দেশদ্রোহী কোথাকার!!

রাহুল রায়

 




লেখক পেশায় অধ্যাপক ও নেশায় বহুরূপী।

 

 

 

বর্তমানে ভারতের শাসকবৃন্দ ও তাহাদের চেলা-চামুণ্ডারা ভারতবর্ষে ‘হিন্দু-রাষ্ট্র’ স্থাপনের শর্ত হিসাবে দেশ-মাতৃকার বক্ষ হইতে মুসলমান ও কমিউনিস্ট অপসারণে ব্রতী হইয়াছেন। ইহার সহিত তাহারা মুসলমান সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা হ্রাসের অভিপ্রায়ে নানান আইনও পাশ করিয়াছেন। ইত্যাদি প্রচেষ্টার সহিত যোগ হইয়াছে সাম্প্রতিক জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে আপাত-অসংলগ্ন ভাতা-বৃদ্ধি-বিরোধী ছাত্রছাত্রীদের উপর প্যাঁদাইয়া-খাল-খিঁচিয়া-লইব অভিপ্রায়ে নজিরবিহীন গুন্ডাবাজি। এইরূপ ঘটনায় সমগ্র দেশ বেশ নড়িয়া-চড়িয়া বসিয়াছে। আর সর্বত্রগামী ইন্টারনেটের কল্যাণে তাহার আঁচ সাত সমুদ্র পার হইয়া অ্যামেরিকায় আসিয়া পড়িয়াছে।

ইহাতে আমার মত কতিপয় অকর্মণ্য ও গলাবাজ বা বকলমে ইন্টারনেটবাজ ব্যক্তির চক্ষের ঘুম চলিয়া গিয়াছে। অতএব ‘আমায় কিছু করিতে হইবে’ এইরূপ মরণপণ করিয়া আমি বাড়ির আরাম-কেদারায় বসিয়া ফেসবুক নামক কুরুক্ষেত্রে মেঘনাদের মত মেঘের আড়াল হইতে যুদ্ধ করিবার অভিপ্রায় করিলাম।

সম্প্রতি চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম নামক একটি উটকো ই-ম্যাগাজিনে শুভাশিস মৈত্রের গান্ধির উপরে সুচিন্তিত প্রবন্ধটি বেশ মনে ধরিল। তিনি লিখিয়াছেন– ‘তখন বয়স ছিল অল্প, তাই গান্ধিমূর্তি ভাঙাকে বিপ্লব বলে মনে করেছিলাম।’ শেষে লিখিয়াছেন ‘আজও গান্ধিই আমাদের আশ্রয়।’ লেখাটি ভারি মনে ধরিল, কারণ সেই মূর্তি ভাঙার সময় আমিও বিপ্লব আসিতেছে বলিয়া লাফালাফি করিয়াছিলাম। মনে-প্রাণে বিশ্বাস করিয়াছিলাম যে গান্ধিই বুর্জোয়া ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির প্রতিভু। বলা বাহুল্য যে ইহাদের মানে কিছুই বুঝিতাম না, তবে ইহা বলিয়া নিজেকে বেশ ‘বিপ্লবী, বিপ্লবী’ মনে হইত।

অতএব আমি শ্রী মৈত্রের উপরোক্ত উক্তি ও গান্ধির নিজস্ব একটি উক্তি ফেসবুকে তুলিয়া দিলাম–

I came to the conclusion long ago that all religions were true and that also that all had some error in them, and while I hold by my own religion, I should hold other religions as dear as Hinduism. So we can only pray, if we were Hindus, not that a Christian should become a Hindu; but our innermost prayer should be that a Hindu should become a better Hindu, a Muslim a better Muslim, and a Christian a better Christian.

―Mahatma Gandhi

প্রথম দিকে কতিপয় পরিচিত-অপরিচিত ‘ফে-বু’-র বন্ধুগণের উক্তি বেশ ইতিবাচক ছিল। কিন্তু অবশেষে ভীমরুলের চাকে ঢিল লাগিল। কয়েকটি বন্ধু-ভীমরুল কিছুক্ষণ ধরিয়াই চাকের কাছাকাছি ঘোরাঘুরি করিতেছিল। তাহারা নিতান্তই নিরীহ টাইপের, ও তাহাদের ভূমিকা মোটামুটি সমর্থকের মতই। কিন্তু ঢিলটা ঠিকমতো লাগিয়া চাকটা ভাঙিয়া যাইতেই দু-চারটি বেশ গোদা-মত ভীমরুল বাহির হইয়া আমাকে হুল ফুটাইতে উদ্যত হইল– শালা, দেশদ্রোহী। অ্যামেরিকায় বসিয়া পেঁয়াজি মারা হইতেছে। আমাদের দেশে রাম-রাজত্ব প্রায় হইয়া গিয়েছে, আর তুই শালা এখন যুক্তি দেখাচ্ছিস? গৌরী লঙ্কেশের নাম শুনেছিস? এখানে থাকলে তোরও শালা একই অবস্থা জরুর হয়ে যেত। শালে কম্যুনিস্ট, হারামি কা বাচ্চা। আমাদের কালে নিজেকে কম্যুনিস্ট বলিতে বেশ একটু আত্মশ্লাঘা হইত। যদিও অকপটে স্বীকার করিব যে ইহার মানে যে কি, তাহা সম্যক জানিতাম না। তবে কিছুই আসে যায় নাই, কারণ তখন মনে-প্রাণে বিশ্বাস করিতাম যে বিপ্লব আসিয়া গেল বলিয়া, অদ্য কি কল্য।

