অন্তেবাসী — ১১তম পর্ব

পীযূষ ভট্টাচার্য

 

দশম পর্বের পর

লেপের ওপর নকশা তোলা যখন শেষ, তখনই উপস্থিত আমি ও বাবলু। কিন্তু মেজমাসি যে পেছন পেছন এসেছে কখন— টের পাইনি। ধুনকরের সারিবদ্ধভাবে লেপের জমিনে লতাপাতা সহ বিচিত্র ফুল ফুটিয়ে তোলাতে এতটাই মুগ্ধ ছিলাম যে নামহীন অজানা ফুলের রাজ্যে চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু মেজমাসি যখন প্রতিটি ফুলের নকশার ওপর গঙ্গাজল ছিটিয়ে দিচ্ছিল, বুঝতেই পারছিলাম না এই সিঞ্চনের ফলে ফুলগুলো সজীব হবে কিনা। বড় হয়ে জানতে পেরেছি শা দৌলতের প্রতিকৃতির চারধারে এরকম ফুলই চিত্রিত। সেজন্য এ ফুলগুলি মুসলিম— তাকেই কি শুদ্ধিকরণ করা হল হিন্দুত্বে? এ এক অদ্ভুত সংস্কার।

যা হোক, এ তো গেল লেপের কথা, তোষকে এসে মেজমাসিকে থমকে দাঁড়াতেই হয় কেননা তিন ইঞ্চি পরপর সোজা সেলাই। মানচিত্রের রাস্তার মতন। কোন পথকে সে শুদ্ধ করে নেবে বুঝতে না পেরে শিশির বাদবাকি জলটুকু তোষকের ওপর ছিটিয়ে দেয় যেন মানচিত্রের সমস্ত রাজপথই শুদ্ধিকরণ করা হয়ে গেল। বেলুমাসির অসুখটা যে ‘রাজ অসুখ’! তাই পথকে শুদ্ধিকরণ যদি না ঘটানো যায় তবে অশরীরী রোগ আবার চলে আসতে পারে যে কোনও সময়— যে কোনও পথ ধরে। চরমতম আশঙ্কা থেকে উঠে আসছে এইসব সংস্কার। এর মধ্যে রাজশক্তিকে ভয় পাওয়ার কোনও হেতু থাকে কিনা তা বুঝে ওঠবার বয়স তখন ছিল না। এখন কিন্তু মনে হয় রাজভীতির জন্য সারাটা জীবনই সন্ত্রস্ত।

সে যাই হোক, এ ঘটনার দু-তিনদিনের মাথায় বেলুদি দুপুরের আপ ট্রেনে এসে উপস্থিত। এ ঘটনা খুবই আকস্মিকভাবে ঘটেছিল আপ ট্রেন চলে যাওয়ার পর ডাউন ট্রেন হয়ে ফিরবার সময়কালের মধ্যে। কেননা কালুদা বেলুদির জন্যে সকালের খাবার নিয়ে যায় বাই রোডে। আর তা পৌঁছে দেওয়ার সময় জানতে পারে বেলুদিকে ছুটি দেওয়া হয়েছে। ছুটি যে কোনওদিন হয়ে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সেটা আজকেই! বাড়িতে কিন্তু খবরটা পৌঁছায় ডাউন ট্রেন চলে যাওয়ার পর। মেসোমশাই খেতে এসে খবরটা দিতেই মেজমাসি চিৎকার করে ওঠে “কালুর পক্ষে একা নিয়ে আসা সম্ভব বেলুকে? একজন মেয়েমানুষ সঙ্গে থাকল না— হায় ভগবান!” মেসোমশাই মুখে খাবার নিয়েই বলে ওঠেন “সব ব্যবস্থাই করা হয়েছে।” অর্থাৎ অতীতের ব্যবস্থাগুলি এক্ষেত্রেও করা হয়েছে।

তখনই রামছাগলের মার কথা ওঠে। সে যে সঙ্গে আসছে তা শুনে মেজমাসি আশ্বস্ত হয়ে ব্যস্ততায় ডুবে যায়। মুহূর্তের মধ্যে মেজমাসির পালটে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে “এবার তোকেই সামাল দিতে হবে সংসার।” কথাটা যে মাকে উদ্দেশ্য করে বলা মার হাসিতেই বোঝা যায় তা।

