তিনটি অণুগল্প

খালিদা খানুম

 

ছাপ

বড় মাটির চুলাতে দুখানি বাঁশ গুজে দেয় জামিলা। দাউদাউ করে জ্বলে উঠে আগুন। লোহার কড়াইতে সেদ্ধ হচ্ছে ধান। হাজির হয় রফিক-সফিকের দল— কই গো দাদী কী করো? ভালো আছ?

জামিলার কুঁচকানো গালে হাসির আভা— সর সর… তোদের ভুটের কথা আমি শুন্তি পারব না।

–দাদী, ভুটভাট ছাড়ো, কথা তো কইবা দুটা।
–ঘাটের মড়া, ঘরের কাজ করগা, ক্ষেতে যাগা, প্যাটে ভাত হবে। ভুট দিয়ে কি হবে?

জামিলা চুলার আগুন আরও তেজ করে।

–তা বল্লি হয় দাদী। দাদা করেনি রাজনীতি?
–তোর দাদার কথা কইস না। হাড় মাস জ্বালায়ে এক করে দিল। জীবনডা কয়লা হয়ে গেল মিনসের ঘর করতে করতে। রাজনীতি করে পোদানমনতি হবে মিনসে। দিন নায়, রাত নায় রাজনীতি করত্যাছে।

রফিক-সফিকের দল বিপদ বোঝে। দাদার বিরুদ্ধে কথা শুরু হলে শেষ হবে না। কথা ঘোরায়।

রফিক বলে– দাদী কিসে যাবা, বলো। মটর সাইকেলে যাবা?

সফিক বলে— দাদী মটরে পড়ে যাবা, রিকসা পাঠায় দিমু, তুমি আমাদের রিকসায় যাবা ভোট দিতে।

জামিলা চ্যালাকাঠ তুলে— সুমুখ থেকে যা। ভুটের কথা বলিস তো পুড়ায়া দিব।

রফিক বলে— মনে রাখিও, আমার চিহ্ন পা। পা না হলে কি তুমি হাঁটতে পারবা? পারবা না, তাই পায়ে ছাপখান দিও।

সফিক বলে— পা না হলেও জীবনে বাঁচবা। হাঁড়ি না থাকলে কীসে রাঁধবা? ছাপখান হাঁড়িতেই দিও।

 

জামিলা সেদ্ধ ধান উঠোনে ফ্যালে। শুকায়। আবার কড়াই ভর্তি করে। বিড়বিড় করে বলে— ভুট আর ভুট। রোজ লেগে আছে ভুট। খাওয়াদাওয়া নায়, দু দণ্ড ঘরে বসা নায়।

বিড়বিড় করতে করতে পান্তাভাত ভর্তি সানকি নিয়ে বসে জ্বলন্ত চুলার একপাশে।

ষাট বছরের কুঁচকে যাওয়া চোখ চিকচিক করে উঠে। দীর্ঘশ্বাস পড়ে জামিলার— কত করে বুলেছিনু যাস না ব্যাটা। রাজনীতি চাষার কাজ না। শুনল না। বলে, মা আমি রাজনীতি করছি না। দ্যাশের কাজ করছি। এই তোর দ্যাশের কাজ। মাটা ক্যামনে একলা হয়ে গ্যাছে, দেখতি পাস। তোর দেহখানও যদি মিলত। একটুকু ছাপ তোর যদি পেতাম।

টপটপ করে বয়ে চলে অশ্রু। চুলার আগুন নিভে যায়। একলা বসে থাকে জামিলা।

 

নামহীন

এ শহরের কোনও নাম নেই। এ শহরে কোনও ফুল ফোটে না, এ শহরে গাছ নেই, এ শহরে পাখি ডাকে না। মানুষের মতো হাতপাওয়ালা কিছু প্রাণী থাকে এ শহরে। এ শহর আমাদের শহর না, এ শহর নামহীনদের।

নামহীন মানুষগুলো পাশাপাশি বসে থাকে, শুয়ে থাকে, আকাশের দিকে চোখ করে বেবাক তাকিয়ে থাকে। পিঠ পাছা উদোম পড়ে থাকে, কারু খেয়াল থাকে না। কেউ কারু সঙ্গে কথা বলে না। দিন আসে, দিন যায়। সময় এখানে নিস্তব্ধ। কোনও সময় কেউ খেয়াল করে পাশের জনের থেকে পচা গন্ধ আসছে, বোঝা যায় সে মারা গেছে। এখানে মৃত্যুও দুঃখ আনে না। ময়লা পড়া থালা থেকে চালসেদ্ধ খুঁটে খুঁটে খায় মানুষের মতো কিছু অবয়ব।

