‘হাম দেখেঙ্গে’ আন্দোলনে রয়েছে এদেশের রাজনৈতিক চরিত্র বদলে দেওয়ার বীজ

নীলাঞ্জন হাজরা

 



লেখক কবি, প্রাবন্ধিক, তর্জমাকার এবং সাংবাদিক।

 

 

 

মানুষ ইঁদুর নয় যে এগারো প্রজন্ম ধরে তার লেজ কেটে নিয়ে পরীক্ষা করা যেতে পারে দ্বাদশ প্রজন্মের লেজ বেরোয় কি না। সেই কারণেই ইতিহাসে আজ অবধি কোনও ‘বাদ’ অভ্রান্ত বলে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনদের এটা একটা বড় সমস্যা। ঠিক কোন রাজনৈতিক-সামাজিক রসায়নে ক্ষমতায় আসীন থাকা প্রলম্বিত করা যাবে তার কোনও প্রামাণ্য সমীকরণ নেই। সংশোধিত নাগরিক আইন এবং জাতীয় নাগরিক পঞ্জিকরণের বিরুদ্ধে যে জনরোষ তৈরি হয়েছে তাকে আমি এইভাবেই দেখি। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভয়াবহ হামলার জন্য ভারতীয় জনতা পার্টির ছাত্র শাখা অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের বিরুদ্ধে ছাত্রী-ছাত্রদের উপর দায়ী করে যে অভিযোগ উঠেছে, আমি তা সঠিক বলে মনে করি। এবং আমি এও মনে করি যে সিএএ-এনআরসি বিরোধী আন্দোলন স্তব্ধ করার যে বৃহত্তর সহিংস রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক পরিকল্পনা তৈরি করেছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ, তা থেকে জেএনইউ-এর এই হামলা বিচ্ছিন্ন নয়। এটা বোঝা খুব জরুরি। জরুরি এই কারণেই যে এই যোগাযোগটা ধরতে না পারলে ভারতের বর্তমান আন্দোলন— যাকে আমি ‘হাম দেখেঙ্গে’ আন্দোলন বলে চিহ্নিত করছি, সেই আন্দোলনের জোয়ারের মূল চালিকা শক্তিটা ধরা যাবে না। এবং ক্ষমতাসীন বিজেপি ও আরএসএস-এর প্রখর ধূর্ত নেতৃত্ব সেই চালিকা শক্তির বিষয়ে বিলক্ষণ ওয়াকিবহাল।

আমার জন্ম ১৯৬৭ সালে। কাজেই নকশালবাড়ি আন্দোলন বা জরুরি অবস্থা-বিরোধী আন্দোলনকে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় বিশ্লেষণ করার সুযোগ আমার হয়নি। কিন্তু সিঙুর আন্দোলনের একেবারে গোড়া থেকে, এবং তারই জেরে নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলাম। সিঙুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের ঐতিহাসিক সাফল্য (যাঁরা সিঙুরে অচষা জমি ও টাটার পরিত্যক্ত কারখানার কঙ্কাল দেখিয়ে এ আন্দোলনকে হেয় করেন, তাঁদের ইতিহাস-চেতনা নিয়ে আমার গভীর সন্দেহ আছে) সুনিশ্চিত করেছে ভারতে আর সম্ভবত কোনও দিন রাষ্ট্র ও বৃহৎ কর্পোরেট গাঁটছড়া তুড়ি মেরে নিম্নবিত্ত কৃষকের জমি লুঠ করে নিতে পারবে না। সেই আন্দোলনে শহুরে পশ্চিমবঙ্গের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ জড়িত ছিল। কিন্তু এই মুহূর্তের হাম দেখেঙ্গে আন্দোলনের সঙ্গে সিঙুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের একটা মৌলিক তফাৎ আছে— নবীনদের ভূমিকা। সিঙুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনেও ছাত্রী-ছাত্ররা জরুরি ভূমিকা নিয়েছিল, কিন্তু চালিকাশক্তি ছিল না।

