বিদ্যাসাগর: একালের নিরিখে

রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য

 



লেখক প্রাচীন ভারতীয় বস্তুবাদী দর্শন বিশেষত চার্বাক/লোকায়ত দর্শন বিশেষজ্ঞ, বিশিষ্ট তাত্ত্বিক, গবেষক ও প্রাবন্ধিক।

 

 

বড় মাপের মানুষদের সম্পর্কে অনেক গল্প চালু হয়। সেগুলোর সবই যে পুরো ঠিক তা নয়। কিন্তু কোনো-কোনোটির মধ্যে অন্তত কিছুটা সত্য থাকে। মা-য়ের ডাকে সাড়া দিতে বিদ্যাসাগর ঘোর বর্ষায় সাঁতরে দামোদর পেরিয়েছিলেন— এই গল্পটি পুরোপুরি বানানো। এর মধ্যে এক তিলও সত্য নেই, যদিও হাজার হাজার, হয়তো লক্ষ লক্ষ লোক আজও গল্পটি বিশ্বাস করেন। কিন্তু সে কথা থাক। মানুষের বিশ্বাস করার ক্ষমতা অসীম— যত অসম্ভব ততই যেন বিশ্বাস্য। আরও কম-জানা কিন্তু বিশ্বাস্য একটি গল্প দিয়ে শুরু করি।

উনিশ শতকের শেষে বাঙলায় হিন্দু ধর্মকে আবার জাগিয়ে তোলার চেষ্টা শুরু হয়েছিল। তার নেতা ছিলেন শশধর তর্কচূড়ামণি (১৮৫২-১৯২৮)। তিনি থাকতেন কাশীতে; প্রচারের জন্যে তাঁকে কলকাতায় আনা হয়েছিল। তিনি একবার গেছিলেন বিদ্যাসাগরের সঙ্গে দেখা করতে৷ বিদ্যাসাগর তাঁকে বলেন,

‘আপনাকে হিন্দু ধর্ম প্রচারের জন্য যাঁরা এনেছেন তাঁরা যে কেমন দরের হিন্দু তা তো আমি বেশই জানি, তবে আপনি এসেছেন, বক্তৃতা করুন। লোকে বলবে, বেশ বলেন ভালো। এমন একটা প্রশংসালাভ করবেন এইমাত্র।’ এর পরে তিনি যোগ করেন, ‘আমার স্কুলের [মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন-এর] ছেলেরা যে মুরগির মাংস খায়, আপনার বক্তৃতায় তাঁরা যে সে মাংস ছাড়বে আমি তা একেবারেই বিশ্বাস করি না।’

কথাগুলি শশধরও লিখে যাননি, বিদ্যাসাগরও না। একজন তৃতীয় ব্যক্তি, শশিভূষণ বসু ঘটনাটি লিখেছেন (‘বিদ্যাসাগর-স্মৃতি’, প্রবাসী, শ্রাবণ ১৩৪৩, পৃ.৫৪৯)। অবশেষে তাঁর মন্তব্য: ‘বিদ্যাসাগর মহাশয় অতি উদারচেতা পুরুষ ছিলেন, ধর্ম্ম-বিষয়ে তাঁহার কোনো গোঁড়ামি ছিল না। তবে আমার বিশ্বাস প্রচলিত হিন্দু ধর্ম্মের অনেক উচ্চে তিনি বাস করিতেন।’ তাঁর মতে, ‘লোকের ধর্ম্ম-বিষয়ে মতামত প্রকাশ করা বড় কঠিন বিষয়। তাই এখানে এ-বিষয়ে আর কিছু বলিলাম না।’

একালে মানুষের পরিচয় রাজনৈতিক বিশ্বাস দিয়ে। বিদ্যাসাগরের সময়ে অবশ্য কোনো রাজনৈতিক দল তৈরি হয়নি। গণতন্ত্র শব্দটিও চালু ছিল না। তাঁর জীবন কেটেছে খানিকটা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে (১৮২০-১৮৫৮), বাকিটা মহারানি ভিকটোরিয়ার অধীনে (১৮৫৮-১৮৯১)। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৮৫-তে৷ বিদ্যাসাগরের তাতে কোনো উৎসাহ ছিল না। এবিষয়ে তাঁর কোনো লিখিত মতামত পাওয়া যায় না। তবে নানা লোকের কথায় জানা যায়: বক্তৃতা করে ভারত উদ্ধারে তাঁর আস্থা ছিল না। একজন অন্তত বলেছেন, বিদ্যাসাগর তাঁর বন্ধুদের বলতেন: ‘তোমাদের আর উপায় নেই। জঙ্গলে গিয়ে পল্টন তৈরী করো।’ তিনি সময়ে সময়ে এত গরম ভাবে কথা বলতেন যে, বন্ধুরা তাঁর ঘরের কপাট বন্ধ করে দিতেন। বাঙলার অন্যতম প্রথম বিপ্লবী ভূপেন্দ্রনাথ দত্তকে একথা জানিয়েছিলেন মেদেনীপুরের একটি স্কুলের একজন অতি বৃদ্ধ পণ্ডিত জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসু। ভূপেন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘এই মানসিক প্রস্তুতির দ্বারাই এই অতিবৃদ্ধ পণ্ডিত আমাদের কর্মে [অর্থাৎ, বিপ্লবী কাজকর্মে] সহানুভূতিসম্পন্ন হইয়াছিলেন’ (ভারতের দ্বিতীয় স্বাধীনতার সংগ্রাম, নবভারত পাবলিশার্স ল, ১৯৮৩, পৃ. ৯৩)।