যাহা হউক, শীঘ্রই এক গোদা ভীমরুল আমাকে ‘গান্ধি-লাভার’ নামে সু-সম্ভাষণ করিল। আরও লিখিল কী করিয়া গান্ধির জন্যই ভারতবর্ষ দ্বি-খণ্ডিত হইয়াছিল, ও আমি তাহা সমর্থন করিতেছি ইত্যাদি বলিয়া আমাকে আক্রমণ করিল। শীঘ্রই ‘গান্ধি-লাভার’ পাকে-চক্রে ‘মুসলিম-লাভার’ হইয়া দাঁড়াইল। তাহারা বকলমে বলিল, শালে হারামি কি বাচ্চা, আমি নাকি ভারতবর্ষের বুকে হিন্দু-রাজত্বের রথ থামাইবার চেষ্টা করিতেছি। জানিতাম না যে আমি এত বলবান। এক গোদা নিখিল হিন্দু-রাজত্ব আনয়ন করিবার জন্য প্রধানমন্ত্রীর বাক্য ও সংবিধানই যথেষ্ট, হিংসা, আলোড়ন, আন্দোলন ইত্যাদির কোনও প্রয়োজন নাই। আমি বর্তমান ভারতের বুকে হিংসার প্রাচুর্যর কথা তুলিতে সে আমাকে  ‘সিউডো-সেক্যুলার’ সম্বোধন করিয়া কথা ঘুরাইয়া দিল।

আমিও শালা হারামি কম নই। গোদাদিগের উদ্দেশে প্রশ্ন তুলিলাম ভারত যদি সত্য-সত্যই হিন্দু-দেশ হইয়া যায়, তাহলে কি পূর্ববর্তী হিন্দু সমাজের সব কিছু ফিরিয়া আসিবে? বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, সতীদাহের মত নারকীয় প্রথা? মহিলাগণ তাহা হইলে হেঁসেলে সেঁধিয়া যাইবেন, আর তাঁহাদের ভূমিকা হইবে কি কেবল পুরুষের সন্তানধারণের? কালেজে শিক্ষা-টিক্ষা রহিবে কেবল পুরুষদিগের জন্য? প্রশ্ন তুলিলাম সেই গোদাদের জন্য– তুমি নিম্ন-জাতির হইলে দু-তিন পুরুষ পূর্বে উচ্চবর্গের লোকজন তোমার পূর্ব-পুরুষদের ছায়া পর্যন্ত মাড়াইত না। তাহা কি মাথায় আছে? অধুনা বাংলাদেশের মুসলমানদিগ তো কয়েক পুরুষ পূর্বে হিন্দুই ছিল, হিন্দুদের অত্যাচারে মুসলমান হইয়াছে। দলিত, হরিজন– ইহারা কোন ধর্মের? রাম-রাজত্ব কি তাহা হইলে কেবল হিন্দু পুরুষদিগের জন্য?

আমি এখনও আমার প্রশ্নের কোনও উত্তর পাই নাই।

ইদানীং ভারতের বুকে আঠারো-কুড়ির ঢল নামিয়াছে। তাহারা ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনৈতিক স্ট্যাটাস নির্বিশেষে মুষ্টিবদ্ধ হস্ত আকাশের দিকে তুলিয়া বলিতেছে ‘হাম দেখেঙ্গে’। তাহারা গাহিতেছে– ‘অহরহ তব আহ্বান প্রচারিত, শুনি তব উদার বাণী/ হিন্দু বৌদ্ধ শিখ জৈন পারসিক মুসলমান খ্রিস্টানি। তাহারা সদর্পে রঘুপতিরাঘব রাজারাম গাওয়া এবং এক ধর্মান্ধ হিন্দুত্ববাদীর হাতে নিহত অর্ধ-নগ্ন এক ফকিরের কথার প্রতিধ্বনি করিয়া বলিতেছে–

আমি ভারতবাসী, ইহাই আমার একমাত্র ধর্ম।

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2039 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

  1. প্ৰয়োজন ছিলো এই লেখাটার। আরও লিখুন।

    • হাঁ, লিখবো। আপনার উৎসাহ দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ।

আপনার মতামত...