ভারতবর্ষ রানি ভেলুর এই যোগ্য উত্তরাধিকারিণীদের মনে রাখবে

প্রতিভা সরকার

 




লেখক প্রাবন্ধিক, গল্পকার, অধ্যাপক ও সমাজকর্মী।

 

 

আত্মবিস্মৃত ভারতীয় আমরা, শাহিনবাগ, পার্ক সার্কাস দ্বিতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামস্থল বা সারা দেশে ‘জানানা’দের নেতৃত্বে হওয়া আন্দোলনগুলিকে ‘দিল্লাগি’ বলতে দুবার ভাবি না। ভেবেই দেখি না, এদেশের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন একজন মহিলা— তামিলনাড়ুর শিবগঙ্গার রানি ভেলু নাচিয়ার (১৭৩০-১৭৯৬)। বইয়ে পড়েছি বলে ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈয়ের কথা আওড়াই তোতাপাখির মতো, কিন্তু খবর রাখি না, তারও বহুদিন আগে কী কাণ্ডটাই না করে গিয়েছিলেন এই অল্পবয়েসি রানি! আজও জনজাতির মানুষেরা এই ‘বীরামাঙ্গাই’ বা বীর রমণীর স্মৃতিতে গান গায়, অন্তরের শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

রানি ভেলুর কীর্তিকাহিনি সত্যিই বিস্ফোরক। ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির বানিয়াদের হাতে স্বামীর নির্মম মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে তিনি আট বছর ধরে তিলে তিলে সৈন্যবাহিনী গড়ে তোলেন, যার মধ্যে একটি বাহিনী ছিল শুধুমাত্র নারীদের। এদের সাহায্যে ভারতবর্ষের প্রথম গেরিলা যুদ্ধটি লড়েন ভেলু। তাঁর নারীবাহিনীর সর্বাধিনায়িকা ছদ্মবেশে উৎসবমুখর শিবগঙ্গা দুর্গে ঢুকে সারা শরীরে মেখে নেয় পুজোর প্রদীপ জ্বালাবার জন্য মজুত করে রাখা তরল ঘি। তারপর নিজের সিক্ত শরীরে অগ্নিসংযোগ করে বারুদপূর্ণ অস্ত্রশালায় ঘোড়া ছুটিয়ে ঢুকে পড়ে। প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দে দিশেহারা শত্রুসৈন্যের ছত্রভঙ্গ অবস্থার সুযোগ নিয়ে এবার আট বছর আগে হাতছাড়া দুর্গে সাহেবদের কচুকাটা করতে অবতীর্ণ হন স্বয়ং রানি ভেলু। এরপর দীর্ঘদিন অপ্রতিহত প্রতাপে তিনি রাজত্ব করেন, ব্রিটিশের সাধ্য হয়নি তাঁর কেশাগ্র স্পর্শ করবার।

কেন আমরা রানি ভেলুর কথা জানি না? প্রথম কারণ হয়তো টিপু সুলতানের দূরদর্শী পিতা হায়দর আলি। আর কারও কাছে সাহায্য না পেলেও রানি ভেলুর ব্রিটিশের বিরুদ্ধে একসঙ্গে লড়বার প্রস্তাব ফেরাননি হায়দর আলি। একসঙ্গে লড়াই করেই এই সাফল্য। কিন্তু আজ এই বিভাজনের ভারতবর্ষে শুধু হায়দর আলি নন, তাঁর সুপুত্র সত্যিকারের দেশপ্রেমিক ব্রিটিশবিরোধী টিপু সুলতানকেও ভুলিয়ে দেবার কতরকম চেষ্টাই না হচ্ছে! সম্প্রীতির কাহিনিতে আজ আমাদের বড়ই অনীহা।

দ্বিতীয় কারণটি হয়তো আরও জটিল। স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতীয় নারী বলতেই যে নামটি আমাদের স্মৃতিপটে লাফ দিয়ে উদয় হয়, সেটি ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈয়ের। তিনি অসাধারণ বীরত্ব দেখিয়েছিলেন। তিনি প্রাতঃস্মরণীয়া। তাঁকে বিন্দুমাত্র অসম্মান করলে অকৃতজ্ঞতার নরকে ফুটন্ত তেলে ভাজা হতে হবে— কিন্তু ‘শুধু’ তাঁকেই কেন মনে রাখা? এখন এই টালমাটাল পরিস্থিতিতে মনে হয়, হয়তো উত্তরপ্রদেশ বলেই তাঁকে অন্যদের মতো বিস্মৃত হতে দেওয়া হয়নি। অন্তত বইয়ের পাতায় পাঁচ ছ’ লাইন তাঁর জন্য বরাদ্দ হয়েছে। হিন্দিবলয়ের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা কি তবে বেশি স্মরণযোগ্য? অন্যান্য প্রদেশের বীরাঙ্গনারা স্মৃতিযোগ্যতার বিচারে পিছিয়ে পড়ুক, এটি কি পরিকল্পনামাফিকই হাসিল করা হয়েছে?

