কী আমার পরিচয় মা!

প্রবুদ্ধ বাগচী

 



লেখক গদ্যকার, ভাবুক। তিন দশকেরও বেশি সৃজনশীল লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত।

 

 

 

নাগরিকত্ব আইন নিয়ে দেশজোড়া প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ আন্দোলনের ন্যায্যতা নিয়ে আজ আর শুভবুদ্ধিসম্পন্ন কারও মনেই কোনও সংশয় নেই— এর বাইরে আছে কিছু ধান্দাবাজ মানুষ ও নেতা যারা সুযোগ পেলেই কুকথার বান ছোটাচ্ছে ও আন্দোলনের অভিপ্রায়কে লঘু করে দেখানোর চেষ্টা করছে। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আজ এই পরিব্যাপ্ত উত্তেজনার মধ্যেও একটা কথা ইতিমধ্যেই উঠেছে যে, দেশের সব স্তরের মানুষ কি এই আন্দোলনে সামিল? পৃথিবীর কোনও দেশেই কোনও আন্দোলনে সর্বস্তরের মানুষ সামিল হয়েছেন এমন দৃষ্টান্ত নেই, হয়তো সংখ্যাগুরু মানুষ তাতে থাকেন কিন্তু সবাই নন। এই সকলের না থাকাটার একটা কারণ নিশ্চয়ই আন্দোলনের স্বার্থের সঙ্গে শতকরা একশোভাগ মানুষের স্বার্থের যোগ থাকে না। বরং কেউ মনে করেন সেইসব আন্দোলন তাদের স্থিতাবস্থাকে বিঘ্নিত করছে, ফলত তারা সরে থাকেন। আর অন্য কারণ হল, অনেকেই মনে মনে থাকেন এই বিদ্রোহের সঙ্গে কিন্তু শারীরিকভাবে থাকতে পারেন না— কেন পারেন না তার অনেক কারণ। খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই যে, সামাজিক স্তর বিন্যাসে যেখানে তাদের অবস্থান সেখান থেকে তারা আন্দোলনের কেন্দ্রে এসে পৌঁছাতে পারেন না। আজকের আন্দোলনের ভরকেন্দ্র মূলত বড় শহর, কেননা শহরের আন্দোলন খুব দ্রুত প্রচার পায়, তাতে সংগঠকদের সুবিধে। কিন্তু এর বাইরে যে বিপুল গ্রাম ও মফস্বল আছে সেখানে কি এই প্রতিবাদের শরিক নেই? অবশ্যই আছে। কিন্তু সমাজের দুর্বলতর শ্রেণির অংশ হওয়ায় প্রতিবাদের পাশাপাশি আত্মরক্ষার একটা পথও তাদের ভেবে রাখতে হয়। কারণ সমাজের বা রাষ্ট্রের অনাচারে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হন তাঁরাই। সংশোধিত নাগরিকত্ব বিধির রূপকাররা এই একটা বিষয়ে গোপনে গোপনে আরও মারমুখী— আজকের প্রতিবাদী শক্তিটাকে তারা প্রত্যক্ষ দমনপীড়নের আওতায় এনে ফেলেছেন তাই নয়, ওই দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষদের পায়ের তলার মাটিটাও সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন তলায় তলায়। যে দমনের প্রক্রিয়াটা তত প্রচারিত নয়।

কেন এই কথা বলছি?

গত মাস দেড়েকের সংবাদপত্রের পাতা ওলটালে রাজ্যে রাজ্যে শহরে শহরে প্রতিবাদী আন্দোলনের খবরের পাশে পাশে আরও কিছু খবর অনেকেরই চোখে পড়েছে। সেটা হল আধার কার্ড নতুন করে তৈরি করা বা তার ভুল সংশোধনের জন্য বিপুল মানুষের জড়ো হওয়া ও তাঁদের ভোগান্তির খবর। কেউ কেউ প্রবল শীতের মধ্যে সারারাত রাস্তায় কাটিয়েছেন যাতে তাঁরা বেলা এগারোটায় কাউন্টার খুললে তার সামনে পৌঁছাতে পারেন, কেউ দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করেও তার সুযোগ পাননি, কেউ আবার তাঁদের নতুন কার্ড তৈরি করার জন্য যে তারিখটি পেয়েছেন তা বর্তমান সময় থেকে দুই বা আড়াই বছর পর! এই ঘটনাটা থেকে দুটো সহজ প্রশ্ন তৈরি হয়। প্রথমত, নতুন করে আধার কার্ড তৈরি বা তার সংশোধনের জন্য এত ভিড় কেন? দ্বিতীয়ত, সেই ভিড়কে সামাল দিতে এত সমস্যা হচ্ছেই বা কেন? দুটো জিজ্ঞাসার জবাব পরস্পরের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

