লোহার শিকড়

সঞ্জীব দেবলস্কর

 

আমাদের কাহিনির শেষ পর্বটি সংগঠিত হয়েছে এই মাত্র সেইদিন। গিয়েছিলাম এক অভিনব বিদায়ী অনুষ্ঠানে। এ বিদায়ী সভা অবশ্য আমাদের চিরপরিচিত সেই ফেয়ারওয়েল অনুষ্ঠান নয়। মিটারগেজ-বিদায় অনুষ্ঠান। সভায় বসে আমার মন চলে গেছিল সেই ছাত্রজীবনের অনুষ্ঠানের দিনগুলোতে, যখন পাঁজিপুথি দেখে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের ফেয়ারওয়েলের দিনক্ষণ ঠিক করতেন আমাদের পণ্ডিতমশাই তর্কসরস্বতী শ্রী মধুসূদন ভট্টাচার্য, বিদ্যাবারিধি, বিদ্যাবিনোদ। সকালবেলা পূজাপাঠ সাঙ্গ করে পুষ্পপাত্র হাতে তিনি সটান হাজির হতেন সভাগৃহে। বিশুদ্ধ সংস্কৃতমন্ত্র উচ্চারণ করে বিদায়ী ছাত্রদের কপালে চন্দনের টিপ পরিয়ে দিয়ে হাতে আশীর্বাদী ফুল দিলে পর শুরু হত সভার অন্যান্য কাজ। আমি রেলস্টেশনে আয়োজিত অনুষ্ঠানটিতে বসে সেইসব দিনের কথাই ভাবছিলাম।

অনুষ্ঠান ক্রমেই জমে উঠল। স্মৃতিচারণ, প্রথম রেলভ্রমণের অভিজ্ঞতা, রেলের রোমান্স, ফিরিওয়ালাদয়ের ডাক, কু ঝিকঝিকের কথকতা— এর ফাঁকে ফাঁকে কবিতা, গান, নৃত্য, নাটিকা। এসব শুনছি আর ভাবছি, হোক না সে লোহার রেল, এর শিকড়ও তো আমাদের প্রাণের গভীরে চলে গেছে। একে এত সহজে উপড়ে ফেলা কি সম্ভব? শতবর্ষ পূর্বেকার সেই মহা-অভিযান, গভীর অরণ্যে ঘেরা পাহাড় কেটে রেললাইন বসাতে গিয়ে কত বিদেশি প্রাণ হারিয়েছে, এদের হাড় আজ মিশে আছে এদেশের পাহাড়ি মাটিতে, এদের দীর্ঘশ্বাস আজও বুঝি বাঁশবনের ভেতর দিয়ে ঘুরে ঘুরে ভেসে যায়… এসব ভাবছি, আর কেবলই আশ্চর্য হচ্ছি আজকের এ অত্যাশ্চর্য সংযোগের জন্য। মঞ্চে বসা আজকের বিশেষ অতিথি, রেলের উচ্চ-পদাধিকারী, আমার সহপাঠী বন্ধুটির এসব কিছুই আঁচ করার কথা নয়। কিন্তু আজকের এই বিদায় অনুষ্ঠান যে আমার কাছে আরেক অন্তিমযাত্রা, একথা আমার বাল্যবন্ধুর কাছে নিতান্ত অবিশ্বাস ঠেকবে। তবু আজই কথাগুলো বলে নেবার শেষ লগ্ন। রেললাইন উপড়ে নিলে শেষ চিহ্নটিও থাকবে না। ওদিকে মঞ্চে ভাষণ চলছে— ‘ওল্ড অর্ডার চেঞ্জেথ ইন্ডিং প্লেস টু নিউ, গড ফুলফিলস হিমসেলফ ইন মেনি অয়েস …’ ইত্যাদি বলে যাচ্ছেন মুখ্য বক্তা, এ অঞ্চলের বিশিষ্ট পণ্ডিত।

 

এবারে গল্পের প্রয়োজনে পাঠককে একটু পিছনে টেনে নিয়ে যেতে হচ্ছে। যে পণ্ডিতমশাইয়ের কথা বলা হয়েছে, আমার গল্পের কেন্দ্রভূমিতে রয়েছেন তিনিই, যদিও আজকের অনুষ্ঠানের উপলক্ষ নিষ্প্রাণ কিছু রেলওয়ে ট্র্যাক…। সে প্রায় চল্লিশ বছর আগের কথা। মধুপণ্ডিত এ অঞ্চলের এক বর্ধিষ্ণু গ্রামের হাই ইশকুলে সংস্কৃত পড়াতেন। আমরা ছিলাম তাঁর ছাত্র। গ্রামের নামটি এমন কোনও গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়, এরকম গ্রাম এতদঞ্চলে অনেকগুলোই রয়েছে। যে-সময়ের কথা বলছি তখন এরকম পণ্ডিতমশাইদের জন্য সরকারি হাইস্কুলগুলোতে সামান্য বেতনের একটা সংস্থান ছিল। এদের বয়সের কোনও গাছপাথর ছিল না। এদের ছিল না কোনও সিলমোহর দেওয়া সার্টিফিকেট। পূর্ববঙ্গ কিংবা নদীয়া-শান্তিপুর অথবা কাশী, বারানসির কোনও না কোনও টোল থেকে ওরা বিরাট বিরাট সব উপাধির বোঝা মাথায় নিয়ে আসতেন। সাংসারিক জ্ঞান ওদের অবশ্য কারওই ছিল না। যে যৎসামান্য মাইনে ওরা পেতেন এতে উপোষ যাওয়া থেকে কোনওক্রমে রক্ষা পেয়ে যেতেন। এতেই ছিলেন ওরা তৃপ্ত। ষাট-পঁয়ষট্টি কিংবা আরও বেশি বয়স পর্যন্ত এ পণ্ডিতকুলকে অবসর দেওয়া হত না। কারণ এদের কোনও এজ সার্টিফিকেটের ব্যাপার ছিল না, আর এ নিয়ে সরকার বাহাদুরের খুব একটা দুশ্চিন্তাও ছিল না।

