কাশ্মিরে নিরাপত্তাব্যবস্থার তমসাচ্ছন্ন এবং কদর্য অন্তর্বস্তুই মূর্ত হয়েছে দাভিন্দর সিংহের মধ্যে দিয়ে

অনুরাধা ভাসিন জামওয়াল

 




লেখক কাশ্মির টাইমস-এর এক্সিকিউটিভ এডিটর। মূল লেখাটি নিউজলন্ড্রি-তে প্রকাশিত।

 

 

গত ১১ই জানুয়ারি নিজের গাড়িতে দুই সন্ত্রাসবাদী এবং একজন প্রকাশ্য সংগঠনের কর্মীকে নিয়ে যাওয়ার সময় জম্মু-কাশ্মির পুলিশের এক ডিএসপি দাভিন্দর সিং গ্রেপ্তার হয়েছে।

বেদনাদায়ক ঘটনা নিঃসন্দেহে। সন্ত্রাসবাদীদের এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যেকার আঁতাতের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে পড়ল। কিন্তু শুধু এটুকুই নয়। নিরাপত্তাব্যবস্থার ভেতরকার প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয়টাও উন্মুক্ত হয়ে গেল। আরও সেটা হল এমন একটা অঞ্চলে, যেখানে সরকারের নিরাপত্তা নিয়ে অবসেশন প্রায়শই গণতান্ত্রিক নিয়মগুলিকে এবং মানুষের নাগরিক অধিকারকে খর্ব করে থাকে।

এই গ্রেপ্তারি এবং সিংয়ের দাগি অতীত অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সরকারের তরফ থেকে গ্রেপ্তারির পরে যা যা বলা হয়েছে তাতে রহস্য আরও বেড়েছে বই কমেনি। কিন্তু দাভিন্দার সিংকে ছাপিয়ে আরও বড় প্রশ্ন উঠে এসেছে নিরাপত্তা নিয়ে, কাশ্মিরিদের মুক্তি নিয়ে। পছন্দমতো বেছে নিলে হবে না। সমস্ত প্রশ্নগুলোকেই মোকাবিলা করতে হবে। সেটাই আপাতত চ্যালেঞ্জ।

 

গ্রেপ্তারির ঘটনা

দাভিন্দর সিং নাভিদ মুস্তাক এবং রফি রাথার নামে দুই জঙ্গির সঙ্গে গ্রেপ্তার হয়েছে। তাদের সঙ্গে আরও একজন ছিল যাকে প্রকাশ্য সংগঠনের কর্মী হিসেবে দাবি করা হচ্ছে। ঘটনার একদিন পরে কাশ্মির পুলিশের আইজি বিজয় কুমার একটি সাংবাদিক সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি বলেন যে, তার কাছে খবর ছিল দুই জঙ্গি একটি আই-টেন গাড়ি নিয়ে জম্মুর দিকে যাচ্ছে। আরও বলেন, গাড়িটি খুব জোরে যাচ্ছিল এবং তিনি দক্ষিণ কাশ্মিরের ডিআইজিকে তার এলাকায় একটি চেক পয়েন্ট বসানোর জন্য বলেন।

ডিএসপি সিংয়ের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদীদের যোগাযোগটা কিসের? সে তাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছিল? কেনই বা নিয়ে যাচ্ছিল? তাদেরকে কি কোনও ভুয়ো আত্মসমর্পণের নাটক করানোর জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল? যদি তাই হয়, তবে সেটা কোথায়?

