রাজা সুলেমান

সাদিক হোসেন

 

সন্ধানে ছিলাম নাজিবের। দেখা হয়ে গেল সুলেমানের সঙ্গে। সুলেমান আমার সঙ্গে মাধ্যমিক অব্দি পড়েছিল। একদিন মাথায় লাল রঙের ফেট্টি বেঁধে সে গায়ক হবে বলে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছিল। কোথায় যে গেছিল তা কেউ জানে না। এখন সে দক্ষিণ কলকাতার একটা শপিং মলে বাচ্চাদের খেলনার গাড়ি চড়ায়।

সুলেমান যে শপিং মলে চাকরি করছে তা আমি জানতাম না। শুনেছিলাম নাজিবের কোন বন্ধু দিল্লি থেকে কলকাতায় চলে এসেছে। পালিয়েই এসেছিল, কিন্তু ইংরাজি জানার সুবাদে এই শপিং মলের কোন শো-রুমে আপাতত ম্যানেজারির চাকরি নিয়েছে। সেজন্যই ছানবিন চালাচ্ছিলাম। এক্সেলেরেটর দিয়ে উপরে উঠছি, কে যেন কাঁধে হাত দিল। কে? তাকিয়ে দেখি তিনি আমার দিকে তাকিয়ে হাসছেন।

–চিনতে পারিসনি তো?
–সুলেমান!
–এই তো। সে আশ্বস্ত হয়ে বলল, ভাবছিলুম চিনতে পারবি না। এই দেখ্, তোরা কেমন পাল্টে গেছিস।
–পাল্টে গেছি? কেমন?
–সে আর বলতে। চুলগুলো সব পাকিয়ে ফেলেছিস। দেখলে মনে হয় কী সিরিয়াস মানুষ। স্কুলের কথা মনে আছে তোর?

সুলেমানকে কী ভোলা যায়! ও ছিল আমাদের গানের ভাণ্ডার। যাবতীয় যা নিষিদ্ধ, তার স্বাদ আমরা সুলেমানের মাধ্যমেই পেতাম।

সেইসময় হিন্দি র‍্যাপে বাজার গরম। এই গান বাড়িতে, স্কুলে অচল। লুকিয়ে লুকিয়ে শুনতে হত। আমার কাছে একটা ফিলিপ্সের ওয়াকম্যান ছিল। প্লাটফর্মের পাশে রন্টুদার দোকানে ব্ল্যাঙ্ক ক্যাসেট দিয়ে গানের লিস্টি জমা দিলে দু-তিনদিন পর রন্টুদা সেই গানগুলো রেকর্ড করে ক্যাসেটটা ফেরত দিত। গানপিছু দু-টাকা। তা, এই রন্টুদা, শুধু যে গান বেচত তা-ই নয়; কীভাবে যেন তিনি এই এলাকার সবকটা ছেলেপুলের গার্জেন বনে গিয়েছিলেন।

আমার লিস্টিতে বাবা সায়গালের নাম দেখে তিনি তো রেগেই আগুন। আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, ছ্যা ছ্যা আজকালকার ছেলেরা কোথায় নেমে গেছে। মাস্টারের ছেলে হয়ে কী না বাবা সায়গাল!

আমি প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বলি, বাবা সায়গাল শুনব না?

তিনি আমার দিকে এমনভাবে তাকান যেন এই ঘৃণ্য জীবটির সঙ্গে কথা বলাই পাপ। কোনও উত্তর দেন না। অন্য খদ্দেরদের সঙ্গে বাতচিত চালাতে থাকেন।

এদিকে ব্ল্যাঙ্ক ক্যাসেটটা রন্টুদার হাতেই ধরা। ওটা না নিয়ে যাওয়া যাবে না। আমি করুণ চোখে অপেক্ষা করতে থাকি। প্রায় মিনিট দশেক পর তিনি আমার দিকে ফেরেন, কোন ক্লাস?

–সেভেন।
–সেভেন?

মাথা নাড়াই। লজ্জায় আর মুখে কথা আসে না।

–বাবা সায়গালের গান কোথায় শুনেছ?
–টিভিতে।
–চিত্রহার?
–সুপারহিট মুকাবুলা।

তিনি আবার মুচকি হাসেন, এসবই চলবে এবার। মাস্টারের ছেলেরাও মান্না-কিশোর শোনে না। আমরা তো বাবা দোকানদার। অতকিছু বুঝি না। তোমাদের মত বয়সে আমরা বড়দের সামনে ফুলপ্যান্ট পরে হাঁটতে পারতাম না। ওটা ইংরাজি পোষাক তো!

এতক্ষণে আমার মাথায়ও মোক্ষম বুদ্ধিটা চলে এসেছে, না রন্টুদা, গানগুলো আমি নিজের জন্য নিচ্ছি না। মুজাফফর এইসব গান শোনে। ক্যাসেটটা তো ওরই। আপনি ঠিকই বলেছেন। গানগুলো খুব খারাপ। খালি চেঁচায়। গলায় সুর নেই। আপনি বরঞ্চ এইখানে হেমন্তের গান রেকর্ড করিয়ে দিন।

রন্টুদাও অত সহজে মুরগি হবার পাত্র নয়, এই যে বললে তুমি টিভিতে ওর গান শোনো। আর ক্যাসেটটা তো মুজাফফরের।

আমি ঘাবড়ে যাই। কী বলব বুঝতে পারি না। কোনওরকমে বলি, টিভি তো খুব একটা দেখা হয় না। পড়াশোনর কী চাপ। এবার থেকে আবার বীজগণিত শিখতে হচ্ছে। ঐ সেবার সুপারহিট মুকাবুলায় শুনেছিলাম। ঐ একবারই।

–মুজাফফর কে?

–ছলিম কাকার ছেলে।

ছলিম কাকা আমাদের এলাকার সবথেকে বড়লোক। অত বড়লোক বাপের ছেলের তো কোন অভিভাবক থাকতে নেই— রন্টুদা তাই দমে যান। বলেন, হেমন্তের গান দিলে ও কিছু বলবে না?

–কী আর বলবে! আসলে ওরা তো হেমন্তের গান শোনেনি, তাই বাবা সায়গালের গান শোনে। একবার হেমন্তের গান শুনলে কী আর বাবা সায়গাল কেউ শোনে?
–তা কী কী গান চাই? হিন্দি না বাংলা?

