তবু বিহঙ্গ — তৃতীয় বর্ষ, নবম যাত্রা

স্টেশন মাস্টার

 

গুমোট ভাঙার গান

ভয় পাওয়া মানুষের একটি মৌলিক অনুজ্ঞা। শব্দটির সহজতম সংজ্ঞাটি এইপ্রকার, ভয় এমন এক অস্বস্তিকর অনুভূতি যাহা কোনও আসন্ন সঙ্কটের ধারণা হইতে, সেই সঙ্কট বাস্তবই হোক অথবা কাল্পনিক, উদ্ভূত হয়। সঙ্কট যখন আসন্ন মহাপ্রলয় বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস, ভয়টি বাস্তব। সঙ্কট যখন এই জন্মের কর্মফলের সূত্রে আগামীতে ইতরজন্মের আশঙ্কা, ভয় কাল্পনিক। ক্রমে সংস্কৃতির বিবর্তনের সহিত মানুষ কিছু ভয়কে উপভোগ করিতে শিখিল। অর্থ ব্যয় করিয়া বাজার হইতে ভয় কিনিতে শিখিল। প্রসঙ্গক্রমে, আমাদের স্মরণ থাকিতে পারে, গত শতাব্দীর সাত ও আটের দশকে হিন্দিভাষার লঘু চলচ্চিত্রে রামসে ব্রাদারস-এর রমরমার কথা। লাহোর-করাচির পাট চুকাইয়া মুম্বই নগরীতে আসিয়া ত্রাসের ব্যবসা ফাঁদিয়া বসিয়াছিলেন ফতেচাঁদ রামসে ও তাঁহার সাত পুত্র ওরফে রামসে ভ্রাতৃগণ। প্রায় দুই দশকব্যাপী একের পর এক তুমুল জনপ্রিয় ভৌতিক চলচ্চিত্রে ভয়ের এক লাভজনক বাজার সুনিশ্চিত করিয়াছিলেন এই রামসে-রা।

এই অবধি পড়িয়া নিবিষ্ট পাঠকমনে প্রশ্নের সঞ্চার হওয়া স্বাভাবিক, এই অবান্তর শিবের গীতটি বঙ্গদেশের কোন ধান্যের সহিত সম্পর্কিত, অথবা চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম নামের এযাবৎ স্বঘোষিত সিরিয়াসধর্মী কাগজটির সম্পাদকীয় পরিসর একত্রিশ ডিসেম্বরের প্রগলভ রাত্রে কোনওক্রমে ‘হ্যাক’ হইয়া গিয়াছে কিনা। পাঠককে আশ্বস্ত করা যাক। মাত্র কিছু প্রহর পূর্বে একটি গ্রেগরীয় নববর্ষ এবং একটি নূতন দশক ধুমধাম করিয়া আসিয়া পড়িয়াছে, আতসবাজি পুড়িতেছে, ফানুস উড়িতেছে, ঠিক সেই মুহূর্তে যাবতীয় ফূর্তি ও উচ্ছাসময়তার বিপ্রতীপে দাঁড়াইয়া আমাদের পত্রিকার প্রচ্ছদ-ভাবনা: ভয়। নাহ, এই ভয় রামসে ব্রাদারস রচিত নিরামিষ ভৌতিক ভয় কদাচ নহে। এই ভীতি জটিল ও বহুস্তরীয়, প্রাণঘাতী, কখনও বাস্তব, কখনও কাল্পনিক, এবং স্পষ্টত, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সচেতনভাবে রাষ্ট্রনির্মিত।

প্রথম প্রকার ভয়টি রীতিমতো বাস্তব, মহাগুরুত্বপূর্ণ ও সর্বগ্রাসী। দেশের অগণিত সাধারণ মানুষের রুজি-রুটি-কাজ হারাইয়া ফেলার ভয়। ক্ষুধার্তের ভাতের থালা হারাইয়া ফেলিবার ভয়। ২০১৬-তে দেশের প্রধানমন্ত্রীর তুঘলকি আদেশে বিমুদ্রাকরণ করিতে গিয়া দেশের অর্থনীতি সেই যে মুখ থুবড়াইয়া পড়িয়াছিল, বিশ্বজোড়া আর্থিক মন্দার এই আবহে তাহা আজও ঘুরিয়া দাঁড়াইতে পারিল না। ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষের শেষে বেকারত্বের হার বিগত চল্লিশ বৎসরের মধ্যে শিখর ছুঁইয়াছিল। তদুপরি সংবাদপত্র খুলিলেই প্রতহ্য একের পর এক লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাকে বিক্রয়ের খবর। সরকারের হাজারো সংখ্যাতাত্ত্বিক কারসাজি উপেক্ষা করিয়া জিডিপি বৃদ্ধির হারের সূচক পাতালের পথে ছুটিতেছে। আজ দেশের অর্থনীতির এই গভীরতম সঙ্কটের ভাগীদার শাসক ও তাহাদের অপরিণামদর্শিতা।