সিং নাকি পুলিশকে প্রথমে বলেছিল যে সে এক বড় মাপের সন্ত্রাসবাদীকে ধরেছে। কিন্তু পুলিশকে গল্পটা খায়নি। তখন সে নাকি শেষমেশ ভেঙে পড়ে বলেছে বলে শোনা গেল, আমার মাথা নিশ্চয়ই আমার মধ্যে ছিল না। যাই হোক, গ্রেপ্তারির পরেই সিংকে ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

ওরা যে কী করতে যাচ্ছিল তা একটা পরিচ্ছন্ন তদন্তের মাধ্যমেই কেবল প্রকাশ পেতে পারে। কিন্তু তার জন্য এই রহস্যকে সিংয়ের অন্ধকারাচ্ছন্ন অতীত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে হবে না।

 

ফিরে দেখা

দাভিন্দর সিং ১৯৯০ সালে একজন সাব ইন্সপেক্টর হিসেবে পুলিশে যোগ দেয়। তার কিছুদিন পরে একটি ট্রাক থেকে কিছু মাদক আটক করা হয়। দাভিন্দর সিং আর একজন প্রশিক্ষণাধীন অফিসারের সঙ্গে নিষিদ্ধ মাদক বিক্রির দায়ে অভিযুক্ত হয় এবং বিভাগীয় তদন্তের সম্মুখীন হয়। “সেই সময় তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু একজন আইজি র‍্যাঙ্কের অফিসার একদমই মানবতার খাতিরে সেটা ঠেকান এবং ওই দুজনকে জঙ্গি দমনের উদ্দেশ্যে গঠিত স্পেশাল অপারেশনস গ্রুপে পাঠিয়ে দেওয়া হয়”— মঙ্গলবার প্রকাশিত একটি নিউজ রিপোর্টে সেই কেসটি সম্পর্কে পুলিশ অফিসাররা বলছিলেন— “ওখানে বেশিদিন থাকতে পারেনি। আবার পুলিশ লাইনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তারপর আবার ১৯৯৭ সালে এসওজি-তে পুনর্বাসন। এইসময় দাভিন্দরের পোস্টিং হয় বদগাম-এ। সেখানে ওর বিরুদ্ধে তোলাবাজির অভিযোগ ওঠে এবং আবার পুলিশ লাইনে ফেরত পাঠানো হয়।”

রিপোর্টটি আরও জানাচ্ছে, ২০১৫ সালে তৎকালীন ডিজিপি কে রাজেন্দ্রই দাভিন্দর সিংয়ের প্রকৃত পুনর্বাসন শুরু করেছিলেন। তিনি তাকে সোপিয়ান এবং পুলওয়ামার ডিস্ট্রিক্ট হেডকোয়ার্টারে পোস্টিং দিয়েছিলেন। যদিও পুলওয়ামাতে দাভিন্দর আবার কিছু অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। ফলে ২০১৮-র আগস্ট তৎকালীন ডিজিপি এস পি বৈদ তাকে শ্রীনগরের সংবেদনশীল অ্যান্টি হাইজাকিং ইউনিটে বদলি করে দেন, যদিও কিছু অফিসার এই বদলির বিরোধিতা করেছিলেন।

জম্মু-কাশ্মিরের নাগরিক সমাজ এবং ইন্টারন্যাশনাল পিপলস’ ট্রাইবুনাল অন হিউম্যান রাইটস অ্যাবিউজ যৌথভাবে ‘স্ট্রাকচারস অফ ভায়োলেন্স’ নামে একটি রিপোর্ট তৈরি করেছিল। তা থেকে জানা যাচ্ছে ২০০০ সালে শ্রীনগরের গৌকাডালের ১৯ বছরের আইজাজ আহমেদ বাজাজকে তুলে নিয়ে গিয়ে অত্যাচার করে মেরে ফেলাতে অভিযুক্ত ৪ পুলিশ অফিসারের অন্যতম ছিল এই দাভিন্দর সিং।