মধুপণ্ডিতকে চেনে না এরকম লোক অঞ্চলে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এমনিতে যথেষ্ট খ্যাপা হলেও তাঁর পাণ্ডিত্য, নিয়মনিষ্ঠা, শাস্ত্রজ্ঞান সম্পর্কে গ্রামবাসীরা নিঃসন্দেহ। আর হবেই না বা কেন? তাঁর নামের আগে এবং পিছে অনেকগুলো উপাধি। তিনি সিলেটের টোল চতুষ্পাঠীর কথা বলতেন, যেখানে সংস্কৃত ছাড়া অন্য কোনও ভাষায় সাধারণ আলাপই হত না, শাস্ত্রালোচনা তো দূরের কথা। গৌরবের সঙ্গে তিনি বলতেন–

‘সর্বত্র ত্রিবিধা লোকাঃ উত্তমাধম মধ্যমাঃ
শ্রীহট্টে মধ্যমোনাস্তি চট্টলে নাস্তি চোত্তমাঃ।’

শুনতে শুনতে মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল শ্লোকটি। পণ্ডিতমশাইর দেশে সবই উত্তম, যা কিছু মধ্যম তা আছে এই ভূমিতে, যেখানে এসে ব্যাচারি আছাড় খেয়ে পড়েছেন। আর বলবেন নাই বা কেন? এখানে এসে তিনি সত্যি কী পেয়েছেন? না একটা সমাজ, না দুটো শাস্ত্রকথা আলোচনা করার মহাল। শাস্ত্রজ্ঞ জমিদারবাবু অবশ্য তাঁর ভুল ভেঙে দিতে চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি। এ ভূমি যে প্রাচীন হেড়ম্বদেশ, এখানেও যে স্মৃতির অনুশাসন প্রচলিত ছিল, এখানকার রাজসভায় যে ‘নারদি পুরাণ’, ‘রাসোৎসব গীতামৃত’ চর্চিত হয়েছে, রাধাকৃষ্ণ প্রেম ভক্তিরসে মজে পদাবলি রচনা করেছেন এখানকার পদকর্তাগণ— এসবও শুনিয়েছেন। কিন্তু তৎসত্ত্বেও বঙ্গীয় মূলভূখণ্ড থেকে রেডক্লিফ সাহেবের জরিপে আচমকা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ভিন্নতর প্রাদেশিক শাসনের আওতায় চলে আসা বিপন্ন এ নির্বাসিতা ভূমির গৌরবের বিশেষ কিছু প্রদর্শন করতে জমিদারমশাই ব্যর্থ হয়েছেন। বিষণ্ণ পণ্ডিতমশাইয়ের শেষ অবলম্বন, সেই স্কুলের ছাত্রদের অবস্থা তো তথৈবচ।

তাঁর সবচেয়ে ক্রোধ ছিল ব্রাহ্মণদের ওপর। এদের না আছে আচার, না আছে বিচার। যে জিনিসটা তাঁকে নিরতিশয় পীড়িত করত তা হল এদের পান চিবানো মুখে সংস্কৃত উচ্চারণ। মিনমিন করে এদের সংস্কৃত পাঠ শুনে বলতেন, ‘শুধু চালকলা খেয়ে সংস্কৃত পাঠ হয় না রে হতভাগার দল, পাঁঠার মাংসও খেতে হয়’। তাঁর ভয়ে আমরা বাংলা রচনায় তদ্ভব শব্দের ব্যবহার করতে সাহস পেতাম না। তিনি শিখিয়েছিলেন— ‘কথাটি শুনিয়াছি’ নয়, লিখবি ‘কথাটি আমার কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হইল’, আর ‘তাঁহার’, ‘আমার’ এ শব্দগুলোর স্থলে লেখা উচিত ‘তদীয়’, ‘মদীয়’। এতেই নাকি অশিষ্ট ভাষাটি শিষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁকে ভয় করতাম কারণ তিনি নাকি একসময় বোমাওয়ালাদের সঙ্গে চলাফেরা করতেন। এখন বুঝতে পারছি পণ্ডিতমশাই অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের সাঙ্গাৎ ছিলেন। বোমাবাজির কোনও প্রদর্শনী তিনি অবশ্য করেননি, কিন্তু একবার লাঠিচালনা দেখিয়ে আমাদের আক্ষরিক অর্থেই ভড়কে দিয়েছিলেন। কোমরে কাছাটি মেরে বাঁশের লাঠি নিয়ে সেই কী উদ্দামতা সারা মাঠময়। এই ছিলেন এখানে, নিমেষে মাঠের অন্যপ্রান্তে, লাফ দিয়ে চার হাত উপরে উঠে আবার দক্ষিণে, সেই কী জাদুকরী কাণ্ড! আমরা অবাক হয়ে কেবল দেখেই গেলাম। শিক্ষকরা পর্যন্ত আশ্চর্য হয়ে গেলেন বৃদ্ধ লোকটির ভেতর এত আগুন লুকানো ছিল দেখে। আর একবার দেখেছি ছাত্রবোঝাই নৌকাতে পণ্ডিতমশাইয়ের সে কী বৈঠা চালনা। এরকম ক্ষেত্রে তিনি একেবারে অন্য মানুষ। বয়সের ব্যবধান ঝেড়ে ফেলে হয়ে উঠতেন তরুণ। আমরা তখন ভুলেই যেতাম ক্লাসে তাঁর ‘তাম ইতাম অন্তাম, স্ব ইথাম ধ্বম’ বলে বিরাশি সিক্কার সেই ঘুষি আর ‘এ আবহে আমহে’ বলে সমাপ্তি কানমলার কথা।