তার আগে একটু স্মরণ করে নিতে হবে বিগত ২০১৬-১৭ সালে তৎকালীন এনডিএ সরকার প্রায় গোটা দেশকে হুকুম দিয়েছিল যে সকলের জন্যই আধার কার্ড দরকার এবং কোনও নাগরিকের আধার কার্ড না থাকলে তাকে সরকারি সুবিধে, ভর্তুকি এমনকি মোবাইল পরিষেবা অবধি দেওয়া যাবে না। অর্থাৎ আজকের পরিপ্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে বলা যেতে পারে তিনি একরকম সন্দেহভাজন। এই আদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে পিটিশন জমা পড়ে এবং ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সুপ্রিম কোর্ট সরকারি সুবিধা বা ভর্তুকি পাওয়ার ক্ষেত্রে আধার কার্ড বাধ্যতামূলক নয় বলে রায় দেন। যদিও এই রায়ের পরেও কেন্দ্রীয় সরকারের বহু প্রকল্পে এখনও যে সুবিধাপ্রাপক বা বেনিফিশিয়ারি অনলাইন নথিভুক্ত করার ব্যবস্থা আছে বা চালু হয়েছে সেখানে আধার কার্ডের নম্বর না দিলে সেই নথিভুক্তির কাজটাই হয় না, কারণ তাদের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাটা সেইভাবেই নিয়ন্ত্রিত। এই বিষয়টায় সর্বোচ্চ আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে কি না আমাদের জানা নেই। কিন্তু কোনও এক দুর্যোগে যদি কাল সকালে কেন্দ্রের সরকার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন যে আধার কার্ডের বাইরে কোনও সরকারি সুবিধাভোগী থাকবেন না তাহলে বেশ কয়েক কোটি মানুষ পথে বসবেন। কেউ কেউ বলতেই পারেন, কেন? আধার কার্ডের মাধ্যমে ব্যাঙ্ক আকাউন্টে ভর্তুকি বা অন্যান্য সুবিধে পাঠালে সে তো বেশ একটা স্বচ্ছ ব্যবস্থা, অন্তত দুর্নীতি বা সরকারি অর্থ অপব্যবহারের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসে। সন্দেহ নেই, ভাল যুক্তি। কিন্তু এর একটা অন্য দিক আছে। সেটা হল, আধার কার্ড বিষয়টা এমন যে ভোটের তালিকা বা ভোটার কার্ডের মতো তার একটা নিরন্তর উদ্যোগ থাকা দরকার। কারণ প্রতি বছর কোটি কোটি লোকের প্রয়োজন হবে নতুন কার্ড তৈরি বা সংশোধনের— ভোটের লিস্টের ক্ষেত্রে দেশের নির্বাচন কমিশন এই প্রক্রিয়া প্রতি বছর নিয়ম করে চালু রাখেন বলেই প্রতি বছর নতুন ভোটার যুক্ত হন, স্থান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ঠিকানা বদল নথিভুক্ত করতে পারেন। কিন্তু মজার কথাটা হল, ২০১৬-১৭ সালে সার্বিক আধার কার্ড করবার তাড়নায় কেন্দ্রের আধার কার্ড কর্তৃপক্ষ সারা দেশে প্রচুর বেসরকারি এজেন্সি নিয়োগ করেছিলেন যারা চুক্তির বিনিময়ে নাগরিকদের আধার কার্ড তৈরি করত, এর সঙ্গে ছিল নির্বাচিত সরকারি ব্যাঙ্ক, পোস্টাফিস যেগুলোকে আধার কেন্দ্র বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরে কেন্দ্রের সরকার আস্তে আস্তে ওইসব বেসরকারি এজেন্সির সঙ্গে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চুক্তি বাতিল করে, পোস্টাফিস বা ব্যাঙ্কগুলিতেও পরিষেবা কমিয়ে দেওয়া হয়। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। এই মুহূর্তে প্রচুর মানুষ আধার কার্ডহীন হয়ে আছেন, অগণিত মানুষ ঠিকানা বদল করায় তাদের আধার কার্ড সংশোধনের জন্য পড়ে আছে— কিন্তু সেই কাজ করার লোক নেই। পরিষেবা কতদূর সঙ্কুচিত হয়েছে তার একটা উদাহরণ, কলকাতার জিপিও। রাজধানীর সব থেকে বড় এই পোস্টাফিসে একটি মাত্র কাউন্টার থেকে আধার কার্ডের কাজ করা হয়। দিনে মাত্র তিরিশ জন সেই সুবিধে নিতে পারেন। সকাল আটটায় লাইন দিলে তিরিশ জনের হাতে স্লিপ ধরিয়ে দেওয়া হয় বেলা এগারোটা থেকে, বাকিদের জন্য আবার পরের দিন এবং সেটাও অনিশ্চিত। স্টেট ব্যাঙ্কের বেশিরভাগ শাখায় এখন আর এই পরিষেবা পাওয়া যায় না, যেখানে পাওয়া যায় সেখানেও এই একই অবস্থা। চাহিদা ও জোগানের এই যেখানে অবস্থা সেই সন্ধিক্ষণে এসে পড়ল নাগরিকত্ব আইন, এনআরসি।

