প্রতিবাদগুলি শুধু সিএএ-এনআরসি এবং এনপিআর ত্রয়ীর বিরুদ্ধে না হওয়া সত্ত্বেও অনেকভাবেই সফল

হর্ষ মান্দর

 

নিবন্ধটি ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ প্রকাশিত। বঙ্গানুবাদ: সত্যব্রত ঘোষ।

ভারতের মানুষ জেগে উঠেছে। সংহতি এবং প্রতিরোধের ভাবনায় দৃঢ় থেকে দেশের সবখানে শহর মফস্বল, এমনকি সুদূর গ্রামগুলিতেও বিভিন্ন বিশ্বাস এবং পরিচিতির মানুষ হাজারে হাজারে উপচে উঠছে। কোনও একজনের নেতৃত্বে নয়। এই জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে রয়েছেন তরুণ ছাত্রবৃন্দ এবং খেটে-খাওয়া মুসলিম মহিলারা। এই আন্দোলনের আইকন হিসেবে আছেন মহাত্মা গান্ধি এবং বাবাসাহেব আম্বেদকর। প্রতীক হিসেবে রয়েছে ভারতের তেরঙ্গা পতাকা এবং সংবিধান। উদাত্ত কণ্ঠে বারে বারে গেয়ে ওঠা জাতীয় সঙ্গীত এই আন্দোলনে হয়ে উঠেছে প্রতিবাদ স্তোত্র। সংহতি এবং স্বাধীনতা, দেশ এবং সংবিধানকে উদযাপন করা বেপরোয়া কবিতা আবৃত্তি আর স্লোগানে আমাদের হৃদয় আজ মথিত।

প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এই আন্দোলনের গতিপথে কোনও পূর্বসূরি নেই। অনেকে ভাবছেন এটি সফল হবে কিনা, ক্লান্ত হয়ে নিভে যাবে কিনা, একে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে কিনা এবং শেষ অবধি এই আন্দোলন কোন দিশা নেবে।

যারা এর সাফল্য নিয়ে সন্দিহান, তাঁরা প্রতিরোধের চরিত্রটি বুঝতে ভুল করেছেন। একে শুধুমাত্র সিএএ-এনআরসি এবং এনপিআর ত্রয়ীর বিরুদ্ধে এক লড়াই হিসেবে দেখাটা মস্ত বড় ভুল। এটি সরকারের সেই স্পর্ধার বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ, যা নাগরিকদের প্রমাণ করতে বলে তাঁরা কোথাকার মানুষ। এটি সরকারকে সাবধান করে দিয়ে বলে যে জনগণের কথা তাকে শুনতে হবে। ভয়, ঘৃণা, বিভেদ এবং হিংসার বিরুদ্ধে এই স্বতঃস্ফূর্ত জাগরণ জঙ্গি হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধেও, যা ছাত্রসমাজ, বিরোধীপক্ষ এবং সংখ্যালঘুদের শয়তান আখ্যা দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বেকারত্ব, কৃষকসমাজের দুর্দশা, নারীদের উপর অত্যাচার এবং ভাঙাচোরা এক অর্থনীতি— দৈনন্দিন জীবনের এই রূঢ় বাস্তব চিত্রগুলিকে শুধরানোর সরকারি ব্যর্থতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার জন্য এই আন্দোলন।

এটা বোঝা যাচ্ছে যে আন্দোলনটি অনেক দিক থেকে সফল। সবচেয়ে বড় সাফল্য মহাত্মা গান্ধিকে আমাদের থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের জন্য এটি প্রথম জাতীয় স্তরের আন্দোলন। এই আন্দোলনে বিভিন্ন ধর্ম এবং জাতিপরিচয়ের মানুষের ঐক্য সাধন যে হয়েছে তা ঠিক। যখন দরিদ্র শিখ চাষিরা শীতের রাতগুলিতে ক্যাম্প করে দেশি ঘি দিয়ে লঙ্গর বানায় শাহিনবাগে প্রতিবাদরত বোনদের জন্য, তখন তা আমাদের সভ্যতার পরম্পরার জয় হিসেবে চিহ্নিত হয়। একজন বলেন, “১৯৪৭ সালে আমরা সেই যন্ত্রণা দেখেছি। আমরা চাই না তা আবার ঘটুক।”

