রণ বিশ্বাস কারও নাম নয়: একটি পাঠ প্রতিক্রিয়া

অপর্ণা ঘোষ

 

কারণ আমার পরাজয়ে বিশ্বাস করার জন্য আপনার আমাকে বিশ্বাস করাটা জরুরি। (পৃঃ ৯)

যেমন ‘অর্থ নয়, কীর্তি নয়, স্বচ্ছলতা নয়’, তেমনি রণ বিশ্বাস কারও নাম নয়।

আত্মহননের আবহে অযুত প্রশ্নের আর বিরুদ্ধতার জলকাদা পেরোতে পেরোতে অন্ধকার যে গাঢ়তা ধারণ করে, অলোকপর্ণা, তাকে আপনি একটি অবয়ব দান করেছেন। অ্যানার্কির উৎকেন্দ্র পেরিয়ে যায় তার দীর্ঘচ্ছায়া, ছায়ার তলায় বয়ঃসন্ধি জড়ো করে রণ বিশ্বাস জিতা জাগতা একটি অন্তর্ঘাত হয়ে ওঠে। তার তীক্ষ্ণমুখ নাশকতার একটি অবশ্যম্ভাবী ছক আছে, তাই ‘রণ বিশ্বাস কারো নাম নয়’ সম্পূর্ণত অ্যানার্কি হয়ে ওঠে না। যৌন-জাগরুক সেই ছকটির টানা আর পোড়েন নির্মাণ লাভ করে পিতৃতন্ত্রের নিষ্করুণ জেদ ও সামাজিক মধ্যমেধার এক অলঙ্ঘনীয় নির্দেশে। এক ঘোলাটে চাঁদের দিকে এ লেখা পাঠককে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যেতে থাকে রাহুগ্রাসের আপাত অনিশ্চয়তায়, কিন্তু সর্বনাশ ও সমূহ ধ্বংসের একটি পূর্বনির্দিষ্ট পরম্পরা আছে সেটা রণ বিশ্বাস ও তার পাঠক হাড়ে হাড়ে টের পায়। রন্ধ্রে রন্ধ্রে উঁকি দেয় কার্পেটের তলায় লুকানো ধুলোর মতো পাপ ও অনাচার— এই মরজগতে যা দুবেলা ভাত মেখে খাওয়ার মতোই নিয়মসিদ্ধ অথচ বইয়ের পাতায় তাদের বীতশোক, উদাসীন, নির্বসন আবির্ভাব পাঠকের অস্বস্তি বাড়ায়, সহ্যসীমার শেষ প্রান্তে পৌঁছেও সেই আঘাতে আহত হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।

আমি মানবশিশু একদম পছন্দ করি না। শিশুকন্যা তাও সহ্য করা যায়। কিন্তু বাচ্চা ছেলে দেখলে আমার ভেতর প্রবল রাগ পাকিয়ে ওঠে। ইচ্ছে করে মাথায় চাঁটি মারি, খামচে দিই, লাথি মারি, আরও যাচ্ছেতাইভাবে প্রহার করি। (পৃঃ ৭৮)

