মুসাফির এ মন

নীলাঞ্জন হাজরা

 

পঞ্চম পর্বের পর

মুসাফিরি ৬

ঊনবিংশ শতকের বিখ্যাত ফরাসি শিল্পী জাঁ-লেয়ঁ জেরোম (১৮২৪-১৯০৪)-এর ১৮৮৬ নাগাদ আঁকা একটা ছবি। ছবিটার নাম ‘The Terrace of the Seraglio’৷ মন দিয়ে দেখুন ছবিটা৷ আর তার ঠিক পরেই দেখুন আমার তোলা ছবিটা৷

বুঝতে খুব কষ্ট হবে না যে ঠিক ওইখানটিতেই দাঁড়িয়ে ছিলাম৷ কিংবা ব্রিটিশ শিল্পী জন ফ্রেডেরিক লুইস (১৮০৪ – ১৮৭৬)-এর আঁকা এই ছবিটা৷ (The reception নামের এই চিত্র অবশ্য তোপকাপির নয় কায়রো-র একটি হারেমের)৷

গায়ে কাঁটা দেবে না?

সে এক গোপন দুনিয়া৷ সেখানে অপর্যাপ্ত অপরূপ নারী, হরিণের মতো নিরপরাধ তাঁদের নগ্নতা৷ সেখানে টলটলে শীতল জল৷ সেখানে রং৷ সেখানে ললিত সুর৷ সেখানে দাসীদের সেবা৷ সে দুনিয়া স্বপ্নের৷ সে দুনিয়ায় যথেচ্ছ যৌন-ক্রীড়া৷ নেশা৷ মিছে খুনসুটি৷ আরাম৷ এই তো হারেম৷ আসলে এই তো প্রাচ্য— The East! আমি দাঁড়িয়ে আছি এমনই একটা দুনিয়ার এক্কেবারে মাঝখানে৷ হলেই বা শ’দেড়েক বছর পরে৷ গায়ে কাঁটা দেবে না?

এরকম সব ছবি আর এরকমই বর্ণময় বর্ণনা ছিল প্রাচ্যে কখনও আসতে না পারা, বা আসতে না চাওয়া, পশ্চিমের রাজদরবার থেকে আমজনতার প্রাচ্য বিষয়ে ধারণার উৎস— The exotic East! আর ঠিক সেই মুহূর্তেই কিন্তু একের পর এক পাশ্চাত্যের ঔপনিবেশিক শক্তি— ব্রিটেন, ফ্রান্স, হল্যান্ড, পর্তুগাল— দখল করতে উদ্যত বিস্তীর্ণ প্রাচ্য দুনিয়া, পশ্চিম এশিয়া (ওদের ভাষায় মধ্যপ্রাচ্য) থেকে ভারত উপমহাদেশ হয়ে পূর্ব এশিয়া৷ যুদ্ধের পর যুদ্ধের পর যুদ্ধ৷ আরও আরও অস্ত্র চাই— কামান, বন্দুক, সেনা৷ তা ছাড়া বাণিজ্যে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা— আরও আরও জাহাজ চাই, আমাদের কলকাতার মতো শহর পত্তন করা চাই৷ আগে এলাকা দখল৷ তারপরে তো সে এলাকা নিংড়িয়ে, সে এলাকার মানুষের শ্রম নিংড়িয়ে মুনাফা পাঠাব দেশে৷ কিন্তু এ সব করতে তো টাকা চাই৷ সে টাকা তো রাজকোষ থেকেই আসবে৷ ব্রিটেনের, ফ্রান্সের, হল্যান্ডের, পর্তুগালের রাজকোষ থেকে৷ সে টাকার অঙ্ক বিপুল৷ কেন দেবেন রাজা-রানিরা টাকা? দেশের লোকেও তো খেপে যেতে পারে?

এর জন্য প্রয়োজন দেশে জনমত তৈরি৷ আজকের ভাষায় যাকে বলবে— Public relations campaign! এই সব ছবি আর বর্ণনা ছিল সেই পাবলিক রিলেশন্স ক্যাম্পেনের অন্যতম হাতিয়ার— মহারাজ আমরা কী আর হেঁজিপেঁজি দেশ দখলের ছক কষে টাকা চাইছি৷ এইরকম সেই দেশ৷ এমন রঙিন স্বপ্নপুরী হবে আপনাদের! মনে রাখতে হবে সে দুনিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থাটা আজকের মতো ছিল না৷ ভারত বা তুর্কি বা ইরান বা মিশর এসব দেশ যে কীরকম তার কোনও ধারণাই ছিল না কালা-পানির ওপারের পশ্চিমের মানুষদের৷ তারা এসব ছবি দেখত আর তাদের তাক লেগে যেত৷ মনে করে দেখুন, সেই ১৪৯২ সাধারণাব্দে ক্রিস্টোফার কলম্বাস যখন নতুন সামুদ্রিক পথে ‘ইন্ডিয়া’ পাড়ি দেবে বলে বিশাল ছক কষেছিলেন, সে যাত্রার ফান্ডিং আদায় করতে পর্তুগালের রানি ইসাবেল-এর মাথায় ঢুকিয়ে ছিলেন— একবার ইন্ডিয়া পৌঁছতে পারলেই শুধু তাল তাল সোনা! তারপর তো পথ হারিয়ে আমেরিকা হাজির হয়ে যাওয়ার অন্য গপ্পো৷ মোট কথা পূর্বে উপনিবেশ পত্তন করার টাকা আদায় করতে বিভিন্ন ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি’গুলোকে দুরন্ত একটা পাবলিক রিলেশন্স ক্যাম্পেন চালাতে হয়েছিল৷ তা আজকের টেলিভিশন বিজ্ঞাপনের মতোই ঝলমলে রঙিন আর গাঁজাখুরিতে ভরা৷

