সমসাময়িক রাজনীতি এবং প্রাইড ওয়াক, ২০১৯-এর আশেপাশের সময়

পাঞ্চালী কর

 




লেখক নাট্যকর্মী, লিঙ্গরাজনৈতিক কর্মী, West Bengal Forum for Gender and Sexual Minority Rights-এর সদস্য।

 

 

 

কলকাতা শহর লিঙ্গসাম্যের রাজনীতিতে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কারণ দক্ষিণ এশিয়ার তথা ভারতের প্রথম প্রাইড ওয়াকের সূচনা এই শহরেই। ১৯৯৯ সালের ২ জুলাই একদল মানুষ তাদের অধিকারের দাবি সমাজের সামনে রাখার পদক্ষেপটা নেয়। ১৯৯৯-এ এই মিছিলের নাম ছিল ফ্রেন্ডশিপ ওয়াক। ওয়ায়েস খানের প্রস্তাব অনুযায়ী পবন ঢল, অশোক রাও কবি ইত্যাদি বেশ কিছু মানুষ, যাঁরা লিঙ্গ ও যৌন পরিচয়ের অধিকার নিয়ে লড়ছিলেন, তাঁরা একত্রিত হন। এই ওয়াকের মূল লক্ষ্য ছিল কিছু সংস্থার কাছে পৌঁছে যাওয়া এবং সংহতি প্রকাশ করা। মানবাধিকার, নারীবাদী আন্দোলন, এইডস নিয়ে সচেতনতা ইত্যাদি ইস্যুর সঙ্গে যুক্ত কিছু এনজিওর কাছে পৌঁছে যায় ফ্রেন্ডশিপ ওয়াকের সদস্যরা। সেই থেকে পথ চলা শুরু।

দুই দশকের বেশি ধরে কলকাতা প্রাইড ওয়াকের ইতিহাসে বাঁধা পড়েছে মানুষের লড়াইয়ের গল্প, কখনও সামাজিক উৎপীড়ন, কখনও পুলিশি নিপীড়ন, কখনও অধিকারের দাবিতে দাঁতে দাঁত দিয়ে পড়ে থাকা, তো কখনও বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার গল্প। কুইয়ার বা জেন্ডার আ্যন্ড সেক্সুয়াল মাইনরিটির হাসিকান্নার ক্রনিক‍ল ফুটে উঠেছে মানুষের পায়ে পায়ে। প্রাইড হামেশাই বাঁধাধরা গৎ বা স্টিরিওটাইপি ভাঙার একটা মূল প্ল‍্যাটফর্ম। সামাজিক জেন্ডার বাইনারি বা দ্বি-লৈঙ্গিক স্বাভাবিকতার মেরুকরণ ভেঙে প্রসাধনী ও পোশাক হয়ে ওঠে সামাজিক অর্ডারকে চ্যালেঞ্জ করার একটা মোক্ষম হাতিয়ার। বহু মানুষ LGBTQIA+ সম্পর্কে জেনেছেন প্রাইড ওয়াকের মাধ্যমে। লিঙ্গসাম্যের অধিকারের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে উঠে এসেছে জেন্ডার ও সেক্সুয়াল মাইনরিটির চাকরি, স্বাস্থ্য, সুরক্ষা, শিক্ষার অধিকারের দাবি, রোটি কপড়া ঔর মকানের দাবি। ২০১৮ সালে যখন মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী ট্রান্সজেন্ডার বিল নিয়ে সারা দেশ উত্তাল, তখন কলকাতার প্রাইড মার্চ সেই প্রতিবাদে গলা মিলিয়েছে। উৎসব আর অধিকারের দাবি একাকার হয়ে গেছে।

