বিচ্ছিন্নতার মনোলগ — জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়ের অণুগল্প: একটি আলোচনা

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

 

‘ছোটগল্প যন্ত্রণা থেকে তৈরি হয়’। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়কে মনে পড়ল। উপন্যাস থেকে ছোটগল্প এবং পরে অণুগল্পের বিবর্তনে এই যন্ত্রণার বিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ। মনে পড়ছে বনফুলের ‘তাজমহল’, ‘আত্ম-পর’, ‘হাসির গল্প’, ‘প্রজাপতি’ বা ‘নিমগাছ’-এর মতো গল্পকে। অথবা বিশ্বসাহিত্য মনে করলে কাফকার ‘The Next Village’, বা ‘The Trees’। অণু অর্থে কতটা ছোট হতে পারে গল্প তার যদিও কোনও মাপকাঠি নেই। কিন্তু যন্ত্রণার যে বিকাশের কথা বলছিলাম, সেই রাস্তা ধরেই বনফুল, কাফকা বা ‘লিপিকা’র জন্য রবীন্দ্রপ্রসঙ্গও স্মরণ করা যেতে পারে। গল্পের অতি ক্ষুদ্র পরিসরে লিনিয়ারিটি ভাঙা, অ্যাবসার্ডিটি এসব প্রয়োজনে চলে আসতে পারে। আসতে পারে নন-লিনিয়ার ‘in medias res’ ধরনের অ্যাব্রাপ্ট শুরু ও শেষ।

এত কথার অবতারণা জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় অণুগল্প সঙ্কলন ‘যূপ’ প্রসঙ্গে। প্রকাশক হাওয়াকল। লেখাকে জানতে গেলে লেখকও পাশাপাশি এসে পড়েন। ক্যামেরাবন্দি জয়দীপের ঘোরার নেশা তাঁর অণুগল্পের পাতায়। অদ্ভুত ছোট ছোট ডিটেলিং, মানুষকে দেখার চোখে এক ধরনের স্বকীয়তা কাজ করছে। জয়দীপ ন্যারেটিভ ভেঙেছেন। এনেছেন স্বপ্ন-মুহূর্ত বা মনোলগের ঝুঁকি। ঝুঁকি বললাম এই কারণে, পাঠক প্রথাগত গল্পের বই হিসেবে ‘যূপ’কে দেখলে ঠকবেন। দেখতে হবে অন্য চোখে …

‘ক্রিস্টাবেল’, ‘ফ্ল্যামিঙ্গো’, ‘একপেশে’, ‘স্নানঘর’, ‘শুভেচ্ছা’— গল্পের পর গল্পে জয়দীপ কখনও আশ্রয় নেন কথোপকথনে। সাইকোটিক চরিত্র বেছে তার মধ্যে ঢুকিয়ে দেন আহত পুরুষ, লোনলিনেস, নস্টালজিয়ার মতো বিষয়। চেনা যায় ক্রুড-রিয়েল বাস্তব। ‘খঞ্জনি’ গল্পে হ্যালুসিনেটরি স্টোরিলাইনে ঢুকে যায় সাম্প্রতিকতা। ‘বাইকে আসা সেই ছেলেদুটির চেয়েও আমার একা একা কথা বলা আরও বেশি ভয়ের?’ বা ‘একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার জন্ম এবং’ গল্পের ডিটেলিং, নারকীয় বাস্তব— ‘অন্য কোথাও করে এখানে ফেলে দিয়ে গেছে না?’ ‘মাদুলি’ গল্পে এসে যায় ধর্ম এবং নিরাপত্তাহীনতার সুতোয় ঝুলতে থাকা দুটো মানুষ। কিন্তু কতদিন? শক্তিপুর আর জুনিদপুরের দূরত্বে কমে আসে মনোহর আর শামসুরের চরিত্রগত তফাত। বাড়ে চিনে ফেলার ভয়। রুমকি তখন কোনও চরিত্র হয় না, রুমকি আমাদেরই মানবিক বোধ। মাইনরিটি। জয়দীপ আপস-বিশ্বাসী নন। তাই অদ্ভুত মায়াস্বরের পরেই নির্মাণ করেন ‘দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে এগিয়ে আসা’ চরিত্রদের। ‘পনেরোই আগস্ট স্বাধীনতা দিবস, তার কদিন পরই ভাদ্র মাস।’ পাঠক চমকাবেন। ‘ক্রিস্টাবেল’ গল্পের থাকা-না থাকার ভেতর দুলতে থাকা অ্যাবসোলিউট হোয়াইটনেস। ‘নাভিই শুধুমাত্র গভীর হয় না। কমনীয় ক্লিভেজই একমাত্র বিভাজন রেখা না।’ একটা ড্রিম সিকুয়েন্স আর সলিলোকির পর হঠাৎ শকথেরাপি। ‘মুখ অবধি ঢাকা একটা সাদা চাদর, হাতে সিরিঞ্জ বিঁধনোর অজস্র দাগ। আজকাল শিরাও খুঁজে পাওয়া যায় না চট করে।’ একটা জাফরির মধ্যে দিয়ে আসা যাওয়ার টেকনিক, সাক্ষী থাকা টিকটিকি, মাকড়সা— জয়দীপের ‘স্নানঘর’-এর চরিত্রদের দুঃস্বপ্নচারণের এসব সঙ্গীদের সঙ্গে জাম্প-কাট হয়ে এসে যায় মালিকের মুখ। ঘর ছেড়ে দিতে হবে। ‘এটা ভদ্রলোকের পাড়া।’

