নাগরিকের পঞ্জি, পুঞ্জীভূত প্রেত, বিক্ষোভের দিনপঞ্জিকা

অনিন্দ্য সেনগুপ্ত

 



লেখক গদ্যকার, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম স্টাডিজের অধ্যাপক।

 

 

 

 

 

ভারতবর্ষ, ডিসেম্বর ২০১৯ এবং জানুয়ারি ২০২০ নিয়ে কিছু না-তথ্যমূলক গদ্য…

১।

আমি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসিন্দা। ২০১৪-১৬-র পর থেকে মাঝবয়সে একধরনের মেলানকোলিয়ায় ধরে, যা অভিপ্রেত ছিল। ‘হোক কলরব’ ফিকে হয়ে উবে যায়, কিন্তু ওই, যাওয়ারই ছিল। অর্থাৎ এ অঞ্চলে বামপন্থার চেনা ইতিহাস অস্তমিত হওয়ার পর যে অবসাদ আসার কথা ছিল, সে যৌবনের জোয়ারে একটু পিছিয়ে গেছিল আগমনে। ভাবতাম– ‘হোক কলরব’ কি ভ্রম? না, ভ্রম নয়, হয়েছিল। তাহলে আমার মত আগত মাঝবয়েসে সেই আন্দোলন ওভাররেটেড ছিল? আমি বলব– না। ‘হোক কলরব’-এর মূল্য এখন আমার কাছে একদমই ব্যক্তিগত, পাঠকসমাজে তা আরোপিত করতেও চাইব না, কারুর সঙ্গে তর্কেও যাব না কারণ আমি জানি ভিন্ন মত আছে। যে অর্থ আমি সর্বজনসম্মত বলে দাবিই করছি না– তাকে ওভাররেটেড বলব কেন?

গত এক-দেড় সপ্তাহে দেখলাম সেই ‘হোক কলরব’-এর সেই স্পিরিট (যার আরেক প্রতিশব্দ হল প্রেত) জাতীয় স্তরে ফিরে এসেছে, ফিরে এসছে বিক্ষোভের রাজনীতির প্যারাডিগমাটিক শিফট হয়ে।

সেই স্পিরিটটা কী ছিল? প্রথমত, ছাত্র-যুব আন্দোলন থেকে এই স্পিরিটের উদ্ভব। দ্বিতীয়ত, বোধহয় নাগরিক আন্দোলনের মধ্যে প্রথম যে আন্দোলন একদম সামনের সারিতে রাখে নারী প্রতিবাদীকে। সত্তর দশকের দাঁড়ি, উসকো-খুসকো চুল, জিন্স পাঞ্জাবি পরিহিত যুবক নয়, ‘হোক কলরব’-এর আইকন একজন যুবতী, যাদের এবার আলিগড়, জামিয়ায়, জেএনইউতে দেখা যাচ্ছে।

‘হোক কলরব’ ডিসেন্টারড, অরৈখিক, লিডারলেস ছিল। অতএব মুভমেন্টের যে চেনা ধরন তা পালটে গেছে। আশি-নব্বই দশকে সেন্ট্রালাইজড, এবং গোল-ওরিয়েন্টেড বামপন্থী ছাত্র-আন্দোলনের মডেলে যারা অভ্যস্থ আমাদের মত, তাদের এই রাজনীতি বুঝতে খুব অসুবিধে হবে। এখন আমি বুঝতে পারছি যে ‘কলরব’-এর অবসানে আমার অবসাদ বোকা-বোকা ছিল; কারণ এই রাজনীতির চরিত্রই স্পোরাডিক, ফ্র্যাগমেন্টারি, ইনটেন্স কিন্তু ইনট্র্যানজিটরি– অর্থাৎ এই আন্দোলন ফুরিয়ে যাবেই যেহেতু এটা একরৈখিক নয়। আগে ভেবেছিলাম এটা সীমাবদ্ধতা, এখন বুঝছি– না, এটাই বৈশিষ্ট্য– মিলিয়ে যাবে, আবার ফিরবে, হারিয়ে যাবে, উত্থান হবে।

 

