অসঙ্গতির সঙ্গত — ৯ম পর্ব

হিন্দোল ভট্টাচার্য

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

‘মুখে মুখে তর্ক করবি না একদম’,– এই কথাটি যে কতবার শুনতে হয়েছে বাড়িতে। এমনকী স্কুলেও এই বদনামটি ছিল খুব। যে কোনও একটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন এবং পালটা প্রশ্ন করার একটা সহজাত অভ্যাস থাকাটা খুব দরকারি, পরে মনে হয়েছিল। কিন্তু যে সব বাচ্চারা বা পড়ুয়ারা মুখে মুখে তর্ক করে, তাদের বেশ দুর্বিনীত বলে মনে করা হয়। যেন, বাড়ি থেকে কীভাবে আচার আচরণ করতে হবে, তার পাঠ নেয়নি। বাড়িতে কিছু শেখানো হয় না। এটাও এক দারুণ অসঙ্গতি আমাদের শিক্ষা এবং বেড়ে ওঠার। বলে দেওয়া হচ্ছে, গুরুজন যা বলছেন, মানতে হবে। অবশ্যই তাঁদের অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। কিন্তু যে ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে, তার অভিজ্ঞতাকে ছোট করার কারণটা কী? সে হয়তো বোঝার চেষ্টা করছে বলেই তর্ক করছে। কিন্তু বেশি তর্ক করলেই সে এঁড়ে। কারণ বড় সবসময় বড়। তিনি শুধু উপদেশ দেবেন। তিনি কেবল-ই মান্য। কিন্তু সমস্যা এখানেই। হয়তো অনেকের তর্কই ভিত্তিহীন। অনেকের প্রশ্নই শিশুসুলভ। কিন্তু এই অনেকের মধ্যে যখন একজন গ্যালিলিও বা কোপারনিকাস বা বিবেকানন্দ বা সক্রেটিস বা মার্ক্স থাকেন এমনকী আমাদের কঠোপনিষদের সেই নচিকেতা, তাহলে প্রশ্নটা বা তর্কটা আসলে একপ্রকার দ্বান্দ্বিক চ্যালেঞ্জেই দাঁড়িয়ে যায়।

ভারতবর্ষ কিন্তু এই তর্ককে চিরকাল জ্ঞানচর্চার এক অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে মনে করেছে। তর্ক যে ভারতের জ্ঞানচর্চার অন্যতম এক অঙ্গ, তা অমর্ত্য সেনের তর্কপ্রিয় ভারতীয় পড়লেই বোঝা যায়। এই দেশেই তো ন্যায়রত্ন, তর্কালঙ্কারের মতো উপাধিপ্রাপ্তরা ছিলেন। রীতিমতো তর্কযুদ্ধ হত নানা বিষয় নিয়ে। আমাদের চৈতন্যদেব তো তর্কে সারা ভারতের তার্কিক এবং পণ্ডিতদের পরাস্ত করেছিলেন। তর্ক মানে বিপরীত এক প্রেক্ষিত আর সেই বিপরীত প্রেক্ষিতের সঙ্গে সুস্থ এক দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্ব ছাড়া কোনও শিক্ষা বা সভ্যতাই এগোতে পারে না। তর্ক কখনওই বিষয়ের থেকে বেরিয়ে ব্যক্তিতে প্রবেশ করেনি আমাদের শিল্পে, সাহিত্যে, জ্ঞানচর্চায়। মতান্তর হওয়াটা মতের ভিন্ন ভিন্ন রুচির বা অবস্থানের পরিচায়ক। সেই ভিন্ন ভিন্ন রুচিগুলি আছে বলেই, সভ্যতা অগ্রসর হয়েছে চিরকাল। যদি এক মত, এক ভাবনার মধ্যে থাকতে হয়, তবে তো সেই ভাবনাও মৃত হয়ে পড়বে।

বরং তর্ককে স্বাগত জানানো ভালো। কিন্তু সেই তর্কের উপস্থাপনার মধ্যে ব্যক্তিগত আক্রোশ বা ব্যক্তিগত কাদা ছোড়াছুড়ি থাকলে তা সম্ভবত সভ্যতার পরিচায়ক নয়। কারণ তর্ককে স্বাগত জানানো উচিত বিষয়ের ও বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তির আত্মিক উন্নতির জন্যই। তা যদি সেই ব্যক্তিকে ছোট করে দেয়, যদি তাকে সেই তর্কের উপযুক্ত ধারক না করে, তাহলে সে তর্কটা করছেই বা কেন? তর্কের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়। আগে আমরা দেখেছি, এক বিশেষ পণ্ডিতের সঙ্গে তর্ক করার আগে তার্কিককে তর্ক করতে হত আরও অনেক পণ্ডিতের সঙ্গে। কারণ তিনি যদি বিভিন্ন ধাপে তর্কগুলি না করে সেই মহাপণ্ডিতের সঙ্গে তর্কে প্রবৃত্ত হন, তাহলে তিনি পারবেন না। ধাপে ধাপে তাঁকে উঠতে হয় সেই তর্কের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে করতে। কারণ প্রতিটি ধাপেরও রয়েছে একপ্রকার ভাষা।