২০১৯-এ রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী চোখরাঙানি যখন সারা দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার খর্ব করছে, যখন জাতি-ধর্মকে হাতিয়ার বানিয়ে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ তৈরি করছে, যখন সিএএ, এনআরসি-র মত অসাংবিধানিক আইন লাগু করে দেশের মানুষের নাগরিকত্ব প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, যখন ট্রান্সজেন্ডার বিল আইনে পরিণত হয়েছে, যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কলেজ, ইউনিভার্সিটি বিপন্ন, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রাইড ওয়াকের অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের বিরোধিতা ও অসম্মতি জানানোর জন্য প্রাইডকে হাতিয়ার করেছেন। পোস্টারে উঠে এসেছে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বক্তব্য, মোদি-শাহ-র সমালোচনা, নো-সিএএ, নো-এনআরসি থেকে শুরু করে সুকুমার রায়ের খুড়োর কল অবলম্বনে ক্যারিকেচার। স্লোগানে সরাসরি বিজেপি-আরএসএস বিরোধিতা, ট্রান্স বিলের বিরোধিতা থেকে জয় ভীম এবং অধুনা ‘ক্যা ক্যা ছিঃ ছিঃ’র সঙ্গে চিৎকার করে সমর্থন জানিয়েছে দলে দলে মানুষ। কলকাতার বিখ্যাত যৌনপল্লী সোনাগাছির সামনে দিয়ে মিছিল যাওয়ার সময় যৌনকর্মীদের প্রতি সলিডারিটি জানিয়ে স্লোগান ওঠে, “গতর খাটিয়ে খাই, শ্রমিকদের অধিকার চাই।”

প্রাইড-পরবর্তী সময়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু উঠে আসছে: প্রাইডের রাজনীতিকরণ, এবং হিন্দুত্ববাদীদের দ্বারা প্রাইড মার্চে অংশগ্রহণকারী মানুষদের তাদের পোশাকের কারণে হেনস্থা। যৌন ও লিঙ্গ পরিচয়ের ভিত্তিতে সংখ্যালঘুদের একাংশ মনে করছেন যে মূলধারার রাজনীতির কথা প্রাইডে আসা সমীচীন নয়, কেউ কেউ আবার মনে করেন যে প্রাইড শুধুই উৎসব, সেখানে রাজনীতি কেন? এই বিভাজনটা প্রতিবারই প্রাইডের আশেপাশের সময়ে দেখতে পাওয়া যায়। এবং দ্বিমত থাকা সত্ত্বেও বেশিরভাগ মানুষ এই মর্মে একমত হয়েছে যে এই কঠিন সময়ে সমস্ত সংখ্যালঘুদের একে অপরের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন কারণ আমাদের শত্রু একই। আর মুসলমানেরা বিপন্ন কারণ আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সমাজে মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা এবং ঔদাসীন্য ভীষণভাবে বিদ্যমান, এবং সেটাকেই বিভাজনের অস্ত্র বানাচ্ছে রাষ্ট্র। এই ইস্যু পুরনো হয়ে এলে কোপ পড়বে কুইয়ার মানুষের ওপর, কারণ ভালনারেবিলিটির নিরিখে, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার নিরিখে LGBT সম্প্রদায়ের মানুষও অনেকটাই পিছিয়ে, সে সুপ্রিম কোর্ট যতই ৩৭৭ ধারা বাতিল করুক।

যুক্তি-তক্কো, কনসেন্ট-ডিসেন্টের মাঝে উঠে এসেছে প্রাইডের তাৎপর্য। ইতিহাসের পাতায় চোখ মেললে প্রাইডকে ভীষণভাবে র‍্যাডিক্যাল অধিকারের লড়াইয়ের পর্যায়ে ফেলা যায়। এই অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়েছে যুগ যুগ ধরে লাঞ্ছনা, বঞ্চনা, গঞ্জনা উপেক্ষা করে লড়ে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে, অনেক তাজা প্রাণের বিনিময়ে। আজ কাগজেকলমে সেই অধিকার আমরা ছিনিয়ে এনেছি বটে, কিন্তু সামাজিক স্তরে কাজ অনেক অনেক বাকি। প্রাইড উৎসব বটেই, কিন্তু এই উৎসব রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, সমাজের বিরুদ্ধে, স্টেটাস ক্যুয়ো-র বিরুদ্ধে গলা উঁচিয়ে নিজের পরিচয় ব্যক্ত করার উৎসব, যা সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক। যেই সমাজ পুরুষকে বেশি করে পুরুষ আর মেয়েদের বেশি করে অনুগত হয়ে থাকতে চাপ সৃষ্টি করে, সেই সমাজের বুকের ওপর খোলা রাস্তায় যখন একজন কুইয়ার মানুষ তার সমকামী পার্টনারকে আলিঙ্গন করে, যখন মেয়েলি ছেলেটা লিপস্টিক আর ক্রপ টপ পরে নিজের নারীসত্তাকে সেলিব্রেট করে, যখন একজন ট্রান্সম্যান ইজ নো লেস ম্যানলি বলে ঘোষণা হয়— সেই উৎসব রাজনৈতিক ব্যতীত অন্য কিছুই হতে পারে না। রাজনীতি সম্পর্কে মানুষের ধারণা অনেক সময় সংসদীয় রাজনীতিতেই সীমিত, তাই জীবনের রাজনীতি, বেঁচে থাকার রাজনীতির অরাজনীতিকরণ হয়ে যায় আমাদের অগোচরে।