সেইসব পাড়ায় যাতায়াতের মধ্যে অবিরত মনোলগ। ‘মেলানকোলিয়া’। শহর চেনা। সেই শহর যার ‘কোনও ব্যক্তিগত বিদূষক নেই’। নাগরিক মোহ অথচ লোনলিনেস। ‘পোস্টার থেকে রণবীর, দীপিকা, শ্রদ্ধা— কেউ আপনাকে দেখছে না।’ শূন্যতা নাকি নিরাপত্তাহীনতা— কার কাঁধে মাথা রাখে অন্য পুরুষ, অন্য নারী! তার মতো করে ফুলগুলোর নাম আর কেউ জানতে চায় না। ‘চিনচিনে ব্যথার কাছে এসে মনে হয় তলানিতে অবশিষ্ট কফি ঠান্ডা হয়ে আছে।’ ‘হয়তো আমারই কাছাকাছি’ গল্পের সেইসব ম্যানেকিন। কথোপকথন। ‘পুরুষকে বোকা বানাতে চায় লাস্যময়ী, নিজেকে কী বানায় কে জানে।’ উজ্জয়নীর বারাঙ্গনার প্রসবদাগ। পুরনো নারী। প্রেম। যেন ভীষণ স্বাভাবিক বিচ্ছেদ। ‘এ সে নয়, ভাগ্যিস এ সে নয়।’ শুধু ন্যারেটিভ নয়, ভাষার ব্যবহারেও অসম্ভব যত্নশীল জয়দীপ। তখনই মনোলগ। ‘কার কাছে কতটা সস্তা সবকিছু?’ হাসি-কান্নার দোটানা। ‘তুমি জোকার নও? সত্যি? ঠিক জানো তুমি?’

টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে থাকা নির্মোহ অস্তিত্ববাদ, অ্যাবসার্ডিটির মাঝে তবুও নির্ভেজাল প্রেম। ‘দুজনে একা একা হাঁটলেও পাশাপাশি হাঁটতে পারে একসাথে।’ মানুষ। ‘সরু কাচের চুড়ি’র সেইসব রুরাল ফায়ারপ্লেস, তোবড়ানো গাল, দুটো ফ্রক পড়া মেয়ে, একটু পরেই যাদের চটিটা ছিঁড়বে হোঁচট খেয়ে। বেড়ালের কপালে রসকলি এঁকে দেওয়া জয়দীপের যূপেরা আসলে এ শহরের বাড়ি, বাড়ির বাইরের চোখে না পড়া চরিত্র। ও হেনরি যেমন বলতেন, সবকিছুই গল্পের চরিত্র হয়। ট্রামলাইন, ফুটপাথ, পোস্ট অফিস, পার্কের বেঞ্চ…

সামগ্রিকভাবে দেখতে গেলে জয়দীপ তাঁর চরিত্রায়ন ও ন্যারেটিভে সফল এবং সাহসী। আগেই বলেছি, এ বই সাধারণ গল্প পাঠের মননে দেখলে হবে না। প্রায় প্রতিটি গল্পই অণু পরিসরে পরিচিত আঙ্গিক, প্রথাকে ভেঙে পাঠককে ভাবায়। লেখক তখন কিছুটা হলেও আনরিল্যায়েবল ন্যারেটর। পাঠক নিজের তাগিদে দুতিনবার পড়ে। ধাক্কা খায়। প্রচ্ছদে বিতান চক্রবর্তীর প্রস্তুতিতে লুসি গ্রসমিথের ‘ইয়েলো মুন অ্যান্ড লিটল আউল’ তখন কি শুধুই শান্তি? নিজস্ব ঘর? লেখকের কথায়, ‘পাঁচিলের চৌহদ্দি’, যার ভেতর ‘বাইরের ভয়গুলো চোখে পড়েনি এখনও’। নাকি ঠিক বিপরীতে এক মৃত্যুবৎ স্তব্ধতা, একটা আয়না, ঘর, স্মৃতি ছাড়া যা আর কোথাও নেই? এটুকু অন্ধকারে রেখেছেন লেখক।

বাংলা অণুগল্পে, পরীক্ষামূলক সাহিত্যধারায় জয়দীপ বড় লোভ দিয়ে রাখলেন। মুখিয়ে থাকব তৃতীয় সঙ্কলনটির জন্য। পাঠক আমার, আমাদের এটুকুই ‘প্রিয় প্রত্যাশা, প্রিয় অধিকারবোধ’…

যূপ
জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়
হাওয়াকল প্রকাশনা
দাম — ১৫০ টাকা

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2090 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...