ভাঙা ইটের ছাপ

সোমজিৎ হালদার

 

বৈভবের গায়ে একটা স্যাঁতস্যাঁতে বিষণ্ণতা ছত্রাকের মতো জড়িয়ে থাকে। তার পরজীবী হয়ে থাকার অধিকারে গাছগুলো মরে যায়। অচল আধুলির স্নেহে লক্ষ্মীর ভাঁড় ফুলে ওঠে। মৃত সন্তান বয়ে বেড়ানো পোয়াতি। অর্থহীন। তবুও গোষ্পদে সুখ জমে। চামড়া ওঠা উঠোন গোবরজলে চকচকে হয়ে ওঠে। আলমারি খুলে বেরিয়ে আসে ন্যাপথালিন আর পুরনো হাওয়া। শরিকি বিবাদে ছিঁড়ে যাওয়া খামারবাড়ির কপাটগুলো খোলা রাখে। পূর্বপুরুষেরা সে পথে আসাযাওয়া করে। এ বাড়ির দাওয়ায় পা ঝুলিয়ে বসে কুটুমজন। ডালভাতে সহজ হয়ে আসে বিবাদ। অন্য চাতালে দড়ি জড়ানো জাবদাখাতায় হিসেবে ব্যস্ত থাকে নুয়ে আসা উত্তরপুরুষ।

বনেদিয়ানা নিয়ে এক রোমান্টিকতায় আচ্ছন্ন থাকি আমরা। আভিজাত্যের গরিমা না পাওয়া মধ্যবিত্তের লালন করা বিস্ময়। তাতে পরিচর্যা না পাওয়া খিলানের ফাটলগুলো চোখ এড়িয়ে যায় দিব্যি। ক্ষয়কে সাজানো আড়ম্বর দিয়ে ঢেকে দেওয়া যায়। দুর্গাপুজোর আগে আগে হাতে রেকর্ডার নিয়ে যখন বেরিয়ে পড়েছিলাম, ভেবেছিলাম চুনকাম করা ঠাকুরদালানের কথা, যৌথতার সাজগোজ করা পরিবারের কথা শুনব হাসিহাসি মুখে। রাস্তায় নেমেই ভুল ভেঙে গেল। কেমন যেন অভাবের কথাগুলোই বড় হয়ে উঠছে। সেখানেও জীবন জুড়ে আছে কিংবদন্তি। তবে অলৌকিক দূরত্বে দেবী ঠাকুরদালানে প্রতিমাটি হয়ে থাকেন না। সংসার পাতেন গরীব বৈদ্য পরিবারের কুলুঙ্গিতে। কেতুগ্রাম থানার নিরোল গ্রামে ঘুরে বেড়ায় এমন গল্প। নিত্যভোগের সামর্থ্য ছিল না আদি পুরুষ রামরত্ন গুপ্তের। উপহারস্বরূপ পাওয়া কামাখ্যা মূর্তি পূজিত হলেন পান্তাভাতে। লোকায়ত সমাজজীবনের সঙ্গে কী সহজে দেবত্বের মেলবন্ধন ঘটে যায়। আকাশছোঁয়া মন্দির তৈরির দরকার পড়ে না।

দুর্গামন্দিরে মূর্তির গায়ে রঙের প্রলেপ দিচ্ছিলেন প্রতিমাশিল্পী স্বপন মিস্ত্রি। বংশানুক্রমে তাঁরাই নিরোলের গুপ্ত পরিবারের প্রতিমা নির্মাণ করে আসছেন। প্রতিমার কোনও পরিবর্তন ঘটেছে কিনা জানতে চাওয়ায় বললেন, ‘বাবা ছিলেন সোনার মেডেল পাওয়া শিল্পী। আমরা তো তাঁর শিষ্য। কমা তো হবেই।’ এমন নত হতে জানার যাপনেই অভ্যস্ত শিল্পী। কথা শেষ করে আবার কাজে মগ্ন হয়ে গেলেন। প্রাচীন যজমানি প্রথা টিকে যাওয়া এই পুজোগুলোতে পরস্পর নির্ভরশীলতার প্রবহমান থাকার কথা।

প্রাচীন কণ্টকনগর। আজকের কাটোয়া। গঙ্গাতীরবর্তী এই অঞ্চলের সমৃদ্ধির ইতিহাস। পাশাপাশি অবাক করা দুর্গাপুজোর গল্প। ভিখারিনির সাজে মা সেখানে দরিদ্র হাঁড়ি সম্প্রদায়ের বাড়ি আসেন পান্তাভাত খেতে। পুজোয় লাগে থোড়ের নৈবেদ্য। কাটোয়ার হাঁড়িবাড়ির দুর্গাপুজোর গল্প। বিশ্বাস আর জনশ্রুতিতে জীবন্ত। তথাকথিত অন্ত্যজ শ্রেণির এই পুজো সমাজবিন্যাসের চেনা ছকের বাইরে। যে দেশে ব্রাহ্মণের বাড়ির সামনের রাস্তায় জুতো খুলে হাঁটতে হয়, সে দেশেই দেবী অলঙ্কার বৈভব ছেড়ে দুঃখের বারোমাস্যায় ভাগ নিতে আসেন।