তার মানে, সরাসরি কোনো ধরণের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যোগ না থাকলেও, তাঁর একটি রাজনৈতিক মত ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছিল।

তবে এও ঘটনা যে, নিজের ধর্মবিশ্বাসের মতো রাজনৈতিক বিশ্বাস নিয়েও তিনি কারুর সঙ্গে আলোচনায় যেতেন না। তাঁর সমসময়ের সকলেই অবশ্য জানতেন: তিনি পরকালে বিশ্বাস করেন না, বরং সেই নিয়ে ঠাট্টা করেন (বিপিনবিহারী গুপ্ত, পুরাতন প্রসঙ্গ, বিদ্যাভারতী, ১৩৭৩ ব., পৃ.১৩১)।

ডিরোজিও আর ইয়াং বেঙ্গলের মারফত একই সঙ্গে সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতা আর যুক্তির যুগ-এর ধারণা এসেছিল বাঙলায়। বিদ্যাসাগরও তাঁর নিজস্ব রীতিতে আধুনিক পৃথিবীর সেইসব ধারণাকেই ছাত্র-ছাত্রীদের মনে গেঁথে দিতে চেয়েছিলেন। এই দিকটিকে জোর দেওয়া হয় না, অথচ এর ওপরেই তাঁর গোটা জীবন-দর্শন দাঁড়িয়ে আছে। দীনেশচন্দ্র সেনকে একটি চিঠিতে (১৭ নভেম্বর ১৯০৫) রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন: ‘… বোলপুরের বিদ্যালয় স্থাপন ও শিক্ষার ভার নিজের হাতে ও স্বদেশী ভাবে প্রবর্ত্তনের চেষ্টা’ ছিল স্বদেশী আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ইনি বলেন, ‘এ সম্বন্ধে বিদ্যাসাগর মহাশয় অগ্রণী। তিনি ইংরেজি ধরণের বিদ্যালয় দেশীয় লোকের দ্বারা চালাইতে সুরু করেন— আমার চেষ্টা যাহাতে বিদ্যাশিক্ষার আদর্শ যথাসম্ভব স্বদেশী রকম হয়।’ (চিঠিপত্র, খণ্ড ১০, বিশ্বভারতী, ১৩৭৪, পৃ.৩৩)।

বিদ্যাসাগরের চরিত্রর অনেক দিকই দুর্জ্ঞেয়, শুধু সাধারণ লোকের পক্ষেই নয়, সকলের পক্ষেই। সংস্কৃত ভাষা ও সংস্কৃত সাহিত্য নিয়ে বইটির উপসংহার-এ কুসংস্কারের বিরুদ্ধে একটি বাক্য ছিল। কেন তিনি দ্বিতীয় সংস্করণ থেকে সেটি বাদ দিলেন, তা সহজ বুদ্ধিতে বোঝা যায় না। তেমনি, বোধোদয়-এর প্রথম ও দ্বিতীয় সংস্করণে ‘ঈশ্বর ও ঈশ্বরসৃষ্ট পদার্থ’ অংশটি থাকলেও (সম্ভবত) পঞ্চম সংস্করণ থেকে ঈশ্বর-প্রসঙ্গ বাদ দিলেন, আবার ১০৫তম সংস্করণে কেনই বা প্রথমে ‘পদার্থ’ ও তার পরে ‘ঈশ্বর’ নামে দুটি আলাদা অংশ আনলেন— সে রহস্যও ভেদ করা যায় না।

বিদ্যাসাগরের স্বরূপ বোঝার পক্ষে তাঁর জীবনীকাররাও দুটি বড় বাধার সৃষ্টি করেন। এক তো হলো তাঁর মননশীলতার চেয়ে হৃদয়বত্তার ওপর বেশি জোর দেওয়া, আর দ্বিতীয় হলো জনদরদে তাঁকেও ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা। বিদ্যাসাগর কেন ১৮৫৯-এর সর্বজনীন শিক্ষার কথা বলেন নি এই নিয়ে কোনো কোনো গবেষক কমবেশি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন৷ অলডস হাক্সলি দুঃখ করেছিলেন যে ভারতে ভালো ভালো বিশ্ববিদ্যালয় গড়া হচ্ছে কিন্তু জনশিক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। মুসোলিনির কারাগারে বন্দী, বিশিষ্ট মার্কসবাদী তত্ত্ববিদ, আন্তোনিও গ্রামশি (১৮৯১-১৯৩৭) বলেছিলেন, কথাগুলোর মধ্যে কিছুটা সত্য আছে। কিন্তু দেশের ‘প্রথাগত বুদ্ধিজীবী’দের নিয়ে আগে উচ্চশিক্ষার বন্দোবস্ত না করলে নিচের স্তরের ছেলেমেয়েদের শেখাবেন কারা? আর গোড়ার দিকের শিক্ষার সুযোগ তাই সকলে পাবেন না, বরং অল্প লোকই পাবেন (Antonio Gramsci, Selections from the Prison Notebooks, New York: International Publishers, 1971, pp.26-43; Further Selections from the Prison Notebooks, Minneapolis: University Minnesota Press, 1995, p.122)।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2458 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...