হিন্দির থেকে বাংলা গান শোনা বেশি ভদ্রতার পরিচয়। আমি নির্দ্বিধায় জানাই, বাংলা। রবীন্দ্রসঙ্গীত।

বাবা সায়গালের এলব্যমের বেশ দাম। ব্ল্যাঙ্ক ক্যাসেটে রেকর্ড করিয়ে নিলে অনেক সস্তায় পড়ত। পরিবর্তে আমি দু-দিন পর হেমন্তের রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে ঘরে ফিরি। ক্যাসেটটা মাকে দিয়ে বলি, এই দেখো মা, তোমার জন্যে কী এনেছি!

প্রতিবারের মত এবারেও আমাকে বাঁচায় সুলেমান। ও যে শুধু বাবা সায়গালের গান শোনায় তা-ই নয়, একটা ক্যাসেটও দেয়। এক সপ্তাহের জন্য ভাড়া ১০ টাকা। তবে বেশ হেয় করে বলে, তোরা কেন যে বাবা সায়গালের গান শুনিস বুঝি না। আসল র‍্যাপ তো অ্যাপাচি ইন্ডিয়ানের। ঐটা শোন।

–অ্যাপাচি ইন্ডিয়ান? এই প্রথম আমি নাম শুনলাম।

সুলেমান বলল, ট্যাঙ্কির পাশে বিকেল পাঁচটায় চলে আসিস।

স্কুলের পেছনে কশাইপাড়া। পাড়ার ভেতের ছোট্ট মাঠ। আসলে সেটি আর মাঠ নেই; এলাকার যাবতীয় নোংরা সেখানেই ফেলা হয়। সেই মাঠের পাশেই জলের ট্যাঙ্কি। ট্যাঙ্কিটি কোনও একসময় কুরেশিদের ছিল। এখন সেই কুরেশিও নেই— ট্যাঙ্কিটাও অব্যবহৃত।

অবশ্য অব্যবহৃত বলাটা বুঝি ভুল হবে। এইরকম ঘিঞ্জি জায়গায় কোনওকিছুই অব্যবহৃত থাকে না। পরিত্যক্ত বলতে এখানে কিছুই নেই।

ট্যাঙ্কির কাছে গেলেই ঝাঁঝালো গন্ধ নাকে আসে। গন্ধটা পেচ্ছাপের। ন্যাকড়া, ভাঙা কাচ, ব্যবহৃত কন্ডোম— কী নেই সেখানে। বাকি যদি কিছু থেকে থাকে— মানুষের গু— চোখ ঘোরালে তার সন্ধানও পাওয়া যাবে নিশ্চিত।

ট্যাঙ্কির তলায় ইট পেতে জনা পাঁচেক ছেলে বসেছে। সকলের বয়সই আমার মত। কিন্তু আমি এদের কারওকেই চিনি না। কশাইপাড়ার ছেলেদের সঙ্গে আমরা মিশতাম না।

সুলেমান সকলের মধ্যমণি। আমাকে দেখে বলল, আমি ভাবলুম আসবি না।

–এলাম তো।

আমাকে দেখে অন্যরা খুশি হয়নি। এতক্ষণ তাদের গানবাজনা চলছিল। আমি আসায় তা খানিক ব্যাহত হয়েছে। আমি চুপচাপ তাদের মাঝখানে বসে পড়লাম।

একটা কুড়ি লিটারের রঙের ডিব্বা। সেটাকে উপুড় করে তাতে তাল ঠুকল সুলেমান। একজনের হাতে ঝুনঝুনি রয়েছে। অমনি সে তালের সঙ্গে ঝুনঝুনি বাজাতে শুরু করল। একটা নেড়ি কুত্তা অনেকক্ষণ ধরেই আমাদের মাঝখানে ঘুরছিল। সে ব্যাটা ক্যাও করে ডেকে উঠতেই সুলেমান র‍্যাপ শুরু করল।

অ্যাপাচি ইন্ডিয়ান এর আগে কোনওদিন শুনিনি। No Problem rude boy greeting with
respect Namaste Sasnikar Salaam আমার মাথা ঝাঁকিয়ে দিচ্ছিল। সুলেমানের গলার শিরা ফুলে উঠছে। সে র‍্যাপারদের মতই শরীর দুলিয়ে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করছে। আঙুল উঁচিয়ে রকেট ছুঁড়ছে। কখনও ঘাড়ের উপরের চুলে হাত দিয়ে প্রায় নায়কদের মত তাকিয়ে নিচ্ছে সকলের দিকে।

এরপর প্রায়দিন আমি কশাইপাড়ার দিকে চলে যেতাম। আমার নতুন নতুন বন্ধু হচ্ছিল। টিঙ্কা, জাকির, নেলুয়া, কাদের। ওসমান আমাদের থেকে একটু বড়। সে ইতোমধ্যেই দু-পয়সা ইঙ্কাম করতে শিখে গেছে। কী করে জিজ্ঞেস করলে অম্লানবদনে জানায়, কাটপিস টু লেগপিস।

–সেটা আবার কী?
–ওসব বলা যাবে না। ওসমান বিড়ি ধরিয়ে হাসতেই থাকে।

সুলেমান একদিন জানাল, কাটপিস টু লেগপিস মানে ইন্টুমিন্টু।

–ইন্টুমিন্টু!
–আজ্ঞে।

আমি তাও বুঝতে পারি না।

সুলেমান বলে, ওসমান একদিন ওসমান শেঠ হয়ে যাবে, দেখবি।

ওসমান প্রায়দিন কিছু না কিছু আমাদের খাওয়াত। সুলেমানকে কথা দিয়েছিল ও একটা গিটার কিনে দেবে।

কল্পিত গিটার, কল্পিত ঝঙ্কার— ওসমান সম্পর্কে এইটুকুই মনে পড়ে এখন। যে-কারও ভাবতে ভাল লাগবে কোন এক জ্যোৎস্নারাতে কশাইপাড়ার ভেতর দিয়ে গিটার বাজাতে বাজাতে হাঁটছিল ওসমান। তার মাথার উপর চাঁদের গোলাকার আলো। পরনে ছিল জিন্স ও জোব্বা। সে ঠোঁট নাড়ছিল। কিন্তু গান গাইছিল না। কেননা গান গাইবার আগেই একটা তির এসে তাকে বিদ্ধ করেছিল।