প্রাইডে তৎকালীন মূলধারার রাজনীতির গুরুত্ব হিসেবে উঠে এসেছে অসমের হাজার কয়েক ট্রান্সজেন্ডার মানুষের কথা যাদের নাম বাদ গিয়েছে এনআরসিতে। কুইয়ার মানুষদের আজও সামাজিক বৈষম্যের ও হিংসার শিকার হতে হয়, এবং অনেক সময়ই এই হিংসা আসে পরিবারের তরফে। সামাজিক নিয়মের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা LGBT কম্যুনিটির মানুষদের বহু ক্ষেত্রে বাড়ি থেকে বিতাড়িত করা হয় পরিবারের মর্যাদা রক্ষার জিগির তুলে। ইন্টারসেক্স বাচ্চাদের অনেক সময় খুব ছোট বয়েসে হিজড়া কম্যুনিটির হাতে তুলে দেয় বাবা মা। এইসব মানুষ যে প্রয়োজনীয় ডক্যুমেন্ট দেখাতে পারবে না, সেটাই স্বাভাবিক। এনআরসি, সিএএ থেকে কেউই সুরিক্ষিত নয়, কুইয়ার মানুষ তো নয়ই, তাই এনআরসি, সিএএ-র বিরোধিতাও কুইয়ার রাজনীতির থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।

প্রাইড-পরবর্তী সময়ে ভয়ঙ্কর ন্যক্কারজনক সাইবার হিংসা দেখা গিয়েছে বিজেপির আইটি সেলের তরফে। যেহেতু ২০১৯-এর কলকাতা প্রাইড একটি মোদি-বিরোধী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে রুখে দাঁড়িয়েছে, তার আঁচ এসেছে কুইয়ার মানুষদের ওপর। তাদের ছবি ব্যবহার করে যথেচ্ছ মিম, ঘৃণা, ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের প্রতি কটূক্তি অনবরত চালিয়ে যাচ্ছে আইটি সেল। রাষ্ট্র আমাদের পিছন দিকে নিয়ে যাচ্ছে, সরকার আমাদের পিছন দিকে ঠেলে দিচ্ছে, ঠিক। কিন্তু পচনটা আমাদের ভেতরে, যেটা প্রগতিশীলতার বর্ম দিয়ে ঢাকা ছিল। সমস্যাটা অভ্যন্তরীণ, সেটা উস্কানি দিচ্ছে রাষ্ট্র। কুড়ি বছর ধরে প্রাইড ওয়াক হওয়ার পরও, ৩৭৭ আংশিক বেআইনি ঘোষণা হওয়ার পরও আমরা আমাদের রাজনৈতিক বোধের দৈন্য যখন প্রকাশ করে ফেলি আমাদের অসহিষ্ণুতা ঘৃণার মাধ্যমে, তখন সেই ক্ষয়ের দায় নিজেদের। বিজেপির মত সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী দল যখন আমাদের রাজ্যে ১৮টা সিট পায়, তখন বুঝে নিতে হয় খামতি আমাদের।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2214 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...