আন্দোলনের দ্বিতীয় সাফল্য সারা ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজকে রাজনৈতিকভাবে আরেকবার দীক্ষিত করা। দীর্ঘ সময় ধরে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় রাজনৈতিক এবং নীতিগত চিন্তাভাবনার দিক থেকে নির্জীব হয়ে গেছিল। আজ ছাত্ররা বয়োজ্যেষ্ঠদের ঘৃণা না করবার কথা শেখাচ্ছে, দেখাচ্ছে আরও যত্নবান এবং সমান হওয়ার দিকে দেশকে কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।

তৃতীয় সাফল্য হল ভারতের মুসলমান মানুষদের আশ্বস্ত করা। মুসলিমদের জন্য গত কয়েক বছর দুর্বিষহ এক আতঙ্কের সময় ছিল এই দেশ। মুসলিমদের রাজনৈতিক দিক থেকে অপ্রাসঙ্গিক বানিয়ে তাঁদেরকে প্রত্যেকটি দলের কাছে বোঝাস্বরূপ করে তোলা হচ্ছিল। ধর্মান্ধতা, ঘৃণাভরা বক্তৃতা, এবং গণপিটুনি যেন প্রাত্যহিক জীবনের অংশ— এমনভাবে গ্রাহ্য করে তোলা হচ্ছিল। আমি সারা দেশের প্রতিটি কোণে আয়োজিত প্রতিবাদ মঞ্চে গেছি। শাহিনবাগে মুসলিম মেয়েদের নেতৃত্বে গড়ে তোলা আন্দোলনের প্রেরণায় আয়োজিত এই প্রতিবাদ মঞ্চগুলিতে দেখেছি উৎসবের উজ্জ্বল মেজাজ। প্রতিবাদ কম হওয়া সত্ত্বেও এই উদযাপনগুলি আশ্বাস দেয় ভারত তাঁদেরও দেশ। মহাত্মা গান্ধি এবং সংবিধান যে প্রতিশ্রুতিগুলি তাঁদের দিয়েছে, তা শূন্যগর্ভ নয়। আমরা সবাই একসঙ্গে আছি। এই একই আবেগ দেখেছি সেই সমারোহগুলিতে যেখানে লক্ষাধিক মানুষকে উদ্দেশ্য করে আমি কথা বলেছি। সেখানে টুপিধারী পুরুষ আর হিজাবপরিহিতা নারীরা অন্য ধর্মবিশ্বাসী মানুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জাতীয় পতাকা নাড়িয়েছেন।

আন্দোলনের চতুর্থ অর্জনটি হল জাতীয়তাবাদের ধারণাটিকে সেই সব ভারতীয়দের প্রচারিত ভাবধারা থেকে সংশোধন করা, যারা অন্তর্ভুক্তি এবং ঐক্যের চেয়ে বেশি বিভাজনে মনোযোগী। যারা দেশকে প্রকৃতই ভালবাসে, তারা কখনওই তা ঘৃণা, ভয় এবং হিংসার কারণে টুকরো টুকরো করে দিতে চাইবে না। ডানপন্থীদের ক্রোধান্ধ বিভাজনের জাতীয়তাবাদকে যথার্থে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মহাত্মা গান্ধির দেশভক্তি দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। যা আমাদের শেখায় দেশের সব মানুষকে ভালবাসলে আর অন্য দেশগুলিকে মান দিয়ে নিজের দেশকে ভালোবাসা যায়।

পঞ্চম জয়টি হল ভারতীয় সংবিধানকে গণ আন্দোলনের আত্মা হিসেবে স্থাপন করা। যখন আমি রাস্তার কোণে অথবা বিশাল সমারোহগুলিতে সাধারণত ছোট ছোট মেয়েদের নেতৃত্বে জনগণকে সংবিধানের প্রস্তাবনা (preamble)-টি আবৃত্তি করতে শুনি, আমার রোমকূপগুলি খাড়া হয়ে যায়। এমন একটি সময়ে যখন আমাদের সংবিধানই হুমকির শিকার, তখন এই “উই দ্য পিপল অফ ইন্ডিয়া”-র চেয়ে যথার্থ আর কীই বা হতে পারত।