আর এই উপনিবেশ ছড়ানোর সময়টা মোটামুটি সপ্তদশ থেকে ঊনবিংশ শতক৷ সেই জন্যেই লক্ষ করলে দেখা যাবে এইসব ছবির শিল্পীরা সক্কলে অবধারিত ভাবে সেই সময়কার মানুষ৷ এঁদের যে ঘরানার ছবি তাকে বলা হত ‘Orientalist school of painting’৷ এই ঘরানার জনা পাঁচেক প্রথম সারির চিত্রকরের সময়কাল দেখুন— ইউজিন দেলাক্রোয়া— ১৭৯৮-১৮৬৩, জাঁ লেয়ঁ জেরোম— ১৮২৪-১৯০৪, জন ফ্রেডরিক লুইস— ১৮০৪-১৮৭৬, আমাদেয়ো প্রেজিওসি— ১৮১৬-১৮৮২, জাঁ অগুস্ত দোমিনিক অ্যাঁগ্রেস— ১৭৮০-১৮৬৭৷

তবে আমার এটাও মনে হয়, এই সব শিল্পীদের প্রায় সকলেই পশ্চিমের মানুষ ছিলেন৷ কাজেই তাঁরা পূর্বে এসে সত্যিই বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিলেন৷ আমাদের ঝলমলে রোদ, আমাদের নতুন কায়দা-কানুন, আমাদের বিপুল জঙ্গল, মরুভূমি, ফুল-ফল— সব মিলিয়ে পূর্বের রং এইসব শিল্পীদের সত্যিই তাক লাগিয়ে দিয়েছিল৷ তার উপর ছিল ঔপনিবেশিক দৃষ্টির প্রলেপ৷

ও ভালো কথা, হারেম নামক ব্যাপারটার সবচেয়ে সুড়সুড়ি দেওয়া ক্ল্যাসিক— শেহেরজাদ-এর কাহিনি— আরব্য রজনীও কিন্তু প্রথম পাশ্চাত্যে অনূদিত হয় ফরাসিতে ১৭১৭-তে৷ বারো খণ্ডে এ কাজ করেছিলেন আঁতোয়ান গাইয়ঁ৷ আর প্রথম ইংরেজিতে ১৮৪০-এ৷ করেছিলেন এডোয়ার্ড লেন৷ সেই সব রঙিন গপ্পের প্রভাবও যে এই সব ছবির ওপর পড়বে তাতে আর অবাক হওয়ার কী আছে!

অথচ কী আশ্চর্য, আজও বহুলাংশে এমনটাই রয়ে গিয়েছে প্রাচ্যের অনেক বিষয়েই আমাদের ধারণা৷ আসলে আমাদের সভ্যতা-অসভ্যতার ধারণার গঠনটাই যে বিপুল ভাবে পাশ্চাত্যের সংজ্ঞায় বাঁধা৷ হারেম এই বৌদ্ধিক উপনিবেশবাদের, ‘Intellectual colonialism’-এর এক আশ্চর্য উদাহরণ৷

কিন্তু ওই একই সময়ে আঁকা মিনিয়েচার পেন্টিং-এ হারেমের এই ছবিটা দেখুন৷

গোলকোণ্ডার যুবরাজ হোলি খেলছেন নিজের হারেমে৷ দিল্লির জাতীয় জাদুঘরে রাখা এই ছবি আঁকা হয় আনুমানিক ১৮০০ সাধারণাব্দে৷ স্বাদটা অনেকটাই ভিন্ন নয় কি?

বুঝলুম৷ এ সবই যদি ‘পাবলিক রিলেশন্স ক্যাম্পেন’, তা হলে আসলে কেমন ছিল এই সব হারেম? সেটাই নানা গপ্পো-সপ্পো, ছবি-ছাপা দিয়ে আমরা বোঝার চেষ্টা করব তোপকাপির এই হারেমে ঘুরতে ঘুরতে৷ আর আমাদের সঙ্গে থাকবে দুটি বই— মার্কিন নিবাসী তুর্কি লেখিকা আলেভ লিটল ক্রুটিয়ের-এর ‘Harem: The World Behind the Veil’৷ তাঁর নিজের দিদিমা বড় হয়েছিলেন হারেমে৷ আলেভ জন্মেছিলেন তুর্কির ইজমির শহরের যে বাড়িতে সেখানেই ছিল একটি হারেম৷ আর সঙ্গে থাকবে হারেম নিয়ে রীতিমতো গুরুগম্ভীর গবেষণা৷ বার্কলে-র ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক লেসলি পি. পেয়ার্স-এর ‘The Imperial Harem: Women and Sovereignty in the Ottoman Empire’৷

