পূর্ণপাত্রে রিক্ত— নেশাতুর অঞ্জলি

পূর্ণপাত্রে রিক্ত-- নেশাতুর অঞ্জলি : প্রিয়দর্শী চক্রবর্তী

প্রিয়দর্শী চক্রবর্তী

 

বিশ্বভারতীর প্রাক্তনী এবং পারিবারিক— উভয় সূত্রেই শান্তিনিকেতনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকার দরুণ মাঝেমধ্যেই ঐ চত্বরে যাতায়াতের অভ্যাস আমার বহু বছরের। আর আশ্রমপ্রাঙ্গনের ‘পার্ক স্ট্রিট’ রতনপল্লীতে সকালসন্ধে বার দুয়েক চক্কর মেরে ‘কালো-চা’ বা আধুনিক এসপ্রেসো কফিতে চুমুক দিয়ে আসা তখন একরকম নিয়ম নির্বন্ধেই বাঁধা। কারণ, নবীন-প্রবীণ নির্বিশেষে কথার ফোয়ারায় সেখানে ধূমায়িত চা-কফি নিমেষে গ্লাসের তলানিতে ঠেকে তর্কে-বিতর্কে, বিবিধ নরক গুলজারে।

মাসকয়েক আগে তেমনই এক অলস সন্ধেবেলা মুখোমুখি বসেছিলাম সুজিত চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে, অবসরপ্রাপ্ত জীবনের দিনগুলো বুকভরা প্রশান্তিতে ভরে নিতে যিনি স্থায়ী বাসিন্দা এখন পূর্বপল্লীতে। অতএব বাদবাকি করণীয় কাজকর্ম ফেলে ঘণ্টাখানেকের জন্য কফি আর আড্ডা তো অনিবার্যই। রসিক সুজিতদা স্বকীয় ঢঙে রসিয়ে গল্প বলায় ওস্তাদ মানুষ। প্রবীণ আশ্রমিক হিসাবে যাঁরা পরিচিত, অধিকাংশের সঙ্গেই তাঁর মেলামেশা যৌবনের দিন থেকেই। অতএব শান্তিনিকেতনের আনাচকানাচের বহু অজানা গল্পে সুজিতদার ভাঁড়ার সর্বদাই রসসিক্ত। ধরতাইটুকু ধরিয়ে দিয়েছিলাম আমিই, বিশেষ কোনও আলোচনা প্রসঙ্গে ঋত্বিক ঘটকের নামটা টেনে এনে। সুজিতদা জমিয়ে শুরু করলেন পাঠভবনের প্রাক্তন অধ্যক্ষ শ্রদ্ধেয় সুপ্রিয় ঠাকুরের মুখে শোনা একটি ঘটনা। বিষয়টা হয়তো কলেবরে বা গুরুত্বে বিশেষ বড় কিছু নয়, তবুও মজা পেলাম। কিম্বা হয়তো সবটাই শুধু উপভোগ্য নয়, আন্তরিক গহনে কোথাও স্নাত হলাম বিষণ্ণ এক উপলব্ধির চোরাস্রোতে। লিখে ফেলাটাও জরুরি অনুভবে যতটুকু সাধ্য তুলে ধরা যাক এই পরিসরে।