রানি ভেলুকে জানি না, কর্নাটকের কিট্টুর রাজ্যের রানি চিন্নাম্মার নামও শুনিনি, ফলে শাহিনবাগের দাদিদের নিয়ে হাসাহাসি করতে আমাদের বাধে না। কারণ ছোটবেলা থেকেই আমরা পিতৃতন্ত্রের দ্বারা এই বলে শিক্ষিত যে বন্যেরা বনে সুন্দর, নারীরা রন্ধনশালায়। এই যে দলে দলে মহিলা দেশের সর্বত্র আন্দোলনে বিস্ফারিত হচ্ছেন ‘কাগজ নেহি দিখায়েঙ্গে’— তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবার স্পর্ধা আমাদের হয়, কারণ আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীর অবদান কতটা সে নিয়ে স্বতন্ত্র পর্যালোচনা হয়নি, পিতৃতন্ত্রের কিঞ্চিৎ ছাড় এবং লোকমুখে ও লোকগাথায় যতটুকু টিঁকে আছে ততটুকু ছাড়া।

ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় দিল্লি এবং অন্যান্য জায়গায় দল বেঁধে অবস্থান করছেন যে মহিলারা তারা কিন্তু সবাই অনেক পিছুটানকে জয় করেই এসেছেন। সংসার, সন্তান, সামাজিক গোঁড়ামি, অর্থনৈতিক বাধা, কোনও প্রতিবন্ধকতাকেই পাত্তা না দেবার যে অনমনীয় মানসিকতা তাকে আর যাই হোক খিল্লি বলা চলে না। যিনি কখনও পিতার কণ্ঠকে ছাপিয়ে নিজের কণ্ঠ তোলবার সাহস দুঃস্বপ্নেও দেখেননি, তিনি মাইক হাতে আজাদির স্লোগান দিচ্ছেন এও কিন্তু এক অর্জন।

কেন দলে দলে এই মরিয়া যোগদান? স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ছাড়া ভারতীয় মেয়েদের রাজনীতিতে এইরকম উথালপাথাল অংশগ্রহণ আর দেখা যায়নি। সে এক সময় ছিল, যখন গায়ের গয়না খুলে গান্ধিজির হাতে তুলে দিতে ইতস্তত করেনি মেয়েরা। গুপ্ত সন্ত্রাসবাদী দলে অবলীলায় নাম লিখিয়েছে। পরাধীনতা থেকে মুক্তি, অত্যাচার শোষণ অপমান থেকে নিষ্কৃতি ছিল তখন আন্দোলনকারী মেয়েদের প্রধান চালিকাশক্তি। আর এই এক সময় এখন, যখন বে-ঘর হওয়ার ভয়, বাপ পিতেমোর দেশ থেকে বিতাড়িত হওয়ার ভয় দলে দলে মেয়েদের নামিয়ে এনেছে আন্দোলনের ময়দানে। সংখ্যাগুরু নিজেদের ওপর বিপদ কীভাবে নামবে সে শিক্ষা যদি অসম এনআরসি থেকে না নিয়ে থাকে তাহলে সে দায় সম্পূর্ণ তার। বুঝতে হবে ধর্মীয় বিভাজন তাকে চিরতরে অন্ধ করে দিয়েছে। আর সংখ্যালঘু? সংবিধানের সমস্ত সুরক্ষা হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে ২০১৪ সাল থেকে তার ওপর যেভাবে প্রত্যক্ষ এবং অপ্রত্যক্ষ আঘাত নামিয়ে আনা হচ্ছে তার বিরুদ্ধে আজ রাস্তায় নেমে এসেছেন যাঁরা তাঁদের অধিকাংশই মহিলা।