সব্বার আগে বোঝা দরকার ‘হারেম’ কথাটার মানে কী? কথাটি এসেছে আরবি শব্দ— ‘হরম’ থেকে৷ যার অর্থ হতে পারে একাধিক— বেআইনি, বাইরের দুনিয়া থেকে সুরক্ষিত বা নিষিদ্ধ৷ তুর্কির অটোমান সম্রাটদের বসতবাটির যে ব্যবস্থা ছিল তার দু’টি অংশ— ‘হারেমলিক’ আর ‘সালেমলিক’৷ সালেমলিক অংশে পুরুষদের বসবাস৷ আর হারেমলিকে মহিলাদের৷ এই অংশ বাইরের দুনিয়া থেকে কঠোর, কঠোরতমভাবে বিচ্ছিন্ন৷ পাহারা যত কঠোর, যতটা নির্মম কল্পনা করা যেতে পারে ততটাই কঠোর, নির্মম৷ একমাত্র সুলতান ছাড়া আর কোনও পুরুষের নেই সেখানে প্রবেশাধিকার৷ এই যে আজ আমার মতো সুদূর বাঁকড়োর লোক ঘুরঘুর করছি হারেমের এ ঘরে সে ঘরে, এ হারেম জাদুঘর হয়ে যাওয়ার আগে স্বপ্নেও তা কল্পনা করা অসম্ভব ছিল৷ কাজেই, হারেমের দুনিয়া যে গোপন দুনিয়া ছিল, সেটা ঠিক৷ কিন্তু কেমন ছিল সে দুনিয়া? কারা থাকতেন সেখানে? ওই ছবিগুলোর মতোই কি দলে দলে খেলা-গান-নেশায় মশগুল ফুলের মতো নিরপরাধ সুন্দরীর দল? রগরগে যৌনতায় ভরপুর রঙিন স্বপ্নপুরী?

এক কথায় এ প্রশ্নের উত্তর হল — না৷ না৷ না৷ না৷

তাহলে?

ভয়, সাঙ্ঘাতিক ভয়— প্রাণের ভয়, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে মহিলাদের ক্ষমতা, গান-বাজনা, আঁকাআঁকি-সহ নানান শিল্পকলার চর্চা, ভাষা ও সহবত শিক্ষা, গভীর মনখারাপ, গভীরতর বন্ধুত্ব, পদে পদে ষড়যন্ত্র, যৌনক্রীড়ায় পারদর্শিতা দেখানোর প্রতিযোগিতা, মায়ের মমত্ব আর ঈর্ষা, শিশুদের খেলাধুলো— এ সব মিলেমিশে একাকার হয়ে তৈরি হত হারেমের পরিবেশ৷ এক কথায় তার ওপর কোনও তকমা মেরে দেওয়া অসম্ভব৷

ইস্তানবুলের তোপকাপি প্রাসাদের ৩০০টি কামরা, একাধিক হামাম, দু-দুটি মসজিদ, সারি সারি রান্নাঘর, বাগান, চিড়িয়াখানা, হাতিশাল এই সব মিলিয়ে যে বিরাট হারেম তার মধ্যে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে কিন্তু মোটেই তার আন্দাজ মেলে না৷ কারণ এখন সেখানে শুধু বাকি রয়ে গিয়েছে আশ্চর্য রং— দেওয়ালে, ছাদে, জানালায়, দরজায় স্থাপত্য শিল্পের রুদ্ধশ্বাস সব সৃষ্টি৷

এই যে হারেমের একটি প্রধান কক্ষের ছাদের ছবি, এটা দেখে তাক লেগে যায়, কিন্তু বোঝা কি যায় সে ছাদের নীচে চলত কী কাণ্ডকারখানা? সেই পরিবেশটা কল্পনা করতে হলে প্রথমেই বোঝা দরকার হারেমের বাসিন্দা কারা ছিলেন আর তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্কটা কীরকম ছিল৷ এটা বুঝে ফেলতে পারলে আন্দাজ মিলবে বাইরের দুনিয়া থেকে কঠোরভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হারেমের ওই ঘরগুলিতে ঠিক কেমন ছিল আজ-কাল-পরশুর গল্প৷ আর সেটা বোঝার জন্য ওই অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতকে আঁকা কিছু কিছু ছবির সাহায্য নেওয়া যেতে পারে৷ তার অনেকটাই কল্পিত অতিরঞ্জন বটে, কিন্তু তার থেকে শ্বেতাঙ্গ ঔপনিবেশিক এবং পুরুষ-দৃষ্টি (হারেমের এইসব ছবি অবধারিতভাবে পুরুষদের আঁকা) ছেঁকে নিতে পারলে এ সব ছবির মধ্যেও মেলে কিছু কিছু কঠোর সত্য৷

ধরা যাক বিখ্যাত ব্রিটিশ শিল্পী ফ্রেডেরিক গুডলের (১৮২২-১৯০৪) এই বিখ্যাত ছবিটির কথা৷

হারেমে মা ও শিশু৷ নাম ‘A New Light in the Harem’৷ ওরিয়েন্টালিস্ট শিল্পীদের আঁকা হারেমের অধিকাংশ ছবির মতো এটা দেখলেও প্রথমেই চোখে পড়বে হারেমে দু ধরনের বাসিন্দা থাকতেন৷ সাদা চামড়া আর কালো চামড়া৷ এই হল হারেমের বাসিন্দাদের প্রথম ভাগ৷ হারেম বুঝতে হলে এ দুইয়ের সম্পর্কটা বোঝা জরুরি৷

কালো চামড়ার মানুষটি এই ছবিতে দাসী৷ ঠিকই, দাসীদের একটা বিরাট অংশ ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ৷ মনে রাখতে হবে কোনও পুরুষ চাকর-বাকরের কোনও গপ্পো হারেমের মধ্যে ছিল না৷ সুলতান ছাড়া অন্য পুরুষ পা রাখলেই গর্দান ঘ্যাঁচাং৷ সে তুমি যত বড় মুরুব্বিই হও না কেন৷ রেহাই নেই৷ কিন্তু বিরাট আরেক দল কৃষ্ণাঙ্গ থাকতেন হারেমে— খোজা৷ শানিত তলোয়ার হাতে সারা হারেম জুড়ে দিন-রাত টহল দিতেন শত শত খোজা৷ তাঁদের মধ্যেও ছিল উচ্চা-নীচ পদে ভাগাভাগি৷ কিন্তু প্রায় সর্বত্র, সর্বক্ষণ ছিল তাঁদের প্রবেশাধিকার৷ হারেমের ভীষণ প্রহরী দল৷