এসব ভাবতে পারলে ভাবতে ভালই লাগত। কিন্তু ওসমানের সঙ্গে এইসব কিছুই ঘটেনি। গিটার, তির, ঝঙ্কার… এগুলো অলঙ্কারের মতই রয়ে গেছে। ওসমানের বরাদ্দে জুটেছিল পুলিশের ডান্ডা।

কিংবা অন্যভাবে বলা যেতে পারে— ওসমান তার কল্পিত গিটারে ঝঙ্কার তুলতে তুলতে কশাইপাড়ার ভেতর দিয়ে হাঁটছিল। তার মাথার উপর ছিল গোলাকার চাঁদ। চাঁদের নিচ দিয়ে সাদা সাদা বকেরা উড়ে যাচ্ছিল। একটা লক্ষ্মী পেঁচা এসে বসেছিল তার বাম কাঁধে। পেঁচাটার দিকে তার মোটেই কোনও খেয়াল ছিল না। যেন এই যে সে গিটার বাজাচ্ছে, বাজাতে বাজাতে হেঁটে যাচ্ছে— এই সময় যেখান থেকেই হোক পেঁচাটা যে তার কাঁধে এসে বসবেই— এইটা ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক একটা পরিণতি। শুধু ঝঙ্কারের মাঝে মাঝে আচমকা গৎ বদল করলে পেঁচাটা ডানা ঝাপটে সেই সুরের সঙ্গে তাল রাখছিল।

ওসমান, গিটার, পেঁচা, সাদা বক… এইসব দিয়ে কী কী বোঝানো যেতে পারে? আসলে কিছু দিয়েই অন্যকিছু বোঝানো যায় না। ওসমানকে লিখতে গেলে ওসমানকেই লিখতে হবে। লিখতে হবে কশাইপাড়া, পাড়াটার অবস্থান, পেচ্ছাপের গন্ধ, কাটপিস-টু-লেগপিস। কিন্তু এইখানে সাহিত্যের শব্দগুলো কেমন যেন এঁকেবেঁকে যায়। চাঁদ এসে পড়ে। পাখিদের পাখনা ঝাপটানো এসে পড়ে। ট্যাঙ্কির নিচের চুপচাপ অন্ধকার থমকে যায়। আর ঘেয়ো কুকুরটা সেই অন্ধকার ভেদ করে ডেকে চলে। ডেকেই চলে। পাছায় পুলিশের রুল খেয়ে পড়ে থাকা প্রায় অচৈতন্য ওসমান কুকুরটার ডাকে সাড়া দিতে পারে না।

ওসমান! ওসমান!

এইখানে ওসমানকে খুঁজতে থাকা প্রতিবেশীদের হাতে টর্চের আলো মানানসই হয়েছিল। মিহি কুয়াশার উপর, ভাঙা কাচের উপর গুটিকয়েক টর্চের আলো পড়ছে। আলো দেখে ইঁদুরগুলো গর্তে ঢুকে যাচ্ছে। এইখানে আমি আবার লক্ষ্মী পেঁচাটার দিকে ফিরে যাব। এইবার তার পাখনা দুটো বৃহৎ। এত বৃহৎ যে তা দিয়ে আকাশ ঢেকে দেওয়া যেতে পারে। হাইরাইজ ঢেকে দেওয়া যেতে পারে। এমনকি পেঁচাটা উড়লে হেলিকপ্টারের মত হাওয়ায় চারদিক দুলে উঠবে যেন বা। সাময়িক ঝড় উঠবে। ঝড় উঠলে সময়টাকে ভোরবেলা ভেবে নেওয়া অতীব উত্তম। তখন ঝড়ের মধ্যে ফজরের আজানকে সুপরিকল্পিতভাবে স্থাপন করা যেতে পারে। অর্থাৎ, এইটুকু উল্লেখ থাক, আজানের মধ্যে, কুকুরের ডাকের মধ্যে, পেঁচা ও ইঁদুরের উপস্থিতিতে ওসমানকে কশাইপাড়ার ট্যাঙ্কের তলায় খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল।

ওসমাআআন! ওসমাআআন!

এইভাবে ডেকে উঠেছিল প্রথিতযশা সাদা সাদা বকেরা।

কিন্তু সবসময় তো আর বকেদের দেখা পাওয়া যায় না। যাদের দেখতে পাওয়া যায় তারা যে প্রথিতযশা হবে তারও কোন মানে নেই। ফলে বক বহুক্ষেত্রে শুধুমাত্র রূপক হিসেবেই রয়ে যায়। প্রতীক বা চিহ্ন আর কতটুকুই বা সত্যের আধার হতে পারে। মিহি কুয়াশা, ঘেয়ো কুকুর, তার মধ্যে পড়ে থাকা ওসমান— এইটুকুই যা সূত্র; এইটুকু দিয়ে ওসমান সম্পর্কে কীই বা জানা যায়। ওসমান নাজিবের মতই গায়েব হয়েছে— পাঠক এইভেবেই গল্পের এই অংশটি টপকে যেতে পারেন।

অবশ্য আমার ক্ষেত্রে হয়েছে আরও বিপদ। যেহেতু প্রতিবার বাড়ি থেকে লুকিয়েই কশাইপাড়ায় গেছি, জনশ্রুতিকেও আর গল্পের আকার দিতে পারি না। একমাত্র ভরসা ছিল সুলেমান। তার দুঃখ যতটুকু না ওসমানের প্রতি— তার থেকে অনেকবেশি ট্যাঙ্কির নিচটুকুর অধিকার হারিয়ে যাওয়ায়। আমরা ছিলাম দখলদার মাত্র। পুলিশ এসে জায়গাটা দখলমুক্ত করল।

তা বলে কি অ্যাপাচি ইন্ডিয়ান এমনি উবে যাবে? সুলেমান বিকল্প প্রস্তাব দিতে পারল না। আমাদের পরীক্ষা এগিয়ে আসছিল। সুলেমান পিছিয়ে পড়ছিল। পিছিয়ে পড়তে পড়তে একবার সে হুঙ্কার দিয়ে উঠল।

কাটপিস, না লেগপিস?

সুলেমান বলল, নিশ্চয় ব্যাটার বাড় বেড়েছিল খুব। নাহলে এমনি এমনি পুলিশে ডান্ডা দেয়?

