কথা বলা পুতুল

সায়ন্তনী বসু চৌধুরী

 

–মৃত্যু মানে কী মাম্মা?

তোতার প্রশ্নটা শুনেই আমার বুকের মধ্যিখানটা ধক করে উঠল। তোতা আমার মেয়ে। নভেম্বরে পাঁচে পড়েছে। আজকাল মুখ খুললেই ও মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে নানারকমের প্রশ্ন করে। প্রশ্নগুলো মূলত দু ধরনের হয়। জটিল প্রশ্ন আর বড় প্রশ্ন। খেয়াল করে দেখেছি সরল সোজা প্রশ্নে তোতার মন ভরে না। আর সোজা উত্তরে তো নয়ই। সেইজন্য আমি সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকি। চারদিকের যা পরিস্থিতি তাতে পাঁচ বছর তিন মাসের মেয়েটাকে সব প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দেওয়ার কথা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারি না। আবার বানিয়ে বানিয়ে যে মিথ্যে কথা বলব, তাতেও ধরা পড়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। তোতার বাবা অবশ্য মোটামুটি সেফ জোনে বাস করে। সকাল সকাল তার অফিসে বেরোনোর তাড়া থাকে আর রাত করে বাড়ি ফিরে থাকে গুচ্ছের ফাইলপত্র দেখার কাজ। অজুহাত দিয়ে প্রতিবার সে দিব্যি মুক্তি পেয়ে যায়। কিন্তু মেয়ের প্রশ্নের হাত থেকে আমি রেহাই পাই না। আমারই হয়েছে শাঁখের করাত!

তোতা একটা মর্নিং স্কুলে পড়ে। বেশ ভাল স্কুল। নিয়মের কড়াকড়ি আছে। অনেক ঝাড়াই বাছাই করে ওর জন্য স্কুল বেছেছিলাম আমরা। সোম থেকে শনি ঠিক সকাল সাতটায় ওদের ক্লাস শুরু হয়। জন্ম থেকেই তোতা লেট রাইজার। খিদে পেলেও চুপটি করে বিছানায় পড়ে থাকত। পাছে ঘুমটা নষ্ট হয়ে যায়! তবে এখন ওকে ভোর ভোরই ঘুম থেকে উঠতে হয়। স্কুলে ভর্তির পর যেনতেনপ্রকারেণ প্রথম সপ্তাহটা কাটিয়ে ফেলেই মেয়ে আমার মানিয়ে নিয়েছিল। ভোরবেলা স্নান করতে গিয়েও তেমন কান্নাকাটি করেনি। সমাজের ইঁদুর দৌড়ে আমার কন্যাটির নাম লিখিয়ে দিয়ে গর্বিত আমিও বেশ নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম। এখন তো আমাকে ভাবতেই হয় না। নিজে নিজেই রেডি হয়ে যায় তোতা। উল্টে আমাকেই তাড়া মারে। আমি বুঝি আসলে আমার মেয়েটা স্কুলে যেতে বড় ভালবাসে। নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির বাচ্চারা তো আজকাল স্কুলেই বন্ধু খুঁজতে যায়। আমার তোতাও অনেক বন্ধু পেয়েছে স্কুলে। একদিন স্কুল কামাই করতে বললেই ও বলে,

–ভুলে গেলে? আজ তো আমাদের টিফিন বক্স বদলের দিন মাম্মা। আমি না গেলে ফ্রেন্ডরা রাগ করবে না? যদি কাল অফ করি?