এই এসে পড়া আরও বাড়িয়ে দিল চাহিদা। যারা এই বিষয়ে কিছুটা নির্লিপ্ত ছিলেন তারাও পথে বেরোলেন। কারণ, নাগরিকত্ব ইস্যুতে নয়াদিল্লির নেতারা একেক বার একেক রকম সুরে গাইছেন, কোনটা যে ঠিক নাগরিকত্বের প্রমাণ তা আজও তারা খোলসা করতে পারেননি। ফলে যেহেতু তারা মাত্রই তিন চার বছর আগে আধার কার্ড নিয়ে অনেক চাপাচাপি করেছিলেন এবং প্রকারান্তরে আধার কার্ড থাকা না থাকা নিয়ে নাগরিকত্বের একটা চিহ্নিত করার কাজ করবে বলে গলাবাজি করেছিলেন। একদম প্রান্তীয় মানুষদের মনে এমন ধারণা হওয়া স্বাভাবিক যে আধার কার্ড তৈরি করে বা সংশোধন করে রাখলে ভবিষ্যতে নিস্তার পাওয়া গেলেও যেতে পারে। এই ধারণাকে খুব দোষ দেওয়া যায় না। কিন্তু তারা জানতেন না সেই পাওয়ার পথটাকে সরকার নিজেই দিনে দিনে সঙ্কুচিত করে ফেলেছেন তাদের নীতি দিয়ে। দুর্জনের যেমন ছলের অভাব হয় না দেশের কেন্দ্রীয় সরকারেরও তাই। ফলে ব্যাপারটা দাঁড়িয়ে গেছে প্রত্যন্ত গ্রাম বা মফস্বলের কিছুটা বিভ্রান্ত মানুষ যখন আধার কার্ড তৈরি বা সংশোধন করার মাধ্যমে একটা খড়কুটো ধরে নিজেদের আশঙ্কার মহাসাগর থেকে উত্তরণের পথ খুঁজছেন, খুঁজে পেতে চাইছেন যে কোনও একটা পরিচয় চিহ্ন তখনও কিন্তু আদপে প্রতিশোধকামী সরকার তার জন বিরোধী ধূর্ততায় তাদের পায়ের তলা থেকে সরিয়ে নিয়েছে বাঁচবার মাটিটুকু। সারা দেশে যে আন্দোলন, যে শাহিনবাগ তার চেহারাটা কিছু প্রত্যক্ষ, তার বিরুদ্ধে যারা দমন নীতি নিয়ে পথে নামছে তাদের চেহারাও দেখা যায়— কিন্তু এই যে গ্রামের মানুষগুলি রাতের পর রাত শীত উপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে আছেন লাইনে কখন কাউন্টার খুললে তারা নিজেদের সুযোগ পাবেন তার অপেক্ষায়! কেউ এসেছেন অসুস্থ শরীরে, কেউ এসেছেন তার সন্তানকে বুকে ধরে, কেউ সারাদিন মাঠে খেটে, কেউ বা কোনও ছোট দোকান সামলে— তাদের বিরুদ্ধে যে পরোক্ষ এক দমন পীড়ন চলছে সম্ভবত আশু উত্তেজনার আবহে আমরা এদের পেজ থ্রি আইটেম বলেই ধরেই নিয়েছি। কিন্তু কলকাতার পার্ক সার্কাস ময়দানে যারা রাত জাগছেন আর সুদূর তেহট্ট বা করিমপুরে আধার কার্ড পাওয়ার আশায় যারা বিনিদ্র রয়েছেন তাদের মধ্যে তো এক গভীর সখ্য— দুই পক্ষই হাতড়ে বেড়াচ্ছেন তাদের পরিচয়। একদল চাইছেন বিভেদের পরিচয়কে উপড়ে ফেলতে আর অন্যদল একটু কমজোরি, কিন্তু তারা আতঙ্কে নীল তাই তারাও চান একটা বাঁচবার মতো পরিচয় যা দেশের সরকার তাদের আজও দিয়ে উঠতে পারেননি।

এরই মধ্যে একটা মশলাদার খবর। চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য বিঘ্নিত হলে আরও একটা জিনিস কিন্তু বাড়ে। সেটার আর নাম নাই করলাম। আধার কার্ড নিয়ে এই বিপুল চাহিদায় একদল কিন্তু যে করে কম্মে খাচ্ছেন তার হাতে গরম প্রমাণ পেয়েছে এই প্রতিবেদক। কোথাকার কোন যোগাযোগে কোন আশীর্বাদে জানা নেই নতুন আধার কার্ড ও তার সংশোধন করা যাচ্ছে কোথাও কোথাও— সরকার নির্ধারিত মূল্য একশো আঠারো টাকা, আর এইসব সংস্থায় তা পাওয়া যাচ্ছে সাতশো আটশো হাজারে যে যেমন পারে। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে হালে পরিচয় হয়েছে যার কর্ণধার স্থানীয় বিজেপির এক নেতা। বলেন কী? আপনার কাছে প্রমাণ আছে? চুরি কি কেউ প্রমাণ রেখে করে মশাই?

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2090 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...