সুলতানের প্রাসাদে অবশ্য বলকান এবং ককেশিয়া অঞ্চল থেকে আসা শ্বেতাঙ্গ খোজারাও ছিলেন৷ কিন্তু সুলতান তৃতীয় মুরাদের (রাজত্বকাল ১৫৭৪-১৫৯৫) আমল থেকেই হারেম চলে যায় আফ্রিকা থেকে আসা কৃষ্ণাঙ্গ খোজাদের হাতে৷ কীভাবে খ্রিশ্চান এবং ইহুদি ব্যবসায়ীরা আফ্রিকার ছোট ছোট ছেলেদের ধরে তাদের অণ্ডকোষ কেটে সারা দুনিয়া জুড়ে লক্ষ লক্ষ খোজা দাস সরবরাহ করতেন সে ইতিহাস পড়লে শিউরে উঠতে হয়৷ আর পাঁচটা সাম্রাজ্যের মতো অটোমান সাম্রাজ্যেও দলে দলে কিনে আনা হত এই খোজাদের৷ তুর্কি ভাষায় ‘হাদিম’৷ কেন এই হাদিমদের দেওয়া হত হারেমের দায়িত্ব তা ভেঙে বলার দরকার নেই৷ কিন্তু সেখানে একটা ফসকা গেরো ছিল৷ হারেমের ইতিহাস ঘাঁটলেই দেখা যাবে হারেমের মহিলাদের অনেকের সঙ্গে খোজাদের দুরন্ত যৌন সম্পর্কের বিবরণ৷ কারণ, অণ্ডকোষ ছেদন মানেই সমস্ত যৌন আকাঙ্খার শেষ তা মোটেই নয়৷ বহু খোজার ক্ষেত্রে তা হত না৷ আর হারেমের কিছু কিছু মহিলার মধ্যে তাঁদের ব্যাপক চাহিদা ছিল৷ কারণ, গর্ভবতী হওয়ার সম্ভাবনা নেই৷ কিন্তু ধরা পড়লে দুজনেরই জীবন শেষ৷ তৎক্ষণাৎ৷ কাজেই ভীষণ গোপনে৷ হারেমের নানা অন্ধকার আড়ালে আবডালে চলত সে সব কাণ্ড৷

যাই হোক হাদিমদের প্রধানের পদের নাম ছিল ‘কি‌জ়িয়ার আগাসি’৷ আর তৃতীয় মুরাদের আমল থেকেই খোজা প্রধানের সরাসরি যোগাযোগ থাকত সুলতানের সঙ্গে৷ আর সুলতানের মায়ের সঙ্গে৷ সুলতানের মা-ই সর্বদা হতেন হারেমের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, সুলতান নন৷ তুর্কি ভাষায় তাঁর পদটিকে বলা হত ‘ওয়ালিদ সুলতানা’৷ কাজেই কি‌জ়িয়ার আগাসি কী সাঙ্ঘাতিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন তা কল্পনা করা কঠিন নয়৷ সেই ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই প্রতিফলিত হত অন্যান্য কিছুটা উচ্চপদস্থ খোজাদের মধ্যেও৷ এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই হারেমের শত শত মহিলা এই খোজাদের ভয়ে তটস্থ থাকতেন৷ সে সম্পর্কের একটি দুরন্ত উদাহরণ রুশ ওরিয়েন্টালিস্ট শিল্পী আলেকজান্দার নিকোলায়েভিচ রুসোভ-এর ১৮৯১ সাধারণাব্দে আঁকা এই ছবিটি৷ ছবির নাম ‘Bought for the Harem’৷ লক্ষ্য করুন, ফ্রেডেরিক গুডলের হারেমের ছবির পরিবেশের সঙ্গে এ ছবির পরিবেশের তফাৎ৷ কোথায় সেই রং? সেই স্বপ্নিল পরিবেশ? আর লক্ষ করুন, স্পষ্টতই কান্নায় লুটিয়ে পড়া মেয়েটি কিন্তু শ্বেতাঙ্গ৷