২।

স্লোগান। গান। পতাকা। কবিতা। ছন্দ। হিউমার। গ্রাফিত্তি। সব ফিরে এসেছে গত এক মাসে।

বিউটি, সৌন্দর্য। এরকম আন্দোলনের সময়ে সুন্দরের জন্ম দিতে হয়, সুন্দরের জন্ম হয়। তেরঙ্গা পতাকা রিক্লেম করার মুহূর্ত সৌন্দর্যের; জামা মসজিদে চন্দ্রশেখর আজাদের আর্বান লেজেন্ডের মত উদয় হওয়া সৌন্দর্যের; দেবস্মিতা চৌধুরীর কনভোকেশনে সিটিজেন বিলের অ্যামেন্ডমেন্ট ছিঁড়ে ইনকিলাব জিন্দাবাদ বলা সৌন্দর্যের। এক্সট্যাটিক সৌন্দর্যের জন্ম হয় এরকম মুহূর্তে, যা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে রাষ্ট্র কদর্যতা প্রসবে রত।

এই আন্দোলন ওই কদর্যতার প্রতিতর্ক। এই তর্ক কীভাবে জয়লাভ করবে সেটা অপ্রাসঙ্গিক। এই প্রতিতর্ক কল্পনার আর কবিতার। পরিবেশ-ধ্বংসের প্রলয়ে যেদিন মানবসভ্যতা শেষ হবে, কুকুরেরা শুনবে পৃথিবীর শেষ মানুষরা প্রাণত্যাগ করার সময়ে (সেই মানুষ কুকুরদের বন্ধু হতে বাধ্য) মানবহীন মেট্রোপলিসের কোনও ঘরে লুপে চালিয়ে গেছে একটা গান, যতক্ষণ বিদ্যুৎ থাকবে চলবে– জন লেননের ইমাজিন।

সেন্সিবিলিটি, বোধ, আইডিয়া-– মানুষের অবদান এতটুকুই এই ধরিত্রীতে। ইকুয়ালিটি, ইকুইটি, সাম্য, সুদিন– এগুলি মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিতা, সুন্দরতম কল্পনা– এগুলোকে শেষের সে ক্ষণ অব্দি বাঁচিয়ে রাখা আমাদের কাজ। তাই এই কল্পনা বাস্তবায়িত হবে কীভাবে তা নিয়ে উৎকণ্ঠায় ভোগাটা বোকামো– কারণ আইডিয়া, কল্পনা উদয় হওয়া মাত্রই বাস্তব। যেভাবে ঈশ্বর বাস্তব, ভূত বাস্তব, সেভাবেই সাম্য বাস্তব– কারণ মানুষের কল্পনা না থাকলে এসব কিছুই নেই। ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের কাজ হল আমাদের মগজকে এই আজাদির সৌন্দর্যের কল্পনা থেকে নিরস্ত করা, আমাদের কল্পনার স্পর্ধাকে নির্মূল, নাম্ব করে দেওয়া।

সৌন্দর্যের প্রায়োরিটি হয় না– আজাদির স্লোগান, শিশুর হাসি, কুকুরের দৃষ্টি, কবিতায় একটা চেনা শব্দের পর আশ্চর্য একটা শব্দ– এর মধ্যে কোনও স্তরান্তর থাকে না এইসব মুহূর্তে। এই মুহূর্ত চাঁদ-ফুল-জোছনারও মুহূর্ত; যা কিছু সুন্দর আমরা কল্পনা করেছি সেই সবকিছুকে ফিরিয়ে আনার মুহূর্ত। শুধু তার মধ্যে একধরনের সেন্স অফ প্রিকেরিটি থাকতে হয়, অমরতার নয়। সুন্দর মুমূর্ষু, সুন্দর আক্রান্ত, সেইজন্যই সুন্দর লড়াকু– এই বোধ থাকতে হয়।

ইতিহাসপ্রসূত কদর্যতার তীব্র বোধ না থাকলে এই সৌন্দর্য কল্পনা করা যায় না। যেমন লাল পতাকা সবসময়েই আগামী কোনও সাম্যবাদের প্রতীক, তাই তা কখনওই পুড়িয়ে ফেলা যায় না, ভবিষ্যতের কল্পনা দাহ্য নয়, কখনওই ফুরোয় না।

 