মেয়ের পাকা পাকা কথা শুনে আমি মুখ টিপে হাসি। কারণ আগামী দিন যে টিফিনের বদলে অন্য একটি স্বাদু অজুহাত মেয়ের জিহ্বাগ্রে তৈরি হয়ে থাকবে সেটা আমি জানি। ঠিক ছটার সময় আমরা মা আর মেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ি। আমাদের লাল সিমেন্টের বারান্দার পাশে ঝাঁকড়া হয়ে থাকা এরিকা গাছের পাতাগুলোতে একবার হাত বুলিয়েই তোতা আমার বাঁ হাতটা জড়িয়ে ধরে শেষের আগের সিঁড়িটা থেকে লাফিয়ে উঠোনে নেমে পড়ে। পাড়ার মোড় পর্যন্ত আমরা গল্প করতে করতে হেঁটে যাই। সোয়া ছটার সময় মোড়ের মাথায় নিতাইদার চা দোকানের সামনে উজ্জ্বল হলুদ রঙের একটা স্কুলবাস আসে। চোখের পাতা থেকে রূপকথার ছোট ছোট কণাগুলোকে হাওয়াতে উড়িয়ে দিয়ে ঘুমভাঙা পক্ষীশাবকের মত তোতাও গা ঝাড়া দেয়। তারপর টুক করে বাসে উঠে জানালার ধারের সিটে বসে অভ্যেসবশত গোলাপি রঙের ফোলা ফোলা হাত নেড়ে আমাকে টা টা করে। ওর মুখের অনাবিল হাসি দেখে মনটা ভরে যায়। পাঁচ ঘণ্টার জন্য বুকের খাঁচা থেকে মেয়েটাকে বিদায় জানিয়ে অনেকগুলো ছোট বড় টেরা বাঁকা প্রশ্নচিহ্ন মনের মধ্যে লুকিয়ে নিয়ে আমি বাড়ির দিকে ফিরে আসি। ভাবি, ছানা ঠিকমত উড়তে শিখে গেলে মা পাখিও কি এইভাবে একা একা বাসায় ফিরে আসে?

সকালের দিকটায় রোজই গাঢ় কুয়াশা পড়ছে। তোতার গায়ে উলের হাতকাটা সোয়েটারের ওপর ঘন নীল রঙের ফুলহাতা হুডিওয়ালা জ্যাকেট। জ্যাকেটের পকেট থেকে একটা মোটাসোটা কাঠবেড়ালি উঁকি মারছে। তার দুহাতে একটা ফোলা চীনেবাদাম ধরা। থ্রি-ডি প্রিন্ট করা জ্যাকেট। গতবার শীতে বায়না করে তোতা এই জ্যাকেটখানা কিনেছিল। ওর পানপাতার মত মুখটা হুডির ভেতর থেকে সামান্য বেরিয়ে রয়েছে। আমার চাদরের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে ছটফটে ভঙ্গিতে হাঁটতে হাঁটতেই ফুটপাথের ওপর ভেঙে পড়া কৃষ্ণচূড়া গাছটার দিকে চোখ পড়ল তোতার। সম্ভবত গতকাল সন্ধ্যায় গাছটাকে গোড়া থেকে উপড়ে ফেলা হয়েছে। মিউনিসিপ্যালিটির উদ্যোগে রাস্তা চওড়া করা হবে। মাস খানেক আগেই বাড়িতে বাড়িতে নোটিস এসেছিল। আমরা অনেকেই বাধা দিয়েছিলাম। গাছটাকে কেটে ফেলা কি সত্যিই খুব প্রয়োজন? আমাদের কথা ধোপে টেকেনি। ভাঙা গাছটা এখন একটা অসনাক্ত মৃতদেহের মত অর্ধেক রাস্তা দখল করে পড়ে রয়েছে। কৃষ্ণচূড়া গাছটাকে দেখেই গত রবিবার দুপুরে শোনা নতুন শব্দটা নিয়ে আচমকা একটা প্রশ্ন করে বসল তোতা। “মৃত্যু কী?” রবিবার দুপুরে রেডিও চ্যানেলে “গাছের মৃত্যু” নামে একটা গল্পপাঠ শুনেছিল তোতা। তার পর থেকেই দেখছি কিছুটা বুঝে কিছুটা না বুঝে আমার মেয়েটা যেন অনেকখানি বড় হয়ে গিয়েছে। মনে মনে উত্তর তৈরি করছিলাম আমি। আমার হাতটা ধরে একটা হাল্কা ঝাঁকুনি মারল মেয়ে।

–ও মাম্মা?
–কী তোতা?
–বললে না তো?