এই নামহীন শহরের অপরদিকে অবন্তী নামক শহরে বিজয় উৎসব। আলোয় আলোয় সাজানো হয়েছে শহরের প্রতিটি রাস্তা। সকল শহরবাসীর জন্য আয়োজিত হয়েছে খাবারের মেলা। রাজা বিজয় তার চিরশত্রু জাতিকে পরাজিত করে, বন্দি করেছেন চিরশত্রু জাতিকে। পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে ওই জাতির সমস্ত ঘরবাড়ি, জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের সমস্ত পরিচয়। নামগোত্রহীন এক জাতি, যাদের নামে কোনও দেশ নেই। তারা অবন্তী নগরে বসবাস করছে বহু বছর, কিন্তু তারা অবন্তী নগরের মানুষ না। তারা নামহীন গোত্রহীন। আগাছা যেমন, তেমনই।

বহুদিন পর দক্ষিণের বাতাস নিয়ে আসে অজানা ফুলের ঘ্রাণ। সঙ্গে সঙ্গে আসে অচেনা সুর। অবন্তী শহরে বয়ে যায় সে বাতাস। গুপ্তচর ছুটে আসে— মহারাজ খারাপ খবর আছে। নামহীন জাতি ফুল ফুটিয়েছে। নামহীন শহরের পথে পথে গাছ। নামহীন মানুষেরা ফসল ফলায় আর গান গায়। চারিদিক থেকে ধেয়ে আসছে তারা তাদের সুর নিয়ে।

রাজা বিজয় দ্যাখেন— তার শহর ভরে গেছে নামহীন মানুষে।

 

এ আমার শহরের গল্প

শহরের এদিকটাতে শহর বলতে চওড়া রাস্তা আর আকাশছোঁয়া বহুতল। সন্ধ্যার আলো আকাশে ছড়ালেই অনেক দূরে দূরে যে দু একটা চায়ের ঝুপড়ি দোকান আছে সেগুলোও বন্ধ করে দোকানি চলে যায়। বহুতলের তলায় তলায় কখনও আলো জ্বলে, কখনও অন্ধকারের বাস। এমনই এক বহুতলের টপ ফ্লোরের আলো জ্বললে তার উল্টো দিকের বহুতলের টপ ফ্লোরে আলো নেভে।

চলেন, গল্পে প্রবেশ করি, মানে ওই দুই টপ ফ্লোরের আনাচেকানাচে ঘুরে গল্পের খোঁজ করি।

যে টপ ফ্লোরে আলো নেভে সেই ফ্লোরে হিন্দোল নামের একটি ছেলে থাকে, একাই থাকে। সে একা থাকতে ভালোবাসে কি না, সেই প্রশ্ন কেউ তাকে কোনওদিন করেনি।

প্রশ্ন করেছে সবাই। তার মা তার বোন তার প্রেমিকা। তার কাছে উত্তর নেই। হিন্দোলের কাছে ভালো ডিগ্রি, ভালো স্যালারি আছে কিন্তু প্রশ্নের উত্তর নেই।

কী উত্তর দেবে, যদি সবাই তাকে জিজ্ঞেস করে— কেন তার মেঘ হতে ইচ্ছা করে।

হিন্দোলের ঘরে যখন আলো নেভে, আর উল্টো দিকের ফ্লোরে যখন আলো জ্বলে তখন ভোর প্রায় হবার সময় হয়ে যায়। হিন্দোল দ্যাখে একটি মেয়ে ব্যালকনির গাছে জল দিতে দিতে ব্রাশ করে, কোঁকড়া এলোমেলো চুল। রাতের ছোট ড্রেস তখনও পরা। মেয়েটি এর পর রান্নাঘরে যাবে, ওটস খাবে। কফি খাবে।

আমরা দেখব তারপর মেয়েটি মিশে হাওয়ায়। যে হাওয়া এখন হালকাভাবে বইবে, যত দিন বাড়বে তত তার বেগ বাড়বে, ঝড়ের আকার নিয়ে তার শহরের রাজপথ অলিগলিতে ছুটবে পাগলের মতো।

এই সব না-গল্পরা জোনাকির মতো আমার শহরের রাতের আলোয় মিটমিট করে জ্বলে আর নেভে। আমার শহরের জমা মেদে শহরের আয়তন বাড়ে। ফুসফুসে জমা হয় কালিঝুলি, কাদা পাঁকে আমার শহরে জেগে থাকে হিন্দোল— তার বড় মেঘ হতে ইচ্ছা করে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2090 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

আপনার মতামত...