রিপোর্টটি থেকে জানা যাচ্ছে, ২০০০ সালের ১৫ই জুন আইজাজ আহমেদ বাজাজ শ্রীনগরের বেমিনায় এক আত্মীয়ের বাড়ি যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। ১৭ই জুন তার বাড়ির লোক জানতে পারে যে তাকে জম্মু-কাশ্মির পুলিশের হুমহামা ক্যাম্পের এসওজি তুলে নিয়ে গেছে। তার বাড়ির লোক সেই হুমহামা ক্যাম্পের এসওজির কাছে যায় এবং সেখানে এসএইচও ইমতিয়াজ এবং দাভিন্দর সিংয়ের সঙ্গে তাদের দেখা হয়। দুজনেই জানায় যে আইজাজ তাদের কাছেই আছে, এবং ৪০ হাজার টাকা দিলে তারা তাদের সঙ্গে আইজাজের দেখা করার ব্যবস্থা করিয়ে দেবে। ২০১৭-তে প্রকাশিত হওয়া এই রিপোর্টটিতে আরও বলা হচ্ছে, ২০০০ সালের ২২শে জুন ক্রাল খুদ থানার পুলিশ আইজাজের পরিবারকে জানায় যে, আইজাজের মৃতদেহ তাদের কাছে আছে। দেখানো হয়েছে শ্রীনগরের বেমিনা বাইপাসে একটি এনকাউন্টারে আইজাজ নিহত হয়েছে। আইজাজের পরিবার পুলিশ স্টেশনে কোনও অভিযোগ জানায়নি, কোনও রিপোর্টও লেখায়নি। পুলিশ নিজেই কোনও এফআইআর ফাইল করেছিল কিনা, সেটা অস্পষ্ট।

এই সময়কালে দাভিন্দর সিং অপহরণ, অত্যাচার এবং জোরজুলুম করে তোলা আদায়ের জন্য কুখ্যাত হয়ে ওঠে। তার নামই হয়ে যায় ‘টর্চার সিং’।

এরপর আরও একটি এক্সটরশন কেসে তার নাম জড়ায় এবং তাকে সেশন কোর্টে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়। আরও একজন ডিএসপির সঙ্গে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ২০০৩ সালে আদালত তার বিরুদ্ধে পুলিশকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়। সেই নির্দেশ উপেক্ষা করা হয়।

এইসব ঘটনা কিন্তু জনসমক্ষেই ছিল।

তবে সিংয়ের অন্ধকারাচ্ছন্ন অতীতে সবচেয়ে মারাত্মক অভিযোগ হল ২০০১-এ সংসদ ভবনে হামলার ঘটনায় তার জড়িত থাকার কথা ওঠা। এই হামলার ঘটনায় আফজল গুরুকে অবস্থানগত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ২০১৩ সালে ফাঁসি দেওয়া হয়।

গুরু একই বক্তব্য জানিয়ে দুটি চিঠি লেখেন। একটি তার স্ত্রী তবসুমকে এবং আরেকটি তার আইনজীবী সুশীল কুমারকে। তবসুমের চিঠিটি কাশ্মিরের অন্যান্য স্থানীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত হওয়ার আগেই কাশ্মির টাইমস এবং এশিয়ান এজ-এ হুবহু প্রকাশিত হয়।

গুরু অভিযোগ করেছিলেন, তাকে দাভিন্দর সিং এবং আরও দুই পুলিশ অফিসার অত্যাচার করে তাদের হয়ে কাজ করতে বাধ্য করে। তিনি আরও লিখেছিলেন, যে সিং তাকে সংসদ ভবনে হামলাকারীদের একজনের সঙ্গে দিল্লি পাঠায় এবং হামলাকারী দলটিকে রসদ সরবরাহ করার নির্দেশ দেয়। সেই সময় কিছু সাংবাদিক সিংকে ইন্টারভিউ করার চেষ্টা করেন। সিং তাঁদের একজনকে হুমকি দেয়, কিন্তু অন্য আরেকজনের কাছে গুরুকে অত্যাচারের কথা স্বীকার করে নেয়। কিন্তু গুরু যে তার বিরুদ্ধে সংসদে হামলার জন্য রসদ সরবরাহে বাধ্য করার অভিযোগ এনেছিলেন, সিং সেটা অস্বীকার করে। এইসব সাক্ষাৎকারই প্রকাশিত, একটির তো ভিডিও-ও আছে।