–চোর?
–তা নয়ত কী!

গরুর তো শুধু গোশ বিক্রি হয় না। খুড় থেকে শিং অব্দি সবকিছুই বিক্রয়যোগ্য। ওসমান বিক্রয়যোগ্য মালগুলো গোপনে বিক্রয় করত।

সুলেমান বলল, যেমন ধর চামড়া।

আমি থরে থরে সাজানো চামড়া দেখতে পাচ্ছিলাম। আমার চোখের সামনে গোলাকার চাঁদ উঠে এল। চাঁদের আলোয় চামড়াগুলো টানতে টানতে পাচার করছে ওসমান। সাদা চামড়া এতক্ষণে ময়লা। খয়েরি চামড়াগুলো কালচে হয়ে গেছে। ওসমান চামড়াগুলো তুলে দিছিল ভ্যান রিক্সায়।

সুলেমান বলল, শিং!

আমি দেখলাম বিশাল ডানা ঝাপটে লক্ষ্মী পেঁচাটা উড়ে যাবার পর আবার চাঁদের আলো এসে পড়ল ভ্যান রিক্সাটার উপর। সেখানে গরুর কল্লাগুলো ডাঁই করে রাখা। ভোরবেলা জবাই করা হয়েছিল। কিন্তু খুন হবার পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় প্রতিটা চোখ ছিল খোলা ও বিস্ফারিত। রক্ত বসে গিয়েছে। মাছি ভনভন করছে। তারপর টর্চের আলো এসে পড়ল ওসমানের চোখে। টর্চটা সিগন্যাল। ওসমান ভ্যানরিক্সাটা টানতে শুরু করল। তার ঠোঁটে বিড়ি। পরনে ছিল জিন্স ও জোব্বা। পেছনে গীটার বাজছিল।

–কীরে তুই কি দাঁড়িয়েই থাকবি?

তাকিয়ে দেখি সুলেমান। সে এখন আমার বয়সি। মাথায় লাল ফেট্টি নেই। কালো ফুলপ্যান্টের সঙ্গে হলুদ টি-শার্ট। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত শপিং মলে আমরা আবার মুখোমুখি। এবার আর সুলেমান পালাতে পারবে না। আমাদেরকে নজরে রাখছে অসংখ্য সিসিটিভি ক্যামেরা।

–তুই কখন ফ্রি হবি?
–আটটা। এখনও দু ঘণ্টা। অতক্ষণ কী করবি তুই।

নাজিবের বন্ধুর ব্যাপারটা চেপে গেলাম। বললাম, তুই তোর কাম সাপ্টে নে। আমি এখানেই টাইম কাটিয়ে নিচ্ছি।

–তালে যাইরে। সে মুচকি হেসে বলল, তুই ঘোরাঘুরি কর।

সুলেমান চলে যেতে মনে হল, ওসমান এখন কোথায়? সে কি এখনো কশাইখানার ঘুপচিতে রয়ে গেছে? এখনও চাঁদ ওঠে, বক ওড়ে, ঘেয়ো কুকুররা ডেকে ওঠে ওখানে?

মল-টা ঠান্ডা। তবে তা মর্গের মত নয়। উৎসবে মুখর। কত মানুষ যে কতকিছু কিনছে প্রতিনিয়ত… আমি ঘুরতে ঘুরতে তাদের কেনাকাটা দেখে চলি। এত পণ্যের মাঝখানে নাজিবের বন্ধুটি কোথায় লুকিয়ে আছে?

আমি জেন্টিলম্যান্স চয়েস (একটি পোষাক বিপণি কেন্দ্র)-এর মধ্যে ঢুকে গেলাম। এই যে শার্ট, প্যান্ট, কোমরের বেল্ট সহ জুতো— যা জেন্টিলম্যানদের স্বরূপ ও আধার— এখানে কোনও রূপক নেই— এই অদৃশ্য জেন্টিলম্যানদের বোঝাতে বাংলা সাহিত্যে কোনও অলঙ্কারের প্রয়োজন পড়ছে না। বস্তুত প্রতিটি পুরুষই এখানে প্রবেশ করে হয়ে উঠতে চায় এক একজন জেন্টিলম্যান। এখানে জেন্টিলম্যান শুধু যে প্রভূত সম্ভাবনাময় তা-ই নয়; প্রতিটি পুরুষের মধ্যে সে স্বয়ংসম্পূর্ণও বটে। ৩৪নং কোমর, ৩২নং কোমর, XXL:, M— এক একটি আধার— প্রতিটা আধার শুধুমাত্র জেন্টিলম্যানদের জন্যই অপেক্ষমান। এই অপেক্ষা আনন্দের। উৎসবের। ঘুরপাক খেতে থাকা নাজিবের মায়ের অপেক্ষার সঙ্গে এটার গুণগত পার্থক্য এটাই। নাজিবের মায়ের অপেক্ষা সমষ্টির অপেক্ষা হতে পারত— কিন্তু হয়ে গিয়েছে ব্যাক্তির। অন্যদিকে সেই অদৃশ্য জেন্টিলম্যানদের নিজস্ব শরীরে ধারণ করবার অপেক্ষা হয়ে উঠেছে সমষ্টির। জেন্টিলম্যান শুধু ধারণা নয়; এটি একটি গন্তব্য, স্থান। অদৃশ্য শরীরের জন্য অদৃশ্য স্থান। তবে এই অদৃশ্যতা অলীক নয়; এই অদৃশ্যতাকে অনুভব করা যায়, অভিজ্ঞতায় পাওয়া যায়। অদৃশ্য জেন্টিলম্যান সর্বত্র দৃশ্যমান। সে সর্বত্র দৃশ্যমান বলেই অদৃশ্য হতে পেরেছে। তার হাতছানি নিয়ন আলো ছাড়িয়ে, বিজ্ঞাপন ছাড়িয়ে, রাতেরবেলা হোর্ডিং-র বসে থাকা লক্ষ্মী পেঁচার মত সর্বত্রগামী। সে মাথা ঘুরিয়ে সম্পূর্ণ বৃত্ত রচনা করতে পেরেছে। সেই বৃত্তে কোথায় যে নাজিব, কোথায় যে ওসমান, কোথায় যে আমলাশোল কিংবা কৃষক আত্মহত্যা— তা হয়ত অনুমান করা যায় না; কিন্তু এরা প্রত্যেকেই যে এই বৃত্তের মধ্যেই অবস্থিত সে-সম্পর্কে সুনিশ্চিত হওয়া যায়। এই বৃত্তের বাইরে কিছু নেই।

