সিএএ-র বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মানে বিষাক্ত রাজনীতি আর জননীতিগুলির বিরুদ্ধে সমবেত প্রতিবাদ

হর্ষ মান্দের

 

নিবন্ধটি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সংবাদপত্রে গত ২৫শে ডিসেম্বর প্রকাশিত হয়। তর্জমা: সত্যব্রত ঘোষ

ভারতের প্রতিটি কোনে নাগরিক সংশোধন আইন এবং জাতীয় নাগরিক পঞ্জীকরণের বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদের ডেউ ফুলে ফেঁপে উঠছে, তা এই প্রজাতন্ত্রের দীর্ঘ যাত্রাপথের এক উজ্জ্বল আলোকময় মুহূর্ত হিসেবে সবার মনে রয়ে যাবে। কারণ, এই প্রতিবাদগুলির অন্তরে নীতিবোধ থেকে সোচ্চার হওয়া জনগণের যে সৌহার্দের জন্ম হয়েছে তেমনটা আমরা অনেক কাল দেখিনি। রাস্তায় উপচে পড়া মানুষেরা ভরসা জুগিয়ে তাঁদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, যারা ঘৃণা আর ভয়ের রাজনীতির কারণে সন্ত্রস্ত। এই প্রতিবাদগুলির মধ্যে দিয়ে সেই বিষাক্ত রাজনীতি এবং জননীতিদের সমবেতভাবে নাকচ করা হচ্ছে, যা আমাদের বাহির জীবনকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।

এর প্রতিক্রিয়ায় শাসনাধীন প্রতিষ্ঠানগুলি বহু-ব্যবহৃত বোলচালে প্রতিবাদকারীদের সাম্প্রদায়িক হিসেবে নিন্দিত করে মিথ্যার জালে মানুষদের বিভ্রান্তিতে ফেলতে চাইছে। এবং রাষ্ট্রশক্তি দিয়ে ভাঙতে চাইছে সব প্রতিরোধ। কিন্তু এবার তা বিশেষ কাজে আসছে না। জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া এবং আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়— ভারতের মুসলমান পরম্পরা দ্বারা চিহ্নিত এই দুটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের উপর বর্বর আক্রমণ চালিয়েছে পুলিশ। কিন্তু সেই রাতেই আটক করা জামিয়ার ছাত্রছাত্রীদের সমর্থনে ছাত্রছাত্রীরা সমবেত হয় পুলিশ থানার সামনে। কনকনানি শীতকে অগ্রাহ্য করে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে জমায়েত হয় পুলিশ হেডকোয়ার্টারের এবং দিল্লির বিভিন্ন পুলিশ থানার বাইরে। যতক্ষণ না আটক ছাত্রছাত্রীদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয় পুলিশ, ততক্ষণ তাঁরা অবস্থান বিক্ষোভ চালিয়ে গেছেন। দেশের মধ্যে পঞ্চাশের অধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী এবং ফ্যাকাল্টি এই বিক্ষোভকে সমর্থন জুগিয়েছে। নিদ্রা-বঞ্চিত আইনজীবীরা থানাগুলির বাইরে সতর্ক থেকেছেন, যেখানে ছাত্রছাত্রীরা আটক ছিলেন।

আন্দোলনকারীদের বিদ্রুপ করবার জন্য প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে তাঁদের পরিহিত পোশাক দেখে তাঁদের চিহ্নিত করা যাবে। বোঝাই যায়, তিনি তাঁদের মুসলমান পরিচিতির দিকেই আঙুল তুলছেন। এই শ্লেষের জবাবে আপামর মানুষ সর্বধর্মের পরিচিতির চিহ্নশোভিত হয়ে ফেজ এবং হিজাব পরিহিত আন্দোলনকারীদের ভিড়ে মিশে গর্বিত ভঙ্গিতে জাতীয় পতাকা তুলে নাড়িয়েছেন দেশবাসী নারী ও পুরুষদের সঙ্গে সৌহার্দের পরিচয় দিয়ে। কমবয়সীরা মজার মজার পোস্টার দেখিয়ে শ্লোগান দিয়ে গান গেয়ে এই দেশের জন্য এক অহিংস আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন যার ভিত্তি আশা ও ভালোবাসা।