আফজল গুরুর চিঠির বক্তব্য সুপ্রিম কোর্টে বিচারকালীন পেশ করা হয়েছিল কিনা সেটা স্পষ্ট নয়। কিন্তু এই চিঠির বক্তব্য ২০০৪ সাল থেকেই জনসমক্ষে রয়েছে। কি কোর্ট, কি পুলিশ, কেউই এই বক্তব্যকে ভিত্তি করে সিংয়ের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত করার কোনও চেষ্টা করেনি। সেই সময় অনেক পুলিশ অফিসারই এই চিঠির বক্তব্যকে আফজল গুরুর মনগড়া মিথ্যে কথা বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।

চিঠিতে আফজল গুরু তার সঙ্গে সংস্পর্শে থাকা আরও দুই পুলিশ অফিসারের নাম উল্লেখ করেছিলেন। বিনয় গুপ্তা এবং আলতাফ হুসেন। এর মধ্যে আলতাফ হুসেন আশিক হুসেন বুখারি নামে এক এসপির আত্মীয়।

একটা বিষয় কৌতূহলোদ্দীপক। সংসদ মামলার চার্জশিট যে তিনজনকে মাস্টারমাইন্ড বলে উল্লেখ করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে তারিক নামে এক ব্যক্তি ছিল। গুরুর চিঠি থেকে জানা যায়, হুমহামা টর্চার সেন্টারে তারিকের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল এবং অত্যাচারের হাত থেকে বাচার জন্য তারিক তাঁকে পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করার পরামর্শ দেয়। নন্দিতা হাসকার কিছুদিন গুরুর আইনজীবী ছিলেন। তিনি তাঁর বই ‘দ্য মেনি ফেসেস অফ কাশ্মিরি ন্যাশনালিজম’-এ লিখেছেন, “অন্য দুজন— গাজি বাবা এবং মাসুদ আজহার— পরিচিত সন্ত্রাসবাদী। কিন্তু এই তৃতীয় ব্যক্তিটি— তারিক— পুরোপুরি রহস্যজনক। তার সম্পর্কে কিছুই জানা যায়নি। না মিডিয়ার থেকে, না বিচার চলাকালে।”

এই তারিকের গল্প নিয়েও কোনও তদন্ত হয়নি।

গুরুর চিঠির বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করার জন্য একটা পূর্ণাঙ্গ তদন্তের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এটাকে উপেক্ষা করা হল। “জাতির বিবেক”কে সন্তুষ্ট করতে তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলানো হল। ঝোলানো হল সংসদে হামলার রসদ সরবরাহে তার ভূমিকার ব্যাপারে অবস্থানগত সাক্ষ্যপ্রমাণের ওপর। আর যে লোকটা সম্পর্কে অভিযোগ উঠল যে সে তাঁকে এই কাজ করতে পাঠিয়েছে, তাকে কোনওরকম প্রশ্ন পর্যন্ত করা হল না, এবং সে নিজের কাজে আগের মতই বহাল রয়ে গেল।

এমনকি সিং যে স্বীকার করে নিয়েছিল যে সে আফজল গুরুকে টর্চার করেছে, তাতেও কোনও ভুরু কুঁচকায়নি। টর্চারের অবৈধ রূপগুলো এখন খুব সাধারণ হয়ে গেছে। বিশেষত, আরও জায়গাটা যখন কাশ্মির।

কাশ্মিরে টর্চার, সামরিক বা আধা-সামরিক বাহিনী সহ অন্যান্য বিদ্রোহ-দমনকারী ফোর্সগুলির হয়ে কাজ করতে বাধ্য করা বা মানবপ্রাচীর হিসেবে ব্যবহার করার প্র্যাকটিস এতটাই সাধারণ, যে এগুলিকে নিয়ম ভাবা হয়। কিছু কিছু এসওবি অফিসার আছে যারা একেবারে জঘন্য, কিন্তু অন্য ফোর্সগুলিও খুব ভালো কিছু নয়।

