খাদ এবং চোরা আলো

বুবুন চট্টোপাধ্যায়      

 



লেখক কবি ও প্রাবন্ধিক।

 

 

 

যে কোনও অশিক্ষিত, যে কোনও স্বৈরাচারী, যে কোনও ধান্দাবাজ সর্বশেষ এটাই করতে চায়। তারা জানে লোভী, সুবিধাবাদী, পাকা মাথাগুলোকে নিলামে চাপাতে বেশিক্ষণ লাগে না। জীবনের অর্ধেক যাদের পেরিয়ে গেছে তাদের সঙ্গে রফা করা সহজ। কিন্তু যে মাথাগুলো কচি, যেখানে এখনও নিছক বেঁচে থাকার জন্য ঘৃণ্য ধান্দাবাজি ঢোকেনি, যা এখনও সংসারের কুটিল চক্রব্যুহয় ঢোকেনি, যারা এখনও ঈশ্বরী পাটনির সেই আদি, অকৃত্রিম শুধু “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে”-র মতো স্বার্থগন্ধী প্রবাদকে সন্দেহের চোখে দেখে, যারা এখনও বিশ্বাস করে বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে জীবন চলে যায় – সেই মাথাগুলোকে ভাঙতে হবে। তবেই কাজ হবে। কারণ ওরা জানে, ওদের কাছেই প্রকৃত আগুন আছে যা মুহূর্তে দাবানল হওয়ার ক্ষমতা রাখে।

হ্যাঁ। ওরাই। ওদের কাঁধগুলো গুঁড়িয়ে দিলেই কেল্লাফতে। মারের চেয়ে বড় ওষুধ আর নেই। মারের চেয়ে নির্লজ্জ গুন্ডামি আর কিছু হয় না। কারণ ওদের মোটা চামড়া দেওয়া মাথায় এর চেয়ে সুচারু কোনও রণকৌশল ঢোকে না। তাই ওরা সশস্ত্র হয়ে মারতে গিয়েছিল। মেরেওছে। কাদের? এ-দেশের অন্যতম প্রিমিয়ার অ্যাকাডেমিক ইনস্টিউশনের ছাত্রছাত্রীদের। যারা চাইলে একজোট হয়ে সাম্প্রতিক ঘটতে থাকা একের পর এক এই গণতান্ত্রিক (?) রাষ্ট্রের এই অশিক্ষার, ধর্মান্ধ ধ্যাষ্টামোকে   লাথি মেরে গুঁড়িয়ে দিতে পারে। সেই মৌচাকেই গুন্ডাগুলো ঢিল মেরেছে। যে কোনও স্বৈরশাসকের এটাই নিয়ম। ইতিহাস তাই বলে। তাদের প্রাথমিক সফ্‌ট টার্গেট হয় ধর্মস্থান এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেই নিয়মেই তারা সেদিন সন্ধেবেলা মুখ বেঁধে ছাত্রছাত্রীদের পিটিয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই তারা একটি মস্ত জায়গায় হিসেবে ভুল করে ফেলে। এবারও তাই করেছে। নিজেদের মোটা চামড়ার মাথার সঙ্গে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের মাথাগুলো গুলিয়ে ফেলেছে। গুন্ডাগুলো ভেবেছিল আঘাত লাগলে তাদেরই মতো ককিয়ে উঠে তারা লেজ গুটিয়ে পালাবে। কিন্তু মেধাবী মাথা যে অন্যভাবে কাজ করে, আগুনের ফুলকি হয়ে চরাচর জ্বালিয়ে দিতে পারে – সেটি কার্যত, শুধু ওদের কেন, ওদের বাবাদেরও হিসেবের বাইরে ছিল।