পনেরো বছর এগারো মাস বয়সের রণ বিশ্বাস এই লেখার মধ্য দিয়ে ষোলো বছর অতিক্রম করে পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। আর তার শৈশবস্মৃতি— আসলে আমাদের মতোই অন্যের কাছে শোনা শৈশবের জমাটবাঁধা গল্প, প্যান্টে হিসি করে ফেলার পুনরাবৃত্ত আখ্যান, তার স্মৃতির বাইরে একটি উদ্যত কালদণ্ডের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। পিতার ডায়েরি পড়ে ফেলার বাস্তব অভিজ্ঞতা, অবাঞ্ছিত জন্মের নির্বিশেষ দৌরাত্মে নির্মিত তার মনোজগত—তাতে পাঁচফোড়নের মতো ক্রিয়াশীল পিতৃতন্ত্রের ঝাঁঝ, নারীশরীরের প্রতি যুগপৎ ঘৃণা ও টান, যৌনতার প্রতি ধূসর প্রতিবন্ধ ও আত্মধ্বংস। রণ বিশ্বাস যৌনতার বিপ্রতীপে ধর্মকে আহ্বান করে আনে, রণ বিশ্বাস বিশ্বাস করে নায়ক-হতে-না-চাওয়া হিরোইজমে, কারণ সে বুঝেছে ‘সাধারণ’ শব্দটা ‘রণ’ দিয়ে শেষ হয়, যে সাধারণ প্রতিটি যুদ্ধের সেনানী, যে নাশকতার বিশ্বময় শাখা প্রতিটি সাধারণকে গ্রাস করে নেয়, যুদ্ধপ্রিয় করে তোলে, প্রতিবেশী, বন্ধু, স্বজন, স্বদেশ সবই এই যুদ্ধসীমানার আওতায় স্পন্দিত ও বিস্ফারিত হতে থাকে! ধর্ম ও নৈতিকতার প্রতি পরাক্রমী টান অনুভব করে সে, ‘পিতা’ শব্দের ঐচ্ছিক ও অনবরত প্রয়োগের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার দ্বন্দ্বসীমা যে পর্যন্ত বিস্তৃত হয় তার পদপ্রান্তে পড়ে থাকে লিঙ্গ নির্বিশেষে মানুষের দল। ধর্ম, যুদ্ধ ও পিতৃতন্ত্রের নিশানাহত রণ নৈরাজ্যের ধকধকানির মধ্যে পিষ্ট হয়। তাই এই ধ্বংস ও নৈরাজ্যের দ্যোতনা নিগূঢ়ভাবে পিতৃতান্ত্রিক।

এই মুহূর্তে জানিয়ে রাখা ভালো, আমি কারও স্পর্শ পছন্দ করি না। মায়েরও না। আমার পিতা ঘুমের মধ্যে বিবিধ আওয়াজ করেন মুখ দিয়ে। বারংবার পাশ ফেরেন। গায়ে হাত-পা ছুঁড়ে দেন। আমি জানি না স্বপ্না বিশ্বাস কোন মন্ত্রবলে পিতা বিশ্বাসের সাথে এত বছর সংসার করছে। অতএব আজ রাতে আমার ঘুম আসবে না। (পৃঃ ২৩)

রণ বিশ্বাসকে ঘিরে সন্নিবিষ্ট চরিত্রগুলি একটি ক্লস্ট্রোফোবিয়া তৈরি করে। অন্তত রণ বিশ্বাসের আচরণ তাই বলে, কারণ এই ক্লস্ট্রোফোবিয়াই তাকে বারবার কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য করে, পাঠকের ভ্যালিডেশন চায়, না পেলেও অবশ্য তার কিছু এসে যায় না।

আপনার কি আমাকে পাশবিক লাগছে? (পৃঃ ৭৮)

আপনি কি কখনও নির্মম হননি? (পৃঃ ৭৮)

আচ্ছা ভবিষ্যতে সিরিয়া সম্পর্কে আপনার কি প্রতিক্রিয়া হবে? (পৃঃ ৭৯)

কারণ সে জানে এইসব ইতিউতি ছুঁড়ে দেওয়া প্রশ্নের উত্তর তার আর তার পাঠকের নির্জ্ঞানে অভিন্নতা পাবে।

রণ বিশ্বাসের বন্ধু রক্তিমের ডাকনাম লাল। আর সেই নাম রাখা বিকলাঙ্গ প্রাক্তন মাওবাদী বাবার মুখ থেকে ঝরে পড়া লালা এক মারমুখী বিষণ্ণতার জন্ম দেয়, জন্ম দেয় অপরাজেয় লড়াকু মোরগ রজনীকান্তের (রক্তিমের একমাত্র মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র)। যতীন প্রোমোটার আর রক্তিমের ব্যাভিচারী মা রণ বিশ্বাসের ক্লস্ট্রোফোবিয়াকে আরও অসহনীয় করে তোলে। যৌন অত্যাচারী পিতার অনতিক্রম্য অবহেলা ও সময়বিশেষে শত্রুতা, বাবলু-পিনাকীর সমকাম, গৎবিদ্ধ শিক্ষক ও শিক্ষার পরিসর বমনোদ্যত রণ বিশ্বাসের চক্রব্যূহ আরও শক্তিশালী করে তুলেছে।