এই নারীদের হারেমের পরিভাষায় বলা হত ‘ওদালিস্ক’৷ তুর্কিতে ‘ওদা’ মানে ঘর৷ ঘরবন্দি বলেই এই মহিলারা ওদালিস্ক৷ এই ওদালিস্করা আসতেন সারা দুনিয়ার দাস-বাজার (Slave market) থেকে৷ ডাকসাইটে রূপসীদের দাস-বাজার থেকে কিনে অটোমান বাজারে বিক্রি করতে পারলে মিলত দারুণ মুনাফা৷ যদিও অটোমান বাজারের মাপকাঠিতে এই সব হাদিম আর ওদালিস্কদের ছিল জলের দর৷ ১৭৩৯ সাধারণাব্দের অটোমান সাম্রাজ্যের একটি শুল্কের হিসেবের খাতায় এঁদের দামের যে হিসেব পাওয়া যাচ্ছে তা সত্যিই চমকপ্রদ— ‘আট বছরের একটি সিরকাসীয় মেয়ে (সিরকাসিয়া হল রাশিয়ার পাশে উত্তর-পশ্চিম ককেশাসের একটি অঞ্চল), প্রায় দশ বছরের একটি আবিসিনীয় কুমারী মেয়ে, ১৫-১৬ বছরের একটি সিরকাসীয় মহিলা, জর্জিয়ার প্রায় ১২ বছরের একটি মেয়ে, মাঝারি উচ্চতার একজন নিগ্রো (যদ্দৃষ্ট) দাস, ১৭ বছর বয়সের একজন নিগ্রো দাস৷ মোট মূল্য ১০০০-২০০০ কুরোশ (তখনকার সোনার মোহর)৷’ এবার দেখুন ওই বাজারেই একটি, হ্যাঁ একটি, ঘোড়ার দাম ছিল আনুমানিক ৫০০০ কুরোশ৷ (হবে নাই বা কেন? যুদ্ধের জন্য চাই দুরন্ত জাত ঘোড়া৷ আর যুদ্ধে জিতলে তবেই তো গ্রাম শহর লুঠ করে দলে দলে সুন্দরী পাকড়াও করে পাচার! এই তো ছিল রাজতন্ত্র-সামন্ততন্ত্রের যুক্তির অভিমুখ৷ সারা দুনিয়া জুড়েই৷)

আর তাঁদের মধ্যে যাঁরা শ্রেষ্ঠ সুন্দরী, বেছে বেছে তাঁদের কিনে নেওয়া হত সুলতানের হারেমের জন্য৷ তবে তাঁদের মধ্যে সিংহভাগই আসতেন ককেশাস এবং ইউরোপের বিভিন্ন রাজ্য থেকে৷ হয় দারিদ্রের তাড়নায় বাপ-মা, আত্মীয়স্বজন তাঁদের দাস-বাজারে বিক্রি করে দিতেন, নয়তো যুদ্ধের সময় বিজয়ী সেনারা বিজিতদের গ্রাম-শহর থেকে এই সব সুন্দরীদের তুলে এনে বিক্রি করে দিত দাস-বাজারে৷ তাঁরা সকলেই হতেন খ্রিশ্চান বা ইহুদি৷ এবং তাঁদের সিংহভাগই হতেন শ্বেতাঙ্গ৷ আর এই শ্বেতাঙ্গ ওদালিস্করাই ছিলেন হারেম নিয়ে বিশিষ্ট শিল্পীদের আঁকা শত শত ছবির মূল বিষয়৷ এমনকী অঁরি এমিল রেনোয়া মাতিস-এর (১৮৬৯-১৯৫৪) মতো কিংবদন্তি ফরাসি শিল্পীও তো দেখছি শ্বেতাঙ্গ ওদালিস্ককে নিয়ে ছবি আঁকার আকর্ষণ সামলাতে পারেননি৷ তাঁর এই অপূর্ব ছবিটির নাম— Odalisque৷ আসলে এই ওদালিস্করা তাঁকে এতই আকর্ষণ করেছিল যে তাঁর ছবির একটি সিরিজই আছে ওদালিস্কদের নিয়ে৷

এমন যাঁদের আকর্ষণ তাঁদের জীবনের আজ-কাল-পরশুর কাহিনি যে সাঙ্ঘাতিক আকর্ষণীয় হবে, তাতে আর অবাক হওয়ার কী আছে৷ আজ শুধু এটুকু বলে শেষ করি যে, ডজন ডজন দেশ থেকে আসা, ডজন ডজন ভাষাভাষী, ডজন ডজন সংস্কৃতির শত শত শিক্ষিত, অশিক্ষিত, অর্ধ-শিক্ষিত তরুণীকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করে, তুর্কি ভাষা, সংস্কৃতি, রাজদরবারের আদবকায়দা, নাচ-গান-আঁকা শিখিয়ে সুলতানের মন-পসন্দ করে তোলা কী বিপুল এক কর্মযজ্ঞ ছিল, তা কল্পনা করাও কঠিন৷ আর তার পুরোটাই হত হারেমের ভিতরে!

 

রোক্সেলানা!

অটোমান সাম্রাজ্যের তোপকাপি সরাই বা প্রাসাদে বিশ্বের বৃহত্তম হারেমে বিপ্লবের এক আগুনের নাম রোক্সেলানা৷ আশ্চর্য রোক্সেলানার রূপ৷ আশ্চর্যতর তাঁর তীক্ষ্ণ মেধা৷ কিন্তু আশ্চর্যতম তাঁর রুদ্ধশ্বাস রোমহর্ষক জীবন৷ তোপকাপি হারেমের খাস কক্ষ, যেখানে সুলতান স্বয়ং রাত কাটাতেন তাঁর শয্যাসঙ্গিনীকে নিয়ে সেই ঘরে দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখতে দেখতে মনে পড়ল রোক্সেলানার কথা৷ গায়ে কাঁটা দিল আরও একবার৷

