রোবসন কথা : চতুর্থ ভাগ

দেবাশিস মৈত্র

(তৃতীয় ভাগ এখানে)

পল রোবসন # ৮

“Artists are the gatekeepers of truth. We are civilization’s anchor. We are the compass for humanity’s conscience.”

১৯৪৬ সালে হার্লেমের একটি ছোট্ট প্রেক্ষাগৃহের বেসমেন্টে বসে একদল যুবককে এই কথাগুলি বলেছিলেন পল রোবসন। শ্রোতাদের মধ্যে একজন ছিলেন উনিশ বছরের যুবক হ্যারি বেলাফন্টে। ঠিক দশ বছর পরে, ১৯৫৬ সালে, এই বেলাফন্টেই একটি ছোট্ট রেকর্ড গড়ে ফেললেন। তিনি হয়ে উঠলেন পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম গায়ক, যাঁর লং-প্লেয়িং রেকর্ডের বিক্রি দশ লক্ষ পেরিয়েছে। রেকর্ডটির নাম ছিল, Calypso। এই রেকর্ডে ছিল বেলাফন্টের বিখ্যাত কয়েকটি গান-– Banana boat song, Come back Liza এবং Jamaica farewell। ওয়েস্ট ইণ্ডিজের ক্যালিপসো গান এর আগেও আমেরিকার অনেক গায়ক গেয়েছেন, কিন্তু শ্রোতাদের এইভাবে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারেননি আর কেউ।

‘ক্যালিপসো’ রেকর্ডটির অভাবনীয় সাফল্যের পর বেলাফন্টের খ্যাতি এবং জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকে। ঠিক কতটা জনপ্রিয়তা সেকথা বোঝানোর জন্য সমসাময়িক এক সুপরিচিত সঙ্গীতশিল্পী অ্যাব্রাম চেজিনসের একটি উক্তির এখানে উল্লেখ করা যায়। পাঁচ ও ছয়ের দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীতের প্রতি শ্রোতাদের অনীহার কথা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে চেজিনস সখেদে বলেছিলেন, ‘আমাদের যুগটা তো হল আসলে তিন বি-এর যুগ-– বেলাফন্টে, বিটলস আর বার্নস্টাইন।’

আশ্চর্যের বিষয় হল, হার্লেমের কৃষ্ণাঙ্গ-অধ্যুষিত পল্লীতে তীব্র দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়ে ওঠা বেলাফন্টে কিন্তু গায়ক হতে চাননি। তাঁর স্বপ্ন ছিল অভিনেতা হওয়া। রীতিমতো ফিল্ম স্কুলে ভর্তি হয়ে অভিনয় শিখতে শুরু করেছিলেন তিনি। সেখানে তাঁর সহপাঠীদের মধ্যে ছিলেন পরবর্তীকালের দুই প্রথিতযশা অভিনেতা– সিডনি পয়টিয়ার এবং মার্লন ব্র্যান্ডো। অদূর ভবিষ্যতে বেশ কয়েকটি ফিল্মে অভিনয় করবেনও বেলাফন্টে। ঠিক পল রোবসনেরই মতো বেলাফন্টেও কখনও ভাবেননি যে তিনি গায়ক হবেন, অথচ তা-ই হয়ে উঠলেন শেষ পর্যন্ত।

খ্যাতির চূড়ায় যখন বেলাফন্টের অধিষ্ঠান, তখন থেকেই তিনি ক্রমশ যুক্ত হতে থাকেন নাগরিক অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে। পল রোবসনের মন্ত্রশিষ্যের কাছে অন্য কিছু তো আশা করাও যায় না। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্রমশ বেলাফন্টের পেশার উপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৬-– এই দশ বছরকে বলা যায় বেলাফন্টের যুগ। তারপর থেকে তাঁর জনপ্রিয়তার স্রোতে ভাঁটা পড়তে থাকে। বেস্ট-সেলিং রেকর্ডের তালিকা থেকে ক্রমে তাঁর নাম বাদ পড়তে শুরু করে। তাতে অবশ্য বেলাফন্টের বিশেষ হেলদোল ছিল না। বন্ধু সিডনি পয়টিয়ার নিজের আত্মজীবনী ‘This Life’-এ লিখছেন, ‘Harry was then deeply involved in the civil rights movement at every level.’