তাহলে নাজিবের বন্ধুকেও কি শপিং মলের মধ্যে পেয়ে যেতে পারি? আলোর রোশনাই, ঝকঝকে চোখমুখ, মোমপালিশ ফ্লোরের উপর হোক না মিলন। তারপর আমরা কফি খেতে চলে যাব। আহা, ফরাসি কফির গন্ধে ভরে যাচ্ছে চারদিক। ওদিকে লিটিলশপ, ম্যাক্স, লাইফস্টাইল আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। দু-হাত তুলে ডাকছে। গেলে হাততালি দিয়ে উঠবে। না গেলেও ক্ষতি নেই। ঠোঁট দুটো সরু করে শিস দিয়ে আবার ডাকবে। যতবার যাব না, ততবার ডাকবে। ত্যাগ নেই, ভারিক্কি চাল নেই, ভাসমান বেলুনের মত আশ্চর্য ও সুন্দর— এইমাত্র হেলে যাচ্ছে, এইমাত্র ঘাড় উঁচু করে উড়ে যাচ্ছে আকাশে। এই পৃথিবীতে বাতাস কিছু কম নেই। জানালা কিছু কম নেই। কাচের জানালা। তাতে আলো চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ে। যেন ঘাম। দিন-রাতের বিরাম এখানে চলে না। এই তো শ্রম। পবিত্র শ্রম। এই তো শ্রমের প্রতিফলন। দেখা যদি হয়ে যায়— তবে এখানেই দেখা হোক। আমি আর নাজিবের বন্ধু— পরস্পর মুখোমুখি। আমাদের ঘিরে আছে অজস্র সিসিটিভি। আমরা কিছুই আড়াল করতে পারব না।

তখন সেকেন্ড ফ্লোরে সুলেমান দৌড়চ্ছে। ছোট ছোট চার চাকার গাড়ি। একজন বাচ্চাই সেই গাড়িতে বসতে পারে। পেছেনে সুলেমান। হাতে রিমোট। সে রিমোটের বোতাম টিপে গাড়ি ছোটায়। গাড়ির পেছনে নিজেও ছোটে। যত জোরে সে ছোটে, বাচ্চারা তত হাসে। হাসতেই থাকে। অট্টহাসির মত চারদিক দিয়ে সেই হাসির প্রতিধ্বনি আসে। প্রতিধ্বনি শেষ হবার পূর্বেই তাকে আবার শুরুর জায়গায় পৌঁছে যেতে হয়। সেখানে বড়লোক মা ৬-৭ বছরের বাচ্চাটার হাত ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাচ্চাটাকে গাড়িতে বসিয়ে তাকে উচ্চ ক্রয়ক্ষমতা প্রমাণ করতে যেতে হবে। ফলে বাচ্চা প্রস্তুত। সুলেমান প্রস্তুত না হতে পারলেও তাকে প্রস্তুত হয়ে যেতে হয়। জল খাবার তার সময় নেই। সে বসতে পারে না। কোমরের ভেতর আলপিন ফুটে থাকে সারাক্ষণ। সে মূত্রথলিতে একগাদা পেচ্ছাপ আটকিয়ে আবার ছুটে চলে। পাঁই পাঁই করে ছোটে। জিভ বার করে ছোটে। বড়লোক বাচ্চাটাকে হাসাতে তাকে মাঝে মাঝে হোঁচট খেতে হয়। তবে চোট লাগলে চলবে না। বড়লোকের বাচ্চারা হিংসা সহ্য করতে পারে না। সুলেমান অর্ধেক জোকার-অর্ধেক মানুষের মত অর্ধেক দৌড়ে অর্ধেক হেঁটে সারা ফ্লোরমায় লোক হাসিয়ে চলে। যখন ফেরে তখন যদি মায়ের ক্রয়ক্ষমতা দেখানো হয়ে গিয়ে থাকে, তবে নিশ্চয় তার ভাগ্যে হাততালি জোটে।

কাজ শেষ করতে সুলেমানের প্রায় সাড়ে আটটা বেজে গেল। টি-শার্ট আলগা করতে করতে বলল, একবার ছবিকে জিজ্ঞেস করি ও যাবে কী না।

–ছবি আবার কে? আগে তো বলিসনি।

সুলেমান হাসে, ওয়েট কর সব দেখতে পাবি।

আমি গ্রাউন্ড ফ্লোরেই দাঁড়িয়ে থাকি। আমাকে রেখে সুলেমান লিফটে করে উপরে উঠে যায়। খানিকপর ফিরে এসে বলে, ছবি যাবে বলেছে। তবে ওর ছুটি ৯টায়। ততক্ষণে আমরা মালটা কিনে নিই চল। আমার কাছে একটুখানি বাংলা আছে। তুই তো ইংলিশ খাস।

–ইংলিশ খাব কেন? বাংলাই খাব। খেতে খেতে তোর গান শুনব।
–তোর এখনও মনে আছে ওসব? সুলেমান যেন লজ্জা পেল। বলল, চল মালটা কিনে নিই।

মদ কিনতে গিয়ে আর এক প্রস্থ তর্ক লেগে গেল। সুলেমান কিছুতেই আমাকে টাকা দিতে দেবে না। শেষপর্যন্ত ঠিক হল ও মদ কিনবে, আমি সিগারেট আর চাট কিনব।

–পটাটো চিপস কিনি?
–হ্যাঁ।
–আঙুর খাবি? আঙুরের সঙ্গে বাংলা দারুণ জমে। কমলালেবুও কিনে নিচ্ছি। কমলালেবুর রস মেশালে দারুণ টেস্ট হবে।

সুলেমান আমার কথায় দুঃখ পেল, আমি জানতাম তুই বাংলা খাস না। খামোকা আমাকে দিয়ে বাংলা কেনালি। আমার কাছে তো টাকা ছিল। রম কিনে নিতাম। তুই আরামসে খেতে পারতিস।