কেন বিপ্লব? অনেক কারণে৷ তার কয়েকটা আগে জেনে নিতে পারলে, বোঝা যাবে রোক্সেলানার জীবনকাহিনি সত্যিই কেন আশ্চর্য৷ রোক্সেলানাই প্রথম ‘ওদালিস্ক’ বা দাস-বাজার থেকে হারেমে ধরে আনা মহিলা, যিনি সরকারিভাবে হয়েছিলেন অটোমান সম্রাটের রানি— তুর্কি ভাষায় যে সাঙ্ঘাতিক গুরুত্বপূর্ণ পদটির নাম ‘হাসেকি সুলতান’৷ সেটা ১৫৩৪৷ কোন সম্রাট বা ‘পাদিশাহ’-এর রানি? অটোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাসের সব থেকে দোর্দণ্ডপ্রতাপ সফল সম্রাট সুলেমানের রানি! আজ ব্যাপারটা শুনে মনে হতে পারে, সম্রাট যাকে খুশি বিয়ে করবেন, এতে আর কামান দাগার কী আছে৷ সাঙ্ঘাতিক আছে৷ আছে এই কারণেই যে ঠিক আজকের রাষ্ট্রপ্রধান— প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির— মতোই সেদিনের সম্রাটরাও আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা থাকতেন পারিবারিক পরম্পরা আর রাষ্ট্রের নিয়মে৷ তখনকার দিনে আবার এর সঙ্গে ছিল ভয়ঙ্কর কড়া ধর্মীয় অনুশাসন৷ হারেমের মধ্যে খোজাদের পাহারায় তুমি কী করছ না করছ, কারও মাথাব্যথা নেই (আসলে তাও করা যেত না৷ কারণ সেখানেও ছিল রাজমাতা বা ‘ওয়ালিদ সুলতানা’-র কড়া নজর) কিন্তু সিংহাসনে তোমার পাশে যাকে বসাচ্ছ, দুনিয়ার সামনে যিনি সম্রাটের সহধর্মিণী, তাঁকে বাছতে হবে পরম্পরা মেনেই৷ সেই পরম্পরা ভেঙে দিয়েছিলেন রোক্সেলানা৷

কিন্তু তখন হারেম আর সুলতানের বসতবাটি ছিল আলাদা৷ রোক্সেলানা তো হারেমের বাসিন্দা৷ কাজেই ফের সব পরম্পরা ভেঙে বিয়ের ছ বছরের মাথায় গোটা হারেমটাই চলে এল তোপকাপি প্রাসাদের মধ্যে৷ সেটা সুনিশ্চিত করেছিলেন রোক্সেলানা৷ এও এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত৷ ঠিক কেন এই প্রায়-অকল্পনীয় ব্যাপারটা ঘটালেন রোক্সেলানা, তা নিয়ে বিশেষ কোথাও কিছু পাইনি৷ কিন্তু আমার অনুমান, নিজের জীবনের সেই অন্ধকার দিনগুলির কথা ক্ষমতায় এসেও ভুলে যাননি তিনি৷ হারেমকে চেয়েছিলেন নিজের, অর্থাৎ রাজপরিবারের অঙ্গ করে নিয়ে তাকে একটা অন্তত আধা-মর্যাদা দিতে৷ ১৫৪১-এ৷ অভূতপূর্ব৷

আর সেই থেকেই অটোমান সাম্রাজ্যে শুরু হয়ে গেল একটা নতুন যুগ, ইতিহাসের ছাত্র মাত্রেই জানবেন, সে যুগের নাম ‘Reign of women’৷ পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ এবং গুরুত্বপূর্ণ সাম্রাজ্যের সেরা সময়ে তার শাসনে রানি বা ‘হাসেকি সুলতানের’ ভূমিকা ছিল সুলতানের প্রায় সমান সমান৷ কেউ কেউ বলেন আরও বেশি! আর সেই ‘নারী শাসন’ চলেছিল পাক্কা দেড়শো বছর৷ রোক্সেলানা থেকেই তার শুরু৷ কিন্তু এ ব্যাপারটা বার করেছেন আধুনিক ইতিহাসকাররা৷ নানা দলিল-দস্তাবেজ-ফরমান ঘাঁটাঘাঁটি করে৷ সে সময় খোলাখুলি তা কেউ ঘুণাক্ষরেও জানত না৷ গোটা ব্যাপারটা চলত হারেমের ভিতর থেকে, প্রধান খোজা— যে পদের তুর্কি নাম ছিল ‘কি‌জ়িয়ার আগাসি’— তার মাধ্যমে সুলতানের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে৷ রোক্সেলানা বিশেষভাবে পারদর্শী ছিলেন বিদেশ-নীতিতে৷ পোল্যান্ডের সম্রাট দ্বিতীয় সিগিসমুন্ড অগুস্তাস-কে লেখা তাঁর দুটি চিঠি পাওয়া যায়৷ সে চিঠি দুটি প্রমাণ করে পোল্যান্ড এবং অটোমান সাম্রাজ্যের সুসম্পর্ককে গভীরতর করতে রোক্সেলানার উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল৷ স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক কূটনীতিও ছিল রোক্সেলানার আঙুলের ডগায়৷

এ ছাড়া তাঁর সমাজসেবার শেষ ছিল না৷ ইস্তানবুলের বিপুলায়তন সুলেমানিয়ে মসজিদ তাঁর নির্দেশে করা৷ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বহু মাদ্রাসা৷ একটি বিশাল হামামি (স্নানাগার)৷ জেরুজালেম ও মক্কায় তৈরি করেছিলেন দুটি স্থায়ী লঙ্গরখানা, যেখানে প্রতিদিন দুবেলা ৫০০ জন দরিদ্রকে খাওয়া দেওয়া হত৷ কিন্তু যেটা আমাকে সব থেকে অবাক করে, তা হল রোক্সেলানা তৈরি করেছিলেন অটোমান সাম্রাজ্যের প্রথম শুধুমাত্র মহিলাদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল৷ এত বিশাল ছিল সেটা যে, সে হাসপাতালের বাড়িটা ছিল ইস্তানবুলের তৃতীয় বৃহত্তম ইমারৎ৷ আর সেটা কোথায় করা হয়েছিল? ঠিক যেখানে ছিল ইস্তানবুলের সবচেয়ে বড় মহিলা দাস-বাজার তার পাশে! আমি নিশ্চিত ক্ষমতার রোশনাইয়ে নিজেকে নিজের অন্ধকার দিনগুলোকে ভুলতে দেননি তিনি কোনও দিন৷