গল্পটা খানিক এমন। সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়। সুপ্রিয় ঠাকুর, যদিও তখন তিনি পাঠভবনের প্রিন্সিপাল, একদিন নিজেই ক্লাস নিচ্ছিলেন বেদিতে, একটু চড়া বেলায়। পড়াতে পড়াতে দেখলেন, দূরে একটি সাইকেলরিক্সা মৃদুমন্দ দুলে এগিয়ে আসছে, চৈতি পেরিয়ে। খানিক অদ্ভুত অবয়বের ভারসাম্যে। কারণ রিক্সাওয়ালার দু-কাঁধের দুদিক দিয়ে দুটো মাথা ঝুলে দুলছে, একটি ডানে অপরটি বাঁয়ে হেলে। যদিও দূর থেকে চেনা দায় তাঁরা পরিচিত না অপরিচিত। বেনুকুঞ্জের দিকে ধীরে এগোতে এগোতে মোটামুটি সুপ্রিয়দার বেদির সমান্তরালে এসে রিক্সাটা থামল। ক্লাস নিতে নিতেই দেখলেন রিক্সাচালক দ্রুত হেঁটে তাঁর দিকেই আসছেন। খানিক গোবেচারা এবং নিতান্তই নিরুপায় বেকুব মুখে কাছে পৌঁছে তিনি সুপ্রিয়দাকে বললেন– “আপনাকে একটু ডাকছেন।” ছাত্রছাত্রীদের পড়ানোর মাঝে হঠাৎ এমন উৎপাত! একটু বিরক্তই হলেন সুপ্রিয়দা। প্রথমে সপাট অস্বীকার করলেন ক্লাস ছেড়ে যেতে। নাছোড় রিক্সাচালক আরও করুণ মুখে মরিয়া— “আপনি একটু না গেলে আমার বড় বিপদ হয়ে যাবে।” উপায়ান্তর না দেখে বাধ্য হয়ে ছাত্রছাত্রীদের অপেক্ষা করতে বলে গুটিগুটি হেঁটে পৌঁছোলেন রিক্সার সামনে। এবং বিস্ময়, ডানদিকে ঝুঁকে কোনওক্রমে রিক্সার হাতলে আটকে রয়েছেন প্রায় অচৈতন্য ‘কিঙ্করদা’। আর স্বভাবজাত বামপন্থী ঋত্বিক ঘটক একই ভঙ্গিমায় রীতিমতো হেলে… ঐ বাঁয়ে। পার্থক্য এই, ঋত্বিকের মধ্যে সামান্য চেতনার আভাস রয়েছে, রামকিঙ্কর নিঃসাড়। সুতরাং সুপ্রিয়দা ঘটকবাবুকেই প্রশ্ন করলেন— “কিছু বলবেন আমায়?” মুদ্রিত নয়ন অতি কষ্টে সামান্য মেলে ধরে ঋত্বিক বললেন— “আমার না… বুঝলেন, আমার না কিছুই বলার নেই।” একে শৃঙ্খলাপরায়ণ শিক্ষক হিসাবেই সুপ্রিয় ঠাকুর আশ্রমে সুবিদিত। তায় ছাত্রছাত্রীদের পড়ানোর মনোযোগের মাঝ থেকে তাঁকে একরকম জোর করেই টেনে আনা হয়েছে। সুতরাং এমন বাউন্ডুলে উদাসীন উত্তরে তাঁর তখন রাগে চিড়বিড়িয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। অথচ সামনের মানুষটি ঋত্বিক ঘটক! তেড়িয়ে কিছু কথা শুনিয়ে দেওয়াটাও অশোভন। এঁদের সংজ্ঞাহীন বেসামাল অবস্থার প্রকৃত কারণটুকু বুঝতেও আর কোনও বাকি ছিল না আশ্রমিক ঘরানার কঠোর অনুবর্তী সুপ্রিয় ঠাকুরের। অতএব সাধ্যমত শিষ্টাচারে নিরুপায় প্রশ্ন— “কিন্তু আমাকে ডাকলেন যে…!” এবার কৃপাদৃষ্টিটুকু কৃপণের মতোই সামান্য ছড়িয়ে ঋত্বিকের আকুতি, প্রায় জোড়হাতে— “হ্যাঁ, ডেকে ফেলেছি। কিন্তু বিশ্বাস করুন… বিশ্বাস করুন, আমার না কিছুই বলার নেই… কিচ্ছুটি না…।” সামান্য থেমে আবারও নম্র জবাবদিহির পুনরাবৃত্তি— “বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি? সত্যিই… বলার যে কিচ্ছুটি নেই।” বোঝা গেল, পরিস্থিতির মাথায় গুরুতর ভারে স্বয়ং মুশকিল চড়ে বসে আছে! দূর থেকে ছাত্রছাত্রীরাও দেখছে সব কিছুই। সুজিতদার আনুপূর্বিক রসিয়ে বলার ঢঙে ফুটে ওঠা এই চিত্রকল্পে যে কোনও শ্রোতারই বেদম হাসিতে ফেটে পড়া অনিবার্য। আমিও ব্যতিক্রম ছিলাম না মুখোমুখি শ্রবণে। যাই হোক, শেষমেশ আজগুবি এই আবহাওয়া সামলাতে সুপ্রিয়দা তড়িঘড়ি রিক্সাওয়ালাকে বুঝিয়েসুজিয়ে আবারও চাকা ঘুরিয়ে দিলেন— কোথায়, কোন গন্তব্যে নিয়ে গিয়ে এঁদের নিরাপদে ভূমিস্পর্শ করাতে হবে। রিক্সা ধীরগতিতে লালমাটির ধুলোপথে এগোতে শুরু করলে বাঁচলেন হাঁফ ছেড়ে।

