মৃত পাখিদের গান — ১৩শ পর্ব

অবিন সেন

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

উনিশ

প্রবীর কিছুতেই বুঝতে পারছে না, এমনটা কীভাবে হতে পারে! তারা যে পাসোয়ানের এখানে আসবে সে খবর তো বাইরের কেউ জানত না। জানতে পারার কথাও নয়। এমনকি, সে তার কলিগদেরও জানায়নি সে কোথায় যাচ্ছে। এমনকি বড়বাবুকেও না। তার মনের ভিতরে একটা সম্ভাবনা উঁকি দিয়ে উঠল, তবে কি বান্টি এই খবর জানিয়ে দিল! কিন্তু বান্টি কেন জানাবে? বান্টির এই ব্যাপারে কী স্বার্থ থাকবে সে বুঝে উঠতে পারছে না। তবে একটা বিষয় ভেবে সে কিছুটা আশ্বস্ত হচ্ছে যে, এই প্রথম খুনির খুব কাছে তারা আসতে পেরেছে। অর্থাৎ খুন হবার পর-মুহূর্তে খুনের প্রত্যক্ষ বিষয়গুলিকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে। না হলে আগের কোনও খুনের ক্ষেত্রেই ক্রাইম সিন ইনভেস্টিগেশন বলতে যা বোঝায় তার সুযোগ তারা পায়নি। সুতরাং এই সুযোগ কোনও ভাবেই ছাড়া যাবে না। প্রবীর ভাবল। সে ইশারা করে বান্টিকে চোখে চোখে রাখতে বলল। যেন সে পালিয়ে না যায় কোনওভাবে।

সে তন্ময় সামন্তকে ডায়াল করল,

সামন্তদা, প্রবীর বলছি। একবার এখুনি আসতে হবে। আবার একটা খুন।

প্রবীর সংক্ষেপে বিষয়টা ব্যাখ্যা করল। সামন্ত অরাজি হল না। সেও চাইছে না এমন একটা ক্রাইম সিন হাতছাড়া করতে।

এর পরে প্রবীর মোবাইলে ধরল প্রবাল সেনকে।

প্রবালও তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেল।

ফোনাফুনির কাজটা সেরে প্রবীর ঘরের চারপাশটা চোখ বোলাল। ছোট অপরিসর ঘর। সেই ঘরের লাগোয়া একটা ছোট করে রান্নার জায়গা। রান্নার জায়গায় কয়েকটা অ্যালুমিনিয়ামের অপরিষ্কার হাঁড়িকড়া, থালা, গ্লাস। একটা আঁচের তোলা উনুন। উনুনের পাশে ডাঁই করে রাখা কেজি পাঁচেক কয়লা। গোটা কয়েক ঘুঁটে। একটা মাটির জল রাখার কুঁজো। কুঁজোর মুখে একটা অ্যালুমিনিয়ামের বাটি চাপা দেওয়া, তার উপরে একটা গ্লাস। গ্লাসটা কাচের। প্রবীর ভাবল, এই গ্লাসের নিশ্চয়ই একটা জুড়ি আছে। খুঁজতে খুঁজতে তেমনি একটা কাঁচের গ্লাস সে তক্তপোশের নীচে দেখতে পায়। তক্তপোশের মাথার কাছে একটা ‘ওল্ড মঙ্ক’ রামের বোতল। বোতলে তখনও অর্ধেকটা রাম রয়ে গিয়েছে।

রক্তের ধারা সেই বোতলের কাছ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে। প্রবীর ভাবল, বড্ড বেশি যেন রক্ত চারপাশে। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছিটকে পড়েছে চারপাশে। তাদের একবার ব্লাড স্ট্রেন প্যাটার্নের উপর ট্রেনিং হয়েছিল। প্রবীর নিজের মনে খুক করে হাসল। কী বোরিং সেই ট্রেনিং। সে তো পিছনে বসে ঘুমিয়ে কাটিয়েছে। তবে সে বুঝতে পারছে, খুনি খুব দক্ষ হাতে গলাটা কেটেছে পাসোয়ানের। কিন্তু ছুরি বা চাকুটা নেই চারপাশে কোথাও। খুনি কি সেটা সঙ্গে করে নিয়ে গেছে? নিশ্চয়ই নিয়ে গেছে।