ইদানিংকালে জীবনে প্রথমবার আমি বুঝেছিলাম আমার যতটুকু আশা ছিল তা তলানিতে পৌঁছেছে। আমার ব্যক্তিগত রাজনীতি বলতে যা কিছু ছিল তা প্রায় ছেলেমানুষি পর্যায়ে মানুষের শুভবোধের প্রতি নির্ভরশীল। দৃঢ় বিশ্বাস ছিল ঘৃণা এবং স্বেচ্ছাচার এই দেশে কায়েম হবে না। কিন্তু গণপিটুনিতে মৃত পরিবারগুলির পাশে আশ্বাস দিতে দাঁড়ানো এই কারবাঁ-এ মহব্বত-এ যোগ দিয়ে বারবার দেখলাম প্রধানত কমবয়সীদের একটা ভিড় মুসলমান এবং দলিতদের উপর অকথ্য নিষ্ঠুরতায় অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে প্রাণঘাতী আক্রমণ শানাচ্ছে। এই অসহায় মানুষগুলিকে বাঁচাতে কেউ এগিয়ে আসেনি। পুলিশও ভিড়কে উৎসাহ দিয়েছে শিকারীদের, অত্যাচার চালিয়ে যাও। অন্য সব সম্প্রদায় এবং ধর্মীয় দলগুলিকে একত্রিত করে বিজেপি রাজনৈতিক চালে মুসলমানদের প্রান্তবাসী করতে সমর্থ হয়েছে। আজ কমবয়সীরা আন্দোলনে যখন নেতৃত্ব দিয়ে হিন্দু-মুসলমান ঐক্য এবং সর্বধর্মের সাম্যতা উদযাপন করছে, তখন আমার আশা প্রজ্জ্বলিত। আমি নিশ্চিত, লক্ষ লক্ষ ভারতীয়দের মনেও এই এক আশা সংক্রামিত হয়েছে।

একশো বছর আগে মহাত্মা গান্ধি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফিরে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেওয়ার পর যে মানবিক বোধ এবং সর্বধর্ম সমন্বিত জাতীয়তাবাদের সূত্রপাত ঘটান, আজকের আন্দোলন তারই ক্রমানুসারী। বর্তমান এই মুহূর্তটির তাৎপর্য এটুকুই। তখনকার মতো এখনও দেশ বলতে এমনই এক ভাবনাকে তুলে ধরা হয় যা বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসী এবং পরিচিতির মানুষদের সহনাগরিক হিসেবে স্বাগত জানাবেন। হিন্দু মহাসভা এবং আর এসএস-এর অন্যরকম কল্পনা ছিল। ওরা ভেবেছিল একটা হিন্দুরাষ্ট্র তৈরি হবে যেখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকতে বাধ্য হবে। মুসলিম লিগও নিশ্চিত ছিল, অন্য একটি মুসলমানগরিষ্ঠ দেশ না নির্মাণ করলে মুসলমানেরা নিশ্চিন্তে সাম্যময় এক জীবন নির্বাহ করতে পারবে না। আজ যারা ক্ষমতা অধিকার করে রয়েছেন, তাঁরা গান্ধিকে ভুল প্রমাণ করে জিন্নাহ আর সাভারকরকে ঠিক প্রমাণ করতে বদ্ধপরিকর। নিজের চিন্তাকে সঠিক জেনে গুলিতে প্রাণ দেন মহাত্মা গান্ধি। বাবাসাহেব আম্বেদকর ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ভ্রাতৃত্ববোধের ধারণাগুলিকে দেশের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেন। তার সত্তর পর সেই আজকের যুবসমাজ মশালটিকে নিজেদের হাতে নিয়ে লড়ছেন সেই ভারতের জন্য যা সাম্যতা, মহানুভবতা এবং ন্যায়ভাবনার জন্য সারা জগতে পরিচিত।