১৩১৫ বঙ্গাব্দ। কাটোয়ার মল্লিকবাড়ির পুজো শুরু। প্রতিষ্ঠাতা রাধিকাপ্রসাদ মল্লিক। ঠাকুরদালানে পূর্বপুরুষদের তৈলচিত্র। এক পরম্পরা। একসময়ের জাঁকজমক থেকে আজকের ভাঙা পরিবার। পুজোর চারদিনের জন্য কাচঘর থেকে বের করা হত সুদৃশ্য ঝাড়বাতি। এখন ভাড়া করা আলোই ভরসা। ঠাকুরদালান এখনও সেজে ওঠে রকমারি আয়নায়। অতীতের ছায়া পড়ে সেখানে। শত প্রতিবন্ধকতা। আইনি জটিলতা। জমে থাকা অভিমান পেরিয়ে পুজো যেন ক্ষতের মলম।

সাবেকি পুজোয় বারেবারে উঠে আসে অর্থনীতির পটপরিবর্তনের কথা। কাটোয়ার জেলেপাড়ার বিখ্যাত চারহাতের দুর্গা। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের অনুষঙ্গ। দাসচৌধুরীদের জমিদারি অস্ত গেল। দশহাতের দেবী অভাবের তাড়নায় একসময় হলেন চারহাতের। পদবির সঙ্গে জমিদারির স্মৃতি হিসেবে জুড়ে থাকা চৌধুরী অংশটি বাদ দিয়েছেন তাঁরা স্বেচ্ছায়। তলিয়ে যাওয়া গৌরবের ভার বহন করা যে ভারি অসহ্য লাগে।

চন্দ্রবণিকদের গ্রাম শ্রীবাটী। নুনের ব্যবসায় একসময়ের প্রতিপত্তি। গ্রামময় মন্দির, উঁচু উঁচু বাড়ি। টেরাকোটা মন্দিরের জন্য বিখ্যাত। আমরা গিয়ে পড়লাম পলেস্তারা খসা সেই মনখারাপের মাঝখানে। চন্দ্রদের সাতশরিকের সাতটি পুজো। ক্ষয় হতে হতে এখন একটিতে এসে ঠেকেছে। চন্দ্রদের ছোটবাড়ির ঠাকুরদালানে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছি। বাতায়নবর্তিনীর মতো দোতলার জানলা ঠেলে এক প্রৌঢ়া বলে উঠলেন, ‘কোত্থেকে এসেছ বাবা?’ পুজোর গল্প শোনাতে বললে উজ্জ্বল হয়ে উঠল তাঁর চোখমুখ। ঠাকুরদালানের দেওয়ালে একসময় নাকি মুখ দেখা যেত। এখন পুজোর কথা বলতে বলতে গলা বুজে আসা। ফেলে আসা দিনের সঙ্গে লড়াই।

সারাদিন ক্রমাগত ক্ষয়ের কথা শুনতে শুনতে ভারি হয়ে আসা মন। শরতের দ্রুত অন্ধকার হয়ে আসা বিকেল। ঘোর লেগে থাকা। আচমকাই গাড়ি থেমে যাওয়ায় চিন্তায় ছেদ পড়ল। গাড়ি আটকেছেন এক মধ্যবয়সী মহিলা। বোঝা যাছে বাড়ি থেকে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়েছেন। গাড়ির জানলায় এসে বললেন, ‘আমায় একটু সামনে কৈচরে নামিয়ে দেবেন?’ অস্বস্তি লুকিয়ে রাখতে পারিনি। ‘খুব বিপদে পড়েছি ভাই।’ খানিক দোনামোনা করেই বললাম গাড়িতে উঠুন। বারবার ফোন বাজছে। শান্ত হতে পারছেন না। বললেন, ‘শ্বশুরবাড়িতে আমার মেয়ের উপর খুব অত্যাচার হচ্ছে। মারধোর করছে স্বামী। আমি না গেলে মেয়েটা বাঁচবে না।’ হায় রে দুর্গাপুজো! সারাদিন নারীশক্তির আখ্যান শুনে এসে এত কঠিন একটা সত্যির মুখোমুখি হতে হবে কে জানত? আমার সামনে তখন এক মায়ের লড়াই। আটপৌরে আলুথালু। সেই মা আমার সারাদিনের জমানো আখ্যানগুলোকে ফালাফালা করে দিলেন।

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2214 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...