গমন

বিশ্বদীপ চক্রবর্তী

 

আলো মরে যাওয়া আকাশ গভীর কালচে নীল। নীল? নাকি রক্ত শুকিয়ে জমাট হলে এমনি গাঢ় বেগুনিরং ধরে! তারাহীন নিষ্প্রাণ রাত্রির দিকে চেয়ে এরকমই মনে হল সুদর্শনের। কবে থেকে এমন বদলে গেল তার আকাশ? কেউ যেন একটা একটা করে আলো বোজানোর মত তারাগুলোকে লুকিয়ে ফেলেছে।

মৃত্যুর কথা সবসময়ে মনে নিয়ে ঘোরেন তেমন নয়। পরিচিত কারও শ্রাদ্ধে গেলে নানাজনের শেষযাত্রার কথা মনে বিনবিন করে ওঠে। বাবা মারা গিয়েছিল বাহান্নয়, সময়ের অনেক আগে। মা পঁচাশি। নিজের তো সত্তর পেরোল, দরজায় কড়া নাড়ার সময় হয়েছে এবার। এমনিতে জীবন নিয়ে ভাবতে ভালবাসেন সুদর্শন। তবুও কোনও কোনও রাতে ঘুম ভেঙে বিছানায় উঠে বসেছেন। আর কদিন বাদে তিনি যে কোথাও থাকবেন না সেটা এত স্বচ্ছ নির্দেশের মত মনে বেজেছে যে আর ঘুম আসেনি তারপর। ধীরে ধীরে ভোরের পাখিরা ডাকতে শুরু করেছে, ঝিল্লি জানালা দিয়ে আলো চুঁইয়ে চুঁইয়ে ঘরে ঢুকতেই দরজা খুলে পথে বেরিয়ে গিয়েছেন। নতুন ভোরের গন্ধ টেনেছেন বুক ভরে। প্রাণের আরাম পেয়েছেন দিগন্ত বিস্তৃত নীল চাঁদোয়ার নীচে।

যখন দিক দিশা হারিয়ে যায়, বুকের খাঁচায় অস্থিরতা টগবগ করে, চিরটাকাল প্রকৃতির মধ্যে ডুবে পথ খুঁজতে চেয়েছেন। খুঁজেছেন শান্তির আশ্বাস। আজ আর সেটা পারেন না। স্বস্তির বদলে এখন নাকে এসে ঝাপটা দিল দুর্গন্ধ। নোংরা পরিষ্কার করার লোকজন তো আর আসে না। গন্ধ যে শুধু রাস্তার আবর্জনা থেকে নয়, সেটাও বোঝেন সুদর্শন। অনেক বাড়ির ভিতর থেকেও পচা গলা গন্ধ বাইরে বেরোনোর পথ খুঁজে নিয়েছে। রাস্তার কুকুরগুলোর যেন মহোৎসব লেগেছে!

জানালার পাট টেনে বন্ধ করে ঘরের টিমটিমে আলোয় নিজেকে ফিরিয়ে আনলেন সুদর্শন। বাইরের দিকে তাকানো যায় না, ঘরেও অন্ধকার। আজকাল আর সব আলো ব্যবহার করা যায় না। একসঙ্গে বাড়িতে বেশি আলো জ্বালালে টানতে পারবে না। বইয়ের আলমারির সামনে টিমটিম করছিল একটা হলদে আলো। এটা বড় প্রিয় জায়গা সুদর্শনের। অনেক শখ করে একটা দেওয়াল জুড়ে বইয়ের তাক বানিয়েছিলেন, একদম ছাদ অবধি। হাজার কয়েক বই আছে তার। উপরের তাক থেকে বই আনতে মই লাগাতে হয়।

কোন বই নেবেন সঙ্গে? ওরা বলেছে সঙ্গে বেশি কিছু নেওয়া যাবে না। শুধু তিনটে বই নেবেন না হয়? তিনখানাতে অত বেশি জায়গা চলে যাবে না।

এভাবে তো ভাবতে হয়নি কোনদিন। যদি আর কোনও বই সঙ্গে না নেওয়া যায়, কোন তিনটে বই নেবেন সুদর্শন? এত এত প্রিয় বইয়ের থেকে শুধু তিনটে নেওয়ার ভাবনা দোলাচলে ফেলে দিল সুদর্শনকে।