সামন্তবাবু সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে প্রবালকে। প্রবাল ঘরে ঢোকার আগে চারপাশটা ভালো করে দেখে নেয়। সারি সারি টিনের ছাউনি দেওয়া এক কামরা দু কামরার ঘর। দু চারটে বাড়ির ফাঁকে কাঁকে সরু অপরিষ্কার রাস্তা। রাস্তায় আলো কম। বস্তিটার মুখেই একটা ভাঙা পরিত্যক্ত গ্যারাজ। গ্যারাজের সামনে বেশ কয়েকটা ভাঙাচোরা গাড়ি পড়ে রয়েছে। প্রবাল ঘরে ঢোকার আগে আবার সেই পরিত্যক্ত গ্যারাজটার সামনে এসে দাঁড়ায়। দাঁড়িয়েই থাকে। তার যেন কেমন মনে হচ্ছে গ্যারাজটা পরিত্যক্ত হতে পারে কিন্তু এখানে লোকজনের আনাগোনা আছে। সেখানে দাঁড়িয়ে সে একটা সিগারেট ধরায়। সিগারেট টানতে টানতে সে গ্যারাজটার দিকে তাকিয়ে থাকে। সিগারেটটা শেষ করে দগ্ধ অবশেষটি ছুড়ে ফেলে দিলে সেই দগ্ধ অংশটি যেখানে গিয়ে পড়ল সেখানে আর একটা আধপোড়া সিগারেট পড়েছিল। প্রবালের চোখ পড়ে যায় সেদিকে। সে এগিয়ে গিয়ে সেখানটায় বসে পড়ে, তার পরে পকেট থেকে একটা দস্তানা বার করে পরে নিয়ে সেই সিগারেটের টুকরোটি হতে তুলে নেয়। দেখল দামি ‘ডানহিল’ সিগারেটের টুকরো সেটি। তার কপালে একটা চিন্তার ভাঁজ খেলে যায়। এবং সিগারেটের বাটটা পুরানো নয়। টাটকা। সে সেই টুকরোটি একটি পলিথিনের পাউচে রেখে পকেটে ভরে নেয়। গ্যারাজটা তাকে যেন কিছুটা ভাবিয়ে তোলে।

প্রবাল খুনির সাহস দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছে, দিনে দুপুরে খুন করে সিগারেট টানতে টানতে ডাঁটের সঙ্গে বেরিয়ে চলে যাচ্ছে। কেউ দেখল কি দেখল না সেদিকে তার কোনও খেয়াল নেই। কেন? এটা কি খুনির দম্ভ? সে কি পুলিশকে তার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল?

দু-তিনটে বাচ্চা ছেলে তখনও খেলা করছিল, অপরিসর রাস্তাটার উপরে। আদুল গা, ময়লা ছেঁড়া প্যান্ট। তারা কয়েকটা মার্বেল নিয়ে খেলা করছিল। সে ঘরে ঢোকার আগে তাদের সঙ্গে গিয়ে বসে গেল। তাদের সঙ্গে গল্প জুড়ে দিল। সবথেকে যেটি বড় তার নাম ভজা। খেজুরে গল্প করতে করতে প্রবাল যেই প্রশ্ন করতে শুরু করল তখনই সে তার ময়লা ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

দশটা টাকা দাও আগে।

প্রবাল সহজেই টাকা বার করল না। বলল,

টাকা নিয়ে কী করবি?
খাব।

খুব সহজ আর সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল ভজা।

প্রবাল দশ টাকার একটা নোট বার করে দিয়ে বলল,

ওই ঘরটায় যে থাকত তাকে চিনিস?