অতি দুঃখজনক, এই অর্থনৈতিক মহাসঙ্কট হইতে উদ্ধারের পথ খুঁজিয়া নেওয়ার প্রচেষ্টায় সরকার যতখানি আন্তরিক, তাহা অপেক্ষা বহুগুণ বেশি সচেষ্ট এই সঙ্কট হইতে সাধারণের চক্ষু ঘুরাইয়া দেওয়ার অপচেষ্টায়। শাসক অবাস্তব ও কাল্পনিক ভয়ের আবহ সৃষ্টি করিতেছেন, কথায়-কাজে-ভাষণে-প্রকল্পে সেই ভয়কে বিজ্ঞাপিত করিতেছেন, জনসাধারণকে প্রতিদিন বিমুদ্রাকরণের ন্যায় নূতন নূতন সঙ্কটের মুখোমুখি নামাইয়া আনিতেছেন। অবশ্য এক্ষণে যাহা ভাবিয়া দেখিবার, দেশজোড়া এই আর্থিক সঙ্কট না থাকিলে কি বর্তমান শাসক তাহাদের অ্যাজেন্ডাগুলির রূপায়ণ বন্ধ রাখিতেন? কদাচ নহে। বস্তুত, আজ শাসকের প্রতিটি কাজ, প্রতিটি পদক্ষেপ একট বৃহত্তর ও সুচিন্তিত ছকের অংশ। পিতা ফতেঁচাদ রামসে-র স্বপ্নপূরণ করিয়াছিলেন তাঁহার পুত্র, রামসে ভ্রাতৃগণ। আর বর্তমান ভারতে শাসকের পিতা হইলেন বিনায়ক দামোদর সাভারকর, হিন্দুজাতিরাষ্ট্র নির্মাণের যে স্বপ্ন তিনি দেখিয়াছিলেন, যাহার সূচনা হইয়াছিল বিষাক্ত দ্বিজাতিতত্ত্বের উত্থাপনে, গান্ধিহত্যাকারী নাথুরাম গোডসে যে মতাদর্শের একজন বীর ‘এক্সিকিউশনার’, সেই মতাদর্শ আজ পূর্ণতা লাভ করিতেছে রামভক্ত দুই দেশোয়ালি ভ্রাতা শ্রী নরেন্দ্র মোদি ও শ্রী অমিত শাহ-এর পৌরোহিত্যে। সাভারকর প্রস্তাবিত হিন্দুরাষ্ট্রে হিন্দু ব্যতীত শিখ, বৌদ্ধ, জৈন ইত্যাদি সম্প্রদায়ের স্থান (প্রসঙ্গত, স্থান থাকিলেও সকলে সমমর্যাদায় অধিষ্ঠিত নহে, এই হিন্দুরাষ্ট্রে দলিত ও নারীর স্থান যথাক্রমে ব্রাহ্মণ ও পুরুষের সমপঙক্তিতে হইতে পারে না, সেই প্রসঙ্গ অবশ্য অনত্র‍্য আলোচ্য) আছে, কারণ তাঁহার সূত্রানুযায়ী ইহাদের জন্মভূমি ও পূণ্যভূমি একই, এই ভারতবর্ষ। একমাত্র মুসলমানেরা ব্যতিক্রম, কারণ তাহাদের জন্মভূমি এই দেশ যদি বা হয়, পূণ্যভূমি সুদূর মধ্যপ্রাচ্যে। সংসদে নিজেদের দ্বিতীয় ইনিং-এ প্রয়োজনীয় সংখ্যার জোরে মোদি-শাহ জুটি বর্তমানে পিতা সাভারকরের কর্মসূচির বাস্তবায়নে ব্যস্ত। এই কর্মসূচির পোশাকি নাম যদি ফ্যাসিবাদ হয়, তাহা হইলে তাহার শ্বাসশব্দই হইল ভয়। এই ভয়ের নানা মুখ। সংখ্যালঘুর অপরায়ণ, গোরক্ষা সংক্রান্ত হিংসাসহ দেশজুড়ে সংখ্যালঘু নির্যাতন, দেশে একটি নির্দিষ্ট ভাষাকে প্রধানতম ভাষা হিসেবে কার্যকর করিয়া অন্য ভাষাগুলির অধিকার হরণের প্রচেষ্টা, কাশ্মির বিধানসভাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করিয়া অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ৩৭০ ধারার বিলোপ, উপত্যকায় দীর্ঘকালীন অবরোধ, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্ল্যাক-আউট, বিরুদ্ধমতের কণ্ঠরোধ, দেশের সর্বোচ্চ আদালত হইতে বাবরি মসজিদ সম্পর্কিত বিতর্কিত রায়, এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জি ও নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের দ্বারা প্রান্তিক নাগরিক ও বিশেষ করিয়া মুসলমান সমাজকে অভূতপূর্ব সঙ্কটের সম্মুখীন করিয়া তোলা- এই প্রতিটি অ্যাজেন্ডা হিন্দুরাষ্ট্র নির্মাণ নামক বৃহৎ জিগস পাজলের একেকটি খণ্ড, ইতিহাসের প্রেক্ষিতে দেখিলে এ কথা বুঝিতে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপ হয় না। আর বলপূর্বক এই জাতিরাষ্ট্রের কর্মসূচি রূপায়ণ করিতে গিয়া গণতন্ত্র কখন যে ‘maximum governance, minimum government’ -এর প্রতিশ্রুত শাখা হইতে বায়সদষ্ট আম্রফলের ন্যায় বিচ্যুত হইয়া গেল, গুজরাতি ভাতৃদ্বয় খেয়ালই করিলেন না।