‘স্ট্রাকচার অফ ভায়োলেন্স’— যাতে এরকম শ খানেক ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে— তা থেকে জানা যাচ্ছে পুঞ্চের হাভেলি থেকে ২০০৩-এর ২৩শে আগস্ট তসবির হোসেনকে পেয়ারা সিং তুর নামে এক আর্মি অফিসার তুলে নিয়ে যায়। তসবির হোসেনকে বন্দি করে টর্চার করা হয় এবং সেই টর্চারের ফলে সে মারা যায়। তুরের বিরুদ্ধে একটা এফআইআর করা হয়েছিল, কিন্তু ২০১১ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক তার বিরুদ্ধে তদন্ত করার অনুমোদন প্রত্যাহার করে নেয়। পুলিশি তদন্তের উপর ভিত্তি করেই ২০০৮ সালে রাজ্য মানবাধিকার কমিশন তসবিরের পরিবারকে এক লক্ষ টাকা এবং একটি সরকারি চাকরি দেওয়ার সুপারিশ করে। যখন তসবিরকে গ্রেফতার করা হয় তখনকার মিডিয়া রিপোর্ট থেকে জানা যায় তার পরিবারের কথানুসারে, আর্মি তসবিরকে তাদের সোর্স হিসাবে কাজ করাতে চেয়েছিল, কিন্তু সে রাজি হয়নি।

এর সঙ্গেই আছে আত্মসমর্পণকারী জঙ্গিদের সরকারি বাহিনীর হয়ে কাজ করানোর চাপ। বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী শোভনা শোনপারের রিপোর্ট ‘ভায়োলেন্ট অ্যাক্টিভিজম: এ সাইকোলজিক্যাল স্টাডি অফ এক্স-মিলিট্যান্টস ইন জম্মু অ্যান্ড কাশ্মির’ থেকে এই সম্পর্কে বহু ঘটনা জানা যায়।

রিপোর্টটি দেখিয়ে দিয়েছে প্রাক্তন জঙ্গিদের আবার হিংসার বৃত্তে টেনে আনার ঘটনার সঙ্গেই যুক্ত হয় অপব্যবহার, অবমাননা এবং ভয় দেখানোর ঘটনাগুলি। কিন্তু এগুলো সবই সাধারণ অনুশীলন হিসেবেই গ্রহণীয় হয়ে উঠেছে। ঠিক যেমন স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া হয়েছে উর্দিধারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, তোলা আদায়ের অভিযোগ এবং অন্যান্য অনৈতিক কাজের অভিযোগগুলিকে।

দাভিন্দর সিংয়ের কলঙ্কজনক কাজের লম্বা তালিকা থাকলেও সেগুলি যে স্পর্শ পর্যন্ত করা হয়নি তার কারণ হিসেবে এই গ্রহণীয় হয়ে ওঠার নির্মিতির দায় কম নয়।

কিন্তু গুরু যে অভিযোগ করেছিলেন তার গুরুত্ব অনেক বেশি। এই ঘটনা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দেয় এবং এই ঘটনার পর থেকে দেশের পলিটিক্যাল ন্যারেটিভই পরিবর্তিত হয়ে যায়। প্রশ্ন ওঠে, এই যে যা কিছু করে ছাড়া পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে সরকারি বাহিনীর মধ্যে, তা কি অনেক বেশি মূল্য আদায় করে নিচ্ছে না?

সিংয়ের ঘটনা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তার ঘটনা আরেকটি কেসের কথা মনে করিয়ে দেয় যে কেসটিরও কখনও ঠিকঠাকভাবে তদন্তই হয়নি।

২০১৩ সালে কুখ্যাত এনকাউন্টার বিশেষজ্ঞ শিব কুমার কিশতোয়ার এসওজি-র দায়িত্বে ছিলেন। ২০১৭ সালে থাথরি থানায় একটি গ্রেনেড বিস্ফোরণ হয়। তারপর থেকে শিব কুমার স্থানীয় তরুণদের ধ্বংসাত্মক কাজকর্ম করতে প্ররোচনা দিতেন বলে অভিযোগ। ১৫ জন সাক্ষী বিরূপ হয়ে যাওয়ায় ভদ্রেশ্বর সেশন কোর্ট তাকে অব্যহতি দেন। মনে রাখা দরকার, এই ঘটনায় কোর্টের অবজারভেশন ছিল যে, পুলিশ ঠিক করে তদন্ত করছে না। কোর্ট সিনিয়র এসপি ডোডাকে এই ঘটনার তদন্ত করার নির্দেশ দেয়।

