এই স্পর্ধা ও ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে এখনই রুখে দাড়ানো দরকার, না হলে দেরি হয়ে যাবে

গুরুপ্রসাদ কর

 

হিন্দুত্ববাদী নেতা মন্ত্রীদের স্পর্ধা ও ঔদ্ধত্য বেড়েই চলেছে। তারা ধরেই নিয়েছেন যে প্রাচীন ভারতের ঐতিহ্যকে সামনে রেখে তাদের অপবিজ্ঞানমূলক প্রচার তাদের জনপ্রিয়তাকে আরও বাড়িয়ে দেবে। সম্প্রতি খড়গপুর আইআইটি.-র ৬৫তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রমেশ পোখরিয়াল বলেন, “আমাদের কী কোনও সন্দেহ রয়েছে যে প্রাচীন যুগে আমাদের দেশে ভালো ইঞ্জিনিয়ার ছিল কিনা! আমেরিকা, ব্রিটেন বা জার্মান নয়, রামসেতু বানিয়েছিলেন এ দেশের ইঞ্জিনিয়াররাই…” এই মন্তব্য করেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করেন, “কী ঠিক বললাম তো?”

আমরা জানি যে উপস্থিত শ্রোতাদের অধিকাংশ এই ধরনের অবাস্তব ও উজবুক মন্তব্যের সমর্থক না হলেও তার বিরুদ্ধে উপস্থিত ছাত্র শিক্ষকদের মধ্যে থেকে কোন প্রতিবাদ উঠে আসেনি। আসলে গত কয়েক বছর ধরে গণতান্ত্রিক ও বিজ্ঞানমনষ্ক মানুষের উপর নিরন্তর আক্রমণ চালিয়ে যে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে এটা তারই ফসল। সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে যেমন এই ভীতির পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে তেমনি উচ্চাকাঙ্খী কিছু শিক্ষাবিদ তাদের উচ্চাশা পূরণ করতেও এই অপবিজ্ঞানকে মদত দিয়ে চলেছেন। সম্প্রতি বিখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অব সায়েন্স-এর নতুন ভবনের শিলান্যাস হয় নারকেল ভেঙে ও প্রশস্ত পুজোপাঠের ব্যবস্থা করে। অংশ নিয়েছিলেন মন্ত্রী হর্ষবর্ধন ও প্রতিষ্ঠানের অধিকর্তা। তার আগে খড়গপুর আইআইটি-র এক অধ্যাপক বাস্তুবিদ্যা নিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বাড়িতে হনুমান অথবা গণেশের মূর্তি রাখার উপদেশ সহ একের পর এক অবৈজ্ঞানিক মন্তব্য করে চলেন।

হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি দীর্ঘদিন ধরে এই অপবিজ্ঞানের প্রচার চালিয়ে আসছে। কিন্তু বর্তমানে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করায় তাতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। সাম্প্রতিককালে এর সূচনা করেন স্বয়ং নরেন্দ্র দমোদর মোদি যখন ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হবার পর তিনি একটি হাসপাতালের উদ্বোধনে গিয়ে গণেশের মাথার উদাহরণ দিয়ে পুরনো ভারতে উন্নত প্লাসটিক সার্জারি ও কর্ণের জন্ম কাহিনি বিবৃত করে প্রাচীন ভারতে জেনেটিক বিজ্ঞানের উন্নতি নিয়ে অবাস্তব মন্তব্য করেন। তার আগেই উনি গুজরাটের স্কুলে ‘তেজোময় ভারত’ নামে দীননাথ বাত্রার যে বই পড়ানোর ব্যবস্থা করেছেন তাতে বলা হয়েছে যে মহাভারতের যুগেই এখানে টেলিভিশন ও স্টেম সেল প্রযুক্তির অস্তিত্ব ছিল। খালি তাই নয় বৈদিক যুগেই এখানে মোটরগাড়ির প্রচলন ছিল। এই বইয়ের ভূমিকা লিখেছিলেন স্বয়ং নরেন্দ্র মোদি। প্রসঙ্গত মনে রাখা দরকার যে হিন্দুত্ববাদের পান্ডা তথা সঙ্ঘ ঘনিষ্ঠ শিক্ষা সংস্কৃতি উত্থান ন্যাসের প্রধান এই দীননাথ বাত্রাই স্কুলপাঠ্য থেকে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমস্ত রচনা বাতিল করবার সুপারিশ করেছিলেন (আনন্দবাজার ২৫ জুলাই, ২০১৭)।

