দেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত গড়ছেন তথাকথিত মিনি পাকিস্তানের মহিলারা

গুলশনারা

 

 




লেখক নাট্যকর্মী।

 

 

 

 

আমার বাড়ি বেকবাগানে। মিঠাইয়ের পাশের গলি দিয়ে ঢুকলেই আমার বাড়ি, অর্থাৎ পার্ক সার্কাস লোকালিটি। আমি এই পাড়ায় রয়েছি গত একত্রিশ বছর ধরে। ২০১৯-এর শুরু থেকেই… না, ২০১৯ বলব না, যে মুহূর্তে ভারতবর্ষে ২০১৪ থেকে একটি সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদী সরকার কায়েম হয়েছে, তারপর থেকে নানারকম কাণ্ডকারখানা হয়ে চলেছে, এবং ফলস্বরূপ একটা ধর্মীয় টেনশন বা টানাপোড়েন অনুভূত হচ্ছে গোটা ভারতবর্ষে। পশ্চিমবঙ্গে সেই আঁচটা কিছুটা পরে এসে পড়েছে। যদিও পরে বলা যায় না, বরং বলা ভালো আমরা সেই আঁচটা অনুভূত হতে দিইনি একটা সেকুলারিজমের মুখোশ পড়ে থাকার কারণে। কিন্তু পার্ক সার্কাস অঞ্চলের বাসিন্দা হওয়ার সুবাদে আমি বলতে পারি– এখানে বলে রাখি, আমি আমার রাজ্য বা আমার শহরের কথাই বলছি– আমরা এই টেনশন বরাবরই টের পেয়ে থাকি। এই শহরে যেসব অঞ্চলগুলো মূলত সংখ্যালঘু বা মুসলমান অধ্যুষিত সেই অঞ্চলগুলো সম্বন্ধে বরাবরই সংখ্যাগুরু বা হিন্দু সম্প্রদায়ের একটা তো আঙুল তোলা ছিলই, যেমন রাজাবাজার বা পার্ক সার্কাস বা মেটিয়াবুরুজ এসব অঞ্চলে, বাবা এখানে তো কিছু বলা যাবে না, এখানে তো হেলমেট না পরলেও কিছু বলবে না পুলিশ… যেহেতু নাকি সংখ্যালঘু তোষণ আছে আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর বা আমাদের সরকারের।

তো সেই পরিস্থিতিতে বড় হলেও, আমার নাম গুলশানারা, এবার একজন মানুষের নাম গুলশনারা হলে তার যেভাবে বড় হওয়া উচিত বা যেরকম আইডেন্টিটি গড়ে উঠা উচিত আমাদের দেশে, আমাদের পরিবারে আমাকে সেরকম করে বড় করা হয়নি। বরং ১৮ বছর হওয়ার পর আমাকে আমার নিজের ধর্ম চুজ করে নিতে দেওয়া হয়েছে এবং সেই ধর্ম আমি নিজে বেছে নিয়েছি। সেই ধর্মটার নাম মানবতা। আমরা নামটা গুলশানারা হতে পারে, কিন্তু সেটা একটা উর্দু শব্দ, কোনও ইসলামি নাম নয়, আমি এটাকে কনডেম করি। কিন্তু পার্ক সার্কাসে বড় হওয়ার কারণে, আমি যখন ছোট থেকে বড় হচ্ছি তখন বিভিন্ন মহল থেকে– কোট আনকোট শিক্ষিত মহল থেকে, বুদ্ধিজীবী মহল থেকে– আমাকে বিভিন্ন সময় শুনতে হয়েছে ‘পার্ক সার্কাস! ও ওটা তো একটা মিনি পাকিস্তান!’ তাতেও আমার খুব একটা আপত্তি নেই। পাকিস্তানের মহেঞ্জোদারো হরপ্পা, পাকিস্তানের মরুতীর্থ হিংলাজ, এই সব মিলিয়ে পাকিস্তানের যে ঐশ্বর্য রয়েছে, বা পাকিস্তানের ক্রিকেট টিম যখন খেলতে আসে তাদের অপূর্ব সুপুরুষ ক্রিকেটাররা মনে তো বেশ পুলকই জাগায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও, এই দেশের বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও এই যে বারবার মিনি পাকিস্তান বলে একটা নেগেটিভভাবে দেগে দেওয়া, এটা একটা খারাপ লাগাও তৈরি করে বটে।