বাড়ির সবাই আপ ট্রেন আসবার অনেক আগেই স্টেশনে পৌঁছে গেছি। “এখনও তো সিগন্যালই ডাউন হয়নি” বাবলু এ কথাটা বলে বুঝিয়ে দেয় আর মা তা শুনে বোনের মাথার টুপিটা নীচের দিকে নামিয়ে দেয়। যদিও এটা হনুমানের টুপির ক্ষুদ্র সংস্করণ, এখানে আসার পর কেনা। আমার সময় ছিল উলের স্কার্ফ। বেলুদিই সেটা বাতিল করে দিয়েছিল কারণ ঠান্ডা হাওয়ার প্রবেশপথ নিশ্ছিদ্র করে দেওয়ার মধ্যে সিগন্যাল ডাউন হয়ে যায়।

বাবলুই আমাদের প্ল্যাটফর্মের এমন এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে দেয় সেখানেই বেলুদির কামরা দাঁড়াবেই। ডলিদি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তাকে থামিয়ে দিয়ে বাবলু বলতে থাকে ডাউন ট্রেনে সান্টিং ফান্টিং হয় না, শুধু ইঞ্জিন বদলে যায়—যেটা নিয়ে গেল সেটা ওখানেই থেকে যাবে, নতুন একটা ইঞ্জিন জুড়ে যাবে সামনে। একবার আসাযাওয়া করতেই হাঁপিয়ে যায়। সব ব্রিটিশ আমলের, ঝরঝরে এক্কেবারে।

অবশ্য এই তথ্যটা আমাদের কারও কাছে নেই বলে বাবলু যেখানে দাঁড়াতে বলছে সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়ি। সেখানেই দাঁড়াল ফার্স্ট ক্লাসের কামরা আর বাবলু বলে উঠল “বলেছিলাম না ফার্স্ট ক্লাসের ডিব্বা এখানেই দাঁড়াবে।” কিন্তু দরজা খুলতেই আমরা সকলেই থ। দেখি বেলুদি বসে আছে এমন একটা চেয়ারে যার দুপাশে লম্বা হাতল। পালকির মতন এক-একটা। দুজন ট্রেন থেকে নেমে এল দ্রুত, নেমেই প্ল্যাটফর্মের ভিতর বেরিয়ে আসা হাতলে কাঁধ রাখতেই পিছনের হাতলের অংশ কালুদা ও বাহাদুরের হাতলের ওপর ভর করে বেরিয়ে আসতেই আরও দুজন কাঁধ দিয়ে দেয় সঙ্গে সঙ্গে। আমরা নির্বাক হয়ে এসব দেখতে দেখতে ভুলে গেছিলাম মেসোমশাইয়ের কথা। তিনি যে সবুজ আর লাল পতাকা জড়িয়ে বগলদাবা করে দাঁড়িয়ে আছেন কখন থেকে বুঝতেই পারিনি। পতাকা দেখানো তার ডিউটি নয়, তিনি কিন্তু স্ব-ইচ্ছেতেই দায়িত্বটা তুলে নিয়েছেন। ফ্ল্যাগম্যান তার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। একদম শেষে ট্রেন থেকে নামে রামছাগলের মালকিন। আর ঠিক তখনই স্টেশন থেকে গাড়ি ছাড়ার ঘণ্টা বেজে উঠতেই কোত্থেকে রামছাগলটা দৌড়ে এসে ঘণ্টার তালে একপাক নেচে উঠে বেলুদির সামনে দাঁড়িয়ে যায় থমকে।

এখন প্রতিটি পদক্ষেপই ভীষণ মনঃসংযোগের দাবিদার কেননা পায়ের তলা থেকে মাথার ওপর পর্যন্ত এক শূন্যতার ভেতর দুলতে দুলতে বেলুদি বাড়ির পথে রওনা হয়। এরপর পাহাড়ি টিলা কেটে বাড়িতে উঠবার সিঁড়ি। আমাকে বিশেষ করে একটা সিঁড়িতে উঠতে গেলে হাতে ভর দিতে হয়। যদিও সেটা বাড়িতে উঠবার শেষ ধাপ। বেশিরভাগ দিনই অবশ্য বাবলু আগেভাগে উঠে হাত বাড়িয়ে দেয় আর এক হ্যাঁচকায় টেনে তোলে। মুখে বলে, থাকতে থাকতে দেখবি কোনও মালুম হচ্ছে না।

সেই সিঁড়ির সামনে এসে চেয়ারবাহকেরা দাঁড়িয়ে পড়ে যেন এখনই শুরু হবে আসল পরীক্ষা।

 

এরপর আগামী সংখ্যায়

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2214 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...