ভারতে বৈজ্ঞানিক চিন্তার বিস্তারে সরকারি ভূমিকা কখনওই ভালো ছিল একথা বলা যাবে না এবং দীর্ঘদিন ধরেই হিন্দুত্ববাদী পান্ডারা তাদের অপবিজ্ঞানমূলক কাজকর্মে পরোক্ষভাবে সরকারি সহায়তাও পেয়ে এসেছে। কিন্তু গত কয়েক বছরে প্রত্যক্ষ সরকারি সহায়তা পেয়ে এই হিন্দুত্ববাদী পান্ডাদের সাহস এতটাই বেড়ে গেছে যে খোদ বিজ্ঞান কংগ্রেসের মঞ্চটাকেই এরা এদের অপবিজ্ঞান প্রচারের প্রধান হাতিয়ার করে ফেলেছে। ২০১৫ সালে এরকমই এক হিন্দুত্ববাদী পান্ডা ক্যাপ্টেন বোদাস বিজ্ঞান কংগ্রেসে খোদ পেপার দিয়ে প্রতিষ্ঠা করবার চেষ্টা করে যে ৭ হাজার বছর আগেই ঋকবেদের যুগে নাকি ভারতে ৪০টি ইঞ্জিন ও জ্বালানি হিসাবে হাতির মূত্র ব্যবহার করে এমন এরোপ্লেন চলত যা অন্যান্য গ্রহে পাড়ি দিতে পারত। ভরদ্বাজ মুনি ছিলেন নাকি তার আবিষ্কারক।

এরোপ্লেন সম্পর্কে ধান্দাবাজ হিন্দুত্ববাদীদের এইসব মিথ্যা প্রচারকে ৪০ বছর আগেই বাতিল করে পেপার লিখেছেন বাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সের বিজ্ঞানী এইচ এস মুকুন্দ ও তার সহযোগী আরও ৫ বিজ্ঞানী। বোদাসের কাণ্ডকারখানা দেখে তিনি বলেছেন, “এ ক্ষেত্রে যিনি পেপার লিখেছেন, তাঁর চেয়ে ঢের বেশি দোষী অধিবেশনের সংগঠকরা, যাঁরা ওরকম একটা পেপার পড়ার অনুমতি দিয়েছেন। ওঁরা বিজ্ঞানের পায়ে কুড়ুল মেরেছেন।”

কিন্তু ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে এদের পাগলামি থামার কোন লক্ষণ নেই। ২০১৯ সালে জলন্ধরে অনুষ্ঠিত ১০৬তম সায়েন্স কংগ্রেসে চাঞ্চল্যকর ঘোষণা করলেন কানন জগথালা কৃষ্ণান নামে এক বিজ্ঞানী। তাঁর মতে আইজ্যাক নিউটন এবং আলবার্ট আইনস্টাইন, দুজনেই নাকি ভুল। আগামী দিনে গ্র্যাভিটেশনাল পুলের নতুন নাম হবে নরেন্দ্র মোদি পুল। গ্রাভিটেশনাল লেনসিং এফেক্টের নাম হবে হর্ষবর্ধন এফেক্ট। কেন ওই দুটি ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী হর্ষবর্ধনের নাম ব্যবহার করা হবে তার কারণ অবশ্য তিনি দেখাননি। প্রসঙ্গত ২০১৮ সালে ১০৫তম বিজ্ঞান কংগেসে এই হর্ষবর্ধন হাস্যকর দাবি করেছিলেন যে বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং-এর মতে বেদের তত্ত্ব নাকি আইনস্টাইনের -এর তুলনায় উন্নত। আর এইসব কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত হয়ে সম্প্রতি বাংলার এক নেতাও দেশীয় গরুর দুধে সোনার হদিস পেয়েছেন।