এখান থেকে টিচার্স রুম স্পষ্ট দেখা যায়। একই সারিতে নীরেনবাবু, বীরেনবাবু, ধীরেনবাবু, নরেনবাবু, বরেনবাবু, হরেনবাবু, সৌরেনবাবু আর সুরেনবাবু নিজেদের কৌটো খুলে খেতে বসেছেন। তাঁদের প্রত্যেককে একইরকম দেখতে। তাঁদের সবার চোখে চশমা। তাঁরা সকলে রোদে পুড়ে তামাটে। সবার হাতের পাতা অবধি এবং সবার কানের লতিভরা— ঘন থকথকে কালো লোম। তাঁদের সবার ডানহাতে বিয়েতে পাওয়া হালকা হলুদ ডায়াল আর সোনালি চেইনের ঘড়ি, পায়ে বাটার ৭ নম্বর সাইজের কালো লোফার, গায়ে নীল-সাদা ডোরাকাটা শার্ট ও শ্যাওলা রঙের ফুলপ্যান্ট। তাঁদের সবার নাক ইন্দিরা গান্ধীর মতো। (পৃঃ ২৭)

যুদ্ধ আর ধর্মে বিশ্বাসী রণ তিন্নিকে ঘেন্না করে, রজনীকান্তকে হত্যা আর যতীন প্রোমোটারের বাইকের আয়না ভাঙার চক্রান্তের মধ্যে দিয়ে এই চক্রব্যূহ ভাঙার তালিম নেয়। তিন্নি রণকে যৌন হুমকিতে ত্রস্ত করে রাখে, শিক্ষক ধীরেনবাবুর অস্বাভাবিক মেয়ে রুমলির উদগ্র যৌন অভিব্যক্তি রণকে আতঙ্কের ডুবজলে ফেলে দেয়। পাপের গন্ধের পিছু পিছু বিষাদের চোরাপ্রবেশের অনিবার্যতা থেকে পরিত্রাণ চেয়েছে রণ। পায়নি, শুধু নিয়তির হয়ে তার পাশে এসে দাঁড়ায় আঁধারের মতো জগন্নাথ দাম আর আলোর মতো তরুমাসি। জগন্নাথের উচ্চাকাঙ্খা অন্ধকারের মতোই শক্তিশালী, সে উচ্চাকাঙ্খা দিয়ে ভবিষ্যৎ দেখে নেয়, ফর্সাবাড়ির মিশকালো ছেলে জগন্নাথ মেধা আর আত্মবিশ্বাসে নিজেই হয়ে ওঠে একটি অধ্যায়, রণ বিশ্বাসের প্রতিস্পর্ধা, ক্লান্ত রণ বিশ্বাস চলে গেলেও সে তার জ্ঞান আর গরিমার নিশ্বাস দিয়ে পৃথিবীর অতলস্পর্শী অন্ধকারকে সহনীয় করে তোলে।

এই ক্লাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে বসে থাকে জগন্নাথ দাম— আমার দেখা পৃথিবীর সবথেকে কালো মানুষ। ক্লাস ফাইভে ওকে যেদিন প্রথম দেখেছিলাম, ভেবেছিলাম ও আফ্রিকান। সেদিন কেউ ওর পাশে বসেনি। আজও কেউ ওর পাশে বসে না। ওকে সবাই ম্যান্ডেলা বলে ডাকে। আমিও ডাকি— মুখে। সবার সামনে ওকে ম্যান্ডেলা বলে ডেকে আমি আরাম পাই। আরামে আমার চোখ লেগে আসে।

কী উপায়ে যেন জগন্নাথ সমস্ত অঙ্কের উত্তর মিলিয়ে দেয়। (পৃঃ ১৩)

রণ বিশ্বাসের সমস্ত অনুষঙ্গকে অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়ে জগন্নাথই তাকে ঠেলে দেয় পরিত্রাণের দিকে, তরুমাসির দিকে। জগন্নাথ প্রকৃতই ম্যান্ডেলা হয়ে ওঠে।