তর্কের সঙ্গে চিন্তা করার ক্ষমতা এবং চিন্তার প্রসারতাও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। চিন্তা যদি দুর্দশাগ্রস্ত না হয়, তাহলে তার প্রকাশের ভাষাও দুর্দশাগ্রস্ত হবে না। কিন্তু এর উল্টোটাই আমরা দেখতে পাই। কাউকে ছোট না করেই বলা যায়, কলতলার ঝগড়াকে কিন্তু তর্ক বলা যায় না, উচিতও নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে যে অসহিষ্ণুতার বাতাবরণ তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে সুস্থ তর্কের সম্পর্ক নেই। একটু খতিয়ে দেখলে বোঝা যায়, সেই সব তর্কে রয়েছে চিন্তার দুর্দশাও। কারণ তর্ক শেষ হয়ে যাচ্ছে কেবল একপক্ষের নিদানের মধ্যে। অর্থাৎ দু পক্ষই ঘোষণা করছে তাদের সিদ্ধান্ত। কেউ কারও সঙ্গে প্রকৃতপক্ষে একটি বিষয় নিয়ে আলোচনায় যাচ্ছে না। ধাপে ধাপে খণ্ডন করছে না অপরের যুক্তিবিন্যাসকে।

এখানে এক মহা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। যে কেউ যেহেতু তর্ক করতে যোগ্য বলে নিজেকে মনে করছে, অতএব, সিদ্ধান্ত ঘোষণা ও তর্কের মধ্যে যে বিপুল ব্যবধান, সে সম্পর্কে তাদের মধ্যে ধারণার অভাব থেকেই যাচ্ছে। তারা চেষ্টাই করছে না একে অপরের যুক্তিবিন্যাস, যুক্তির প্রেক্ষিত এবং চিন্তার ভিতরে ঢুকে সেই সব যুক্তিকে খণ্ডন করতে। যুক্তিকে খণ্ডন করতে গেলে নিজের যুক্তির বাইরে অন্য যুক্তিগুলিকেও জানা দরকার। জেনে, সেই সব যুক্তিকে নস্যাৎ করতে হয়। এইটিই হল তর্ক করর জন্য প্রস্তুতি। কিন্তু এখন, প্রস্তুতির বালাই নেই। এখন যেনতেনপ্রকারেণ মতামত প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আর আমার মতটাই যে নির্ভুল সত্য, তা প্রমাণ না করেই প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যুক্তিবিন্যাস ছাড়া মত প্রতিষ্ঠা করার প্রক্রিয়াটাই তৈরি করে ভায়োলেন্স। একধরনের মৌলবাদ।

একদিকে যেমন আমরা মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা বলছি, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কথা বলছি, অন্যদিকে তেমন-ই আমরা সংক্রামিত হয়ে পড়ছি এক চোরা ফ্যাসিবাদে। আমাদের মধ্যেই একধরনের মৌলবাদ গড়ে উঠেছে। এক ফ্যাসিস্ট শাসক তখনই গেঁড়ে বসতে পারে, যখন সে যাদের শাসন করতে চাইছে, তাদের মধ্যেও সেই মৌলবাদের বীজগুলি বা প্রবণতাগুলি থাকে। তাহলে আমরা কীভাবে লড়াই করব অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে, মৌলবাদের বিরুদ্ধে, ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে, যদি না আমরা নিজেদের মধ্যে থাকা অসহিষ্ণুতাকে, মৌলবাদী প্রবণতাকে সরিয়ে ফেলতে পারি?

তর্ক যে নিরন্তর দ্বন্দ্বের ভিতর দিয়ে আমাদের উন্নত মনের ও মানের এক সমাজের বাসিন্দায় পরিণত করে, তা গোড়াতেই নষ্ট হয়ে যায়, যদি আমরা তর্কের ভাষা না জানি। তর্কের ভাষার জায়গায় যদি আমরা হিংসার ভাষা ব্যবহার করতে থাকি, আক্রমণের ভাষায় ও ব্যক্তি-আক্রমণের ভাষায় কথা বলে নিজেদের মতকে প্রতিষ্ঠা করতে থাকি, তাহলে, তর্ক কেবল একটা নোংরা যুদ্ধে পরিণত হয়, যা আমাদের ক্ষয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অথচ এই অসুস্থ সংস্কৃতির মধ্যেই আজকের বাঙালি সমাজ চলছে। রাজনীতি থেকে খেলা, সাহিত্য থেকে দর্শন, শিল্প থেকে সিনেমা, সর্বত্র দেখা যাচ্ছে এই তর্কের জায়গায় ব্যক্তিগত আক্রমণের যুদ্ধ।

আমরা, তর্ক করতে ভুলে যাচ্ছি।

 

(ক্রমশ)

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2090 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...