কিন্তু মনে রাখা দরকার যে সরকারি সহায়তায় এই অপবিজ্ঞানের প্রচারকারীদের শক্তি বেড়ে চলেছে বিপুলভাবে। হিন্দুত্ববাদী এই শক্তিগুলি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সরকারি সহায়তায় অসংখ্য সংগঠন ও বিদ্যালয় বানিয়ে বিশেষত গরীব, আদিবাসী ও দলিত ও অন্যান্য নিম্নবর্গের মানুষের মধ্যে এক চরম অবৈজ্ঞানিক ও সাম্প্রদায়িক শিক্ষাকে জনপ্রিয় করছে দুটি লক্ষ্য নিয়ে; (ক) এদের মধ্যে থেকে সাম্প্রদায়িক আক্রমণের সৈনিক তৈরি করা, (খ) এদেরকে পশ্চাদপদ অবস্থায় রেখে ব্রাহ্মণ্যবাদী কাঠামোটিকে সুদৃঢ় করা।

এই ধরনের কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে এরা যেমন ইতিহাসকে বিকৃত করছে তেমনি প্রাচীন ভারতে এবং আধুনিক সময়েও বেশ কিছু বিজ্ঞানী যে বিজ্ঞানের জগতে অসামান্য অবদান রেখেছেন তাকেও লঘু করবার চক্রান্ত চালাচ্ছে। প্রাচীন ভারতে একটি পর্যায়ে যে বিজ্ঞান চর্চার যথেষ্ট বিকাশ ঘটেছিল তা অজানা নয় কিন্তু সেটি ঋকবেদের যুগে ঘটেনি। বিশেষত জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিতের ক্ষেত্রে এই বিকাশ উল্লেখযোগ্য। পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিতের বিকাশে অসামান্য অবদান রাখেন আর্যভট্ট ও বরাহমিহির। এই বিকাশের ধারাবাহিকতাতেই ভারতে শূন্যের আবিষ্কার ঘটে ব্রহ্মগুপ্তের হাতে আনুমানিক ৬২৮ খ্রিস্টাব্দে। এছাড়া যে ক্ষেত্রগুলিতে বিশেষ উন্নতি ঘটেছিল তা হল ধাতুবিদ্যা, ভেষজবিজ্ঞান, ও শল্যচিকিৎসা। এ প্রসঙ্গে টাটা ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানী মায়ঙ্ক ভাইয়া বলেছেন যে যখন প্রাচীন ভারতে আমাদের গর্ব করবার মত অনেক আবিষ্কার ঘটেছে তখন আমরা মিথ্যা দাবি করতে যাব কেন! বাস্তবত এরকম দাবি বিশ্বের দরবারে ভারতীয় বিজ্ঞানীদের হাসির পাত্র করে তুলছে। আর এই অপবিজ্ঞানের প্রচারের তলায় প্রকৃত বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলি চাপা পড়ে যাচ্ছে।

তাই বিজ্ঞানের প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ এই মূর্খের দল যদি বলে যে রেডিও, টেলিভিশনের আবিষ্কার হয়েছিল মহাভারতের যুগে তাহলে আমাদের প্রশ্ন করতে হবে যে বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বোস তাহলে কী আবিষ্কার করেছিলেন! কোয়ান্টাম তত্ত্ব যদি বেদেই থাকে তাহলে সত্যেন্দ্রনাথ বোস ও সি ভি রামন কী আবিষ্কার করেছিলেন! সমস্ত আধুনিক গণিত যদি ঋকবেদেই থাকে তাহলে প্রখ্যাত ভারতীয় গণিতবিদ রামানুজম কী আবিষ্কার করেছিলেন! আর তৎকালীন এক হিন্দুত্ববাদী তো বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহাকে সরাসরি বলেই দিয়েছিলেন যে তার আবিষ্কৃত সমস্ত তত্ত্ব নাকি বেদেই উল্লিখিত আছে। এই বিজ্ঞানীরা যদি বেদ থেকেই এই সমস্ত বৈজ্ঞানিক সূত্রগুলি পেয়ে থাকেন তাহলে সেটা না উল্লেখ করাটা নিশ্চয়ই অপরাধ। হিন্দুত্ববাদীরা কি বলতে চান এই সমস্ত বিজ্ঞানীরা সেই অপরাধে অপরাধী?