যৌনতায় যে রণ বিশ্বাস ঘেন্না করেছে, ঘেন্না করেছে সমকাম, পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতায় ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে আমাদেরই মত, ক্ষমতার বিভিন্ন ধাপে ধাপে সাজানো যুদ্ধ, রিরংসা, ধর্মবিশ্বাস, যৌনতা ও ত্রাণকে অনুভব করে সে নিজেই হয়ে উঠতে চেয়েছে ত্রাণকর্তা নিজের ও তরুমাসির। “অসুখী মানব সর্বোপরি বিপজ্জনক” উচ্চারণ করে তার দাদু কোমার অতলে তলিয়ে গিয়েছিলেন। আর ফিরে না এলেও রণর সব চিঠির উত্তর ওই উচ্চারণে লেখা ছিল। ওই উত্তর থেকেই রণ নির্মাণ করে নিয়েছে যৌনতা, আত্মহত্যা ও হননের রাজনৈতিক ভাষ্য, যার উদবর্তন তরুমাসিতে এসে সাময়িক স্তব্ধতা লাভ করে। ঈশ্বর হয়ে উঠবার পিতৃতান্ত্রিক লোভকে তাতিয়ে তোলে তরুমাসি। জীবনের সমস্ত প্রশ্নের একটিমাত্র অনির্বাণ উত্তরের দিকে ঝাঁপ দেয় সে। উত্তর খুঁজতে বারংবার ব্যর্থ তরুমাসিও সঙ্গী হয় তার।

হঠাৎ করে হাতের সিগারেটটা দেওয়ালের গায়ে ঘষে নিভিয়ে দিতে দিতে তরুমাসি বলল ‘আমরা কী করছি রণ? আমরা কোথায় চলেছি?’

‘আমরা কোথাও যাচ্ছি না… আমাদের কোনও যাত্রা নেই।’

তরুমাসি চুপ হয়ে গেল।

আমি চিৎকার করে উঠলাম, ‘কীসের অপরাধবোধ তোমার? কীসের দায়?! জীবনের প্রতি? বেঁচে থাকার প্রতি? মরে গিয়ে বাঁচতে চাওয়ার প্রতি? আমায় ভোগ করার প্রতি? কীসের এত গ্লানি তোমার গলা অবধি বুঝিয়ে দেয়!’ (পৃঃ ১৪৩-৪৪)

এই লেখায় আপনার স্পেস আছে উত্তর দেবার। অক্ষরের মাপ বাড়তে বাড়তে ফেটে যেতে পারে আপনারই মস্তিষ্কের কোষে, নেমে আসতে পারে অমোঘ কয়েকটি দ্রুতলয়ী চড় কানের পাশ ঘেঁষে গালের উপর।

সিঁড়ির ল্যান্ডিঙে দাঁড়িয়ে আমি নিজের গালে

একটা চড় মারলাম।
তারপর দ্বিতীয় চড়টা
তারপর তৃতীয় চড়টা
তারপর চতুর্থ চড়টা
তারপর পঞ্চম চড়টা

মারলাম। (পৃঃ ৫৪)

ছাদের মেয়েটাকে স্পেসশিপ থেকে নামতে দেখেছিল রণ বিশ্বাস। কৌটোয় দমবন্ধ করে মেরেছে সে পিঁপড়েকে। মায়ের মানে স্বপ্না বিশ্বাসের স্বপ্নহীন এবং অবশ্যই বিশ্বাসহীন হাত ভাত বেড়ে দিত তাকে। তার পিতার কারণে ছিন্ন হয়েছিল হাড়গিলের মুণ্ডু। ধর্মবিশ্বাস আর নৈতিকতাকে সে প্রতিস্থাপন করেছিল হস্তমৈথুনে। এসবই বড় চেনা নয়? পিতৃতন্ত্র, ধর্ষকাম, বিবাদ, হোমোফোবিয়া, বর্ণবাদ ও বৈষম্য, সবার উপরে সত্য মানুষের পশুর ওপর অত্যাচার ছড়িয়ে আছে এই লেখার ছত্রে ছত্রে, এমনকি লাইনের মাঝের স্পেসেও। এসব ছক দেখতে দেখতে, গিলতে গিলতে, এমনকি রণ বিশ্বাস কবিতাও লিখে ফেলে আমাদেরই মত। শুধু এসব ছকের গ্র্যান্ড ডিজাইনটি অনুপস্থিত। ব্লার্বেই লেখা আছে অ্যানার্কির কথা। হয়তো তাই অনুপস্থিত। তবু সেই বৃহৎ নীল নকশাটি নৈরাজ্যের ভেতরেও দপ দপ করে। আর রণ বিশ্বাস তাই আপনারও নাম অলোকপর্ণা, আমাদেরও।

রণ বিশ্বাস কারো নাম নয়,
অলোকপর্ণা
আজকাল
২০০ টাকা

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2607 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...