এ হেন পণ্ডিতমশাইকে হেডমাস্টার এবং অন্যরাও বেশি ঘাঁটাতেন না। তিনি নিজের ইচ্ছেমতোই চলতেন। আমাদের খাতায় মার্কস দিতেন মেধার ভিত্তিতে নয়, চালচলনের ভিত্তিতে। পরীক্ষার মাসখানেক আগেই ঘোষণা করতেন, ‘ওহে দেওয়ান, এবারের পরীক্ষায় তোমাকে পঁয়ত্রিশের বেশি দেওয়া যাবে না। …ওহে গোকুলের চতুষ্পদ, তোমার জন্য থাকবে এগারো আর শ্রীমান … অষ্টাশি পর্যন্ত উঠবে এবার তোমার খাতায়’। এসব কথা তিনি মুখে বলতেন। কোনও খাতায় লিখে রাখার ব্যবস্থাই তাঁর ছিল না। কিন্তু কী আশ্চর্য, একমাস পর পরীক্ষার খাতায় ওই মার্কসগুলোই উঠত। আমরা প্রশ্ন মিলিয়ে খাতাগুলো দেখে আশ্চর্য হতাম, কী অলৌকিক ক্ষমতায় পণ্ডিতমশাই তাঁর যোগ অঙ্কগুলো সঠিক জায়গায় এনে মেলাতেন। এত দক্ষ পণ্ডিতমশাই অবশ্য জীবনের অঙ্ক মেলাতে পারলেন না বলেই আজ এত কথা।

ইতিপূর্বে বলেছিলাম, তাঁর ক্রোধ ছিল ব্রাহ্মণদের উপর। অন্য ক্লাসের কথা তো জানি না, আমাদের ব্যাচে ছিল গোটা পাঁচেক ব্রাহ্মণ সন্তান। এদের তিনি দুইবছর ধরেই লক্ষ করে আসছিলেন। ক্লাস নাইনে উঠেও যখন এদের মতিগতি ঠিক হল না তিনি সহ্য করতে পারলেন না, একেবারে রাগে ফেটে পড়লেন। নিয়ম করে দিলেন, এখন থেকে তাঁর ক্লাসে ওরা উপস্থিত থাকে থাকুক, কিন্তু যতক্ষণ তিনি পড়াবেন, এরা সবাই ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে, কিচ্ছুটি করতে হবে না এদের। নিয়মটি চালু করতে কিঞ্চিৎ অসুবিধা হয়েছে, কিন্তু এরপর বিষয়টি কেমন যেন স্বাভাবিক হয়ে গেল। তিনি ক্লাসে এসে বলতেন, ‘বামুনরা সবাই দাঁড়িয়ে পড়ো, আমি তাহলে পাঠ শুরু করি।’ এরপর অবশ্য অত কথা বলারও প্রয়োজন রইল না। তিনি ক্লাসে ঢুকে হাতলওয়ালা চেয়ারটিতে ঠিকমতো বসে ‘হ্যাল্পস স্টাডি’ বা ‘ব্যাকরণ কৌমুদী’ কিংবা ‘সংস্কৃতপাঠম’-এর পাতা খোলার আগে একটা মৃদু ইশারা করতে না করতেই ওরা কেমন যন্ত্রবৎ দাঁড়িয়ে পড়ত, আর তিনি শুরু করতেন, ‘আস্মি কস্মিশ্চিৎ বনপ্রদেশে নানা জলচরসমেত মহোৎসর … অস ধাতু লট তি, কিম শব্দে সপ্তমী, অনিশ্চয়ার্থে চিৎ কস্মিশ্চিৎ বনপ্রদেশে অধিকরণে সপ্তমী …’ ইত্যাদি। বিদ্যাস্থানে ভয়েবচঃ সহপাঠীদের অবস্থা দেখে আমাদের যে অনুকম্পা হত না তা নয়, কিন্তু পণ্ডিতমশাইয়ের বিরাশি সিক্কার কিলের ভয়ে আমরা ওদের পক্ষে ওকালতি করতে এগোইনি। আসলে আমাদের অবস্থাও যে ওদের চেয়ে খুব ভাল তা নয়, নেহাৎ ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মাইনি তাই ক্লাসে বসে থাকার অধিকার লাভ করেছি। প্রথম প্রথম তো পণ্ডিতমশাই হাসির গল্প বললে ওদের হাসতেও বারণ করতেন। কিন্তু সারা ক্লাস হাসবে আর ওরা রামগরুড়ের ছানা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে কেমন করে? ক্রমে তিনি একটু প্রশ্রয় দেওয়া শুরু করলেন। অবস্থা বিবেচনায় আমরা ব্যাচারাদের বললাম, ‘তোরা কেন একটু পড়াশুনা করিস না? পণ্ডিতমশাই তো আর এমনি এমনি রাগ করেন না। কী আর এমন পড়া— বদতি বদত বদন্তি… আর মা কুরু ধনজন যৌবন গরম গর্বম নিমেষাৎ হরতি কাল সর্বমহ, নদীনাং শস্ত্রপানিনাং, নখিনাং শৃঙ্গিনামস্তথা…! এসব মুখস্থ করতে কতদিন লাগে রে?’ কথাটি তাদের মনে ধরল। ওরা সিদ্ধান্ত নিল, ‘আমরা পড়বই পড়ব। পণ্ডিতমশাইয়ের পাগলামোর জবাব দেব। বল, কালকের লেসন কী, বলে দে। কাল একটা হেস্তনেস্ত হয়ে যাবে। রোজ রোজ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে কোমরে, ঘাড়ে ব্যথা হয়ে গেল।’ আমরাও উৎসাহ দিলাম। সেদিন বিকেলে দেখা গেল খেলার মাঠ ব্রাহ্মণশূন্য। একটিবার উঁকিঝুঁকি দিতেও ওদের কেউ আসেনি। আর সন্ধ্যাবেলা এবাড়ি ওবাড়ি থেকে সেই কী চেঁচিয়ে পড়ার ধুম! মা সরস্বতী বুঝি সেদিন অলক্ষ্যে দাঁড়িয়ে হাসছিলেন— এর প্রমাণ অবশ্য পাওয়া গেল পরদিন।