আমি আমার পাড়াটাকে চিনি। উত্তর কলকাতা বা মধ্য কলকাতার যে সমস্ত জায়গা তথাকথিত মিনি পাকিস্তান নয়, যে সমস্ত জায়গা সংখ্যাগুরু অধ্যুষিত বেশ পশ জায়গা, সে সমস্ত জায়গাতেও আমি যেরকম ছোঁয়াছুঁয়ি জাতপাত ধর্মের ব্যাপার দেখেছি, আমি এটা জোর গলায় বলতে পারি যে সেটা আমি আমার পাড়ায়, এই পার্ক সার্কাস অঞ্চলে কখনও দেখিনি। পার্ক সার্কাস যথেষ্ট কসমোপলিটান এরিয়া। বরং আমি বলতে পারি যে কলকাতায় কিছুদিন আগে তসলিমা নাসরিনকে নিয়ে যখন একটা অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটেছিল তখন এই পার্ক সার্কাসের কসমোপলিটান চরিত্রের জন্যই দাঙ্গাটা ঠেকানো গেছিল। এটাই যোধপুর পার্ক বা যাদবপুর হলে সেখানে যেসব বাহিনি– তখন তো আর বিজেপির দুর্গা বাহিনি ছিল না– সেসব বাহিনি যে যথেষ্ট নুইসেন্স ক্রিয়েট করত কিনা, যথেষ্ট ডিসরাপশন ক্রিয়েট করত কিনা সে নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। পার্ক সার্কাসের মানুষ সেই সময় যে সংযম দেখিয়েছিলেন আমি জানি না কোনও সংখ্যাগুরু অধ্যুষিত এলাকার মানুষ ততটা কসমোপলিটান চরিত্র, ততটা সহানুভূতিশীলতা, ততটা সংযম সেইসময় দেখাতেন কিনা। আমার পাড়াতেই একটি বাজার আছে যেটি ধাঙড় বাজার নামে পরিচিত, যেটি পার্ক সার্কাস মার্কেট নামে আরও বেশি পরিচিত, সেই বাজারে পাশাপাশি বসে দুই মাংসবিক্রেতা গরু এবং শুয়োরের মাংস বিক্রি করে। এটা আমার পাড়ার গর্ব, এবং সেই পাড়ার বাসিন্দা হয়ে আমার তো আরও বেশি গর্ব।