প্রবাল আঙুল দিয়ে পাসোয়ানের ঘরটা দেখিয়ে দিল।

ভজা ঘাড় নাড়ল। সে চেনে।

আজ সকালে ওর ঘরে যে এসেছিল তাকে দেখেছিস?
না।
তুই কতক্ষণ এখানে খেলছিস?
অনেকক্ষণ।
ওর ঘর থেকে চেঁচামেচি শুনেছিস?
না।

ভজা আবার হাত বাড়ায়।

প্রবাল চোখ পাকায়। জানতে চায়,

কী?

ভজা হাত বাড়িয়েই বলে,

আর একটা নোট দাও।

প্রবাল এবার একটু দরাদরি করে।

আগে আমার সব কথার জবাব দে, তার পরে।

ভজা হাত গুটিয়ে নেয়।

পাসোয়ানের ঘর থেকে একটা লোক বেরিয়ে ওই গ্যারাজের দিকে চলে গেছিল। তাকে দেখেছিস?

ভজা হাঁ করে তার দিকে তাকিয়ে থাকে এক মুহূর্ত। তার পরে বলে,

লোক নয়। একটা মেয়েমানুষ।

প্রবাল যেন একটু থমকে যায়। নিজের সঙ্গে কথা বলছে যেন এমন করে বলে,

মেয়েমানুষ!

ভজা তার কথাটা শুনতে পায়। সেও প্রবালের সঙ্গে সঙ্গে বলে,

হ্যাঁ! মেয়েমানুষ তো।
মেয়েমানুষটা কী পরেছিল?

ভজা একটু ভাবল।

চুড়িদার।
আর?
চোখে কালো চশমা।
সিগারেট টানছিল?
না।
ওই গ্যারাজটায় লোক আসে যায়?
হ্যাঁ।
তাদের চিনিস?
না।

ভজা আবার হাত বাড়ায়। এবার প্রবাল তার হাতে একটা দশ টাকার নোট ধরিয়ে দিয়ে উঠে পড়ে। সে পাসোয়ানের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। আর একটা সিগারেট ধরাবে বলে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বার করে আবার ঢুকিয়ে নেয়। ঘরের ভিতরে ঢোকে। তখন পুলিশ ফটোগ্রাফার পটাপট ছবি তুলছিল নানা অ্যাঙ্গেল থেকে। প্রবাল চুপ করে এক দৃষ্টিতে মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার পরে ঘরের চারপাশটা একবার তাকিয়ে নেয়। প্রবীর তাকে সমস্ত বিষয়টা আগাগোড়া বলছিল। প্রবাল মন দিয়ে তার কথা শুনল।

প্রবীর কথা শেষ করলে প্রবাল মৃতদেহের একেবারে কাছে এগিয়ে যায়। ঝুঁকে মৃতদেহটা খুঁটিয়ে লক্ষ করে। কেমন পাকা হাতের কাজ। একেবারে যেন শিল্পের মতো ছুরি টেনে দিয়েছে। রক্ত ছিটকে পড়ার প্যাটার্ন দেখে তার মনে হচ্ছে বসে থাকা অবস্থাতেই ছুরি চালানো হয়েছে। এবং সেটা হঠাৎ করেই। প্রবাল তার সন্ধানী চোখ নিয়ে কী একটা যেন খুঁজছিল! হাঁটু মুড়ে বসে খাটের নিচেটা সে একবার তাকিয়ে নেয়। রক্তের ফোঁটাগুলো বাঁচিয়ে সে হামা টেনে টেনে ঘরের এক পাশ থেকে আর এক পাশে ঘুরে বেড়ায়। তার কাণ্ড সবাই কৌতূহলী চোখ নিয়ে দেখছিল। জানালার কাছে থেকে কি একটা ছোট জিনিস সে পকেটে ভরে নেয় সবার অলক্ষ্যে। তার পরে উঠে দাঁড়িয়ে প্রবীরকে প্রশ্ন করে,

পাসোয়ানের মোবাইলটা কোথায়?