প্রসঙ্গত মনে রাখা দরকার যে হিন্দুত্ববাদী শক্তি মনুস্মৃতিকে তাদের সর্বাধিক পবিত্র গ্রন্থ মনে করে। ১৯৪৯ সালে ৩০শে নভেম্বর আরএসএস-এর মুখপত্র ‘অরগানাইজার’-এর সম্পাদকীয়তে মনুসংহিতা অনুসারে সংবিধান রচনা না করার জন্য সমালোচনা করে বলা হয়েছিল, “আমাদের সংবিধানে প্রাচীন ভারতে সংবিধান সংক্রান্ত যে বিকাশ ঘটেছিল তার কোন উল্লেখ নেই।… আজও মনুসংহিতাতে উল্লিখিত আইনগুলি সমগ্র বিশ্বের প্রশংসা পায় এবং তা স্বতঃস্ফূর্ত আনুগত্য ও মান্যতা জাগিয়ে তোলে। কিন্তু আমাদের সংবিধান বিশেষজ্ঞরা একে কোনও গুরুত্বই দেয়নি।” আর এর সম্পূর্ণ বিপরীত মত পোষণ করে বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় দেখিয়েছিলেন যে মনুস্মৃতিতে সমর্থিত পেশার ভিত্তিতে কঠোর জাতিভেদপ্রথা ও নানা ধরনের কুসংস্কার ভারতের বিকশিত বিজ্ঞান চর্চাকে ধ্বংস করে। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় তার বিখ্যাত রচনা ‘হিস্ট্রি অফ হিন্দু কেমিস্ট্রি (১৯০২)’ বইতে এ বিষয়ে তার মতামত বিবৃত করেছেন। তার অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ আলোচনার মর্মবস্তু হল এইরকম:

বিজ্ঞানচর্চার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য অবশ্য প্রয়োজনীয় উপাদান হল যারা হাতেকলমে কাজ করে আর যারা চিন্তা করে তাদের মধ্যে চিন্তার আদানপ্রদান। জাতিভেদ প্রথা প্রবর্তনের ফলে পেশা একদিকে বংশানুক্রমিক হয়ে যায় আর অপরদিকে দৈহিক কাজ ঘৃণার বিষয়ে পরিণত হওয়ায় তার দায়িত্ব পড়ে শূদ্র বা অতিশূদ্র জাতির উপর যারা আবার অস্পৃশ্য। এর ফলে যারা চিন্তা করে তারা বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। খালি তাই নয়, সমাজের এই উচ্চবর্ণীয় অংশ যে বেদান্ত দর্শনের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে তাতে বস্তুজগতকে মায়া বলে ভাবতে শেখায়। ফলে প্রকৃতি জগত সম্পর্কে কোনও অনুসন্ধান অর্থহীন এই ধারণা শক্তিশালী হয়ে পড়ে। অপরদিকে ভারতীয় অঞ্চলে একসময়ে বিকশিত চিকিৎসাবিদ্যা যে ধ্বংস হয়ে যায় তার মূল কারণ হল মনুর বিধান। মনুর বিধান অনুযায়ী মৃতদেহ স্পর্শ করলেই সেই ব্যক্তি অপবিত্র হয়ে যায়। এর ফলে শবদেহ ব্যবচ্ছেদের সমাপ্তি ঘটে যার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা বিজ্ঞানেরও অবনতি ঘটে। একইভাবে বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা তৎকালীন সময়ে ‘সবই ব্যাদে আছে’ শীর্ষক প্রবন্ধ সহ বিভিন্ন রচনার মধ্যে দিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের এইসব গালগল্পের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন।

