এখন নিরপেক্ষ বলে কিছু নেই

সৈয়দ কওসর জামাল

 



লেখক বিশিষ্ট কবি ও প্রাবন্ধিক। দীর্ঘদিন প্রসারভারতীতে রেডিও ব্রডকাস্টারের দায়িত্ব সামলেছেন। বর্তমানে বিশ্বভারতীর আমন্ত্রিত অধ্যাপক।

 

 

 

সিএএ, এনপিআর ও এনআরসি-র বিরুদ্ধে সারা দেশ যখন এক হয়ে পথে নেমেছে, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ আন্দোলন করছেন, স্লোগানে গলা মেলাচ্ছেন, তখন শাসকের ভীত মুখচ্ছবিটি আমরা কল্পনা করতে পারি। তারা তো চেয়েছিলেন এইসব সরকারি বিধিনিষেধের গোপন এজেন্ডাটি দেশের হিন্দুরা বুঝবেন এবং মুসলমানদের বিচ্ছিন্ন করার আনন্দে সবাই সরকারের জয়ধ্বনি করবেন। হয়তো এতটা সরলভাবে তাঁরা ভাবেননি, কিন্তু মূল ধারণাটি ছিল এইরকম। তাঁদের ধারণা ছিল দেশের বৃহত্তম অংশ এইসব পদক্ষেপের জন্য তাঁদের পাশে থাকবেন, যাঁরা থাকবেন না তাঁরা সেকুলারদের সামান্য একটা অংশ, শহুরে নকশাল ও মুসলমানরা। স্পষ্টতই একটা সামাজিক বিভাজনরেখা তাঁরা তৈরি করতে সম্ভব হবেন যাতে ধর্মীয়ভাবে দেশের মুসলমান ও হিন্দুদের মধ্যে সন্দেহের অবকাশ তৈরি হয়। বিজেপির রাজ্য নেতারা বলতে শুরু করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গ থেকে দু কোটি ‘ঘুসপেটিয়া’ বা বিদেশি বহিরাগতকে দেশ থেকে তাড়াবেন।

কিন্তু ইতিমধ্যে সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশ অনুসারে অসমে এনআরসি করতে গিয়ে দেখা গেছে যারা নাগরিকপঞ্জির বাইরে থেকে গেলেন তারা শুধু মুসলমান নন, হিন্দুও, যারা দেশের নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে পারেননি বা যাদের প্রমাণপত্র বিবেচিত হয়নি। ১৯ লক্ষের মধ্যে দেখা গেল ১১ লক্ষ মানুষ হিন্দু, বাকি মুসলমান। এবং এরা সবাই বাঙালি। এই পরিসংখ্যান হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে গোটা দেশের বাঙালির কাছে এক অশুভ সঙ্কেত হয়ে দেখা দিয়েছে। ফলত, হিন্দু ও মুসলমান এই বিভাজনরেখা বিজেপির পক্ষে ধরে রাখা সম্ভব হল না। এই সমস্যাটির মোকাবিলা করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন তৈরি করা হল যাতে প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা হিন্দুদের এদেশে নাগরিকত্ব পাওয়া সহজ হয়। এই আইনে প্রথম দেশের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রে আঘাত করা হল বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিলেন কারণ এই আইনের বাইরে রাখা হয়েছে মুসলমানদের। যে দ্রুততার সঙ্গে এই আইন পাশ করা হয়েছে, তাও সন্দেহের ঊর্ধ্বে থাকেনি। সিএএ এবং তার সঙ্গে এনআরসি-র ঘোষণা সাধারণ মানুষের মনে যে ভীতির উদ্রেক করেছে তার বহিঃপ্রকাশ হতে থাকে দেশের বিভিন্ন অংশে, বিশেষ করে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়, জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। আন্দোলন যত উত্তাল হতে থাকে, শাসকের রক্তচক্ষু তত প্রবল হতে থাকে। তাঁরা ভেবেছিলেন দমননীতি প্রয়োগ করে, ভয় দেখিয়ে যেভাবে তাঁরা কাশ্মিরকে নিশ্চুপ রেখেছেন, সেভাবেই এই আন্দোলনকে সামাল দেবেন। তাই নির্মমভাবে লাঠিপেটা করে পুলিশ আলিগড়ের ছাত্রদের ওপর, নৃশংস অত্যাচার চালানো হয় জামিয়ার ছাত্রছাত্রীদের ওপর। এটাই কর্তৃত্ববাদী শাসকশ্রেণির সামনে সহজ উপায় হিসেবে দেখা দেয়। গোটা পৃথিবীতে এর অজস্র উদাহরণ আছে।