প্রবীর সরু চোখ করে তাকায়! তাই তো, সেটা তো সে দ্যাখেনি। সে উত্তর দিতে পারে না, চারপাশে একবার অস্বস্তি নিয়ে তাকায়। সে প্রবালের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ে। সে দ্যাখেনি।

প্রবাল বলে,

পাসোয়ানের মোবাইলটা ট্র্যাকিং-এ দিয়ে দিন। হয়ত এখানেই শেষ অ্যাক্টিভ ছিল তার ফোন। তবু সে কাদের সঙ্গে কথা বলছিল ইদানীং সেটা জানা দরকার। খুনি তো দেখছি পাসোয়ানের পরিচিত। আমার খুব মনে হচ্ছে বান্টি যখন পাসোয়ানকে ফোন করেছিল তখন খুনি এখানেই বসে ছিল। পাসোয়ানের সামনেই।

সে বান্টিকে ডেকে পাঠায়।

বান্টি এলে প্রবাল জানতে চায়,

তুমি যখন পাসোয়ানকে ফোন করেছিলে তখন কি পাসোয়ান স্বাভাবিকভাবে কথা বলছিল? নাকি তার গলা অন্যরকম শুনেছিলে?

বান্টি একটু ভাবল। তার পরে বলল,

একটু যেন অন্যরকম শুনেছিলাম। চাপা, ঠান্ডা লেগে গলা বসে গেলে যেমন হয়।

নেশা করে কথা বলার মতো?

না, ঠিক তা নয়। ঠান্ডা লাগার মতো।

প্রবাল যেন কিছু ভাবছিল। তক্তপোশের নিচে সেদিনের একটা বাংলা খবরের কাগজ পড়েছিল। সে খবরের কাগজটা তুলে নিয়ে পাতাগুলো উল্টে পাল্টে দেখল। দেখতে দেখতে তার চোখ সরু হয়ে আসে, কপালে ভাঁজ পড়ে। তার পরে বলে,

চলুন, এখানে আমার আর কিছু দেখার নেই।

 

কুড়ি

এক অসহায় মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ টিভির পর্দা ফুঁড়ে বেরিয়ে এসে বসার ঘরের বাতাসকে ভারি করে দিয়েছে। কলকাতার টপ প্রচারিত টিভি চ্যানেল বিশাখা দত্তর মাকে লাইভ কভার করছিল। কী এক মর্মান্তিক হাহাকার অর্কর ভিতরটাকে যেন নাড়িয়ে দিয়ে যায়। অনুষ্ঠানটা সে সরাসরি দেখতে পারেনি। সন্ধ্যা সাতটার স্লটে সেটি দেখানো হয়েছিল। অবশ্য অর্ক সেটা জানত না। সে তখনও অফিসে ফাইল-পত্রের মধ্যে ডুবে ছিল। ডিসিডিডি তাকে ডেকে পাঠায়। সাহেবের ঘরেই সে অনুষ্ঠানের শেষটা দেখেছে। ডিসিডিডি সাহেব ভালো কথায় বললে ভর্ৎসনাই করলেন তাকে। অর্ক মুখ নিচু করে শুনে গেল। তার নিজেরও খুব খারাপ লাগছিল। অর্ক আমতা আমতা করে কিছু বলার চেষ্টা করে। কিন্তু ডিসিডিডি সাহেব তাকে থামিয়েই দিলেন। অর্ক বুঝল তন্ময় সামন্তর কাছ থেকে তিনি আগেই কেসটার ব্যাপারে ব্রিফ পেয়ে গেছেন। সুতরাং অর্কর মুখ বুজে থাকা ছাড়া আর কিছু ছিল না। এবং ডিসিডিডি সাহেব কোনও ভণিতা অর্কর কোনও অজুহাতে কান না দিয়ে সরাসরি বললেন,

মিত্র, কাল থেকে এই কেসটা তুমিই হেড করবে, অ্যান্ড এভরিডে তুমি আমাকে তদন্তের প্রোগ্রেস জানাবে। উইদিন সেভেন ডেজ আই ওয়ান্ট দ্যাট সিরিয়াল কিলার বিহাইন্ড দ্য বার।