পণ্ডিতমশাই ক্লাসে ঢুকে যথারীতি তাঁর হাতলওয়ালা চেয়ারখানায় সমাসীন হয়ে কণ্ঠনালীর দুটো রগ উত্থিত করে, ঠোঁট দুটো একবার জোড়া করে সামনের দিকে তাকিয়ে ইশারা করলেন দ্বিজবংশোদ্ভূতদের প্রতি। কিন্তু ওদিকে কোনও ভাবান্তর নেই। পণ্ডিতমশাই পাঠ শুরু করতে পারছেন না, তাঁর ধৈর্যচ্যুতিও ঘটছে। ‘তোমরা বাবারা দাঁড়াও, আমার পাঠ শুরু হোক।’ না ওদিকে সবাই বেঞ্চে লেপটে আছে। এদের ঔদ্ধত্য দেখে তিনি খেপে গেলেন। –‘কী হল, আজ ক্লাস কি ব্রাহ্মণশূন্য হয়ে গেল। না কি পৈতে খসিয়ে কায়েতের দলে ভিড়ে গেল সবাই। অত সহজ নয় বাবু কুলধর্ম পরিত্যাগ। নাও, নাও— ব্রাহ্মণের কর্তব্য সম্পাদন করো। স্ট্যান্ড আপ। বি স্ট্যান্ড আপ নাও।’ তাঁর ইংরেজিরও একটা কায়দা ছিল। ব্যাকরণের নিয়মের প্রতি নিষ্ঠাই বুঝি এর কারণ, ছাত্রদের বলতেন, ‘বি নিল ডাউন, বি স্ট্যান্ড আপ।’ মানে নিল ডাউন হও, স্ট্যান্ড আপ হও। এবারেও কোনও নড়চড় নেই দেখে তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন— ‘কী ব্যাপার?’ এবার এদিক ওদিক থেকে হতভাগ্যদের প্রতিনিধিস্থানীয় বন্ধুটি দাঁড়িয়ে বলল, ‘স্যার, আজ আমরা পড়া শিখে এসেছি। জিজ্ঞেস করে দেখুন, বিশেষ্যস্য য বিভক্তি…।’ আর দ্বিতীয় বাক্যটি তার শেষ হল না। ক্রুদ্ধ পণ্ডিতমশাইয়ের এক ধমকে সে থমকে গেল— ‘কে বলেছে রে হতভাগা তোকে পড়া শিখতে, ময়ূরবংশজ পতাকা (আসলে তিনি বলতেন কোথাকার, আমরা শুনতাম পতাকা)! –যা আজ বাইরে যা, লাইন দিয়ে দাঁড়া ওখানে, যা যা।’ পণ্ডিতমশাইয়ের সেই রুদ্রমূর্তি দেখে সবাই ভয় পেয়ে গেছে। একে একে মারবেন, না তাকে ধরবেন। তাঁর সেদিনের সেই চেহারাটা আজও ভুলতে পারি না। আমাদের সহপাঠীরা বাইরে দাঁড়িয়ে ভয়ে কাঁপছিল, আর আমরা ভেতরে। সেদিন আর কোনও পড়া হয়নি আমাদের। ঘণ্টা বাজা তক পণ্ডিতমশাই গুম মেরে বসে রইলেন। ওঁর রাগটা ঠিক কার উপর, কেন এ ক্ষোভ সেটা বোঝার ক্ষমতা তখন ছিল না, আজও সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারিনি। সেদিনের তিরস্কৃত ছাত্ররা সারাটা পিরিয়ড বাইরে দাঁড়িয়েছিল, আর সারা স্কুল নীরবে দৃশ্যটি দেখে গেল। এমনিতেই দিনটি ছিল কেমন গুমোট, পণ্ডিতমশাইয়ের এ রাগ সারা স্কুলে রাষ্ট্র হল এবং সারা স্কুলে সেদিন টিফিন পরবর্তী দুটো পিরিয়ড কেমন অসহ্য এক নীরবতা। কোনও ক্লাসেই পড়া হল না, ছুটির ঘণ্টা হলে সবাই নীরবে বাড়ির পথে হাঁটা দিল। হতভাগা সহপাঠীদের চোখের দিকে তাকানোর সাহসও আমাদের হল না। অবশ্য পরদিন পণ্ডিতমশাইয়ের ব্যবহার একেবারে স্বাভাবিক, শাস্তিপাপ্ত ছাত্ররা আগের দিনের ধকল কাটিয়ে পূর্ববৎ দাঁড়িয়ে ক্লাসটি কাটিয়ে দিল।