৩।

কোক স্টুডিওর দশম সিজনে সাফকাত আমানত এবং আহমেদ জেহনজেবের গাওয়া ‘আল্লাহু আকবর’ নামে একটা গান শোনা যায়। এইসব গান শুনে একধরনের ‘হাই’ হয়, অথচ আমি ঈশ্বরবিশ্বাসী নই। আজ বুঝি, ঈশ্বরবিশ্বাস এবং বিজ্ঞানমনস্কতার বাইনারি– এই ধরনের ভুল বাইনারিতে ভুগে নিজেকে কত আনন্দ থেকেই না বঞ্চিত করেছি। বিজ্ঞান সত্য, আধ্যাত্মিকতা মিথ্যে– এইসব খাটে যদি বিজ্ঞানের কোনও প্রায়োগিক ভবিষ্যৎ থাকত। নেই। পুঁজিবাদের খপ্পরে পড়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে একশো বছরে এই গ্রহের বিনাশই ত্বরান্বিত হয়েছে। থিওলজি আর বিজ্ঞান তো আখেরে মানুষের অস্তিত্ব আর বিশ্বকে বোঝার দুটো সিস্টেম ছিল; দুটোর কোনওটাতেই সেই জোর ছিল না যে ক্ষমতা, পুঁজিতন্ত্র আর সংখ্যাগুরুর রাজনীতির প্রকোপ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। তাই আখেরে দুটিই ভোগে গেছে। তবে ধর্ম আর আধ্যাত্মিকতা, আধ্যাত্মিকতা আর কবিতা আবার একই নয়। যেমন বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি নয়। তার চাইতে অনেক বড় বিস্ময় হল চেতনা কী করে চৈতন্য হতে পারে …।

তাই একটা সুফি, বাউল বা আধ্যাত্মিক কাব্য আর দুরূহ অঙ্ক, এই দুইয়েই একধরনের রেজিস্ট্যান্স আছে– ক্ষমতার তন্ত্রে অব্যবহৃত থাকার জোর। ওই গানের আল্লাহু আকবর, সেই কঠিন ম্যাথেমেটিকাল পাজলের মতই, মানুষকে ঘৃণা করতে শেখাতে পারবে না, ঘৃণার অস্ত্র হবে না। অর্থাৎ ডায়লেক্টিকাল ব্যাপার-স্যাপার আছে; বেকার বাইনারি নয় সবকিছু। ঈশ্বর মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কল্পনা, যার সঙ্গে তার অন্তরের কথোপকথন হতে পারে। ঈশ্বরের, এবং স্বপ্নের মৃত্যু হবে যেদিন মানুষের অবসান হবে। ঈশ্বরের মতই মানুষের আরেক কল্পনা হল– দেশ।

আখেরে এইসব সুন্দর সবই কবিতা, সবই মানুষের কল্পনার তুঙ্গ মুহূর্ত– যেমন জামা মসজিদে চন্দ্রশেখর আজাদের মানুষের সমুদ্র থেকে সংবিধান হাতে উত্থান।

সেই কবে একজন বলে গেছিলেন-– আগামীর প্রেতে গ্রস্ত বর্তমানের মহাদেশ! কল্পনার প্রেতকে গুনে রাখবে কোন পঞ্জি?

 

৪।

আজাদি।

এই একটি কবিতা কাশ্মির আমাদের উপহার দিয়েছে সারা ভারত জুড়ে এই কবিতার রচনা ধারাবাহিক ও চিরন্তন হওয়ার জন্য, শেষ না হওয়ার জন্য, শেষ না হয়ে যাওয়ার জন্য। প্রতিটি যুগে যুগে, উত্থানে আন্দোলনে, শ্লোকে শ্লোকে আরেকটি স্বদেশ রচিত হওয়ার জন্য যার কোনও শাসক নেই, যার কোনও নাগরিকপঞ্জি নেই। সেই দেশ স্বাধীনতার। আমরা আজাদির দেশের মানুষ হতে চাই। আজাদির মূল কবিতাটি শুনেছেন? সেখানে ঝর্না আর পাহাড়ও চায় আজাদি।

“অ্যায় মওলা দে দে” বলে আকুতি যে মন্ত্রে থাকে সেটি রাষ্ট্রের সঙ্গে কোনও সংলাপেই যাচ্ছে না। রাষ্ট্রীয় গদ্যের লোকেরা কবিতা বোঝে না। কবিতা বোঝে পাখি আর আগামীর মানুষেরা। ভারতের সংবিধান– আগে যেমন বললাম সেই লাল পতাকার মতই– একটি সম্ভাব্য স্বপ্নের ভারতবর্ষের কল্পনার নিয়মাবলি। এই ভারতবর্ষ আমাদের তিল তিল করে নির্মাণ করার কথা ছিল। সেই কল্পনায় আঘাত হানতে চায় এনআরসি, সিএএ, এনপিআর–

দিল কি ধড়কন আজাদি
মন কা দর্পন আজাদি
আসু কি ঠান্ডাক আজাদি
জিস্‌ম কি রৌনাক আজাদি
ও আই আই আজাদি!
ও আই আই আজাদি!
অ্যায় মওলা দে দে আজাদি!

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2050 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...