আরও কিছুদিন পরে মারটিন লুথার কিং-এর অহিংস আন্দোলনের সময়ে বেলাফন্টে হয়ে উঠবেন প্রায় তাঁর ডান হাত।

নিজের লেখায়, বক্তৃতায়, সাক্ষাৎকারে-– হ্যারি বেলাফন্টে বারবার স্বীকার করেছেন পল রোবসনের কাছে তাঁর ঋণের কথা। সঙ্গীত জীবনের শুরুতে রোবসন তাঁকে বলেছিলেন, “Sing your song, and people will want to know who you are.” বেলাফন্টে অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেছিলেন সেই উপদেশ। Sing your song! রোবসন যেমন তাঁর ভাণ্ডার সাজিয়েছিলেন আফ্রো-অ্যামেরিকান সঙ্গীত দিয়ে, বেলাফন্টেও তেমনি তাঁর গানের ডালি সাজিয়ে নিলেন তাঁর স্বদেশ ওয়েস্ট ইণ্ডিজের ক্যালিপসো গানের সম্ভারে।

Sing your song! জীবন সায়াহ্নে এসে বেলাফন্টে যখন আত্মজীবনী লিখলেন, তার নাম তিনি রাখলেন, “My song.”

বেলাফন্টের বয়স এখন ৯০। এখনও তিনি সবরকম নাগরিক অধিকার রক্ষার আন্দোলনের কর্মী এবং সমর্থক। ঠিক যেমনটি ছিলেন, মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত, পিট সিগার।

একটু পিছনের কথা। তিনের দশকে (১৯৩৬–১৯৩৯) স্প্যানিশ সিভিল ওয়ার শুরু হওয়ার পর জেনারেল ফ্র্যাঙ্কোর বিরুদ্ধে স্পেনের রিপাবলিকানদের হয়ে লড়াই করতে সে দেশে গিয়েছিলেন পৃথিবীর ৫২টি দেশ থেকে প্রায় ৪০ হাজার ভলান্টিয়ার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে গিয়েছিলেন প্রায় ২৮০০ জন। তাঁদের দলের নাম ছিল “লিঙ্কন ব্রিগেড”। ১৯৩৮ সালে তাঁর স্পেন সফরের সময় পল রোবসন লিঙ্কন ব্রিগেডের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, গান শুনিয়েছিলেন তাঁদের।

১৯৯৭ সালে, লিঙ্কন ব্রিগেডের স্পেনের মাটিতে পা দেওয়ার ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে, একটি ছোট্ট অনুষ্ঠান হয়। লিঙ্কন ব্রিগেডের সেইসব স্বেছাসেবীদের মধ্যে যাঁরা তখনও জীবিত, তাঁদেরই এক পুনর্মিলনসভা। হ্যারি বেলাফন্টেকে তাঁরা সেদিন আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, তাঁর মুখ থেকে পল রোবসনের কথা শোনার জন্য। ছোট্ট, মর্মস্পর্শী বক্তব্যের একটি অংশে বেলাফন্টে বলেছিলেন এই কথাগুলি–

“পলের মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগে আমি ওর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। পল তখন থাকত ওর বোনের বাড়িতে। আমি চেয়ে চেয়ে দেখছিলাম এই দৈত্যাকার মানুষটিকে। শরীরটা ভেঙে পড়েছে, মন কিন্তু তখনও সতেজ। আমি বললাম, ‘পল, আমাকে জানতেই হবে… সারাটা জীবন ধরে এত কিছুর মধ্যে দিয়ে যে তোমাকে যেতে হল-– প্রয়োজন ছিল কী? এক সময় নিজের জন্য যে জমি তুমি তৈরি করে নিয়েছিলে, তার দৌলতে কী আরামেই না জীবনটা কাটাতে পারতে তুমি… তার পরেও এসবের প্রয়োজন ছিল কী কিছু?’