 

৩.

এরপর পুরো একটি দশক কেটে গেল। আমরা নানা দিকে ছিটকে পড়লাম। মধুপণ্ডিতের কথা, ইস্কুলের দিনগুলোর কথা সবই মনের ফাইলে চাপা পড়ে গেল। কিছু কিছু খবর অবশ্য নিজেরাই ধরা দিত মাঝে মধ্যে। পণ্ডিতমশাই একেবারে রিক্তহস্তেই রিটায়ার করেছেন ওই বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের বছর। স্কুল থেকে দেওয়া একখণ্ড গীতা, একপ্রস্থ ধুতি-চাদর আর একটি সুদৃশ্য লাঠি উপহার পেয়েই তিনি খুশি। তখন তো তুচ্ছ জাগতিক বিষয়আশয়ে মন দেবার তাঁর অবকাশ নেই। তাঁর চোখে অন্য স্বপ্ন। –‘স্বাধীন বাংলা জেগে উঠছে।… তোমাদের বলিনি, বাঙালিকে কেউ আলাদা করতে পারবে না? মুজিবভাই মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে আসছেন, আমরা ফিরে যাব নিজ মাতৃভূমিতে। ওখানে হিন্দু-মুসলিম প্রশ্ন তোলার আর কেউ থাকবে না। পাকিস্তানিদের হঠিয়ে দিচ্ছে মুক্তিসেনারা।’ সন্দেহপ্রবণদের দিকে মুখ খিঁচিয়ে বলতেন, ‘বাঙালির আবার জাত কী, ধর্ম কী? বাঙালি তো বাঙালি।’ একেবারে শিশুর সারল্যে বলতেন, ‘আমাদের পঞ্চখণ্ডের চতুষ্পাঠীকে ওরা রক্ত দিয়ে টিকিয়ে রেখেছে, আমাদের প্রতিটি মন্দির গড়ে দেবে মুসলিমভাইরা। বাঙালি শিখে গেছে ধুতি, লুঙি, টিকি, তকি সব বাইরের আভরণ। আমাদের বুকের ভেতর এক প্রাণ, শিরায় এক রক্ত, মুখে এক ভাষা— জয় বাংলা…।’ এখানে ওখানে পণ্ডিতমশাই অযাচিতভাবে, যখন তখন এসব বক্তৃতা করে যাচ্ছেন। এখন তো আর রুটিনমাফিক স্কুলে যাওয়া নেই। ডাক্তারবাবুর কোয়ার্টারে সন্ধ্যাবেলা ‘স্বাধীন বাংলা বেতার’, আকাশবাণীর ‘সংবাদ পরিক্রমা’, বিকেলবেলা পোস্ট অফিসে গিয়ে ‘আনন্দবাজার’ পাঠ— এ নিয়ে তাঁর দিন কাটছে। গ্রামের জমিদার, যিনি আবার স্কুল কমিটির সভাপতিও তাঁকে এক টুকরো জমি দিতে ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন, পণ্ডিতমশাই একটা ঘর বানিয়ে থাকবেন। কে শোনে কার কথা? –‘না মশাই, আপনাদের অনেক খেয়েছি, আর আমাকে ঋণী করবেন না। এবার দেশে যেতে দিন। মায়া বাড়াবেন না আর।’ যেন ওপারে তাঁর জন্য সবাই বসে আছে, গিয়ে চাবি দিয়ে ঘর খুলবেন।

এরপর কী ঘটল, এসব খবর আমি নিইনি। তবে এর কয়েক বছর পর পাহাড়লাইনে রেলের কামরায় এক অতিপরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে খবরকাগজ দিয়ে মুখ লুকিয়ে ফেলেছি। এত সুন্দর, শুদ্ধ উচ্চারণে এক ফিরিওয়ালার কণ্ঠে ‘কৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম’, ‘পকেট গীতা’, ‘ছোটদের রামায়ণ’, ‘খনার বচন’— এসব বইয়ের মাহাত্ম্য ভেসে যাচ্ছে গাড়ির ভেতর। মাত্র দশ টাকায় যে কী মহামূল্যবান গ্রন্থ পাওয়া যাচ্ছে— একথাটা একঘর ভর্তি প্যাসেঞ্জারকে বোঝানোর বৃথা চেষ্টা করে অন্য কামরার দিকে ব্যক্তিটি এগিয়ে গেলে আমি ভীষণ এক অস্বস্তি থেকে মুক্তি পেলাম। বুঝতে পারলাম আমাদের বিদ্যাদান করে ব্যর্থ পণ্ডিতমশাই এখন রেলগাড়িতে জ্ঞানের ফিরিওয়ালা। পাহাড় লাইনের ফুরফুরে হাওয়ায় এবং মহানগরীর স্বপ্নে বিভোর পরবর্তী পনেরো ঘণ্টায় মনের সমস্ত যন্ত্রণা, লজ্জাবোধ ঝেড়ে গন্তব্যপথে এগিয়ে গেলাম। আমার চোখে তখন অন্য স্বপ্ন, অন্য চিন্তা, গ্রামের স্কুলের মধুপণ্ডিতের দুর্দশার কথা ভাববার অবকাশ কোথায়!