হিন্দুত্ববাদীদের দাপটে অবস্থা এমন দাড়িয়েছে যে সরকার ক্রমাগত শিক্ষাক্ষেত্রে অর্থের সঙ্কোচন ঘটিয়ে আইনি বা বে-আইনিভাবে এই অপবিজ্ঞানের প্রচারে সরকারি অর্থ ব্যয় করে চলেছে। আর এর সঙ্গে তাল রেখেই সমাজব্যবস্থা সম্পর্কিত গবেষণাগুলিকে বা সেই সংক্রান্ত অনুদান বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির মাথায় বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে এমন সব লোকদের শিক্ষাজগতে যাদের প্রায় কোনও ভূমিকাই নেই।  নির্বিচারে চলছে শিক্ষার বেসরকারিকরণ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফি বৃদ্ধি। এর ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গরীব ও নিম্নবর্ণের ঘর থেকে আসা ছাত্রছাত্রীরা। উচ্চ গবেষণায় ক্রমাগত ফেলোশিপের সংখ্যা সঙ্কুচিত করা হচ্ছে। কোথাও আবার কোন নোটিশ না দিয়েই চালু ফেলোশিপের টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। আর এইসব অপকর্মের বিরুদ্ধে ছাত্রদের বিক্ষোভকে দমন করতে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে সামরিক ছাউনি গড়ে তোলা হচ্ছে। অর্থাৎ এক কথায় দুর্বল হলেও উচ্চশিক্ষার যে কাঠামোটি ছিল তাকে ভেঙে ফেলার চক্রান্ত চালানো হচ্ছে।

এই অবস্থায় আমাদের মনে হয় যে ইতিমধ্যেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। তাই আর দেরি না করে এখনই রুখে দাঁড়ানো দরকার। তা না হলে এখনও স্কুলপাঠ্যে বা সমাজের বিভিন্ন স্তরে যে সামান্য বিজ্ঞানচর্চার সুযোগ রয়েছে তাকেও অচিরেই ধ্বংস করে ফেলা হবে। জনসংখ্যার তুলনায় যথেষ্ট কম হলেও এখানে যে একদল দক্ষ বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ তৈরি হয়েছে তাদের জন্য গবেষণার উপযুক্ত পরিকাঠামো গড়ে দেওয়ার বদলে মহাকাশ গবেষণা সহ তাদের বিভিন্ন সাফল্য নিয়ে একটি উগ্রজাতীয়তাবাদী পরিমণ্ডল গড়ে তোলা হচ্ছে। এতে প্রকৃত বিজ্ঞানের চর্চা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আসলে এই অপবিজ্ঞান প্রচারকারীদের উদ্দেশ্যই হল ছাত্র ও যুবকদের যুক্তিবাদী চিন্তা থেকে দূরে রেখে তাদের কুসংস্কারে আচ্ছন্ন রাখা যাতে চলতি ব্যবস্থার কোনও সমস্যা নিয়েই তারা কোনও প্রশ্ন না তোলে। আর তাই এদের এই অশুভ কর্মসূচিকে প্রতিহত করতে এবং সরকারি উদ্যোগে দেশের মানুষের মধ্যে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারের দাবিকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে অবিলম্বে দেশ জুড়ে বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের সমাবেশ ঘটাতে হবে। এমন একটি শক্তির বিকাশ ঘটাতেই হবে যারা বিজ্ঞানী প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, মেঘনাদ সাহাদের অনুসরণ করে এই অপবিজ্ঞান প্রচারকারী হিন্দুত্ববাদী শক্তির মোকাবিলা করতে পারে এবং সাহসের সঙ্গে বলতে পারে, ‘মন্ত্রীমশাই, আপনি ঠিক বলেননি’ বা ‘রাজা তুমি উলঙ্গ’।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2331 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. খুবই প্রয়োজনীয় ও সবাইকে পড়ানোর মতো একটি লেখা।

আপনার মতামত...