কমলালেবু কিনলাম না। ফিরে দেখি ছবি ইতোমধ্যে রেডি। পুরুষালি চেহারা, ঠোঁটের উপর হাল্কা গোঁফের রেখা আছে। সুলেমান আমার সঙ্গে ছবির পরিচয় করিয়ে দিল। ছবি টপ ফ্লোরে যে সিনেমাহল রয়েছে সেখানকার গার্ড। তার হাতে সবসময় মেটাল ডিটেক্টার থাকে। হলে ঢোকবার আগে সে মহিলাদের উপর ছানবিন চালায়।

যেতে হবে বারাসাত। স্টেশন থেকে অটোতে আবার মিনিট কুড়ি লাগবে। আমরা তাড়াতাড়ি শিয়ালদহের দিকে রওনা দিলাম।

ভাগ্য খারাপ। মাঝখানে বাস আটকে গেল। এত রাতে সিএএ-এনআরসি বিরোধী একটা মশাল মিছিল বেরিয়েছে। মিছিলে স্লোগান উঠছে। আমরা প্লাকার্ডগুলো পড়তে থাকলাম। সুলেমান বারবার ঘড়ি দেখছিল।

ছবি বলল, এখন বাড়িতে কিছু জানাব না। ফোন করলেই হাজার রকম ঝামেলা হবে।

দুজন মিছিল থেকে বাসের মধ্যে উঠে এসে লিফলেট বিলি করছিল।

সুলেমান বলল, আমি বাবা আগে থেকে সব কাগজ রেডি করে রেখেছি।

ওকে জিজ্ঞেস করলাম, তুই বারাসাতে কবে থেকে?

–সে অনেকদিন হল। ৫ বছর তো হবেই। তার আগে খড়গপুরে ছিলাম। কিছুদিন আমতলাতেও কাটিয়েছি। বাড়িতে চল না, তোকে একটা জিনিস দেখাব।
–কীরে?

আমার উৎসাহ দেখে ছবি হেসে ফেলল, ও সবাইকেই এইটা বলে। যেন এই জিনিসটা কেউ দেখেনি।

–দেখেনি তো। শহরের লোক ঐসব দেখেছে নাকি!
–জিনিসটা কী? আমি ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলছিলাম।

সুলেমান কিছুতেই বলবে না।।

–আচ্ছা তুমিই বলে দাও। আমি ছবিকে জিজ্ঞেস করলাম।
–এই না। একদম না।
–কী মুশকিল!
–কোনও মুশকিল না। একটু ওয়েট কর। সুলেমান আমাকে চুপ করিয়ে দিয়ে বলল, রাতে কী খাবি? স্টেশন থেকে তড়কা রুটি কিনে নেব। আর দু-প্লেট চিলি চিকেন।
–রাতে খাবারটা কিন্তু আমি খাওয়াব। ছবি বলে বসল।
–আশ্চর্য! আমি কুটুম নাকি! সবাই আমাকে খাওয়াবে বলে অস্থির।
–প্রথমদিন তো এসেছেন। এবারটা আমরা খাওয়াব। পরেরবার নাহয় আপনি খাইয়ে দেবেন।

আর কথা বাড়ালাম না। ট্রেনে বেশ ভিড় ছিল। তবে বারাসাত যেতে যেতে খানিকটা ফাঁকা হয়ে গেল।

স্টেশনে নামতেই ওরা দু-জনে আমাকে দাঁড় করিয়ে উধাও। যখন ফিরল ছবির হাতে রাতের খাবারদাবার।

স্টেশন চত্বর বেশ জাঁকজমক। তবে মিনিট ১৫ অটোতে যাবার পর রাস্তাঘাট ফাঁকা হতে শুরু করল। রাত ১১টা বেজে গেছে। এদিককার বেশিরভাগ দোকানপাটই বন্ধ। আমরা যাব এনায়েৎতলা। অটো সরাসরি ওখানে যায় না। আমাদের বাতিপোস্টে নামতে হল। এখান থেকে হেঁটে ১০ মিনিট। সুলেমান অটোর ভাড়াটাও দিতে দিল না।

ছবি বলল, এইবার ফোনটা করে নিই। তোমরা এগোও। আমি পেছনে যাচ্ছি।

সুলেমান সিগারেট ধরিয়ে বলল, জায়গাটা একটু দূর। স্টেশনের কাছাকাছি ঘরভাড়া অনেক।

–তুই সকাল ক-টায় বেরোস?
–৭টায় বেরিয়ে পড়ি। ৯টা থেকে তো ডিউটি। সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা। এমনিতে ভালোই। কী বলিস?
–হ্যাঁ ভালো। আর তোর গানবাজনা?
–আবার গানবাজনা! সুলেমান নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, ওসব পার্ট কবে উঠে গেছে।
–যা বাবা। যেজন্য ঘর ছাড়লি সেটাই ছেড়ে দিলি?
–তোরা এখনও ভাবিস আমি গায়ক হব বলে ঘর ছেড়েছিলাম?
–তাহলে কীজন্যে ছেড়েছিলিস?
–বাড়িতে একদিন খুব ঝামেলা করলুম। ব্যাস, ছেড়ে দিলুম।
–ঝামেলা?
–হ্যাঁরে, একটা বাজে কেসে ফেঁসে গেছিলুম।
–প্রেম করতিস নাকি?
–ধুর। আমার সঙ্গে প্রেম করবে কে? ওসব না। কশাইপাড়ায় কেস খেয়ে গেছিলুম। ওসমান ধরা পড়ল। আমার কথাটাও জানাজানি হয়ে গেল। ওরা ঘরে এসে থ্রেট দিচ্ছিল।
–তার মানে তুই ওসমানের সঙ্গে কাজ করতিস?
–সবসময় করতাম না। টাকাপয়সার টান পড়লে ওকে বলতাম। মাঝে মাঝে রাতেরবেলা চামড়া চুরি করতে যেতাম। ওরা তক্কে তক্কে ছিল। ওসমানকে পুলিশে দিল। আমাকে ধরতে পারেনি। কিন্তু চিনে নিছিল। সেই নিয়ে গণ্ডগোল।

ছবি এসে গেছিল। আমরা বড় রাস্তা পেরিয়ে অনেকটাই এগিয়ে গেছি। এখানকার রাস্তাটা অন্ধকার।