আমি চুপ করে রইলাম। তোতা ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠছে। মনে মনে অনেক কাটাছেঁড়া করেও একটা জুতসই উত্তর সাজাতে পারছি না আমি। আসলে মৃত্যু যে কী নিজেকে সে কথা বারবার জিজ্ঞেস করেও কোনও সঠিক উত্তর পাচ্ছি না। তোতাকে আর কী জবাব দেব? অবশেষে স্কুলের বাস এসে আমাকে বাঁচিয়ে দিল। বেজার মুখে হাত নাড়তে নাড়তে তোতা স্কুলে চলে গেল। মেয়ের হাসি দেখতে না পেয়ে বুকটা শূন্য হয়ে গেল আমার। বাড়ি ফেরার সময় দেখলাম কৃষ্ণচূড়ার মোটা মোটা ডালগুলোকে করাত দিয়ে কেটে আলাদা করা হচ্ছে। স্থূল কাণ্ডটা খানিকটা পরিত্যক্ত মাংসপিণ্ডের মত পড়ে রয়েছে। রাস্তার ধারে একটা রংচটা লোডার দাঁড়িয়ে আছে। কটা লোক গম্ভীর মুখে এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আলাপ আলোচনা করছে। গোটা ব্যাপারটা কেমন যেন বিবর্ণ। অনেকটা সংসারে প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়া বয়স্ক ব্যক্তির শ্মশানযাত্রার মত। গাটা সামান্য গুলিয়ে উঠল আমার। ওই মেয়েটাকেও কি এইভাবেই চলে যেতে হবে…?

 

দুই

আমাদের বেডরুমে টিভি চলছে। দীপাঞ্জন এখন একটা পপুলার বাংলা খবরের চ্যানেল দেখছে। টিভির ভলিউম বেশ উঁচুর দিকে। ঘরে উঁকি মেরে দেখলাম, বাবার পাশে বসে হাঁ করে খবর গিলছে তোতা। ওদের দেখেই দপ করে আমার মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। বেশ জোরে চেঁচিয়ে বললাম,

–তোতা, পাশের ঘরে যাও তো একবার। মিউ কী করছে দেখে এস তো!

আমার কথা শুনে খানিকটা চমকে উঠেই টিভির স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে নিল তোতা। ঠিক দেখলাম তো? মেয়েটা চমকে উঠল কি? জানি না, চোখের ভুলও হতে পারে। সোনালি চুলওয়ালা কথাবলা মেয়ে পুতুলটাকে বুকে আঁকড়ে তোতা ধীরে ধীরে পাশের ঘরে চলে গেল। আমি চোখ পাকিয়ে ওর বাবার দিকে তাকালাম।

–আবার মেয়েটার সামনে নিউজ চ্যানেল খুলেছ তুমি? এই খবরগুলো ওর কানে না দিলেই কি নয়?

আমার মেজাজ বিগড়ে গিয়েছে দেখে দীপাঞ্জন একটু ঘাবড়ে গেল। আসলে গত চারদিন ধরে বাংলা ইংরেজি হিন্দি প্রতিটা খবরের চ্যানেলে মেয়েটাকে নিয়ে একটানা আলোচনা চলছে। দফায় দফায় বিশেষজ্ঞদের মতামত তুলে ধরা হচ্ছে ইডিয়ট বক্সের বাধ্য দর্শকদের সামনে। কাটাছেঁড়া বিশ্লেষণ চলছে ধর্ষণের প্রক্রিয়া নিয়ে। অথচ যে ওই তীব্র নির্যাতনের শিকার হয়েছে সে এখন বাকরুদ্ধ! লিখে লিখে জানিয়েছে নিজের যন্ত্রণার কথা। লিখে লিখে আর কতটাই বা বোঝানো যায়? মেয়েটার শরীরে অনুপ্রবেশকারী কাচের বোতল, লোহার রড, হাতের মুঠোগুলোর কথা ভেবে হাত নিশপিশ করে উঠছে আমাদের। অথচ রাগ চেপে রাখা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। গত পরশু আমার বৌদি মাছ কুটতে কুটতে বলছিল,

–ইচ্ছে করছে আঁশবটিটা তুলে নিয়ে একটা করে কোপ বসিয়ে দিই ছেলেগুলোর গলায়! এত খিদে? এমন পিশাচের মত খিদে? মাগো মা! যাইহোক, মেয়েটাকে একটু সাবধানে রাখিস সুমা। অযথা ঝামেলায় জড়াস না। বুঝেশুনে প্রতিবাদ করিস। অথবা করিসই না।