“পল বলল, ‘ভুল কোরো না হ্যারি। যা কিছু আমি করেছি জীবনে, তার কোনওটিই অপ্রয়োজনীয় নয়। হ্যাঁ, যত লড়াইয়ে আমরা জিতব ভেবেছিলাম, তার সবগুলো জিততে পারিনি। যেসব লক্ষ্যে পৌঁছনোর আশা ছিল, তার সবগুলোতে পৌঁছতে পারিনি। কিন্তু জেতা-হারার চেয়ে লক্ষ গুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ কী ছিল জানো? আমাদের যাত্রা।’”

 

দ্বিতীয় বাৎসরিক পল রোবসন বক্তৃতা- ৫ই এপ্রিল, ২০১৭। মঞ্চে রয়েছেন পল রোবসনের নাতনি সুসান রোবসন এবং হ্যারি বেলাফন্টে (বাঁদিক থেকে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয়)

 

পল রোবসন # ৯

পীকস্কিলের ঘটনার পর নিউ ইয়র্কের গভর্নরের নির্দেশে ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি মিঃ ফানেলি ঘটনার তদন্ত করে যে রিপোর্ট পেশ করেন, তাতে দাঙ্গার জন্য সম্পূর্ণ দায়ী করা হয় অনুষ্ঠানের উচ্ছৃঙ্খল শ্রোতাদের। দেশের বিভিন্ন শহরের বড় বড় সংবাদপত্রগুলিতে ঘটনার যেসব প্রতিবেদন ছাপা হয়, সেগুলিরও মূল সুর ছিল মোটামুটি এই রকমই। রেডিও স্টেশনগুলির নিজস্ব প্রতিবেদনেও অন্য কোনও সুর ধ্বনিত হতে দেখা যায়নি। আর, কে না জানে যে, প্রায় সত্তর বছর আগের সেই দিনগুলিতেও জনমতের উপর মিডিয়ার প্রভাব ছিল অপরিসীম।

আর এই সব কিছুর নীট ফল হল, মানুষের সৃষ্টি-করা এই দাঙ্গার বিরুদ্ধে সমাজের সর্বস্তর থেকে যে প্রতিবাদ ওঠা প্রত্যাশিত ছিল, আদৌ তেমন কিছু ঘটল না। প্রতিবাদ সীমাবদ্ধ রইল কৃষ্ণাঙ্গ সমাজ এবং কিছু বাম মনোভাবাপন্ন বুদ্ধিজীবিদের গণ্ডিতে। শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে যাঁরা কিছুটা যুক্তিবাদী, তাঁদের নীরবতার কারণ হয়তো ছিল কু-ক্লুক্স-ক্ল্যানের আতঙ্ক। কিন্তু এর বাইরে রয়ে গেল শ্বেতাঙ্গ জনসমষ্টির যে বিশাল অংশ, যে কোনও দেশেরই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর গরিষ্ঠাংশের মতো যাদের নিজস্ব স্বার্থের বাইরে বিশেষ চিন্তা নেই, সামাজিক দায়বদ্ধতার ছায়াও যারা মাড়ায় না, সমাজের ছোট-বড় কোনও বিষয়ে নিজস্ব মতামত গড়ে তোলার মতো একটি মস্তিষ্কের অভাবজনিত কারণে যারা বিকলাঙ্গ-– তাদের উপর পীকস্কিল-দাঙ্গার প্রভাব হল সুদূরপ্রসারী। এই একটিমাত্র দাঙ্গাকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাম-বিদ্বেষ, কৃষ্ণাঙ্গ ও ইহুদিদের প্রতি ঘৃণা এবং কু-ক্লুক্স-ক্ল্যানের কর্মকাণ্ডের প্রতি প্রচ্ছন্ন সমর্থন রাতারাতি কয়েক গুণ বেড়ে গেল।

পীকস্কিলের দাঙ্গার আনুপূর্বিক ইতিহাস খতিয়ে দেখলে এমন কয়েকটি বিষয় আমাদের নজরে আসে, যেগুলি বিশ্বের নানান দেশের নানান সময়ের দাঙ্গায় এর আগেও দেখা গেছে। এগুলি হল–

এক, দাঙ্গা কখনও সাধারণ মানুষ বাধায় না।

দুই, কিছু উন্মত্ত বা অর্ধ-উন্মাদ জাতিবিদ্বেষীর কথা বাদ দিলে, দাঙ্গা গুণ্ডারাও বাধায় না; দাঙ্গা বাধানোর জন্য গুণ্ডাদের কাজে লাগানো হয়। ভারতের পটভূমিতে এই তত্ত্বের স্বপক্ষে নিদর্শন পাওয়া যাবে ইসমত চুঘতাইয়ের একাধিক ছোট গল্পে। কোস্টা গাভরাসের অবিস্মরণীয় ফিল্ম ‘Z’-এ গ্রিসের পটভূমিতে এই একই ঘটনাকে ধরা হয়েছে।