শেষ জয়টি হল অ-বিজেপি যে দলগুলি অনিচ্ছা এবং নীতিগত দিক থেকে অনিশ্চিত অবস্থানে রয়েছে, তাদেরকে একটি পক্ষ নিতে বাধ্য করা যাতে তারা সংবিধানকে রক্ষা করতে পারে, তুচ্ছ কারণেও যারা সংবিধানের বিরুদ্ধে যেতে প্রস্তুত। এতে কেন্দ্রীয় সরকার স্পষ্টতই বিহ্বল, যার ফলে তা মিথ্যাচারগুলি চালায় যে এনআরআইসি তাদের অ্যাজেন্ডায় নেই, ডিটেনশন ক্যাম্প বলে আদৌ কিছু নেই। এবং দিল্লির নির্বাচনের সময়ে তারা শাহিনবাগে আচ্ছন্ন থাকে।

আমি নিশ্চিত পরবর্তী পর্যায়ে পোঁছালে এই আন্দোলন আরও উজ্জ্বল অনেক সাফল্য লাভ করবে। যতদিন মানুষের শক্তি আর বিশ্বাস অবশিষ্ট থাকবে, প্রতিবাদ এবং সমাবেশ চলবে। তবে এবার এর কেন্দ্রমুখ সরে এনপিআর-এর প্রতি অসহযোগিতার দিকে যাওয়া উচিৎ, যার কাজ আগামী এপ্রিল মাস থেকে শুরু হয়ে যাবে। যদি এনপিআর অনুমোদন পায়, তাহলে কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারকে যে কোনও সময়ে একটি এনআরআইসি থেকে ‘সন্দেহভাজন নাগরিক’-দের চিহ্নিত করে বাদ দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে।

ত্রুটিহীন একটি এনপিআর-এনআরআইসি বানানো অসম্ভব এক প্রকল্প। এর প্রধান উদ্দেশ্য হল ভারতের মুসলমানদের ধাক্কা দেওয়া। এর সাথে ভিন্নমত পোষণকারী দুর্বল দলগুলিকেও সারাক্ষণের জন্য আতঙ্কগ্রস্ত করে রাখা যে কোনও না কোনও সময়ে তাদেরকেও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি রাখা হবে। সেইজন্য আন্দোলনটি যেন রাজ্য সরকারগুলিকে এনপিআর-এর কাজ নাকচ করতে এবং জনগণনার কাজ থেকে এনপিআর-কে আলাদা করতে বাধ্য করে, যা এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

একটি আন্দোলন যদি সংবিধানকে রক্ষা করতে গিয়ে ভারতীয় মুসলিমদেরই কাঁধে চেপে বসে, তবে তা ঘোর অবিবেচনা হবে। কারণ, বর্তমান ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে অসহযোগিতার জন্য তাঁদেরকেই নিষ্ঠুরভাবে লক্ষ্যবিন্দু হতে হবে। তাই এনপিআর বয়কট করার আহবানে অ-মুসলিমদেরকেই সামিল হতে হবে কারণ শুধু মুসলিমদের জন্য এই অবাধ্যতার মূল্য চরম এবং ভয়ানক।

শেষে একবার মৌলানা আজাদের কথাগুলি শোনা যাক: “আজ যদি এক দেবদূত স্বর্গ থেকে নেমে এসে কুতব মিনারের উপর দাঁড়িয়ে ঘোষণা করে যে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্বরাজ পাবে ভারত যদি সে হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যভাবনা ত্যাগ করে, আমি স্বরাজভাবনা ছেড়ে দেব, হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যভাবনাকে না। স্বরাজ অর্জনে বিলম্ব হলে ভারতের ক্ষতি হবে ঠিক, কিন্তু যদি ঐক্যভাবনা হারিয়ে যায়, তাহলে তা সমগ্র মনুষ্যজাতির ক্ষতিতে পরিণত হবে।”

তাই আন্দোলনের অন্য অংশটিকে আমাদের ঐক্য এবং সংহতিসাধনে আরও গভীর হতে হবে। শুধু রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে জন্য, আমাদের নিজেদের জন্য। শেষ অবধি আমাদের দেশের রূপ কেমন হবে, তা আইন বা আদালতের রায়ের উপর নির্ভরশীল থাকবে না, থাকবে আমাদের হৃদয়ে উপনিবেশ গড়ে তোলা ভালোবাসা অথবা ঘৃণার উপর।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2168 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...