ভোলা কি যায় সেই ভয়ঙ্কর দিন? আজকের পশ্চিম ইউক্রেনের (সেদিনের পোল্যান্ড রাজত্বের) কার্পাথিয়ান পর্বতমালার কোলে, গভীর অরণ্য আর ছোট ছোট পাহাড়ের মাঝখানে একরত্তি বসতি রোহাতিন৷ পাশ দিয়ে কুলকুল করে বয়ে চলেছে হ্নাইলা লাইপা নদী৷ শীতে জমে এক কোমর বরফ৷ শান্ত জনজীবন৷ খ্রিশ্চান অর্থডক্স চার্চ-এর গির্জাটা ঘিরে উৎসব-আনন্দ৷ নতুবা উত্তেজনা সামান্যই৷ শুধু একটা ছাড়া, সেটা অবিশ্যি উত্তেজনা নয়, ভয়৷ সন্ত্রাস৷

পোল্যান্ড রাজের অধীনে ইউক্রেনের এই অঞ্চলের পাশেই ক্রিমিয়া বলে আর একটা অঞ্চল৷ সেখানে এক তুর্কি গোষ্ঠীর বসবাস৷ ভীষণ যুদ্ধবাজ তারা— লুঠেরা৷ হঠাৎ হঠাৎ রোহাতিনের শান্ত জীবন শিউরে শিউরে ওঠে ঘোড়ার খুরের শব্দ আর লুঠেরাদের চিৎকারে৷ এই লুঠেরার দলের মূল লক্ষ্য শস্য-আনাজ এসব নয়— মেয়ে৷ ছোট ছোট মেয়ে দল বেঁধে তুলে নিয়ে যাও৷ তারপর দাস-বাজারে বিক্রি করে দাও৷ আনুমানিক ১০ লক্ষ মেয়েকে এই ভাবে লুঠ করে এই তাতার দস্যুরা দাস-বাজারে বিক্রি করে দিয়েছিলেন কয়েক শো বছর ধরে৷ ব্যাপারটা এতই নিত্যনৈমিত্তিক ছিল যে সমসাময়িক শিল্পীদের ছবিতেও, তা বিষয় হয়ে উঠেছে৷ বিশেষ করে পোল্যান্ডের শিল্পী আর্তুর গ্রোটগার (১৮৩৭-১৮৬৭)-এর একটা সিরিজই আছে ক্রিমিয়ার তাতার লুঠেরাদের নিয়ে৷ সঙ্গে যে ছবিটা দিলাম, সেটা ঠিক কার আঁকা আমি ১০০ ভাগ নিশ্চিত নই, তবে সম্ভবত আর্তুর গ্রোটগার-এরই হবে৷ একটি মেয়েকে ঘোড়ায় তুলে নিয়ে যাচ্ছে তাতার লুঠেরা৷ পিছনে পুড়ছে তার গ্রাম৷

গ্রাম থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর সেই সব মেয়েগুলিকে নিয়ে কী করা হত তা ভেঙে বলতেও গা ঘিনঘিন করে৷ কিন্তু কীভাবে দাস-বাজারে এই মেয়েরা বিক্রি হত তা নিয়ে বিভিন্ন বিখ্যাত শিল্পীর শত শত ছবি রয়েছে৷ তার অধিকাংশের মধ্যেই রয়েছে একটা পুরুষতান্ত্রিক যৌন সুড়সুড়ি৷ তবু, তা থেকে কিছুটা আন্দাজ মেলে৷ মূল কথা— মেয়েটিকে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে (সম্পূর্ণ, গায়ে একটা সুতোও থাকত না) ঠিক যেভাবে ছাগল বা গরু বিক্রি হয় সোনপুরের হাটে, সেভাবে বাজারের মধ্যে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হত৷ তাকে নেড়েচেড়ে, বিভিন্ন অঙ্গ দেখে তারপর দর হাঁকত পুরুষ ক্রেতার দল৷ এমন পেন্টিংও দেখেছি সম্পূর্ণ নগ্ন দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি মেয়ে, তার মুখের ভিতর হাত ঢুকিয়ে দিয়েছে এক ক্রেতা, অন্যরা ভিড় করে দাঁড়িয়ে দেখছে৷ মর্মন্তুদ৷ (বিশিষ্ট ফরাসি পেন্টার গুস্তাভ ক্লারঁস রোদোল্ফ বুলঁজে-র (১৮২৪-১৮৮৮) আঁকা এই করুণ ছবিটি দেখুন৷ ছবিটির নাম ‘The Slave Market’৷ মধ্যযুগীয় বা তারও আগের শিল্পকলা দেখে তারিফ করার সঙ্গে সঙ্গে এ কথা মনে রাখতেই হবে এমনই ছিল সে দুনিয়ার আর একটা দিক৷)