দরজায় খুটখুট করে আওয়াজ। মণীষা।

বাবা, আমাদের হাতে খুব বেশি সময় নেই। তোমার জামা কাপড় গুছিয়ে নিয়েছ? আমি দেখে দিই? মণীষার পরনে ট্র্যাক সুট, মাথায় টুপি, পায়ে রানিং শু। গলায় ব্যস্ততা ঢাকার কোনও ত্রুটি ছিল না, তবুও সুদর্শন সেটা অনুভব করলেন। লজ্জাও পেলেন। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে কুণ্ঠিত হয়ে যাচ্ছেন, তার জন্য আর কারও যেন অসুবিধা না হয়।

আভা চলে গিয়েছে দশ বছর। নিজে নিজেই তো সব করেন সুদর্শন। কিন্তু কোন বই সঙ্গে নেবেন এই ভাবনায় এখনও জামাকাপড় নেওয়া হয়নি কিছুই।

না, থাক। আমি নিয়ে নিচ্ছি। আর শোনো বউমা, আমি আর কোন বই নিচ্ছি না সঙ্গে। সবই তো পড়া, খামোকা মায়া বাড়িয়ে কী হবে। সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন সুদর্শন। বই তার সন্তানের মত, পক্ষপাতিত্ব করতে পারেন না।

এক পা এগিয়ে এল মণীষা। ক্লান্ত চোখের পাতায় কোমলতা ডানা গুটোল। একটু আগেই যাওয়ার ব্যাপারে বাবার খুঁটিনাটি প্রশ্নে ভবেশ অহেতুক খেঁকিয়ে উঠেছিল। এই মানুষটার চেহারা এমনিতেই ভেঙে পড়েছে গত কয়েক মাসে। চোখের কোণে চিন্তার কালো ছায়া, সাদা দাড়িতে ঢেকে গেছে আগেকার পরিচ্ছন্ন মুখের অনেকটা। নিঃশব্দ ব্যাথায় তিরতির করে ওঠা চোখের দুই কোল মণীষার নজর এড়ায়নি। সেটা মাথায় রেখে যতটা সম্ভব নরম গলায় বলল, তুমি রাগ করেছ বাবা। আসলে তোমার ছেলের এখন মাথার ঠিক নেই। সবাইকে কীভাবে নিরাপদ করবে সেই ভাবনায়—

না, না আমি বুঝি। এটা তো আমাদের সৌভাগ্য যে আমাদের একটা যাওয়ার জায়গা হয়েছে। আচ্ছা মা, গুরুপদকে নেবে না ওরা? মনের মধ্যে এই ভাবনাটা অস্থির করছিল তাকে, জিজ্ঞেস না করে পারলেন না। গুরু সেই কতদিনের বন্ধু, প্রতিবেশী।

না বাবা, সেটা হয় না। তুমি জানো তো ওদের নিয়মটা। জেঠিমা মারা গেলেন, শুনুদারাও সবাই। বলতে বলতে গলাটা কি একটু কেঁপে উঠল মণীষার? শুনুর বউ ঝুম্পার সঙ্গে কি ভাব ছিল তার! পুরো পরিবারটার সঙ্গেই কতদিনের ওঠাবসা। অথচ কীভাবে চলে গেল সবাই, একে একে। সাহস করে পাশে গিয়েও দাঁড়াতে পারেনি। মৃত্যুর আর কোন মর্যাদা নেই এই করাল সময়ে। নেই শোকের জন্য এক চিলতে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ। যদি সরকারি ঠান্ডা গাড়ি এসে সময়ে ডেডবডি নিয়ে যায় সেটাই শেষকৃত্য। গলাকে দৃঢ় করার চেষ্টায় কেমন যেন নিষ্প্রাণ হয়ে গেল। শীতের শুকনো পাতা মড়মড়ে গলায় বলল, জেঠুকে কেমনভাবে নেবে ওরা? নিয়মকানুন ভেঙে তো নিতে পারে না।

তাই বলে গুরু একা থাকবে? এখানে?