ব্যাপক আন্দোলনের কারণে শাসকদের যে অস্বস্তি হচ্ছে, তা বোঝা যাচ্ছে। উত্তরপ্রদেশের প্রশাসন তো মুসলিম নাগরিকদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মানসিকতা স্পষ্ট করে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেমালুম মিথ্যাকে রক্ষা করতে ব্যস্ত। তাঁর বক্তব্য সরকার নাকি জাতীয় নাগরিক পঞ্জিকরণ নিয়ে কখনও কিছুই বলেনি। অথচ অমিত শাহ সংসদ ভবনে এবং বাইরে বারবার (আটবার) ঘোষণা করেছেন নাগরিক সংশোধন আইনের সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পঞ্জিকরণের যোগ রয়েছে। এই ঘোষণাগুলির মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট বলতে চেয়েছেন যে হিন্দুদের রক্ষা করা হবে, মুসলমানদের নয়। তিনি একথাও বলেছেন যে ভারতে কোনও ডিটেনশন ক্যাম্প নেই। অথচ অসমে এই বিশাল হলের মতো নরকগুলিতে আমিও ঢুকে দেখে এসেছি। শাহের নির্দেশ মেনে বিভিন্ন রাজ্যে ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি করা হচ্ছে।

বিক্ষোভ আন্দোলন ইতিমধ্যেই জিতেছে। জাতীয় নাগরিক পঞ্জিকরণকে কার্যকর করা যে প্রায় অসম্ভব, তা বোঝানো গেছে। এই জয়ের তাৎপর্য এখানেই যে দেশের প্রায় কুড়ি কোটি মুসলমান অসমে জন্মানো বাঙালিদের মতো একই অনিশ্চয়তা এবং আতঙ্কের ঘূর্ণিতে বছরের পর বছর ধরে আর ভুগবেন না। এমনকি, বিজেপি-র সহযোগী যে দলগুলি নাগরিক সংশোধন আইনের সপক্ষে নিরাশ হয়ে সমর্থন জুগিয়েছিল, তারাও আর জাতীয় নাগরিক পঞ্জিকরণকে কার্যকর করতে চাইছে না। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, কেরল, ওড়িশা, রাজস্থান এবং অন্ধ্রপ্রদেশ এনআরসি-কে ইতিমধ্যেই নস্যাৎ করে দিয়েছে।

এখনও যদি কেন্দ্রীয় সরকার গোঁয়ার্তুমি করে তাহলে সাংবিধানিক সঙ্কট তৈরি হবে। কারণ, রাজ্য প্রশাসনের সাহায্যেই এনআরসি করা সম্ভব। প্রতিবাদী রাজ্যগুলিকে যদি সে অবহেলাই করে, তাহলে কতবার, কতগুলি রাজ্যকে সে অবহেলা করে যাবে, সে প্রশ্ন উঠবেই।

এখনও সতর্ক নাগরিক প্রহরা জরুরি। এনপিআর-এর কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে, যা কিনা এনআরসি-র প্রথম ধাপ। কেরল ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে সেই রাজ্যে এনপিআর হবে না। সারা দেশ জুড়ে এনপিআর এবং এনআরসি বয়কট করে প্রাসঙ্গিক তথ্য এবং নথিগুলি দিতে অস্বীকার করে একটি অসহযোগ আন্দোলন গড়ে তুললে রক্ষণভাগ নিরেট হয়।

কিন্তু এই আন্দোলন কি টিকবে? হয়তো এখনই তা উত্তর দেওয়া যাবে না। কিন্ত আন্দোলন যদি বা নিষ্প্রভও হয়, তবু তার মধ্যে দিয়েও ভারতকে সংখ্যাগরিষ্ঠের কল্পনা অনুযায়ী রূপান্তরিত করবার যে সমবেত প্রয়াস শাসকেরা করতে চাইছে, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদটুকু রয়ে যাবে। ভারতীয় মুসলমানদের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্তরে বিচ্ছিন্ন করবার যে প্রকল্পটি ওরা নিয়েছিল, তা ইতিমধ্যেই ব্যর্থ হয়েছে। একটি প্রজাতন্ত্রী দেশকে ঘৃণা এবং ভয়ের যে অন্ধকারে ডুবিয়ে দেওয়ার পথে থমকেছে ওরা। ওদের দেখানো দরকার যে এখনও যথেষ্ট পরিমাণ মানুষ বেঁচে আছেন যারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন যে ভারত প্রকৃত অর্থেই আশা এবং ভালবাসার মন্ত্রেই মহীয়ান।

…….

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2050 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...