 

৪.

একটু ফিরে যাই একাত্তরের দিনে। পণ্ডিতমশাইকে গ্রামের মাতব্বরশ্রেণির কিছু লোক বলত পাকিস্তানি। কেউ কেউ বলত রিফ্যু (রিফ্যুজির সংক্ষিপ্ত, কিঞ্চিৎ শ্লেষমিশ্রিত রূপ আরকি)। তিনি যে দেশবিভাগের ফলে শরণার্থী হয়ে এদিকে আশ্রয় নিয়েছেন। দেশবিভাগ যে কী মারাত্মক অভিশাপ সেটার বোঝার ক্ষমতা তখন আমাদের ছিল না। এখন বুঝতে পারছি, তাঁকে যারা পাকি-রিফ্যু বলত তারা এসেছিল সাতচল্লিশের প্রথম ধাক্কায়। একটু থিতু হয়ে বসেই পরবর্তী আগন্তুকদের তাচ্ছিল্য করা শুরু করেছেন। পণ্ডিতমশাই হলেন দ্বিতীয় পর্যায়ের যাত্রী। আর বঙ্গীয় উত্তরাধিকার সূত্রে যাদের স্বাভাবিক বসতি এ ভূমিতে, সেই সাদাসিধে বুড়বাক কিসিমের মানুষ এসব ব্যাপার ঠিক বুঝতে পারতেন না, পণ্ডিতমশাইকে নিয়ে ক্রুর রসিকতায় না বুঝেই হে হে করে হাসতেন। গ্রামসুদ্ধ লোক পণ্ডিতমশাইকে খ্যাপা ভাবত, এড়িয়ে চলত। তাঁর কথা শুনত, কিন্তু যেচে তাঁর সঙ্গে কেউ কথা বলতে যেত না। আর কথা বলবেই বা কী করে? কী সব ‘নিধনপুর তাম্রফলক’-এর কথা, ‘পঞ্চখণ্ডের দানপত্র’-এর কথা বলতেন— ওখানে নাকি কামরূপরাজ ভাস্করবর্মার প্রমিতামহ ভূতিবর্মা সহস্র ব্রাহ্মণকে ভূমিদান করেছিলেন। (ওরা মস্করা করে বলত পণ্ডিতমশাই তো সেই ভাস্করবর্মার সভাপণ্ডিতের পর নাতি ইত্যাদি), তিনি বলতেন ছাতিআইন গ্রামের গোঁসাইয়ের কথা, ইটা পরগনার অভিশাপ, কোন হাওরের ভেতর রয়েছে অগ্নিকুণ্ড, কোথাকার লৌড় পরগনায় হাজার বিঘে জমি নিয়ে বিশাল মরুভূমির অবস্থান— এসব কথা।

ইশকুল ছাড়া তাঁর আর কোনও যাওয়ার জায়গা ছিল না, বিপত্নীক ব্যক্তিটির কোনও আত্মীয়স্বজন ছিল না কোনওকালে। কেমন নিঃসঙ্গ সারাটা বিকেল দাওয়ায় বসে গুড়ুৎ গুড়ুৎ তামাক টানতেন। কদাচিৎ আমরা ওদিকে গেলে ডেকে নিতেন। গল্পও বলতেন, মাঝে মাঝে স্বগতোক্তি করতেন, ‘আমাদের দেশে সবকিছুই ছিল, কিন্তু অভিশপ্ত ভূমি সবকিছুকে গ্রাস করে ফেলেছে।’ একটি গল্প বলছিলেন— একবার নাকি লাল পাড় শাড়ি পরা এক রমণী রিক্সো চড়ে এদিকে আসতে চাইলেন। সঙ্গীবিহীন একা এ নারীকে পার করতে রিক্সোওয়ালা রাজি হননি, কিন্তু আচম্বিতে এ রমণী হয়ে গেলেন ত্রিনয়নী দুর্গা। রিক্সোওয়ালা কেমন আচ্ছন্নের মতো টেনে নিয়ে তাঁকে বর্ডার পার করিয়ে দিলে তিনি আশীর্বাদ করে তাঁকে ভাড়া দিতে গেলে সে পায়ে পড়ে বলল, ‘মা তোমার আশীর্বাদই তোমার ভাড়া।’ দেবী অন্তর্হিতা হলেন। যে-পথ দিয়ে তিনি এপারে এলেন ওই পথ ভরে ছিল অজস্র কচুগাছ। এরপর থেকেই নাকি সমস্ত কচুপাতায় ফুটে উঠেছে রিক্সোর চাকার দাগ। এসব বলেই ব্যস্ত হয়ে আমাদের পাঠাতেন একটা কচু পাতা ছিঁড়ে আনতে। দেখাতেন— ‘এই দ্যাখ রিক্সার চাকার দাগ! এটা তো কোনওদিন দেখিনি। আমরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতাম এ দেবী কোন মন্দিরে ঢুকেছেন— রণচণ্ডী, নিমাতা না দশভূজা! দুপুরবেলা কতদিন বড়দের চোখ এড়িয়ে গ্রামের পোড়ো মন্দিরের পাশে কচুগাছের সন্ধান করতাম। রিক্সোর চাকার দাগ মিলিয়ে যদি পাকড়াও করতে পারি একবার। ওঁর কাছে আমাদের অনেককিছুই যে চাওয়ার ছিল। বুঝতে পারতাম রাত গভীর হলে ঘুঙুর পায়ে সারা গ্রামজুড়ে কে নেচে বেড়াতেন। কালীপুজোর পর হেমন্তের মধ্যরাতে বর্ডার পেরিয়ে আসা সেই দেবীর ঘুঙুরের শব্দ তো সেদিনও শুনেছি, ভয়ে উঠোনে আসিনি। ভোরবেলা বাড়ির আনাচে কানাচে সরু সরু সাদা সাদা কুর্সি কাঁটার মতো কিছু কাঁটা কুড়িয়ে পেতাম, আর এনে মাকে দিতাম। এখন বুঝছি ওই সজারুর কাঁটার ঝুমঝুম শব্দই সেই নৃত্যরতা দেবীর ঘুঙুর ধ্বনি।