গত কয়েক দিন ধরে পার্ক সার্কাস ময়দানে যে বিখ্যাত মসজিদটি আছে সেখানে মূলত অবাঙালি মুসলমান পরিবারের মেয়েরা– যাঁরা পর্দানশিনতার মধ্যে বড় হয়েছেন বলে কালো হিজাব পরে থাকেন, ধর্মীয় সংস্কার বা কুসংস্কার বা নিজের কোনও ব্যক্তিগত কারণে পরপুরুষকে মুখ দেখান না, তাঁরা বাইরে বেরিয়ে এসেছেন। এনআরসির বিরুদ্ধে, সিএএর বিরুদ্ধে, সিএবির বিরুদ্ধে, এনপিআরের বিরুদ্ধে। ভারতবর্ষে অপর একটি প্রান্তে, শাহিনবাগে, মহিলা, অশীতিপর বৃদ্ধ, এবং বাচ্চারা যে সাহসটা দেখিয়ে চলেছেন দিবারাত্র গত কয়েকদিন যাবত, যা আমাদের নতুন স্বপ্নের কথা ভাবতে শেখাচ্ছে, আমাদের বিশ্বাস করতে শেখাচ্ছে যে মানুষের মধ্যে মানবতা বা সংগ্রামী সত্তা এখনও মরে যায়নি… বেঁচে আছে… তীব্রভাবে বেঁচে আছে। যেকোনও ফ্যাসিজমকে রুখে দেওয়ার জন্য যা যথেষ্ট। ঠিক সেই আঁচটুকু বুকে নিয়ে পার্ক সার্কাস অঞ্চলের মহিলারা, ওই ৪ নম্বর ব্রিজ, লোহাপুল এবং সংলগ্ন অঞ্চলের দরিদ্র মুসলমান মহিলারা বেরিয়ে এসেছেন এবং তারা সারাদিন সারারাত সেখানে বসে থাকছেন। কেউ কেউ সংসারের দায়িত্ব কর্তব্য সামলে আসছেন পালা করে অন্য একজনকে তার জায়গাটা রাখতে বলে। এইভাবে পালা বিনিময় করে তাঁরা বেরিয়ে এসেছেন নিজের অস্তিত্ব, দেশের ভবিষ্যৎ এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি ধর্মীয় মৌলবাদ মুক্ত রাষ্ট্রের স্বপ্নে। তাঁরা বেরিয়ে এসেছেন ধর্মীয় ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে, যে যে রাজনৈতিক– কোট আনকোট কুরাজনৈতিক ফতোয়া নেমে আসছে তার বিরুদ্ধে।

দেশে যখন একের পর এক প্রতিবাদ বিরোধিতার ওপর ফ্যাসিজমের চূড়ান্ত সন্ত্রাস নেমে আসছে, যেগুলো পরিষ্কারভাবেই স্টেট-স্পন্সরড সন্ত্রাস, যেটা আমরা জেএনইউতে দেখেছি, জামিয়াতে দেখেছি, শাহিনবাগেও দেখেছি, তার তোয়াক্কা না করে আট থেকে– আট বছর বলব না, আমি চার বছরের বাচ্চাকেও কাল দেখেছি– আশি অবধি মহিলারা যেভাবে রয়েছেন, সেটা আমাকে খুব ইন্সপায়ার করছে। তাদের মুখে যে আজাদির স্লোগান সেটা কিন্তু কোনও মুসলমান ধর্মকে রক্ষা করার জন্য স্লোগান নয়, বরং দেশের নাগরিক হিসেবে, দেশে বসবাস করার সম-অধিকারের দাবিতে, দেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে বজায় রেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সুস্থ সমাজ, একটি রাজনৈতিক সন্ত্রাস মুক্ত সমাজ দেওয়ার লক্ষ্যেই তাঁদের এই যে লড়াই তা আমি চাক্ষুষ করলাম গতকাল। আমার প্রত্যেক দিন শুটিংয়ের কারণে খুব রাত করে বাড়ি ফিরছি। এবং পরদিন আর্লি কলটাইম থাকার জন্য আমি সেখানে থাকতে পারছিলাম না, কালকে শুটিং তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেছিল বলে আমি ওখানে যেতে পেরেছিলাম। জমায়েতটা যে হয়েছে তাতে সাড়ে তিনশো থেকে চারশো মহিলা রয়েছেন এবং তাঁদের অধিকাংশই হিজাব পরে রয়েছেন, নিজেদের মুখটা ঢেকে রয়েছেন। কিন্তু তারা আজাদির স্লোগান দিচ্ছেন, স্লোগান দিচ্ছেন সিএএর বিরুদ্ধে, ক্যাবের বিরুদ্ধে, এনআরসির বিরুদ্ধে, এনপিআরের বিরুদ্ধে। তাঁদের মুখে ‘গো ব্যাক মোদি’ শব্দটা আসছে। মায়েরা বসে আছেন বাচ্চাদেরকে নিয়ে, ভারতের পতাকা উড়ছে সেখানে, যে মিনি পাকিস্তান বারবার করে বলা হয়, সেখানে। এই মিনি পাকিস্তান বিষয়টাও তো একটা রাজনৈতিক মেরুকরণ, তার কারণ যখন হ্যান্সি ক্রোনিয়ে সাউথ আফ্রিকার ক্যাপ্টেন ছিলেন আমি ভারতীয় হয়েও সাউথ আফ্রিকাকে সমর্থন করতাম। স্টিভ ওয়ার প্রচণ্ড ভক্ত ছিলাম। ইডেনে সৌরভ টসে দেরি করে আসার জন্য কোথাও একটা গর্ব অনুভব হলেও ওয়াকে আমি প্রচণ্ড ভালোবাসতাম। আমার পাশের বাড়ির বন্ধু চিত্রলেখা শাহিদ আফ্রিদির প্রচণ্ড ফ্যান ছিল। ফলে এই যে মিনি পাকিস্তান জাতীয় মেরুকরণ চিরকাল পার্ক সার্কাস রাজাবাজার মেটিয়াবুরুজ জাতীয় অঞ্চলগুলোকে করে আসা হয়েছে, তাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে সেই অবজ্ঞাকে হেলায় হারিয়ে দিচ্ছে কয়েকটা স্লোগান: হাম কেয়া মাঙ্গে– আজাদি, সিএএ-সে আজাদি, এনআরসি-সে আজাদি, এনপিআর-সে আজাদি। ইনকিলাবের নারা উঠছে মুখে। সেখানে কিন্তু আল্লাহু আকবর-এর নারা একবারও ওঠেনি। বিরসা ফুলে আম্বেদকরের কথা উঠছে, জয় জয় জয় ভীম বলছেন সবাই।