বিজেপি মাইনরিটি ক্যান্ডিডেটকে নির্বাচনে টিকিট দিতে খোলাখুলি অস্বীকার করেছে। কর্নাটক, তেলেঙ্গানা, উত্তরপ্রদেশে নির্বাচকের তালিকা থেকে পরিকল্পনামাফিক প্রতি ছজন মুসলমানের মধ্যে একজনের নাম মুছে দিয়েছে। দেশের একমাত্র মুসলমানপ্রধান রাজ্য জম্মু কাশ্মিরকে ইউনিয়ন টেরিটরি বানিয়েছে। প্রান্তিক হতে হতে ২০১৪ সাল থেকে সংখ্যালঘুর পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। তিন তালাক আইন, শহর স্টেশনের নাম বদল, বাবরি মসজিদ রায়, গোরক্ষার নামে পিটিয়ে মানুষ মারা, সবকিছু গিলে নিতে তাকে বাধ্য করা হয়েছে। বাঁধ ভাঙল সেইদিন, যেদিন জামিয়া মিলিয়াতে নিরপরাধ ছাত্রদের ওপর নেমে এল পৈশাচিক আক্রমণ। সংবিধান পরিবর্তনের কুচক্রীরা সেদিন যে কোনও অপরাধ করে পার পাওয়া যাবে এই ভরসায় পুলিশকে নিজের মতলব সাধন করবার হাতিয়ার ভেবে নিল। কিন্তু কোনও ধর্মান্ধ ধান্দাবাজ বা রাক্ষুসে রাজনীতিক এত সবের বিরুদ্ধে ফেটে পড়া প্রতিবাদকে কবজা করে নেবার আগেই, অসন্তোষের বিস্ফোরণে আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যাবার আগেই, যাঁরা শক্ত হাতে এই আন্দোলনের রাশ টেনে ধরলেন তারা সংখ্যালঘু সমাজের অর্ধেক আকাশ, একথা আমরা যত তাড়াতাড়ি বুঝে এই মেয়েদের উদ্দেশ্যে টুপি খুলি ততই মঙ্গল। এঁদের শান্তিপূর্ণ কিন্তু অনমনীয় লাগাতার আন্দোলন ও ধর্না যে কোনও বীরপুঙ্গবকে শেখাতে পারে কীভাবে প্রবল শত্রুর বিরুদ্ধে ধৈর্য ধরে লড়তে হয়।

নীরবতাকে যারা দুর্বলতা ভেবে নিয়েছিল, সেই আধিপত্যকামীরা না বুঝেই হয়ত জাগিয়ে তুলেছে এক ঘুমন্ত দৈত্যকে। প্রতিজ্ঞার অটলতায় তারা যেন আমাজনের সেই নারীযোদ্ধা, যারা ধনুকে জ্যা জুড়তে অসুবিধে হওয়ার দরুণ একদিকের স্তন কর্তনেও ইতস্তত করত না। কী হবে এই আন্দোলনের ভবিষ্যত কেউ বলতে পারে না। শাসকের বুটের তলায় গুঁড়িয়ে যেতে পারে বা উল্টে শাসককে সহবত শেখাতে পারে। যাইই হোক না কেন, ভবিষ্যৎ রানি ভেলুর এই যোগ্য উত্তরাধিকারিণীদের মনে রাখবে। তফাত শুধু এই যে রাজনৈতিক ও হিংসাত্মক প্ররোচনা অগ্রাহ্য করে শাহিনবাগ পার্ক সার্কাস চালাচ্ছে এক দীর্ঘ, সাহসী, শান্তিপূর্ণ, সংগ্রামী প্রতিরোধ। পার্ক সার্কাস শাহিনবাগের মেয়েরা পাথর ছোঁড়েননি, অকথ্য ভাষা ব্যবহার করেননি। শুধু নিজেদের জেদ আঁকড়ে বসে থেকেছেন, আর এইভাবেই সংবিধান এবং নাগরিকত্ব রক্ষার লড়াইতে উৎসাহিত করেছেন পুরুষদের। এ যেন নতুন এক সত্যাগ্রহ, যার সামনে শাসক বেকায়দায়। পুরুষের লড়াই হলে সন্ত্রাসবাদ, হিংসাত্মক ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে এতদিন ঢিট করে দেওয়া যেত। কিন্তু আন্দোলনকারী যখন হাজার হাজার নিরস্ত্র নারী ও শিশু, তখন অহিংসার দীপ্তিতে প্রবল হিংস্র শাসকেরও চোখ ধাঁধিয়ে যেতে বাধ্য। আর হয়েওছে তাই।

ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম মেয়েরা শিশুসহ আছেন লড়াইয়ের একেবারে সামনের সারিতে। মুখে তাদের শ্লোগান— হমারি আওয়াজ না ঢিমি হোঙ্গি / হমারে কদম না থামেঙ্গে / হম পিছে নহি হটেঙ্গে।

গডসের মতো ‘দেশপ্রেমিক’ গুন্ডা পাঠিয়ে আকাশের দিকে তাক করে চাট্টি গুলি ছুড়ে এঁদের হতোদ্যম করা যাবে না।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2090 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. সময়োপযোগী দুরন্ত লেখা। রাণী ভেলুকে এভাবে তুলে আনার জন্য লেখকের কাছে কৃতজ্ঞ পাঠক।

আপনার মতামত...