 

৫.

সীমান্তের ওপারের ঘটনাবলি ক্রমে এদিকে মুখে মুখে প্রচারিত হতে থাকল। সবাই বলছে যুদ্ধ লাগবে। সঠিকভাবে কার সঙ্গে কার যুদ্ধ, এটা আমরা বুঝতে পারছি না। কেউ কেউ বলত সামনে সাঙ্ঘাতিক বিপদ। আমাদের চোখের সামনে কত কী ঘটে যাচ্ছিল। সন্ধ্যা হতেই পশ্চিম আকাশ লাল। সবাই বলত রিফ্যুজি ক্যাম্পের মহাশ্মশান। কখনও আগুন নেভে না। ঝাঁকে ঝাঁকে বিমান আকাশে উড়ে যায়। সন্ধ্যার পর বাড়ির উঠোনে লণ্ঠন নিয়ে যাওয়া নিষেধ। দূরে বর্ডার থেকে ভেসে আসা গোলাগুলির শব্দ। আমাদের ইশকুল যাওয়া, বিকেলে খেলাধূলা সবই বন্ধ। কেমন একটা বিপদের আশঙ্কায় সবাই। ব্যতিক্রম কেবল পণ্ডিতমশাই। যুদ্ধের উন্মাদনায় তিনি একেবারে নতুন মানুষ। তিনি দীর্ঘ পত্র লিখে আশীর্বাদ জানিয়েছেন এ অঞ্চলের সন্তান কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার জাঁদরেল সদস্যকে। ইনি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বাংলাদেশের হয়ে জনমত গঠন করতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেরিয়েছেন। প্রত্যুত্তরে মন্ত্রীমহোদয়ের শ্রদ্ধাভরা চিঠিখানা পকেটে নিয়ে একে ওকে পড়ে শোনাচ্ছেন পণ্ডিতমশাই। সে সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হলেই সে দেশে ফিরে যাবেন একথাও বলে সবার থেকে একপ্রকার বিদায়ই নিয়ে নিচ্ছেন।

এমনি করে একটি বছর কাটিয়ে দিলেন পণ্ডিতমশাই। তবে যুদ্ধ শেষে দেশে যাওয়া তাঁর হয়নি তা তো পাঠক বুঝতেই পারছেন, অবশ্য জমিদারমশাইয়ের প্রস্তাবকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে গ্রাম ছেড়ে শহরের একটি ভাড়াবাড়িতে উঠেছিলেন, যেন ওই পাসপোর্ট ইত্যাদি হয়ে গেলে দেশে চলে যাবেন আরকি। ইত্যবসরে তিনি একটি কমিশনভিত্তিক ছাত্রপাঠ্য নোটবই ডিস্ট্রিব্যুশনের কাজ জুটিয়ে নিলেন। অবসর কাটানোরও তো একটা ব্যাপার আছে, এরকমই ধারণা তিনি দিলেন। আসলে বিষয়টি তা নয়। দিনভর স্কুলে স্কুলে ফিরি করে দু চারটি বই বিক্রি করে সামান্য কটি টাকাতে কষ্টেসৃষ্টেই তিনি দিন কাটাচ্ছিলেন। ক্রমে ঘর ভাড়া বাকি পড়ল, ছাত্রপাঠ্য সস্তা নোটবই থেকে আর কত টাকা কমিশন আসবে?