তিন, দাঙ্গা প্রতিরোধ করার কথা পুলিশবাহিনীর; অথচ ক্ষেত্রবিশেষে তাদেরই সুচতুরভাবে দাঙ্গা বাধানোর কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে (আবার স্মর্তব্য, ‘Z’)।

চার, দাঙ্গার ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোয়েবলসের কায়দায় নিরবচ্ছিন্ন মিথ্যা প্রচার যদি ঠিকঠাক চালিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে সংখ্যালঘুদের প্রতি সংখ্যাগুরুর জাতিগত বিদ্বেষকে এক ধাক্কায় অনেকটা পুঞ্জীভূত করে ফেলা সম্ভব।

আমাদের দেশের অদূর অতীত এবং ঘটমান বর্তমানের কিছু ঘটনার সঙ্গে সাত দশকের পুরোনো এই পীকস্কিল-কাণ্ডের কী অদ্ভুত মিল!

ছ’ঘরা বন্দুকধারী শৃঙ্খলাবদ্ধ পুলিশবাহিনী, সেনাদল, কম্যাণ্ডো অনন্ত অস্ত্রভাণ্ডার-– সব কিছু হাতে থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রের কর্ণধাররা কেন যে কলম বা গিটার হাতে একাকী মানুষকে এত ভয় পায়! সেইজন্যই তো প্রাণ দিতে হয় লোরকা অথবা হোজে মার্তিকে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক গণতান্ত্রিক দেশ, উপরন্তু পল রোবসন এক বিশ্বনাগরিক। তাঁকে হত্যা করলে এদেশের সম্মান কোথায় থাকবে? তার চেয়ে বরং মানুষটাকে বাঁচিয়ে রেখে তাঁর মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করাই ভালো। অলক্ষ্যে তেমন পরিকল্পনাই তখন তৈরি করা হচ্ছে।

পীকস্কিলের দাঙ্গার পর দেশের নানান শহরে পল রোবসনের পূর্বনির্ধারিত প্রোগ্রামগুলি একের পর এক বাতিল করা হতে থাকল। উদ্যোক্তারা ক্ল্যানের গুণ্ডামির ভয়ে অনুষ্ঠান আয়োজন করার সাহস পাচ্ছে না। শহরাঞ্চলে কোনও প্রেক্ষাগৃহ রোবসনকে প্রোগ্রাম করতে দিতে রাজি নয়। জনসমক্ষে রোবসনের গান গাওয়ার জায়গা ক্রমে সঙ্কুচিত হয়ে উঠছে।

চারের দশকের শেষ দিক থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হল কুখ্যাত ম্যাকার্থি-রাজ। মার্কিন সরকার তখন সব কিছুর মধ্যেই কমিউনিজমের ভূত দেখছে। সমস্ত বুদ্ধিজীবী, হলিউডের সব কলাকুশলী, দেশের সব অভিবাসীরা-– সবাই নাকি কমিউনিস্ট। আর পল রোবসন তো একে নিগ্রো, তায় রাশিয়া-ফেরত বুদ্ধিজীবী, অতএব তিনি কমিউনিস্ট এবং দেশদ্রোহী। প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানের মদতে এবং সেনেটর জো ম্যাকার্থির উদ্যোগে তৈরি হল House Committee on Un-American Activity (HUAC)। সর্বশক্তিমান এই কমিটি দেশের যে কোনও নাগরিকের বিরুদ্ধে অ-মার্কিন আচরণের দায়ে তাকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা রাখত।

কিন্তু কাকে বলে অ-মার্কিন আচরণ?

HUAC-এর জেরায় মূল প্রশ্ন ছিল দুটি। প্রথম প্রশ্ন, ‘আপনি কি বর্তমানে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য, অথবা অতীতে কোনও সময় সদস্য ছিলেন?’ উত্তর যদি হ্যাঁ হয় তাহলেই বুঝতে হবে যে, উদ্দিষ্ট ব্যক্তিটির অ-মার্কিন আচরণ প্রমাণিত হয়ে গেল। তখন আসবে দ্বিতীয় প্রশ্ন, ‘আপনার চেনা যত লোক কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিল বা আছে, তাদের সবার নাম বলুন।’

