ্যাসিস্টরা সহজে অনুভূতিশূন্যতা থেকে অনুভূতিপ্রবণ হয়ে উঠবে এ কথা ভাবাটাও অন্যায়। আর পৃথিবীর কোনও এমন জায়গার ইতিহাস নেই, যেখানে ফ্যাসিস্ট শাসকরা নির্বাচনে পরাজিত হয়ে হার স্বীকার করে নিয়েছে। এমনিতেই যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে মোদি সেনাবাহিনির ডিরেক্টর জেনারেল হয়েও যেতে পারেন। সেনাবাহিনি চোখ রাঙাতে শুরু করে দিয়েছে।

এই চোখরাঙানির সংস্কৃতি কিন্তু ভয়ানক। আর দুর্ভাগ্য হল, তা কী শাসক, কী সাধারণ মানুষ, সকলের মধ্যেই ঢুকে পড়েছে। ক্ষমতার স্বাদ পেলেই ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা লোকজনের দলবলের মধ্যেও এই চোখরাঙানির সংস্কৃতি ঢুকে পড়েছে। যেন তাদের হাতেই সব। যেন তারা মানুষের জীবনের দাদামশাই। তবে, সে আলোচনা অন্যত্র করা যাবে।

এখন শিরে সংক্রান্তি। এই হিন্দুরাষ্ট্রে কোনও বিরোধী কণ্ঠই থাকবে না। শোনা যাবে শুধুমাত্র অবনত হয়ে থাকার স্লোগান। মানুষ দলবেঁধে এই বিজেপি আরএসএস–এর ফ্যাসিস্ট শাসকদের সামনে প্যারেড করবে। অসঙ্গতির জায়গাটি হল, এই দেশে এখনও নির্বাচন হলে ভারতীয়রা ভোট দিয়ে নিয়ে আসবে এই ফ্যাসিস্টদের-ই। মেজরিটি নামক সংখ্যাতত্ত্বের ভূত এদেশের গণতন্ত্রকে নিয়ে যাবে যেখানে, সেখানেই আমাদের যেতে হবে।

কথা হল এই, যে, আমাদের করণীয় কী? এই হাজারো অসঙ্গতির মধ্যে পড়ে আমরা ঠিক কী করব? খুব তো নিয়ম মেনে মতাদর্শ অনুসরণ করে আমাদের প্রতিক্রিয়াগুলি আসবে না। কারণ আক্রান্ত হলে আর্তনাদের ভাষা আইনকানুন মানে না। মানুষ তো নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করবেই। তাই না?

 

(ক্রমশ)

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2086 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...