হাম দেখেঙ্গে আন্দোলন উত্তরোত্তর নবীনদের আন্দোলন হয়ে উঠছে। খবর পাচ্ছি বিরলের মধ্যেও বিরলতম উদাহরণ তৈরি করে আন্দোলনে যোগ দিচ্ছে সেন্ট স্টিফেন কলেজ, আইএসআই বা আইআইএম-এর মত প্রতিষ্ঠানের উচ্চকূল শিক্ষার্থীরাও, শ্রেণি নির্বিশেষে, ধর্ম নির্বিশেষে, ভাষা নির্বিশেষে, লিঙ্গ নির্বিশেষে, যা কিছু বিভাজক মানদণ্ড ভাবা যেতে পারে সব কিছু নির্বিশেষে। এর তাৎপর্য যে কী গভীর তা ঠিক এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে পূর্ণতায় উপলব্ধি করাও অসম্ভব, ব্যাখ্যা তো দূর-অস্ত্‌। এই আন্দোলন সিএএ নামক আইন বা এনআরসি নামক একটা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে হলেও, আসলে তা সরাসরি ভারত নামক দেশটার সাংস্কৃতিক-চারিত্রিক ঐতিহ্যকে চিরকালের মতো বদলে দেওয়ার ধূর্ত, নির্মম, অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় বাস্তবায়িত করা ফাশিস্ত পরিকল্পনার হাত থেকে রক্ষা করার আন্দোলন। আর সেই জন্যই ‘হাম দেখেঙ্গে’ কবিতাটা এই আন্দোলনের স্লোগান হয়ে হঠাৎ বোমার মতো ফেটে পড়েছে। খুব ইঙ্গিতবাহী। পাকিস্তানের নির্দয় সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে রুখে ওঠা, জেলখাটা এক কমিউনিস্ট কবির একটা উর্দু কবিতা— যার রস ও বার্তা সরাসরি আহরিত হয়েছে কোরান এবং সুফি আন্দোলন থেকে, তা মূলে-অনুবাদে আচ্ছন্ন করে ফেলছে দিল্লি থেকে বাংলা, কেরল থেকে মুম্বই। লক্ষ করতে হবে এ কবিতার কবি সেই দেশের কবি যে দেশের বিরুদ্ধে বিষোদ্গারী হুঙ্কারই নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ-মোহন ভগবত নেতৃত্বাধীন আরএসএস-এর দীর্ঘকালীন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান প্রোপাগান্ডা-হাতিয়ার। এও লক্ষ করতে হবে এই হিন্দুরাষ্ট্রবাদী পরিকল্পনার যে অন্যতম উদ্দেশ্য, সংখ্যালঘু— এবং বিশেষ করে মুসলমান ধর্মাবলম্বী— মানুষকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা, এবং তাঁদের একদিন-প্রতিদিনের বেঁচে থাকাটাকেই উচ্চবর্ণ হিন্দুত্ববাদী জীবনচর্যার জন্য নির্মিত মনুবাদী বিধিতে বিশ্বাসীদের আজ্ঞা-নির্ভর করে দেওয়া, হাম দেখেঙ্গে আন্দোলন তার বিরুদ্ধে একেবারে মুখোশহীন চ্যালেঞ্জ।

মনুবাদী-হিন্দুত্ববাদী-ফাশিস্ত পরিকল্পনাকারীরা এক দিনে ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতার লাগাম হাতে পায়নি। তার দীর্ঘ ইতিহাসে না গিয়েও বলা যায় ১৯৯২-এর ৬ ডিসেম্বর সেই যাত্রার পথে আধুনিক কালের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ মাইল-ফলক। মূল ধারার রাজনৈতিক দলগুলি সেই কুচকাওয়াজ রুখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। ২০১৪ সালে ৩১ শতাংশ ভোট পেয়েও নির্বাচনী হিসেব-নিকেশের জোরে বিজেপির কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসা এই মনুবাদী-হিন্দুত্ববাদী-ফাশিস্ত পরিকল্পনার প্রযুক্তিবিদদের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার হাতে তুলে দিল। অতঃপর শুরু হল সে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন, যার কেন্দ্রে আছে ভারতবর্ষের চিরন্তন বহুত্ববাদের ধারণাটাকেই পদে পদে ধরে ধরে জনজীবন থেকে মুছে ফেলা। যার জন্য দরকার প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠান দখল করে ফেলা। নির্বাচনে বিভিন্ন রাজ্যে বিজেপি হেরে গেলেও বিজেপি-বিরোধী দলগুলির মজ্জাগত সুবিধাবাদ ও ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি— তা শিব মন্দিরে গিয়ে রাহুল গান্ধির মহা ঘটা করে মাথা ঠোকাই হোক বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইমাম ভাতাই হোক— আরএসএস-এর আসল এজেন্ডাটাটিকে তা চ্যালেঞ্জ করতে পারেনি। পারেনি বলেই ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে মোদির জয়জয়কার।

আমার মনে হয়েছে এই মনুবাদী-হিন্দুত্ববাদী-ফাশিস্ত এজেন্ডার কুচকাওয়াজের বিরুদ্ধে সরাসরি রুখে দাঁড়ানোই হাম দেখেঙ্গে আন্দোলন। কিন্তু এই আন্দোলন তার থেকেও বেশি কিছু বলেও আমার বিশ্বাস। এই আন্দোলনের সুফল কিছু রাজনৈতিক দল ভোটিং মেশিনে তুলবে। ভালো। সেটাই কাম্য। কিন্তু তারা যদি ক্ষমতায় এসেই হাম দেখেঙ্গে আন্দোলনের মূল সুরটি অমান্য করে, তা হলে তাদেরও এ আন্দোলনের মুখোমুখি হতে হবে। কাজেই হাম দেখেঙ্গে আন্দোলনের মধ্যে রয়েছে এ দেশের রাজনৈতিক চরিত্রটাই বদলে দেওয়ার বীজ।


(মতামত সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত)

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2050 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...