ঘটনার পরিধি সামান্য এইটুকুই। তবু সময়কে চিনেবুঝে নেওয়ার বদভ্যাসে হিসেব কষে বুঝলাম, ১৯৭৫-এর মাঝামাঝি কোনও এক দিনের ঘটনা। ঋত্বিক তখন বেশ কিছু মাস শান্তিনিকেতনে যাতায়াতে ব্যস্ত। রামকিঙ্কর-কে নিয়ে তাঁর তথ্যচিত্রের শুটিং চলছিল নিশ্চিত, যে অসমাপ্ত ছবি আজ ‘রামকিঙ্কর বেইজ: আ পার্সোনালিটি স্টাডি’ নামেই লভ্য ইউটিউবের দুনিয়ায়। ছবির কেন্দ্রীয় বিষয় আর তার পরিচালক দুজনেই তখন মজে আছেন পারস্পরিক ভাববিনিময়ে, আশ্রমপ্রাঙ্গণ এবং সৃষ্টিমেধার অলিন্দে ইতিউতি বেখেয়ালি চারণে পারস্পরিক আদানপ্রদানের বোহেমিয়ান উচ্ছ্বাসে। স্পটে ইউনিটের ক্যামেরা আর আনুষঙ্গিক সরঞ্জামের প্রস্তুতিটুকু সেরে ওঠার চিলতে অবসরও যেখানে সদ্ব্যবহৃত হয় কাছাকাছিই খুঁজে নেওয়া ঠেকে আকণ্ঠ ‘দিশি’-র চূড়ান্ত ধ্রুপদী আলোচনায় বুঁদ হয়ে ওঠা দিগ্বিদিকশূন্য মহান বৃত্তে! এদিকে সেজেগুজে প্রস্তুত ডক্যুমেন্টারির ইউনিট ব্যতিব্যস্ত তখন বেমালুম উধাও নির্দেশক আর তাঁর ‘সাবজেক্ট’-এর চিরুনিতল্লাশিতে!