হিটলার যখন ক্ষমতায় আসেন, গোটা জার্মানিকে বশ করেছিলেন উন্নয়নের মিথ্যে স্বপ্ন দিয়ে। আর ছেলেবুড়ো সকলের মস্তিষ্কে জিউদের প্রতি অপরিসীম হিংসা ঢুকিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তার জন্য যতরকম অগণতান্ত্রিক মেশিনারি প্রয়োজন সমস্ত তিনি ব্যবহার করছিলেন। তিনি দেশের জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এ দেশে বিশুদ্ধ আর্য রক্তের জার্মানরা ছাড়া আর কেউ থাকতে পারবে না। মোদিও একই কায়দায় গুজরাট মডেল দিয়ে ভারতবাসীকে ভোলাতে চাইলেন। দেশের সাংবাদিকদের ছলে-বলে -কৌশলে এড়িয়ে বিদেশে গিয়ে এনআরআইদের ডেকে চড়া দাগের যাত্রাপালার আয়োজন করলেন। এই কূটনৈতিক চাল অবধি ঠিকই ছিল। তারপর সেই হিটলারি কায়দায় ভারতের মতো একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে চ্যালা-চামুণ্ডাদের নিয়ে হিন্দুত্বের জিগির তুললেন। কাশ্মীরকে অচল করে দিলেন। অল্পবিদ্যা মা-মাসীদের মতো শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজে মুসলিম বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। বেশিরভাগ বড়ি-আচারের বুদ্ধির ঘেরাটোপে বসবাসকারী আর শুধুমাত্র নিজের সন্তানের কল্যাণকামী, কূপমণ্ডূক মা-বাপরা তা খেলেনও সর্বগ্রাসী হয়ে। লক্ষ্য করুন কী অশেষ মিল হিটলার, মুসোলিনির মতো স্বৈরশাসকদের সঙ্গে। হিন্দু রাষ্ট্রের স্বপ্নে বিভোর পঞ্চাশ-ষাট-সত্তরের প্রজন্মরা ভুলে যাওয়া একদা ভিটেমাটিহীন বাপদাদাদের কান্নায় আকুল হয়ে উঠলেন। সেই সময়ের দেশ ভাগের রাজনৈতিক ইতিহাস না জেনেই। তাঁরা একবারও ভাবলেন না, ভারতবর্ষে ধর্মের ভিত্তিতে মানুষের পরিচয় কোনওদিন ছিল না। যে যার ধর্মের নির্দিষ্ট আচার,বিচার নিয়ে ভারতীয় হিসেবেই পরিচিত ছিল। কোনও কৃত্তিম অনুশাসন নয়, প্রকৃতিগত কারণেই এই সহাবস্থান গড়ে উঠেছিল। চতুর রাজনীতিবিদরা এখানেই মেরুকরণের মশলা ঢাললেন। দুষ্ট লোকের একটাই ভয় থাকে। সারাজীবন সেই ভয় তাদের তাড়া করে। তা হল মানুষে মানুষে বন্ধুতা। যে কোনও সম্প্রীতির আবহ তাদের আতঙ্কিত করে। কারণ দুষ্কৃতিদের দৌরাত্ম্যই রুটিরুজি। দাঙ্গা, হিংসা থেকেই প্রফিট। বিজেপিও সেই মন্ত্রে দীক্ষিত।               

মোদী এই চড়া দাগের, অর্ধসত্য সেন্টিমেন্টকেই ক্যাশ করলেন। ক্ষমতার ধর্মই হল মানুষকে অন্ধ করা। মোদি সেই অন্ধত্বকে আলো বলে ভাবতে শেখালেন। ভাবলেন, এই পথে দেশের বেশিরভাগ দিন-আনি-দিন-খাই আর নিজের ছাড়া কিচ্ছুটি না চাওয়া বেশিরভাগ মানুষকে বাগে আনা শুধু সময়ের অপেক্ষা। না, ভুল বললাম। শুধু দরিদ্র, অশিক্ষার অন্ধকারে থাকা মানুষগুলো নয়। মোদি হাড়েমজ্জায় জানেন, এই জাতীয়তাবাদের জঘন্য উৎসবকে সফল করতে কিছু স্বার্থান্বেষী, মধ্যমেধার অপরিসীম লোভী, ধনীদেরও প্রয়োজন। যাঁরা বংশানুক্রমে সাধারণ মানুষের রক্ত চুষে গেছেন। এই বেনিয়া সম্প্রদায়কে কিনতে বেশি সময় লাগে না। এঁরা বিক্রি হওয়ার জন্যই জন্মেছেন।

কতটা আগুন জ্বললে ওদের চিতা চড়বে। তাই আমি ব্যক্তিগত ভাবে জেএনইউ-এর ঘটনায় মর্মাহত হলেও এই অন্ধকার খাদের মধ্যেও একটা চোরা আলো দেখতে পাচ্ছি। স্বৈরাচারী গুন্ডাগুলোর চিতার আলো। ওই তো পোড়া গন্ধ ভেসে আসছে। ওদের শকুনে এঁটো করা পচা শবের।  

দাহপর্ব শুরু হয়ে গেছে। ওদের। ওই ধর্ম নিয়ে মেরুকরণের ফ্যাসিস্টদের চিতায় আগুন দেওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। ছেলেমেয়েগুলো, তোদেরই দায় সৎকারের। আমরা তোদের সঙ্গে আছি।      

                                                                  

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2050 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...