আচমকা সুলেমান চেঁচিয়ে উঠল, ঐ দেখ। এই জিনিসটার কথাই বলছিলাম।

আমাদের সামনে সব্জির ক্ষেত। অন্ধকারে বুঝতে পারছিলাম না কী সব্জি ফলেছে।

ছবি জানাল, শসা।

–শসা ক্ষেত?
–আজ্ঞে। তাহলে বোঝ কোথায় ঘর বেঁধেছি। খুশিতে সুলেমানের বুক চওড়া।
–দারুণ ব্যাপার তো। কে দেখে বলবে তোর শসা ক্ষেত আছে?
–ধ্যাৎ। ছবি প্রায় হাসিতে গড়িয়ে পড়ল, এটা আপনার বন্ধুর না। ও আবার চাষ জানে নাকি। ও যার বাড়িতে ভাড়া থাকে এটা তার।

এক কামরার ঘর। একফালি মত জায়গায় গ্যাসের ওভেন রাখা। অ্যাটাচ বাথরুম নেই। ঘরের বাইরে টেপাকল। সেটাকে বেড়া দিয়ে ঘিরে চানঘর বানানো।

ছবি চান করতে চলে গেল।

সুলেমান বলল, খাবারগুলো গরম করে নিই। তারপর বাইরেটায় বসে মাল খাব।

কিছুক্ষণ আগেই তড়কা-রুটি কেনা হয়েছিল। গরম করবার দরকার ছিল না। কিন্তু সুলেমান আমাকে গরমাগরম খাবার খাওয়াবে। একখানা বারমুডা দিয়ে বলল, এইটা পরে নে। ছবির হয়ে গেলে তুইও ফ্রেশ হয়ে নিস।

কলকাতায় বোঝা যায় না। তবে এখানে বেশ শীত পরেছে। আমি বাইরেটায় বেরিয়ে সিগারেট খাচ্ছিলাম। সামনে বিস্তীর্ণ শসা ক্ষেত। অন্ধকারে তা কেমন চুপ করে আছে। যেন ঘুমোচ্ছে। সাদা কুয়াশা চাদরের মত নেমে এসেছে ক্ষেত জুড়ে। ঝিঁঝিঁপোকারা ডেকে চলছিল। একনাগাড়ে সেই ডাক শুনতে শুনতে এমনিতেই ঘুম এসে যায়।

ছবির চান করা হয়ে গেছে। তাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। অন্ধকারে অবয়বটি খানিক ঝুঁকে গামছা দিয়ে চুল ঝাড়ছিল। সে গুনগুন করে গান গাইছে। এই ক্ষেতের সঙ্গে, আঁধারে বেজে চলা ঝিঁঝিঁপোকার ডাকের সঙ্গে অবয়বটি যেন চিরন্তন। কত যুগ ধরে সে এইভাবে সামনের দিকে ঝুঁকে চুল থেকে জল ছাড়িয়ে নিচ্ছে!

ছবি গামছাটা দিয়ে বলল, দাদা আপনি হাতমুখ ধুয়ে আসুন। আমি ভেতরে গিয়ে ব্যবস্থা করছি।

একটাও বাতি নেই। টেপাকল অব্দি কয়েকটা ইট ফেলা। হঠাৎ মনে হল সামনে দিয়ে কী যেন একটা চলে গেল। বড়সড় কালো লোমশ একটা প্রাণী। আমি তার জ্বলজ্বলে চোখ দুটো দেখতে পেয়েছিলাম। টাল সামলাতে পারিনি। আমার অবস্থা দেখে ছবি হেসে উঠল।

একটা ফাইল নিয়ে খেতে বসেছে সুলেমান। খেতে খেতে ফাইলটা খুলে বলল, এই দেখ সব কাগজপত্র জোগার করে রেখেছি। এই প্যান কার্ড, আধার, ভোটার কার্ড। কিন্তু একটা প্রব্লেম হয়ে গেছে। বার্থ সার্টিফিকেট নেই। আচ্ছা বার্থ সার্টিফিকেট না থাকলে কী খুব অসুবিধে হবে? আব্বা-মার ভোটার কার্ড নিয়ে রেখেছি কিন্তু।

ছবি বলল, তোমাকে কেউ তাড়াবে না। খামোকা চাপ নিচ্ছ। আগে মালটা খেয়ে নিলে হত না?

আমারও তাই মত।

সুলেমান বলল, আগে খেয়ে নিই। কতদিন পর দেখা। একটু খেয়ে আড্ডাফাড্ডা দিয়ে আবার আসর জমাব। অবশ্য ছবি ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়বে।

–মোটেই না। ছবি প্রতিবাদ করে উঠল।
–রাতের খাবার পর ও দু-মিনিটও জাগতে পারে না। গতবারে কী হয়েছিল মনে নেই? বলব এখানে?
–আবার! ছবি ছেলেমানুষির মত রাগ দেখাল।

সে রুটির টুকরোটা তড়কায় ডুবিয়ে মুখে চালান করছিল। তার পুরুষালি আঙুল– আমার আর সুলেমানের থেকেও চওড়া– কী অনায়াসে চিলিচিকেনের ঝোলে চুবিয়ে নিপুণভাবে তুলে আনছিল ক্যাপসিকামের টুকরো, পেঁয়াজ, পছন্দসই মাংস। সে খেতে খেতে ঢেঁকুর তুলছিল। তার বাহু অব্দি, যতটুকু দেখা যাচ্ছে, লোমে ঢাকা। এলইডির সাদা আলোয় তার ঠোঁটের উপর গোঁফের সবুজ রেখা দুই জন পুরুষের সঙ্গে কোনও তফাৎ না রেখেই সহজে মিশে যাচ্ছিল। সেইখানে তড়কার ডাল লাগার সঙ্গে সঙ্গে সে জিভ দিয়ে তা গালে টেনে নিচ্ছিল।

খাওয়া শেষ হতেই রাত ১২টা। সুলেমান বলল, এই রে!

ছবি বলল, আমি তো আগেই বলেছিলাম মালটা আগেই খেয়ে নিতে।

যাহোক, আর দেরি করা হল না। ঘরের বাতি নিভিয়ে একখানা এমার্জেন্সি লাইট নিয়ে সুলেমান বাইরে বেরিয়ে এল। ছবির হাতে মদের বোতল, গ্লাস আর মাদুর। আমাকে সে কিছুই কাজ করতে দেবে না। মাদুরটা পেতেই আবার ঘরে ফিরে গেল। পটাটো চিপস, আঙুর– এইসব নিয়ে এসে বলল, কুয়াশা পড়ছে কিন্তু। বেশিক্ষণ বসলেই মাথা ধরে যাবে।

সুলেমান ছবিকে পাত্তা দিল না। এমার্জেন্সির সাদা আলোয় তাকে উদাস লাগছিল। সে বলল, লাইফটা এমনিতে খারাপ না। একটু টাফ হয়ে গেছে, এই যা!