শরীরের ওপর ক্রমাগত এই অত্যাচার অনিবার্য জবাব দিয়েছিল অনতিবিলম্বেই। সবাই জানি, ১৯৭৬-এর ফেব্রুয়ারিতে ঋত্বিক চলে গেলেন, এবং গেলেন ছবির এডিটিং-এর কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই। কিম্বা হয়তো বলতে চাওয়া কথাটুকু সম্পূর্ণ বলে ওঠার আগেভাগেই। কিশলয় ঠাকুর জানাচ্ছেন, ‘লিভিং লেজেন্ড’ রামকিঙ্করের ওপর তথ্যচিত্র বানানো ‘জাতীয় কর্তব্য’ বোধে ভগ্নস্বাস্থ্যেও শেষ বাজিটুকু লড়ে জিতে নিতে ছবি তৈরির জন্য মাত্র পনেরো হাজার টাকা সংগ্রহে হাত পেতেছেন ঋত্বিক দরজায় দরজায়। প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন, প্রত্যাশা ছিল যাঁদের কাছে। অথচ মুশকিল আসানে এগিয়ে এসেছিলেন সামান্য ধাতব পাইপের খুচরো ব্যবসায়ী মোহন বিশ্বাস আর তাঁর স্ত্রী শিখা বিশ্বাস যৎসামান্য অর্থসম্বল এবং সঞ্চিত যাবতীয় গয়নাগাটি নিয়ে। সে প্রসঙ্গ অবশ্য অন্য। কিন্তু পরিচালকের অনমনীয় জেদটুকু নিয়ে সংশয় নেই। নিরন্তর এক বজ্রমণির জ্বালায় বুক পুড়িয়ে সেই অঙ্গারে ক্রমাগত দাগ কেটে যাওয়ার আর্তি মহাকালের ক্যানভাসে। বারেবারেই যা অনিশ্চিতে ইচ্ছাকৃত ঝুঁকে, নিজেকে নিংড়ে আহত করে স্বোপার্জিত উপলব্ধির রক্তক্ষরণে অন্তর্গত সৃজনকেই রাঙিয়ে তোলার অভিপ্রায়ে ঐশ্বর্যমণ্ডিত! মদ্যপানের নেশা তো সেই ছায়াযুদ্ধের উদ্দীপক মাত্র।

আজকাল হামেশাই দেখি, শিল্পের সৌকর্য আর শিল্পীর মাতলামির ‘অব্যর্থ’ অ্যালকেমি নিয়ে মাতামাতি প্রচুর। দুই মহারথীর বেআক্কেলে বেসামালপনা, বিপ্রতীপে সুপ্রিয় ঠাকুরের মতো কড়া ধাঁচের মানুষের কিংকর্তব্যবিমূঢ় পরিস্থিতি… সব মিলিয়ে গল্পের প্রাথমিক শ্রবণের মজাটুকু গড়পড়তা শুষে নেওয়ায় অস্বাভাবিক কিছু নেই। কিন্তু মজার সে রেশটুকু কেটে আন্তরিক হৃদয়বেত্তায় অনুধাবনে শেষপর্যন্ত মিশে যায় প্রায় অব্যক্ত এমনই বিষণ্ণতার বোধ। যে কোনও শিল্পই তো স্রষ্টার চেতনার আধার থেকে বেরিয়ে আসা বক্তব্যেরই সারবত্তা। কেউ বলেন ভাস্কর্যে-ক্যানভাসে, কারও বা বলার মতো কথাগুলো বেরিয়ে আসে সজীব চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। যে যার মতো বলেই যান অনর্গল, জীবনের ধারাপাতের প্রান্তসীমাটুকু পর্যন্ত কুড়িয়ে নিতে নিতে। বলতে বলতে একসময় ফুরিয়ে যায় একান্ত বক্তব্যটুকুও। অথচ মগজের অভ্যাসটুকু তাড়া করে ফেরে নিরন্তর… বলতে হবে, বলতে হবে। এবং বলতে গিয়েও তাই চকিতেই নিজেকে দিয়ে দেওয়া ‘ছুটি’, ‘অবেলাতে দিনদুপুরের মধ্যখানে’… কিছুই বলার নেই… কিচ্ছুটি নেই!

শুকনো দুপুরে গৌরপ্রাঙ্গনের মোরাম ছড়ানো রাস্তার ধুলোর আস্তরণ হয়তো জানে সেই পূর্ণপাত্রে ভরে ওঠা আধারের নতুন করে ভরে তোলার অক্ষমতায় চলকে হেলে পড়ার ইঙ্গিত। যত্নে তারা গড়িয়ে দেয় রিক্সার চাকা, দিনান্তের ঈপ্সিত বিশ্রামে। বাতাসের আর্দ্রতায় নীরবেই ফেনিয়ে ওঠে করুণ স্বরক্ষেপ…

‘আমারে তুমি অশেষ করেছ, এমনি লীলা তব…’

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2615 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. জানা ঘটনা, তবে সুপ্রিয় ঠাকুরের অংশটুকু জানতাম না | আপনার বলার ভঙ্গিমা চমৎকার |

আপনার মতামত...