বছর-মাস-দিন-তারিখ ঠিক জানা যায় না৷ কিন্তু সম্ভবত ১৫১৭ সাধারণাব্দের সে দিন রোহাতিনের রাস্তায় কোথাও একটা যাচ্ছিল ১৫ বছরের একটি মেয়ে৷ আনাস্তাসিয়া লিসোভস্কা৷ গ্রামের অর্থডক্স পোলিশ চার্চ ‘হোলি স্পিরিট’ গির্জার পাদরির মেয়ে৷ অর্থডক্স চার্চ যে কী সাঙ্ঘাতিক গোঁড়া তা সকলেই জানে৷ তার পাদরির মেয়ে— চোখ তুলে কোনও পুরুষকে কখনও সে দেখেছে কিনা সন্দেহ৷ তবে এখন সে এ বসতিতে অনেকটা নিশ্চিন্তেই ঘুরে বেড়াতে পারে৷ গত পাঁচ বছর তাতারদের হুঙ্কার আর ঘোড়ার খুরের শব্দে কেঁপে ওঠেনি এই অঞ্চল৷ সম্রাট ব্যাটাদের শায়েস্তা করে দিয়েছেন নিশ্চয়ই৷ আর ঠিক সে সময়েই সেটা ঘটে গেল৷ সেই চিৎকার, সেই অশ্বারোহী লুঠেরার দল, সেই বাড়ি ঘর দোরে আগুন লাগিয়ে দেওয়া৷ সেই লুঠেরার দল সেদিন যে সব মেয়েদের গ্রাম থেকে তুলে নিয়ে গেল তার মধ্যে ছিল আনাস্তাসিয়া৷

তারপর সেই ১৫ বছরের মেয়ের ওপর দিয়ে কী যেতে পারে তা ওই গুস্তাভ ক্লারঁস-এর ছবিটি থেকে কল্পনা করা যায়৷ ইতিহাস বলবে— এর পর ইস্তানবুলের দাস-বাজার থেকে তাকে কিনে নিলেন তখনকার যুবরাজ সুলেমানের খাস দোস্ত অটোমান সাম্রাজ্যের প্রধান উজির ইব্রাহিম৷ যুবরাজকে উপহার দেওয়ার জন্য৷ সুদূর ইউক্রেনের গোঁড়া এক পাদরি পরিবারের মেয়ে বাজারে বিক্রি হতে হতে পৌঁছে গেলেন অটোমান সুলতানের হারেমে৷ তখন তাঁর বয়স বড়োজোর ১৬৷ আজকের নিরিখে, ইস্কুল ফাইনাল দিতে চলেছে৷ তাঁর শরীরের কথা মাথায়ও আনতে চাই না, ভাবছি মেয়েটির মনের কথা৷ কল্পনা করুন, কী হতে পারে সেই মনের অবস্থা৷ যে কোনও সুস্থ মানুষের চোখ ফেটে জল আসবে৷ বলতে ইচ্ছে করবে না কি— ঈশ্বর কী অপরাধ করেছিল এই মেয়েটি?

আনাস্তাসিয়া হয়ে গেলেন রোক্সেলানা! এর পর ১৫২০ সাধারণাব্দে সুলতান হয়ে গেলেন সুলেমান৷ তখন অবিশ্যি তিনি মাহদেওরান বা গুলবাহার নামের এক নারীর প্রেমে মশগুল৷ ১৫১৫-তে তাঁদের একটি সন্তানও হয়ে গিয়েছে৷ মুস্তাফা৷ স্ত্রী না হলেও তিনি সুলেমানের প্রধান সঙ্গিনী৷ তুর্কিতে ‘বিরিঞ্চি কাদিন’৷ প্রথম সন্তান৷ কাজেই ঠিক হয়েই আছে, সুলেমানের পরে মুস্তাফাই হবেন সম্রাট৷

তার পরে গোটা অটোমান সম্রাজ্যের সব নিয়মকানুনটাই কেমন টালমাটাল হয়ে গেল৷ রোক্সেলানার প্রেমে পড়ে গেলেন সম্রাট৷ রোক্সেলানা হয়ে গেলেন সম্রাটের আদরের হুররেম— হাস্যময়ী! এমন প্রেম যে, হারেমের মধ্যেই একদিন রোক্সেলানার সারা মুখ আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত করে দিলেন গুলবাহার৷ ভেনিসের রাষ্ট্রদূত পিয়েত্রো ব্রাগাদিনো সম্রাটের দরবারে সেই কানাঘুষো শুনে তার বর্ণনা পাঠিয়ে ছিলেন ভেনিস-এর সেনেট-এ৷ প্রশ্ন হল কী করে এভাবে অটোমান সম্রাটের মন জিতে নিল ইউক্রেনের এক পাদরির লাজুক মেয়ে?

নেহাতই রূপ? বিশ্বাস করা কঠিন৷ হারেম ছিল ডাকসাইটে রূপসীদের ভাণ্ডার৷ কাজেই রূপ সেখানে হতেই পারে না এত বড় তুরুপের তাস৷ তবে? জানা যায় হারেমে পৌঁছে ক্ষতবিক্ষত মনের সেই মেয়েটি জানালেন তিনি তুর্কি ভাষা শিখতে চান৷ ইসলামের সমস্ত রীতিনীতি শিখতে চান৷ তারপর তিনি হয়ে গেলেন মুসলমান৷ ইতিহাস জানাচ্ছে এটুকুই৷ আমার বিশ্বাস, হুররেমের প্রখর মেধা দুদিনেই বুঝে ফেলেছিলেন সম্রাট৷ আমার কাছে মেধাটা তত বড় কথা নয়, যত বড় কথা একটি পনেরো বছরের মেয়ের কল্পনাতীত ভয়াবহ দৈহিক-মানসিক অপমান অত্যাচার সহ্য করেও জীবনের লাগাম নিজের হাতে রাখার স্পর্ধা আর জেদ৷

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2607 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...