অর্ক যেন বলার চেষ্টা করল,

স্যার, মাত্র এক সপ্তাহ…

অর্কর কথা শেষ হবার আগেই গোয়েন্দা প্রধান কেটে কেটে বললেন,

আই ডোন্ট ওয়ান্ট এনি এক্সকিউজ। কীভাবে জানি না সিরিয়াল কিলিং বলে অলরেডি মিডিয়া সন্দেহ করতে শুরু করেছে। মিডিয়া আজ তো বলেছে “শহরে কী এক সিরিয়াল কিলারের আবির্ভাব হয়েছে! শহরের মানুষ এখন কতটা নিরাপদ!” সুতরাং কোনওরকম বাড়াবাড়ি হবার আগেই এই কিলারকে স্টপ করতে হবে।

তিনি একটু থামলেন, তার পরে আবার বললেন,

আর শোনো, প্রবাল সেনকে যখন তুমি এই কেসে ইনভলভ করেছ তখন প্রবালকে একবার আমার কাছে নিয়ে এসো। আমি ওর সঙ্গেও সরাসরি কথা বলতে চাই।

এবার কিছুটা যেন সান্ত্বনা দেবার ঢঙেই তিনি বললেন,

দ্যাখো, মিত্র, তোমার উপরে আমার পূর্ণ আস্থা আছে। সুতরাং এটাকে টপ প্রায়োরিটি দিয়ে লেগে পড়ো। বুঝতেই পারছ, সিপি সাহেবের কাছে যখন স্বরাষ্ট্র দপ্তর থেকে এই কেসের ব্যাপারে খোঁজখবর চালাচ্ছে তখন বুঝতে হবে এই কেসটা এবার অন্য দিকে মোড় নিচ্ছে। আর হয়ত একটা সেনসেশনাল মার্ডার কিন্তু আমাদের সকলকে প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেবে। ফলে তদন্তে কোনও রকম শিথিলতা কেউ বরদাস্ত করবে না।

ডিসিডিডি সাহেবের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে তার মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছিল। নিজের চেম্বারে কিছুক্ষণ সে গুম হয়ে বসে থাকে। নিজের মনে ভাবে, ‘নাহ্, আজ আর কোনও কাজে তার মন বসবে না, কাল থেকেই তাকে শুরু করতে হবে।’

রাত্রে বসার ঘরে বসে সে বিশাখা দত্তকে নিয়ে অনুষ্ঠানটার রিপিট টেলিকাস্ট দেখছিল। প্রথম থেকে। এক অসহায় মায়ের কান্না তাকে ভিতরে ভিতরে কষ্ট দিচ্ছিল। সে ভাবল, রেখা দাশের কোনও পরিবার নেই। থাকলেই সেটা নিয়ে হয়ত এমনি একটা অনুষ্ঠান হয়ে যেত। এই প্রথম সে নিজের ভিতরে একটা আর্জ ফিল করে কেসটার বিষয়ে। মনটা তার খারাপ হয়ে যায়।

সেই সেদিন গঙ্গার ধারে তার আর রুচিরার দেখা হয়েছিল। তার পরে আর তাদের দেখা হয়নি। ফোনে কথা হয়েছে রোজ। রুচিরার সঙ্গে একবার কথা না হলে কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে অর্কর। রুচিরাও আজ তাকে টিভির এই অনুষ্ঠান নিয়ে বলল। রুচিরা যেন হাসতে হাসতেই বলেছে “পুলিশ সাহেব, আপনারা কিন্তু ঠিকমতো তদন্ত করছেন না।”

অর্ক সেই খোঁচা চুপ করে সহ্য করেছে। রুচিরা তো জানে না এটা একটা সিরিয়াল কিলিং-এর কেস। জানলে হয়ত সে ভয় পাবে, অর্ক তাই কিছু বলেনি। তাছাড়া সে কোনও খুনখারাবির বিষয় নিয়েই কথা বলতে ভালোবাসে না রুচিরার সঙ্গে।