অগ্নিযুগের স্বাধীনতা সংগ্রামী পণ্ডিতমশাই অত সহজে দমবার পাত্র নন। তিনি সামান্য একটি বিছানা, রান্নার সামগ্রী আর কাঁধের ব্যাগ নিয়ে আশ্রয় খুঁজে নিলেন রেল লাইনের পাশে জবরদখল কলোনিতে। যুক্তি সহজ— ওখান থেকে চট করে গাড়িতে চড়ে জংশন হয়ে দুটো শহর কভার করা যায়। মাঝে মাঝে পাহাড় লাইনে উত্তর কাছার অবধিও এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। ওখানে মানে দামছড়া, ডিটেকছড়া পেরিয়েও হারাঙ্গাঝাও হয়ে হাফলং, মাইবং সর্বত্রই বাংলা ইশকুল, বাঙালিদের বসতি। একবার ওই বাজারে ঢুকলে ইত্যাদি…। তবে এখন তিনি স্ট্র্যাটেজি একটু পাল্টেছেন। এবার আর ঠিক নোটবই নয়— ধর্মগ্রন্থ, পাঁচালির সঙ্গে ‘সহজ মৎস্য চাষ পদ্ধতি’, ‘হারমোনিয়াম শিক্ষার বই’, ‘তিনমাসে ইংরেজি কথোপকথন’ ইত্যাদি। গাড়ির যাত্রীদের কাছে এসবের চাহিদাও বেশ। কীভাবে তিনি গ্রাহক সংগ্রহ করতেন তার কথা তো ইতিমধ্যেই বলেছি।

 

৬.

শুনেছি পণ্ডিতমশাইয়ের মৃত্যুটা নাকি স্টেশন ইয়ার্ডেই ঘটেছিল, সান্টিং করা রেল ইঞ্জিনের ধাক্কায়। অবশ্য এ মৃত্যুর দায়িত্ব কেউই স্বীকার করেনি। রেলের রেকর্ডে এটা ওঠেনি। বিষয়টি যখন আমাদের গোচরে আসে ততদিনে আরও কয়েক বছর পেরিয়ে গেছে। ইতিপূর্বে একবার পণ্ডিতমশাইয়ের জন্য কিছু করতে হবে আবেগটা সঞ্চারিত হয়ে কবে যে থিতিয়ে গেছে মনেও করতে পারছি না।

পণ্ডিতমশাইয়ের সর্বশেষ আস্তানা, জবরদখল কলোনির সেই ঝুপড়ি তো কবেই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ব্রডগেজ আসার প্রস্তুতিতে ওই জায়গাটির চেহারা একেবারে আমূল বদলে গেছে। বাঁশ, খড় আর পলিথিনের আচ্ছাদনে ঝুপড়িগুলোর কোনও চিহ্নই নেই। ওখানে সারি সারি রেলের ট্র্যাক। জনৈক ঝুপড়িবাসী বৃদ্ধ এখানে তারই মতো আরেক ঝুপড়িবাসী মাস্টারবাবুর কথা জানিয়েছিল, তাও অনেক আগে। সে নাকি লাইনের ধারে পড়ে থাকা মৃত মানুষটির শেষ কাজের সময় ছিল। বেওয়ারিশ লাশের দায়িত্ব কেউই নেয়নি। রেলও না। পঞ্চখণ্ডের সুসন্তান, সংস্কৃতশাস্ত্রের নিষ্ঠাবান ধারক, অগ্নিযুগের সংগ্রামী, স্বাধীন বাংলার স্বপ্নে বিভোর, স্বাভিমানী মধুপণ্ডিত, অর্থাৎ তর্কসরস্বতী শ্রীমধুসূদন ভট্টাচার্য, বিদ্যাবারিধি, বিদ্যাবিনোদের শেষকৃত্যে কোনও সংস্কৃত মন্ত্র উচ্চারিত হল না, কোনও শাস্ত্রীয় আচার পালিত হল না, জ্বলন্ত চিতায় ঘি মাখা জ্ঞাতিকাষ্ঠ ছুড়ে দেওয়ার জন্য কেউ এগিয়ে এল না, জবরদখল কলোনির কতিপয় ধাঙড় শ্রেণির লোকের কাঁধে তিনি বরাকের পাড়ে শুয়ে আধপোড়া হয়ে ভেসে গেলেন ভাটির টানে।

 

৭.

আগামীকাল লোহার হাতুড়ির ঘা পড়বে শতাব্দী প্রাচীন মিটারগেজ রেল লাইনের উপর। উপড়ে ফেলা হবে সর্বশেষ মিটারগেজ লাইনটি। আজই লাইনের উপর দিয়ে শতাব্দীর শেষ গাড়িটি চলে যাবে দূর পাহাড়ের বুক চিরে। যেতে যেতে উপড়ে নিয়ে যাবে এক শিকড়। যে শিকড় এ নির্বাসিত নদীর বুকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চেয়েছিল এক করুণ, ভেজা মাটি। যে মাটিতে ঘুমিয়ে আছেন পির শাহজলাল আর তাঁর তিনশো ষাট আউলিয়া, যে মাটিতে ঘুমিয়ে আছেন বৈষ্ণবচূড়ামণি শ্রীচৈতন্যের প্রপিতামহের দল, জগন্নাথ মিশ্রের জ্ঞাতিগোষ্ঠী, যে মাটিতে ঘুমিয়ে আছেন উদাস বাউল হাসন রাজা, রাধাপ্রেমে মাতোয়ারা রাধারমণ গোঁসাই। সেই শ্রীভূমি শ্রীহট্টের সন্তান ভাগ্যের ফেরে এসে আছড়ে পড়লেন নির্বাসিতা বাংলার বুকে কয়েকটি ‘আদিম সর্পিনী সহোদরা’-র মতো আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকা লোহার রেললাইনের উপর।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2214 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...