যদিও, সেই তদন্তের আর কিছুই জানা যায় না।

 

আবার, বর্তমানে

সিংয়ের যে লম্বা অন্ধকার অতীত আছে, সেটা আর উপেক্ষা করার উপায় নেই। এখন, খুব নির্দিষ্ট করে, দুটি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।

সামান্য কিছু টাকার লোভে সিং এই কাজে জড়িয়ে পড়েছেন এই যুক্তি, আরও বিশেষ করে যে সময় কাশ্মিরের নিরাপত্তা বেশ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, একেবারেই গ্রহণীয় নয়। কিছু অফিসার প্রাথমিক তদন্ত করে জানিয়েছেন এই কাজের জন্য সিং নাকি ১২ লাখ টাকা পাচ্ছিলেন। এই টাকাটাই এই কাজের প্রেরণা সেটা মানা একেবারেই অসম্ভব, কারণ যে দুজন জঙ্গিকে সিং নিয়ে যাচ্ছিল তাদের মাথার দাম এর চেয়ে বেশি। কাজটির ঝুঁকির কথাটাও মাথায় রাখতে হবে।

গুরু অভিযোগ করেছিলেন তাকে সিংয়ের হয়ে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে এবং নির্দিষ্ট করে সিং-ই তাকে সংসদ ভবনে হামলার জন্য রসদ সরবরাহের কাজে পাঠিয়েছিল। যে সংসদ ভবনে হামলার ব্যাপারে গুরুর বিন্দুমাত্র কোনও ধারণা ছিল না। এখন এই বর্তমান ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গুরুর সেই চিঠির কথা মনে রেখে আমাদের এটা জানা প্রয়োজন যে, কে কাকে নির্দেশ দিচ্ছে? সিং কি নভিদ বাবার হয়ে কাজ করছে, নাকি উল্টোটা?

দ্বিতীয়ত, সিংয়ের অতীত জীবনের কথা মাথায় রেখে এটাও জানা খুব প্রয়োজন যে ওপরতলার কোনও প্রশ্রয়দাতা ছাড়া সে এতদূর আসতে পারল কী করে? কে তাকে বাঁচাচ্ছে? কেন? এই গভীরতর অসুখের উত্তর আমরা কি আদৌ কোনওদিন জানতে পারব?

এখানে অতীত থেকে আরেকটি ঘটনার উল্লেখ করা যাক। ১৯৯৬ সালে টেরিটোরিয়াল আর্মির অবতার সিং মানবাধিকার আইনজীবী জলিল আন্দ্রাবিকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটির কোনওদিনই কোনও পরিচ্ছন্ন তদন্ত হয়নি। এর দু বছর পরে লুধিয়ানায় টেরিটোরিয়াল আর্মি ব্যারাকে সাংবাদিক হরতোষ সিং বাল অবতার সিংয়ের সাক্ষাৎকার নেন। জম্মু-কাশ্মির প্রশাসনের কাছে সে কিন্তু তখনও নিখোঁজ।

বাল-এর ইন্টারভিউটি সেই সময় প্রকাশিত হয়নি। ২০১১ সালে ‘ওপেন’ ম্যাগাজিনে ‘দা ম্যান হু নোজ টু মাচ‘ নামে একটি নিবন্ধ লেখেন এবং সেখানে এই ঘটনা এবং অবতার সিংয়ের সঙ্গে তাঁর বার্তালাপের বিস্তৃত বিবরণ দেন।