অনুষ্ঠানটা শেষ হলে সে প্রবালকে ফোন করে। নিম্নরূপ কথাবার্তা হয় তাদের,

আজ সন্ধ্যায় বিশাখা দত্তর কেস নিয়ে টিভির অনুষ্ঠানটা দেখেছিস?
না, আমি দেখিনি। সন্ধ্যায় বাইরে ছিলাম। তনুকার কাছে শুনলাম।
এবার তো আমার চাকরিটা যাবে।
কেন?
ডিসিডিডির কাছে খুব ঝাড় খেলাম। এক সপ্তাহের মধ্যে এই কেস সলভ করতে হবে। আর আমাকেই তদন্তের লিড করতে হবে।
তা কর।
কর মানে? এ কি হাতের মোয়া নাকি, নিলাম আর গপ করে গিলে ফেললাম!

ফোনের ওদিক থেকে প্রবালের হাসি শুনতে পায় অর্ক।

তুই হাসছিস ভাই? এদিকে আমার চাকরি চলে যাবে আর তোর হাসি পাচ্ছে?
হাসছি না। শোন, এক সপ্তাহ না হলেও খুব তাড়াতাড়ি আমরা কেসটার সমাধান করতে পারব।

হঠাৎ করে অর্কর গলার ভিতরে এক দলা আনন্দ উথলে ওঠে, উৎফুল্ল হয়ে বলে,

রিয়েলি! খুনি কে সেটা বুঝতে পেরেছিস?

প্রবাল তার আনন্দটা টের পায়। বলে,

অতটা নয় তবে অন্ধকার একটু পরিষ্কার হচ্ছে। তবে কাল আমি তোর ওখানে যাচ্ছি, সকালেই। তুই সামন্ত আর প্রবীর পালকে ডেকে নিস। ডিটেল আলোচনা করব।

পরদিন সামন্ত সকাল সকালই পৌঁছে গিয়েছে। প্রবীর পালও এসে গেল তারপরেই। অর্কর চেম্বারে মিটিং বসেছে। অর্ক অধীর গাঙ্গুলিকেও ডেকে নিয়েছে। তারা প্রাথমিক আলোচনা সেরে নিচ্ছিল তখন প্রবাল ঢুকল। যখন কোনও অপরাধের তদন্ত কোথাও গিয়ে আটকে যায় তখন তদন্তকারী অফিসারেরা এইভাবে আলোচনায় বসে। এটা খুব সাবেক আর এফেকটিভ পদ্ধতি। অনেক সময়েই এইরকম আলোচনার মধ্যে দিয়ে কোনও ডাউটের মধ্যে থেকে ক্লু বেরিয়ে পড়ে।

অর্ক কফি বলেছিল। কফি, সেই সঙ্গে স্ন্যাক্স শেষ করে প্রবাল শুরু করল,

এই অপরাধ কাহিনির সূত্রপাত প্রায় তেরো মাস আগে। অরুণ করের মার্ডার দিয়ে। অবশ্য তার আগে কোনও খুন হয়ে থাকতে পারে, তবে আমার মনে হয় অরুণ করের খুনই প্রথম খুন এই সিরিজের। অরুণের বউ অঞ্জলি খুন হল, না পালিয়ে গেল, না সে খুনির সঙ্গী, সেই বিষয়ে আমরা এখনো অন্ধকারে। তবে আমার মনে হয় খুনি পুরুষ, তবে তার কোনও মহিলা সঙ্গী আছে কি না সেই বিষয়টা ক্লিয়ার নয়।

প্রবীর বলল,

আমারও তাই মনে হয়। তবে মহিলা সঙ্গী কি আছে? না থাকলেই সহজ হবে।

সামন্ত বলল,

অঞ্জলি কোথায় গেল? সেও কি খুন হয়েছে?

প্রবাল বলল,

একটা বিষয় দেখুন, রেখা দাশ ছাড়া আর কোনও মহিলার বডি কিন্তু উদ্ধার হয়নি। কেন? অন্য মহিলাদের বডি সে গায়েব করে দিয়েছে। কিন্তু রেখার বডি গায়েব করার ক্ষেত্রে সে আরও সচেতন হল না। কেন?