আমাদের এবারের প্রচ্ছদ-ভাবনায় এই রাষ্ট্রনির্মিত ভয়ের নানা দিক, নানা রূপভেদকে খুঁড়িয়া-ছানিয়া দেখিলেন শুভাশিস মৈত্র, অশোক মুখোপাধ্যায়, আশীষ লাহিড়ী, সুদীপ্ত মণ্ডল, প্রতিভা সরকার, সত্যব্রত ঘোষ, শামিম আহমেদ এবং বিষাণ বসু

কিন্তু শুধু ভয়ের কথাই বা কেন? বস্তুত, এই লেখাটি লিখিত হইবার মুহূর্তে চারিধারে ফূর্তির বায়বীয় বহিরাবরণ যেমন রহিয়াছে, বাতাসে লক্ষ লক্ষ টাকার পোড়া বাজি ও সুরার গন্ধ যেমন রহিয়াছে, ঠিক তেমনি হাজার কিলোমিটার দূরে রাজধানীর শাহিনবাগে সমবেত হইয়াছেন বিপুল সংখ্যক মানুষ। পার্টিতে নহে, নূতন দশক আগমণের মুহূর্তখানি তাঁহারা প্রতিবাদে-প্রতিরোধে কাটাইবেন বলিয়া স্থির করিয়াছেন। মধ্যরাত্রে, মুক্ত আকাশের নিচে প্রায় শূন্য তাপাঙ্কের আবহে, ফ্যাসিস্টের প্রেতচক্ষু উপেক্ষা করিয়া লক্ষ লক্ষ নাগরিকের জমায়েত– এই অপার্থিব দৃশ্য যেকোনও ভয়ের অভিমুখ শাসকের দিকে ঘুরাইয়া দিতে সক্ষম। ভয় ভাঙিতেছে। বস্তুত, ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসটি গোটা দেশকে বসন্ত আগমনের অপ্রত্যাশিত বার্তা দিল।

আমার দেশের আত্মা, আহত বিহঙ্গসম, ডানা ঝাপটাইতেছে। আলো নাই। আগামীর কোনও নির্বাচনী পালাবদলে ফ্যাসিস্টের পরাজয় অবশ্যই সম্ভব, কিন্তু জাতির এক বড় অংশের রক্ত হইতে বিদ্বেষের বীজ নির্মূল করা সহজ কার্য নহে। তবু পাখিটি প্রাণপণ উড়িতেছে। অন্ধরাত্রি জানিয়াও সে পাখা বন্ধ করিবে না। লড়াই দীর্ঘমেয়াদি, তবু ভারত লড়িতেছে। যে দেশে ছাত্রসমাজ তপ্ত বুলেটের ভয় অগ্রাহ্য করিয়া পথে নামিতে পারে, সে দেশের সবটুকু এখনও ফুরাইয়া যায় নাই।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম-এর বর্ষশুরুর সংখ্যাটি তাই শুধুমাত্র ভয়ের ময়নাতদন্ত নহে, গুমোট ভাঙার গানও বটে।

অন্যান্য বিভাগ সম্পর্কেও দু কথা বলিয়া লই। কবি গীতা চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণে তাঁহাকে স্মরণ করিলাম আমরা এই সংখ্যায়। লিখিলেন যশোধরা রায়চৌধুরী। শ্রদ্ধেয় অমর মিত্র সন্ধান দিলেন বিস্মৃত গল্পকার রাধানাথ মণ্ডলের। তাঁহার একটি গল্প এই সংখ্যার স্টিম ইঞ্জিন বিভাগে পুনর্মুদ্রিত হইল। আর গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, অন্যগদ্য, অণুগল্প, বইপত্রের কথা, ফটোফিচার, অনুবাদ আদি বিভাগগুলি রহিল যথাবিধি।

ইংরেজি নূতন বছর, এই নূতন দশক, ভারতবর্ষের পক্ষে শুভ হউক।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2050 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...