খণ্ড-সূত্র

খণ্ড-সূত্র : বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য

 

স্বপ্ন, একাকিত্ব নাকি মৃত্যু– কে ক্ষমতাসীন তবে? আহত পাঁচিলের গা বেয়ে ঝরে পড়ে স্তব্ধ নারীর বিষণ্ণ সুখ (অথবা বিরতি উপহার দিতে পারে এমন যে কোনও ভাবনা বা ভাবনাহীনতা); হে ধীর চৈতন্য তুমিই বলো কে বেশি একা– এই ব্রহ্মাণ্ড, এই শব্দরাজি না এই আমি?

***

হায়, সময়! তোমার নিরন্তর ছিঁড়ে যাওয়ার ফল আজ অর্থের মাত্রাছাড়া অপচয়। লক্ষ করো, তোমার প্রিয়তমা ভাষার জীর্ণ বসনে হাহাকার; তুমি এ কোন জমানায় তারে বৈধব্য দিলে! না-না, ভাবুক হোয়ো না ভুলেও;– ঐ দেখো, কেমন সিঁধ কাটে ফড়েরা, অসহায় ভাষাকে বেচে দেয় রাক্ষুসে রাষ্ট্রপল্লীর ঝাঁ-চকচকে অন্ধকারে; চড়া দামে…

ভাষা বেঁচে থাকে আলুথালু— প্রয়োজনে আতর মেখে চকচকে। ভাবনা! হাঃ, সে বেচারি বাহুল্যের বাজারে বেঘোরে মাতৃহারা অথবা অদূরেই হাইড্রেনে পচাগলা শরীরে চমৎকার দুর্গন্ধ…

***

অই চাঁদ ও অমানিশা— এক অবিকল্প রম্যকাহিনির প্রাত্যহিক বাস্তবায়ন।

মোতি-চুরচুর শাদা মৃত্যু ঝরে পড়ে বুভুক্ষু শহরের স্বাদজিহ্বায়;– লেহ্য মরণমধু— উদরাময় আসে। ছেলেটি পেটব্যথায় ধাঁইধাঁই লাথি চালায় ফ্লাইওভারের পিলারে;– ব্রিজ ভেঙে যায় শহরে। আপাত স্থানাঙ্কবিচ্যুত দুই-সমন্বয়; প্রগতি মুখ থুবড়ে থাকে সভ্যতার শরীরে, আরও গভীরে হা-ঘরে জীবন।

***

ঋণ-ঋণে দম কুঁচকে রেখে তারা দেখেছিল অশ্রুনালীতে স্বপ্ন। শূন্য থেকে শুরু— ডাহা মিথ্যে সান্ত্বনা। মিলেনিয়ামের প্রাচীর ফুঁড়ে যদিবা পৌঁছানো গেল সব পেয়েছির দেশে;– নামভূমিকায় গবাদি। বাঁট যখন নিক্ষিপ্ত তাদের সর্বগ্রাসী বাজারে, স্বপ্ন-ক্লান্ত তারা দেখে চলে স্বপ্নান্তের যজ্ঞমহিমা। মৃত দেবতাদের ভিড় ঠেলে প্রকট হন লীলা-পুরুষ রাষ্ট্র; চোখে মানুষের মক্ষিকা, জল-জল অশ্রু।

হায়! শূন্য দিগন্তে চেয়ে থাকার মতই অভিশাপ অতএব আজীবন নিঃশেষিত হয়ে বেঁচে থাকা।

***

প্রবালপ্রাচীরসমান-ইতিহাস প্রতিভাত হয় হ্রদ-হ্রদ জ্যোৎস্নায়;
জন্ম জেগে ওঠে–
সভ্যতার পর সভ্যতা— কি কেতাদুরস্ত মাৎস্যন্যায়!
অথবা প্রত্যেকেই একেকটি খণ্ড-অস্থি; রিপু-রিপু ছয়–
ভেবে দেখো সময়— কত ক্লান্ত পথিকের পাতলুন-ছেঁড়া বিলাপে হা-হা করে হাসে বারাঙ্গনা পুঁজি;
তুমি, আমি ও সভ্যতা–
এক বীভৎস-হিংস্র থ্রিসামের ঐতিহাসিক ভয়।

***

সময়ের বহুমুখী বর্তমানে উদ্‌ভ্রান্ত মানুষ বেছে নেয় নিঃশেষিত হওয়ার বাজারি বুনিয়াদ। সভ্যতাও চকিতে পোশাক বদলে রূপ নেয় যেমন মায়াধূম্রকানন। বিশ্বাস ও সত্যের উদ্ভট মিশ্রণ অর্থকে করে তোলে তরল-শরীর। রাষ্ট্র প্রকট হন সভ্যতার স্বপ্নে, অগোচর পরিসরে— পুঁজি হয় তথ্য-তথ্য ও বিকৃতি। সহজ ভবিষ্যতের ভাবাবেগে মানুষ হয় বিস্মৃত-অতীত, এবং এই সত্য যেন;–

তবু বিস্মরণে অভিশপ্ত মানুষই সন্ধান করে স্মরণের অভ্যাস-আশ্রয়; এক আত্মপরিক্রমা— ইতিহাসের আবেশে…

***

ক্রেতাসমাজে প্রবেশিলে মানুষ কি দ্রুত পরিবর্তিত হয়ে স্থবির হয়ে যায়! শুরু হয় পাভলভীয় প্রতিবর্ত; কাঁসর বেজে ওঠে স্মৃতিসৌধে, ব্যাকুল মানুষ কিনে চলে যা কিছু ক্রয়যোগ্য বাজারে। লোভ-লোভ-লোভ গড়িয়ে চলে কংক্রিটের শরীরে, পিছু নেয় ঈর্ষা-কামনা-ভয়। আমি দোদুল্যমান দোলনায় চুমে আসি সোনার পাথরবাটি, কখনও বা নিঃসঙ্গতার গাঢ়-ব্যবচ্ছেদ—

অতল-গহ্বর শর্বরী, গুম্‌-গুম্‌ শব্দে শোনা যায় আদিম জয়ঢাক, লাল-নীল ধোঁয়া চোখ-জোড়ানো, ধূপের সুবাস—

কখনও সময় পেলে এসো আরও দূরবর্তী হওয়ার আগে; নিমন্ত্রণ রইল,

ইতি–
আদিরস।

***

প্রত্যেক সাহিত্য প্রকৃতপ্রস্তাবে কতগুলি অসামঞ্জস্যপূর্ণ চিহ্নরাজ্যের সমারোহ, যাদের সীমানা ছুঁয়ে বয়ে চলে পাঠক ও লেখকের একত্রিত বিশ্বাসের সঙ্গম-সুধা।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2615 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...