অর্ক বলল,

তার লাশও সে গঙ্গায় ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু আমাদের কপাল ভালো বলে লাশটা গঙ্গার পার থেকে পেয়ে গিয়েছি।

প্রবাল মাথা নাড়ল। বলল,

সেটাই তো বলছি। এই ব্যাপারে সে সচেতন হল না কেন? রেখার খুনটা দেখে মনে হয় খুনির একটা বধ্যভূমি আছে। সে এইভাবে দীর্ঘ সময় নিয়ে খুনটা করল, অথচ লাশটা ফেলে গেল তাড়াহুড়ো করে! এবার কথা হচ্ছে, লাশটা তা হলে কোথায় ফেলা হয়েছিল?

সামন্ত বলল,

আমার মনে হয়, লাশটা কাছাকাছি কোথাও ফেলা হয়েছিল। যে সময় লাশটা আবিষ্কার হয়, সেই সময় গঙ্গায় জোয়ার চলছিল।

প্রবাল বলল,

তার মানে, আপনি বলছেন লাশটা হাওড়ার দিকে মানে গোলাবাড়ি ঘাটের কাছাকাছি কোথাও ফেলা হয়েছিল?
সেই রকমই মনে হচ্ছে।

প্রবাল বলল,

কিন্তু সে ক্ষেত্রে একটা বিষয় খটকা লাগছে। সিরিয়াল কিলিং সাধারণত একটা পার্টিকুলার এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। বাকি খুনগুলো কিন্তু টালিগঞ্জ আর কালীঘাট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। শেষ লাশটা পাওয়া গেল গোলাবাড়িতে। এটা একটু অড লাগছে।

সামন্ত বলল,

স্যার, রেখার ফোনের শেষ টাওয়ার লোকেশন ছিল বাবুঘাটের লঞ্চঘাট।

প্রবাল মাথা নাড়ল,

ঠিক ঠিক।

প্রবীর বলল,

বিশাখা দত্তর ফোনের লাস্ট টাওয়ার লোকেশন ছিল মেটিয়াবুরুজ ফেরিঘাটের কাছে।

প্রবাল বলল,

বাহ, সব ক্ষেত্রেই গঙ্গাটা কমন। তবে কি খুনির বধ্যভূমি গঙ্গার কোনও ফেরিঘাটের কাছাকাছি?

অর্ক বলল,

সেটা হলেই খুনির পক্ষে সব থেকে সুবিধা হবে। লাশগুলো গঙ্গার বুকে ভাসিয়ে দেওয়া যায় সহজেই। সামন্তবাবু আপনি ওই তিনটে ফেরিঘাটে আপনার সোর্সদের লাগিয়ে দিন। এবং দ্রুত সারতে হবে কাজটা। সে চোখে চোখে কিছু যেন বলল অধীরকে।

অধীর তার ছোট ডাইরিতে কিছু একটা লিখে নেয়। সে মনে মনে একটা অঙ্ক করে। তাদের আর্মস ডিল রিলেটেড এনকাউন্টারটা হয়েছিল নিমতলা ঘটের কাছে। নিমতলার ওপারে একটু কোনাকুনিভাবে অবস্থান করছে গোলাবাড়ি ফেরিঘাট। এ দুটোর ভিতরে কি কোনও কানেকশন আছে? এটা তাকে তদন্ত করে দেখতে হবে। সে কাকে যেন একটা এসএমএস করে।

প্রবাল বলল,

এবার খুনির ক্যারেকটারিসটিকস বিষয়ে আসা যাক। প্রথম দুটো খুন করার(?) পরে খুনি প্রায় এক বছর বসে ছিল। এর মধ্যে কোনও খুন সে করেছে কি না আমাদের জানা নেই।