বাল-এর লেখা থেকে কিছুটা দেখা যাক। “অবশেষে ২০০০ সালে এসআইটি আদালতে জানায় যে অবতার সিং লুধিয়ানায় আছে। এটা তাদের কাছে আগে থেকেই জানা ছিল। এর পরে পরেই কোর্টের অর্ডার থাকা সত্ত্বেও অবতার সিং পাসপোর্ট জোগাড় করে এবং কানাডা চলে যায়, সেখান থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার সেলমায়, সেখানে একটা ট্রান্সপোর্ট সার্ভিস শুরু করে, নিজেই ট্রাক চালাতে শুরু করে। এই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে তার স্ত্রী তার বিরুদ্ধে একটা গৃহহিংসার অভিযোগ আনে। তখন সেলমা পুলিশ তার অতীত রেকর্ড চেক করতে গিয়ে দেখে তার নামে ইন্টারপোলের রেড কর্নার নোটিস জারি আছে।” বালকে টেলিফোনে ইন্টারভিউ দেওয়ার সময় অবতার সিং বলে “যেহেতু আমি অরিজিনালি টেরিটোরিয়াল আর্মি থেকে, সেই জন্য আমার ব্যাপারে দায় ঝেড়ে ফেলাটা খুব সহজ।” সে একজন মেজরের প্রতি অঙ্গুলিনির্দেশ করে, যাকে কোড নেমে ‘মেজর ক্লিফটন’ বলে ডাকা হত। বাল আরও লিখেছেন, “আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি প্রত্যর্পণ হলে কী হবে? অবতার সিং কোনওরকম দ্বিধা করেই জানাল, ‘ভারতে আমার বেঁচে থাকার কোনও সম্ভাবনাই নেই। ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।’ কারা? ‘এজেন্সিগুলো। র, মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স, সব একই।’ অবতার সিং বলছিল, তাকে নাকি আল কায়েদা থেকেও সমানে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমি ব্যাপারটা অতটা গুরুত্ব দিচ্ছিলাম না। সে আমাকে জানাল ‘যদি প্রত্যর্পণ হয় তাহলে আমি মুখ খুলব। আমিও চুপ করে থাকব না।'”

২০১২ সালে অবতার সিংকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। জানা যায়, সে নাকি তার পরিবারের সবাইকে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করে। এ নিয়ে কোনও তদন্ত হয়েছিল কিনা জানা নেই।

অবতার সিংয়ের মতোই দাভিন্দর সিংয়েরও একটা কদর্য অতীত আছে, এবং, সম্ভবত, সেও অনেক কিছুই জানে। এনআইএ তার সঙ্গে কী ব্যবহার করবে?

এই উন্মোচন এবং সম্পর্কিত প্রশ্নগুলির আলোকে নিরাপত্তারক্ষীদের নামে যে আরও বহু অত্যাচার, হত্যা, জঙ্গি গোষ্ঠী বা অন্যান্য ক্রিমিনালদের সঙ্গে ওঠবোস করার অভিযোগ আছে সেই সবগুলিকেও এবার খোলা দরকার।

এই ঘটনা দেখিয়ে দিল, সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী লড়াই খালি বীরত্বের বিষয় নয়। সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী লড়াই যথেষ্ট অন্ধকার এবং নোংরা হতে পারে। সম্প্রতি একজন সিনিয়র সিকিউরিটি অফিসিয়াল দাভিন্দর সিংয়ের বিষয়ে বললেন “দুর্বৃত্তে পরিণত হওয়া একটি সম্পদ।” প্রশ্নটা কিন্তু সম্পদরা কখন দুর্বৃত্তে পরিণত হয়, বা উল্টো পরিবর্তনও সম্ভব নাকি, এসব নিয়ে নয়। প্রশ্নটা ‘সম্পদ’ আর ‘দুর্বৃত্ত’ শব্দদুটি নিয়েই।

যখন একজন ফৌজি নানান দুষ্কর্ম করছে, কিন্তু আবার সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী অভিযানে ভূমিকা রাখছে ততক্ষণ সে ‘সম্পদ’? যখন সে জঙ্গি সংগঠনগুলির সঙ্গে ওঠাবসা শুরু করল, তখন সে ‘দুর্বৃত্ত’ হয়ে গেল? নাকি যখন ধরা পড়ল তখনই ‘দুর্বৃত্ত’ হল?

অনেক প্রশ্ন। কিন্তু তল্লাশ কেবল সত্যের। নিখাদ সত্যের।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2086 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...