ভয়ে আমার বুক কেঁপে উঠেছিল। সবাই কেন আমার তোতার কথা বলছে? তাড়াহুড়ো করে ফোন ছেড়ে দিয়েছিলাম আমি। মেয়েটার অবস্থা ক্রিটিক্যাল। ক্ষুদ্রান্ত্রের কিছুটা অংশ নাকি ছিঁড়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল! অপারেশন করে সেসব বাদ দিতে হয়েছে। ভাবলেই আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। বাথরুমে গেলেই তলপেটটা মোচড় দিয়ে ব্যথা করছে। মনে হচ্ছে হঠাৎ করে গোপনাঙ্গটা ফেটে গিয়ে আমার ভেতরের কিছুটা অংশ শরীরের বাইরে বেরিয়ে পড়েছে। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে। বিদ্যুৎচালিত ধারালো করাত দিয়ে কারা যেন পাকানো নাড়িগুলো কাটছে। সাদা পোশাক পরা কজন মানুষ আমার শরীর থেকে আমারই অংশ আলাদা করে দিচ্ছেন যাতে আমার ভাল অঙ্গে পচন ছড়িয়ে না পড়ে।

শহরে অসংখ্য মোমবাতি মিছিল হয়েছে। আমি রাস্তায় বেরোতে পারিনি তবে ঠাকুরঘরে নিয়মিত বাতি জ্বালিয়েছি। হাতজোড় করেছি পাথরের মূর্তির সামনে। মেয়েটার জন্য সারা দেশ একজোট হয়ে প্রার্থনা করছে। কিন্তু আমার মন বলছে ও মেয়ে আর বাঁচবে না। আমি নেগেটিভ ভাবছি বুঝতে পেরেই দীপাঞ্জন খপ করে আমার হাতটা চেপে ধরল। নিঃশব্দে ওর মুখের দিকে তাকালাম আমি। উত্তেজনায় ঘামছি। ভেতরে ভেতরে কষ্ট পাচ্ছি। কিন্তু মুখে কিছুই বলতে পারছি না আমরা দুজন। কারণ তোতা বুঝে ফেললেই তো আবার নতুন কোনও প্রশ্ন করে বসবে। ওর প্রশ্নের সামনে থেকে আমি পালাতে পারব না। তখন হবে আর এক বিপদ! আসলে যেদিকেই যাচ্ছি ‘ধর্ষণ’ শব্দটা আমাদের ফলো করছে। একটা ভাসমান ব্লেডের মত তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে আমাদের। সুযোগ পেলেই গলার নলিটা কেটে দেবে। তোতার শ্রবণশক্তি প্রখর। আই কিউ দুর্দান্ত। তাই ওকে লুকিয়েই খুব সতর্ক হয়ে আমরা আপডেটটুকু জেনে নিচ্ছি।

 

তিন

দশদিন আগে সে মারা গিয়েছে। সুগন্ধি ফুলের ভারি ভারি মালার আড়ালে খানিকটা চুপিচুপিই তাকে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। খবরে বলেছে কান্নার শব্দ বাড়লে নাকি জনরোষ বাড়ার খানিকটা ভয় ছিল। তাই এই লুকোচুরি। দীপাঞ্জন আবার নর্মাল রুটিনে ফিরে গিয়েছে। খবর টবর দেখার বিশেষ সময় হচ্ছে না তার। আমার বৌদিও মনের সুখে নতুন একটা আসন ধরেছে। কী যেন নাম সেলাইটার! সেদিন বলেছিল। কিন্তু না! মানসিক অশান্তি নিয়ে বোধহয় সেলাইয়ের নাম মনে রাখা সম্ভব নয়। আসলে সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ার পর লুকিয়ে লুকিয়ে আমি মেয়েটার ছবি দেখেছি। আর তারপর থেকেই সব গোলমাল হয়ে গিয়েছে। রোগা রোগা চেহারা, মাজা মাজা গায়ের রং, টিকালো নাক, একঢাল চুল। ভারি সাধারণ দেখতে ছিল তাকে। কেবল চোখদুটোই বড্ড গভীর! এই দশদিনে আবারও কিছু নতুন খবর ছাপা হয়েছে। কাগজের তৃতীয় পাতায়, পঞ্চম পাতায় কিংবা ষষ্ঠ পাতার ওপরের দিকে স্থান পেয়েছে নতুন নতুন একঝাঁক মেয়ে। উঁহু, নিজের নামে নয়। ছদ্ম বিশেষণে। কিন্তু ওই চোখদুটো থেকে আমি কিছুতেই চোখ ফেরাতে পারিনি। চোখদুটো সবসময় আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রয়েছে। ঘুমের মধ্যেও বারবার ওই চোখদুটো আমাকে তাড়া করছে।