সামন্ত বলল,

স্যার, একটা খবর আছে, মাস সাতেক আগে সিনেমাপাড়া থেকে এক সিরিয়াল পরিচালকের এক সহকারিণী উধাও হয়ে গেছে। এখনও সে নিখোঁজ। থানায় কেস ফাইল হয়েছিল। রাহুল বৈদ্যর সঙ্গে নিখোঁজ মহিলার একটা কানেকশন ছিল।

অর্ক বলল,

রাহুলের সঙ্গে তো অনেক মহিলার কানেকশন ছিল।
না স্যার, তপতী মণ্ডলের সঙ্গে বিশেষ রিলেশন ছিল। রাহুলের সুপারিশে সে কাজ পেয়েছিল।

প্রবাল জানতে চাইল,

এ খবর কবে পেলেন?
গতকাল আমার এক বিশেষ সোর্স দিয়েছে। আর কেস নাম্বারটা আমি মিলিয়ে দেখেছি।

দু-জন পুরুষ আর একজন মহিলার খুন থেকে খুনির খুনের ধরনটা বোঝা যাচ্ছে। সে যেন নিজেকে মৃত্যু-দূত ভাবছে। একটা রিভেঞ্জ। সে ভিকটিমদের যেন সাজা দিচ্ছে। কিন্তু কীসের সাজা? প্রতিটা ভিকটিম মৃত্যুদণ্ড পাবার মতো গুরুতর কোনও অপরাধ করেছে। এবং আমি নিশ্চিত সেই গুরুতর অপরাধের বলি হয়েছে খুনির কোনও কাছের মানুষ। এটা আমি নিশ্চিত।

সে একটু থামল।

প্রথম দিকে খুনি অনেক সময় নিয়ে ধীরেসুস্থে তার খুনগুলো করেছে। কিন্তু এখন সে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। দ্রুত তার হিট-লিস্টটা শেষ করে সে থেমে যাবে। এই তার প্ল্যান। অর্থাৎ ঠিক সে সাইকোপ্যাথ নয়। আবার তাকে ঠিক সুস্থও বলা যায় না।

কিন্তু প্রবাল খুনির সম্ভাব্য পরিচয়, কোথায় সে থাকে কিছুই কিন্তু আমরা জানতে পারিনি। অথচ তুই বলছিস দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে কেসটা।

প্রবাল একটু হাসল।

খুনিই আমাদের দ্রুত সাহায্য করবে। এবার আর সে পারফেক্ট থাকবে না। শাস্তি দেবার প্যাশন থেকে সরে এসে সে সরাসরি খুন করায় মেতে উঠেছে। যেমন পাসোয়ানের খুনটা। পাসোয়ানের খুনটা আমার চোখ খুলে দিয়েছে। কিন্তু ডিটেলটা আমি শিওর হয়ে তবে বলব।
তবে?
ওটা ধরা পড়ে যাবার ভয়ে। খুনির ভয়টাই আমাদের এবার সাহায্য করবে।
আচ্ছা মহিলাদের খুনের ক্ষেত্রে কি কোনও সেক্সুয়াল ব্যাপার আছে?
রেখার শরীরে তো তেমন কোনও চিহ্ন ছিল না। না কোনও মেল সিমেনের ট্রেস ছিল তার শরীরে। তবে সেক্সুয়াল টর্চার করার একটা টেন্ডেন্সি থাকতে পারে। কাল একবার ডাঃ দিবাকর সোম সাহেবের কাছে যাব। উনি খুনির একটা প্রোফাইল বানিয়েছেন।

তখনই প্রবীরের ফোনটা বাজল,

ফোনে কথা বলতে বলতে তার চোখ মুখের চেহারা পাল্টে যায়। ফোন রেখে সে ঘোষণা করে,

আবার একটা খুন।

সবার চোখ উৎসুক হয়ে জানতে চায়,

কে?
রাহুল বৈদ্যর কাকা, বলাইবাবু।

প্রবালের চোখ চক চক করে ওঠে। তার হিসেব কি মিলে যাচ্ছে?

 

প্রথম পর্ব সমাপ্ত

দ্বিতীয় পর্ব শুরু আগামী সংখ্যায়

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2214 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...