আমার মনে হয় এই যে বাড়ির মহিলাদের বেরিয়ে আসা এটা খুবই তাৎপর্যবাহী, কারণ ফেমিনিজমের শক্তিই তো ফ্যাসিজমকে সবচেয়ে বেশি রুখতে পারে। যে ফ্যাসিজমটা চলছে সেটা আদতে এক ধরনের পেট্রিয়ার্কি– পিতৃতান্ত্রিকতা, যারা ক্ষমতাসীন ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন তারা, এবং তাদের বিরুদ্ধে লড়ছেন তাঁরা যাঁদের চিরকাল সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন করে রাখা হয়, যাঁরা মাইনরিটি উইদিন দ্য মাইনরিটি। তাঁরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মহিলা। চিরকাল যে মহিলাদের বলা হয়, ও ওদের ধর্মের মেয়েরা তো বাইরে আসে না। ওদের মেয়েরা তো কিছু করে না। আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের জাতীয়তাবাদের যে ইতিহাস, রেনেসাঁর সময়কার ঘটনা যদি মনে করি, তবে দেখব সেটি হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদী জাতীয়তাবাদ। সেখানে মুসলমান সম্প্রদায় ছিলেন না। ছিলেন না, নাকি সেই মেরুকরণটা তৈরি করা হয়েছিল, তা ইতিহাস বলবে, রোমিলা থাপারের লেখায় আমরা পড়েছি। আজ যে জাতীয়তাবাদটা তৈরি হচ্ছে, যে দেশপ্রেমটা তৈরি হচ্ছে আসল দেশদ্রোহিতার বিরুদ্ধে, পার্ক সার্কাসের মানুষ হিসাবে তা আমাকে ভীষণভাবে ইন্সপায়ার করছে, এবং আমি জানি আমার শহর আমার রাজ্যের মানুষকে ভীষণভাবেই যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করছেন পার্ক সার্কাসের বড় মসজিদের সামনে উপনীত ওই মহিলারা।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2050 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...