১৯৪৮ সালে যে-কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে (যদিও সেই ঘোষণার যৌক্তিকতা কী তা কারও জানা নেই), ১৯৩০-৩৫-৪০-৪৫ সালে তার সঙ্গে সংস্রব রাখা কোন যুক্তিতে ‘অপরাধ’ বলে গণ্য করা যায়, সে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায় অবশ্যই কমিটির নেই।

সর্বশক্তিমান HUAC-এর জেরা, এবং তাদের দোসর FBI-এর গোপন অনুসন্ধানের মুখে যাঁদের পড়তে হয়েছে তাঁদের মধ্যে অনেকের নাম শুনলে চমকে উঠতে হয়।

ধরা যাক অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের কথা। ১৯৩৩ সালে, জার্মানিতে হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসিদের ক্ষমতা দখল যখন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে, সেই সময় আইনস্টাইন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেন। ১৯৫৫-তে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তিনি সে দেশেরই বাসিন্দা ছিলেন। বৈজ্ঞানিক আইনস্টাইনকে নিয়ে লাইব্রেরি-বোঝাই বই লেখা হয়েছে; আইনস্টাইনের বেহালাবাদন অথবা তাঁর সম্ভাব্য ঈশ্বরবিশ্বাস নিয়েও কিছু কম লেখা হয়নি। এইসব লেখালেখির পাহাড়ের নীচে তাঁর যে পরিচয়টি প্রায় চাপা পড়ে গেছে তা হল, তিনি ছিলেন শান্তিকামী, আন্তর্জাতিকতাবাদী, সাম্যবাদী, জাতিবিদ্বেষের কট্টর বিরোধী এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার একনিষ্ঠ সমর্থক। ১৯৮৩ সালে প্রথম জানা যায় যে, চার ও পাঁচের দশকে এফ-বি-আই গোপনে আইনস্টাইনের উপর কড়া নজর রাখত। তাঁর টেলিফোনে আড়ি পাতা হত এবং তাঁর প্রতিটি চিঠি খুলে পড়া হত। এত সব কাণ্ডের পরেও কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে তাঁর সংস্রবের কোনও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রমাণ না মেলায় আইনস্টাইনকে সরাসরি জেরার জন্য ডেকে পাঠানোর হিম্মত HUAC-এর কোনওদিনই হয়নি; এমনকী ১৯৫৩ সালে আইনস্টাইন প্রকাশ্যে HUAC-এর অসাংবিধানিক কাজকর্মের বিরুদ্ধে কড়া বক্তব্য জানিয়ে সেনেটর ম্যাকার্থিকে তুলোধোনা করার পরেও নয়।

কিন্তু তেমন সৌভাগ্য সকলের হয়নি। যেসব বুদ্ধিজীবী কমিটির সামনে হাজিরা দিতে বাধ্য হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে পল রোবসন ছাড়াও ছিলেন চার্লি চ্যাপলিন, বেরটোল্ট ব্রেশট, হেলেন কেলার, উডি গাথরি, পিট সিগার, অরসন ওয়েলস, হাওয়ার্ড ফাস্ট, লিওনারড বার্নস্টাইন, বার্ল আইভস, ল্যাংস্টন হিউজ, গায়িকা লেনা হর্ন, নাট্যকার আরথার মিলার, ঔপন্যাসিক ড্যাশিয়েল হ্যামেট প্রমুখ।

কমিটির সবচেয়ে বেশি বিষনজরে ছিল হলিউডের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। বিস্তর কমিউনিস্ট নাকি সেখানে করে-কম্মে খাচ্ছে! ফলে অন্য যে কোনও শিল্পের তুলনায় হলিউডকে অনেক বেশি ঝামেলার সম্মুখীন হতে হয়েছিল।

একথা সত্যি যে, তিনের দশকের ডিপ্রেশনের দিনগুলিতে বহু যুক্তিবাদী মানুষ কমিউনিজমের দিকে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। ফিল্ম ইণ্ডাস্ট্রির বহু লোক সেই সময় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ নিয়েছিলেন; অনেকে আবার সদস্য না হয়েও ছিলেন পার্টির কাছের মানুষ। কালক্রমে কেউ পার্টির সংস্রব ত্যাগ করেছেন, কেউ বা তখনও সদস্য রয়েছেন। HUAC-এর অন্তহীন জেরার মুখে দাঁড়িয়ে তাঁদের কেবল নিজেদের অপরাধ(!) কবুল করলেই হবে না, উপরন্তু ঘরশত্রু বিভীষণ হয়ে নিজের বন্ধু বা সহকর্মীদেরও ফাঁসিয়ে দিতে হবে!