কিন্তু আমাদের বিজেপি-শাসকেরা গোড়াতেই যে ভুল করেছেন তা হল তাঁরা এ দেশের মৌলিক চরিত্রটিকেই বোঝার চেষ্টা করেননি। হিন্দি, হিন্দু ও হিন্দুত্বের আধারে নিবদ্ধ সঙ্কীর্ণ জাতীয়তাবাদের চোখে তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য ভারতকে একটি হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত করা। আর তা করতে গিয়ে তাঁরা ভুলে গেছেন যে গত সত্তর বছরের বেশি সময় ধরে উদারবাদী গণতন্ত্রের শেকড় দেশে যেভাবে চারিত হয়েছে সেখানে কোনও কর্তৃত্ববাদী ভাবনার স্থান নেই, বিজেপি চাইলেই দেশের মানুষের মন থেকে গণতন্ত্রের ধারণাকে মুছে ফেলতে পারবে না। কাশ্মিরে যে চ্যালেঞ্জ নেওয়া যায়, গোটা দেশের ক্ষেত্রে তা নেওয়া যায় না, সে চেষ্টা দুঃসাহসের সামিল। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকার এই দুঃসাহসই দেখাতে চেয়েছেন। আর তার ফল হয়েছে সারা দেশে তৈরি হয়েছে এক অস্থিরতা। একে দেশে উপস্থিত চরম বেকারত্ব, দারিদ্র, অর্থনীতির নিম্নমুখীনতা, তার ওপর এই সিএএ, এনপিআর ও এনআরসি-র আন্দোলন। অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে সরকার দেশের অর্থনীতির হাল ফেরাতে পারতেন, দারিদ্র দূর করার লক্ষ্যে কাজ করতে পারতেন, স্বাস্থ্য-চিকিৎসার মান বাড়ানোর কাজে মন দিতে পারতেন, কিন্তু সেসব কিছুই না করে তাঁরা তাঁদের লক্ষ্য স্থির করেছেন দেশকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজনের, মনে দীর্ঘদিনের লালিত এক হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের ভাবনাকে রূপ দিতে।

বাদ সেধেছেন দেশের মানুষ, বিশেষ করে দেশের ছাত্রসম্প্রদায়। আন্দোলন যত ছড়িয়ে পড়ছে, সরকার দমননীতিকেই একমাত্র উপশম হিসেবে মনে করেছেন। ভয়ের সঞ্চার করতে চেয়েছেন ছাত্রসমাজের ভিতরে। দেশের অগ্রগণ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে আরএসএস-এর সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের নেতৃত্বে গুন্ডারা যেভাবে একতরফাভাবে হামলা করে ছাত্রছাত্রী ও অধ্যাপকদের আহত করল, তাতে এ কথাই স্পষ্ট হল যে মোদি-শাহ ক্যাম্পাসে ভয়ের আবহ তৈরি করতে চান। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তাঁদের হাতের পুতুল। হামলার সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিকিয়োরিটি পারসোনেলকে নিষ্ক্রিয় রাখলেন শুধু নয়, হামলার পরপরই তিনি আহত ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধেই পুলিসে অভিযোগ করলেন। আর হামলার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অধীনস্থ দিল্লি পুলিস কার্যত দর্শকের ভূমিকায় দাঁড়িয়ে থাকল। প্রশ্ন হল, রাষ্ট্রশক্তির প্রতিভূরা এই যে ভীতিসঞ্চার করছেন ছাত্রসমাজের ওপর আক্রমণ চালিয়ে, তাতে কি এই প্রমাণ হয় না যে ছাত্রসমাজকেই তাঁরা ভয় পেয়েছেন? তাঁদের আক্রমণ কি ভয়েরই প্রকাশ নয়?

দেখা যায় যে দেশের যে কোনও সঙ্কটের সময় ছাত্রসমাজই ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। আমাদের এই সঙ্কটে আমরা কি তাঁদের খুব বেশি দায়িত্ব দিতে চাইছি? দেশের সাধারণ মানুষ এখনও দ্বিধার ভিতরে। তাঁরা সত্যিই বুঝতে পারছেন না তাঁদের কী করা উচিত। দুর্বল সরকার-বিরোধী শক্তি এর জন্য দায়ী। তাই কি ছাত্রসমাজ তুলে নেবেন দেশকে অস্থিরতা থেকে বাঁচানোর দায়? এই সব প্রশ্নের উত্তর খুব তাড়াতাড়ি পেতে হবে আমাদের। কিন্তু একটা কথা পরিষ্কার আজ আমাদের সামনে— নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকার দিন শেষ, কারণ দূরত্বে থেকেও কেউ রেহাই পাবেন না; আর নিরপেক্ষ থাকার অর্থই এখন স্বৈরাচারী শাসকশ্রেণির পক্ষ অবলম্বন করা; কে কী করবেন তা একান্তই নিজেদের সিদ্ধান্ত।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2524 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...