–খারাপ হবে কেন? এই রাতেরবেলা ক্ষেতের উপর বসে তিনজনে মদ খাচ্ছি– এ তো স্বর্গীয় ব্যাপার।

হা হা করে হেসে উঠল সুলেমান। তুই বুঝবি না। এর আগে আমি খড়গপুরে ছিলাম। রেলওয়ে কলোনিতে। প্রায় দুবছর ওখানে কাজ করেছিলাম। গোডাউনে মালপত্তরের হিসাব রাখতাম। খালাসির কাজও আমাকে দিয়ে করিয়ে নিত। সবই করতাম। কাজটাকে ভালইবাসতাম। এখানকার কাজের মত না। এই কাজটা করতে বিচ্ছিরি লাগে। মনে হয় যেন জোকার। শালা কলকাতাটাও পাল্টে গেছে। আজকের মিছিলটা দেখলি? ওরা তো আমাদের জন্যেই মিছিল করছে, তবু আমার কেমন ভয় লাগে এসব। আমি কি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি? শালা।

ছবি কোনও কথাই বলছিল না। ঢুকঢুক করে একাই মদ খাচ্ছিল। আমি প্রসঙ্গ পাল্টাতে বললাম, একটা গান গা তো।

সুলেমান হ্যাঁ-না কিছুই বলে না। চুপ থাকে।

ছবিকে আড্ডায় টেনে আনি, তুমি ওর গান শুনেছ?

–গান! ছবি দুটো আঙুর মুখে পুরে বলল, বাবা তা আর শুনব না!
–তাহলে হয়ে যাক আর একবার।

সুলেমান গান গাইবার মুডে নেই। বলল, দাঁড়া। সব হবে। আগে তো দু-পাত্তর পেটে পড়ুক।

আমার থেকে অনেক আগেই ওরা গ্লাস শেষ করে ফেলেছিল। এখন আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি শেষ না করলে ওরা কেউ নতুন করে মদ ঢালবে না।

ছবি বলল, কাল আমার ২টো থেকে ডিউটি। ২টো থেকে ১১টা।

–অতরাতে বাড়ি ফিরবে কীভাবে?
–ওসব আমার অভ্যেস হয়ে গেছে। পৌনে ১১টা থেকে নাইট শো। চেকিং করেই বেরিয়ে যাব।
–তুমি থাকো কোথায়?
–আমি তো কাছে থাকি। পদ্মপুকুরে।

আমাদের অবাক করে সুলেমান গুনগুন শুরু করল।

পরের দুটো গ্লাস আমি প্রায় ওদের সঙ্গেই শেষ করলাম। ওরা পটাটো চিপস, আঙুর বিশেষ খাচ্ছিল না। হয়ত আমার জন্যই রেখে দিচ্ছিল।

সুলেমান গান শুরু করল– গাওয়া হ্যাঁয়, চান্দ্ তারে গাওয়া হ্যাঁয়/ গাওয়া হ্যাঁয়, চান্দ্ তারে গাওয়া হ্যাঁয়/ তেরে মেরে মিলান কে, আপনে দিওয়ানেপান কে/ নাজারে গাওয়া হ্যাঁয়।

আমি ওর গান শুনছিলাম। চোখের সামনে ক্রমশ অন্ধকার ঘনিয়ে আসছিল। খেয়াল করিনি কখন ছবিও গুনগুন করতে করতে ক্ষেতের মধ্যে হাঁটতে শুরু করে দিয়েছে। আলো থেকে অনেকটা দূরে সরে গিয়ে সে পুনরায় অবয়বের রূপ ধারণ করেছে। একটা আদলকে আমি টলতে টলতে হাঁটতে দেখছিলাম। ঘুমন্ত শসা গাছগুলিরে পাশ দিয়ে আদলটি হেঁটে যাচ্ছে। গাছগুলির ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। তারা দুলছে। দুলতে দুলতে মেয়েটির পায়ে আদর করে দিচ্ছে। এই আদর বুঝি অতি স্বাভাবিক। এমন রাতে এমন আদর ছবি বহুবার পেয়েছে। সে অভিজ্ঞ মানবীর মত আদরগুলিকে সেলাম জানিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল।

মাঝপথে গান থামিয়ে সুলেমান এমার্জেন্সির সুইচটা অফ করে দিল। তারপর আমাকে কিছু না বলে আদলটাকে অনুসরণ করতে থাকল।

চারদিক নিস্তব্ধ। সামনে বিস্তীর্ণ চাষাবাদ। আমি আর কারওকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। মাঝে মাঝে গোঙানির শব্দ শুনছিলাম।

যেন কোনও অন্ধকার কুয়ো থেকে শব্দগুলি উঠে আসছে। পুরনো আদিম শব্দ। এই শব্দ জন্মের। মৃত্যুর। এই শব্দ ধ্রুব।

আমার খুব শীত করছিল। ভয় লাগছিল। পায়ের কাছে সেই লোমশ প্রাণীটির উপস্থিতি টের পাচ্ছিলাম।

আমি চেঁচাতে পারছিলাম না। সুলেমানকে ডাকতে পারছিলাম না। যতই অস্থির হয়ে উঠছি, হিংস্র প্রাণীটি ততই আমার গা ঘেঁষে সরে আসছিল। সুলেমান আর ছবি কোথায় নিয়ে এসেছে আমাকে?

ঘোঁত ঘোঁত শব্দ হচ্ছে। কী বিশ্রী গন্ধ বেরোচ্ছে। যেন এখুনি জন্তুটি আমার গায়ে থাবা বসাবে। টুঁটি চেপে ধরবে। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম। তারপর কোনও মতে তাকাতে দেখি সেটির গনগনে দুটো চোখ ঠিক আমার চোখের উপরে। তার গাল থেকে বেরিয়ে আসা জিভটা লকলক করছে।

আমার পালাবার পথ নেই।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2039 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...