আজকাল আমি সারাক্ষণ ভাবি তোতা বড় হলে ওকে ঠিক কেমন দেখতে হবে! কেমন! কেমন? আমার মত মাঝারি গড়ন হবে নাকি দীপাঞ্জনের মত লম্বা চওড়া? মেয়েটা বড় হয়ে গেলে ওকে আমি আগলাব কেমন করে? আজকাল তো সবাই পাশ্চাত্যের পোশাক পরছে। তোতাও নিশ্চয়ই পরবে। ওর বাড়ি ফিরতে রাত হয়ে গেলে কী করব আমি? বাসি বিছানা গোছাতে গোছাতে, ডালে ফোড়ন দিতে দিতে, গরম তেলে কাটাপোনার টুকরো ছাড়তে ছাড়তে এসব আমার নিজের চিন্তা। একান্তই ব্যক্তিগত। দীপাঞ্জনকে বললে সে মোটেই বুঝবে না। তাছাড়া আমি বলতেও যাইনি কখনও। গোটা রাত এপাশ ওপাশ করে করে দু চোখের তলায় ঘন কালি জমিয়ে ফেলেছি। ডাক্তার বকুনি দিয়ে বলেছেন,

–দুশ্চিন্তা কমান মিসেস মিত্র। এই বয়সে এত দুশ্চিন্তা কীসের?

ভেবেছিলাম ডাক্তারকে একবার জিজ্ঞেস করি,

–আপনার ঘরে কি কোনও কন্যাসন্তান আছে ডাক্তারবাবু?

কিন্তু হয়ে ওঠেনি। ওই যে চক্ষুলজ্জা! সেটাই অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

চার

কথায় আছে না, “যেখানে ভূতের ভয়… সেখানে সন্ধ্যা হয়।” আমার ভয়টাও সত্যি হয়ে গেল। তোতাদের স্কুলের নাম খবরে উঠেছে। ঘটনাটা অত্যন্ত তেতো। স্কুল থেকে ফেরা ইস্তক আমার মেয়েটা চুপ করে আছে। অভিযোগটা তোতাদের ক্লাস টিচারের নামে। বাথরুম থেকে একটা মেয়েকে উদ্ধার করে এনেছে দারোয়ান। বাচ্চাটার সাদা জামা রক্তে ভিজে জবজব করছিল। চেতন আর অবচেতনের মাঝের অতল শূন্যতায় ডুবতে ডুবতেও সে মেয়ে আঙুল তুলে অপরাধীকে সনাক্ত করেছে। খবরটা কানে আসতেই আমি পড়ি কী মরি করে স্কুলে ছুটে গিয়েছিলাম। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে তোতা আমাকে বলছিল,

–সহেলি আমার বন্ধু মাম্মা। শি ইজ মাই বেস্ট ফ্রেন্ড।

ব্যস! ওইটুকুই। আমার কথা বলা মেয়ে পুতুলটা আজ এক্কেবারে চুপ হয়ে গিয়েছে। মুখটা শুকিয়ে ম্লান হয়ে গিয়েছে তোতার। একটাও কথা নেই, একটাও প্রশ্ন নেই। এই সমাজ ওকে আজ চুপ করিয়ে দিয়েছে। অথচ কী অদ্ভুত কাণ্ড দেখুন, আজ আর আমার এখন একটুও ভয় করছে না। আজ আর আমি মেয়ের প্রশ্নের সামনে থেকে পালাতে চাইছি না। তোতাকে বেডরুমে নিয়ে এসে টিভির ভলিউম বাড়িয়ে বাংলা খবরের চ্যানেলটা চালিয়ে দিয়েছি। অ্যাঙ্কর তোতাদের স্কুলের কথা বলছেন। তোতা আমার ওড়না জড়িয়ে চুপটি করে আমার কোলে শুয়ে রয়েছে। আর আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি একটা মোক্ষম প্রশ্নের—

–ধর্ষণ কী মাম্মা?

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2090 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...