হলিউডের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি যে কমিউনিজমের চর্চার এক গোপন আখড়া হয়ে উঠেছে, একথা দুজন স্বনামধন্য হলিউড-ব্যক্তিত্ব স্বেচ্ছায় HUAC-এর সামনে হাজির হয়ে কমিটিকে জানিয়ে এসেছিলেন। প্রথমজন ওয়াল্ট ডিজনি, আর দ্বিতীয়জন হলিউডের Actors’ Guild–এর তৎকালীন সভাপতি রোনাল্ড রেগন।

সস্ত্রীক পল রোবসনকেও একদিন কমিটির সামনে উপস্থিত হতে হল। রোবসন যে কমিউনিস্ট, তার অকাট্য প্রমাণ তো কমিটির কাছে ছিলই, নইলে তিনি নিজের ছেলেকে রাশিয়ায় পড়াশোনা করতে পাঠাবেন কেন? রোবসন বলেছিলেন, তার কারণ একমাত্র এই যে, একমাত্র রাশিয়াতেই তিনি গায়ের রঙের কারণে মানুষে-মানুষে ভেদাভেদ করতে দ্যাখেননি। কমিটি জানতে চেয়েছিল, তাহলে তিনি রাশিয়াতেই গিয়ে বসবাস করছেন না কেন? রোবসনের উত্তর-– আমি এক ক্রীতদাসের সন্তান। এই দেশে আমি বড় হয়ে উঠেছি। এই দেশকে তিল তিল করে গড়ে তোলার পিছনে আমার স্বজাতির মানুষদের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। কাজেই এই দেশে থাকার অধিকার কমিটির সদস্যদের যতটা রয়েছে, তার চেয়ে এক বিন্দুও কম নেই আমার।

দীর্ঘ বাদানুবাদের শেষে কমিটি রোবসনকে বলে, তিনি যে কমিউনিস্ট নন–- এই মর্মে তাঁকে মুচলেকা দিতে হবে। রোবসন এবং তাঁর স্ত্রী, দু’জনেই মুচলেকা দিতে অস্বীকার করেন এই যুক্তিতে যে, কে কোন রাজনৈতিক মতবাদে আস্থা রাখবে সেটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। রাষ্ট্রের সেখানে নাক গলানোর কোনও অধিকার নেই। রাষ্ট্রের দায়িত্ব তার নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়ার।

কমিটির সুপারিশে রোবসনের পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করে নেওয়া হল। শিল্পী হিসাবে আত্মপ্রকাশের শেষ যেটুকু সুযোগ ছিল তাঁর, সেটুকুও আর রইল না। দেশের ভিতরে তাঁর কাজ করার সমস্ত পথগুলো তো আগেই একে একে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। রেডিওতে তাঁর গান গাওয়ার অধিকার নেই, ফিল্ম স্টুডিওয় পা রাখার উপায় নেই, কোনও হল-মালিক তাঁকে গান গাওয়ার জন্য বা নাটক মঞ্চস্থ করার জন্য হল ভাড়া দেবে না। শেষ ভরসা ছিল বিদেশে গিয়ে অনুষ্ঠান করা। পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করে সেই রাস্তাটিও বন্ধ করে দেওয়া হল।

এক অনন্যসাধারণ শিল্পীর জীবন ধীরে কিন্তু নিশ্চিতভাবে ঠেলে দেওয়া হতে থাকল ধ্বংসের দিকে, শুধু প্রতিবাদী হওয়ার অপরাধে, শুধু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার অপরাধে।

১৯৫০ সালে তুরস্কের কবি নাজিম হিকমত (রাজনৈতিক কারণে যিনি নিজে অনেকবার জেল খেটেছেন) লিখলেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা— ‘ওরা আমাদের গান গাইতে দেয় না, নিগ্রো ভাই আমার পল রোবসন।’ কে যে সুর দিল এই কবিতায়, কীভাবে যে এই গান নানান ভাষায় অনূদিত হয়ে দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ল, কেউ তা জানে না।

(পঞ্চম ভাগ ১লা অক্টোবর)

 

ছবিঋণ – ইন্টারনেট

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2615 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...