একা নয়। পালিত বাড়ির সোমেন পালিত আর ওনার নাতি থাকবে। পরমা আর ওর শাশুড়ি, ওদেরও থেকে যেতে হবে। মণীষার গলার স্বর এতক্ষণে যান্ত্রিক স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজে নিয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এইসব উপায়হীনতা দৈনন্দিন জীবনের মত সরল সোজা। মন নির্বিকারে মেনে নিতে শিখে গেছে কত কিছু। ঠান্ডা মাথায় দুদণ্ড বসে ভাবার সময় থাকলে বাস্তবের সঙ্গে নিজের এই সমঝোতায় হতবাক হতে পারত মণীষা।

সমরেশ চলে গেল, একবার দেখতেও গেলাম না। সমরেশের ছেলেটাকে সেই ছোট থেকে বড় হতে দেখলাম, রাস্তায় দেখা হলেই কাকু কেমন আছ বলে দাঁড়িয়ে পড়ত। সেও চলে গেল, পাশে গিয়ে দাঁড়াতে পারলাম না। এখন যারা রয়ে গেল— কথা হারিয়ে যেতে যেতে ঘরের ঘোলাটে অন্ধকার গাঢ় হচ্ছিল। অসহায় চোখ মেলে সুদর্শন কিন্তু কিন্তু করলেন, কতদিনের চেনা লোক এরা, এদেরকে ফেলে চলে যেতে হবে?

উত্তর পাওয়া যাবে না জেনেই একটা দুঃখের হাসি দানা বাঁধছিল শুকনো ঠোঁটে। হ্যাঁ যাবেই বা কী করে। মহামারির আঁচে ওরা তো খুঁতো হয়ে গিয়েছে। আমাকেও কেন রেখে যাও না তোমরা? বয়েস আমার তো কিছু কম হয়নি। যেতে তো হবেই একদিন, কটা দিন আগে আর পরে। বলতে বলতে থপ করে চেয়ারে বসে পড়লেন সুদর্শন। এই বাড়ি, এই পাড়া, এই জীবন ছেড়ে যাওয়ার জন্য মনের থেকে কোনও সাড়া পাচ্ছেন না।

তাছাড়া যাচ্ছেনটা কোথায়? ঘড়ঘড়ে গলায় সেটাই জানতে চাইলেন। কোথায় যাচ্ছি আমরা? কেন? জায়গাটা কোথায় বউমা? এখান থেকে কতদূর?

জানি না, তোমার ছেলেও জানে না। কেউ জানে না। কাছে হতে পারে, কিংবা দূরে। হয়তো অনেক দূরে। কোনও দ্বীপে, কিংবা দূর পাহাড়ের কোলে কোনও উপত্যকায় যেখানে এখানকার কোনও বিষাক্ত হাওয়া পৌঁছাতে পারবে না। নতুন করে গড়ার কাজ শুরু হবে সেখান থেকে আবার। সবচেয়ে সজীব, সচল একদল মানুষ যাদের কোনও অসুখ কাবু করতে পারেনি তারা আবার ধাপে ধাপে গড়ে তুলবে মানুষের ভবিষ্যৎ।

সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট, তাই না বউমা। আমি কীভাবে ফিট করি বলো তো ওই ডেফিনিশানে? গুরু তো আমার থেকে আরও বেশি স্ট্রং, আমি কোনওদিন ওকে পাঞ্জা লড়ে হারাতে পারিনি। ওর ছেলে বউ মারা গেছে বলেই কি ও দুর্বল হয়ে গেল?

সেজন্য নয় বাবা, মৃত্যুর ছোঁয়া যাদের উপরে পড়েছে তাদের নেবে না ওরা। ফ্যামিলির কারও হলেও নয়, একসঙ্গে থাকুক আর নাই থাক।

আমাকে তোমরা ছেড়ে দাও। গুরুটা একা আছে। আমি বরং ওর সঙ্গে গিয়ে থাকি।

মণীষা সুদর্শনের কাঁধে মাথা রাখল। এমন করে বোলো না বাবা। তুপাইয়ের কথা ভাবো তো, তোমাকে ছাড়া ও কোথাও যেতে চাইবে?

তুপাইয়ের কথায় সুদর্শনের চোখে ছায়া পড়ল। নাতিকে বড় ভালবাসেন। ওকে ছেড়ে থাকতে খুব কষ্ট হবে। হয়তো তুপাইয়েরও। কিন্তু ও তো বাচ্চা, কদিন বাদে ভুলে যাবে সব।

তাহলে এই পাড়ার কেউ যাবে না আমাদের সঙ্গে?

কজনই বা বাকি ছিল বাবা? বেশিরভাগ বাড়িই তো খালি হয়ে গেছে। বলতে বলতে মণীষার গলা কেঁপে উঠল। মাত্র তিনমাস। কোথা থেকে কী হয়ে গেল, পুরো পাড়া খাঁ খাঁ করছে। কিছু কিছু বাড়িতে এক দুইজন নিবন্ত প্রদীপের সলতের মত এখনও দপদপ করছে।

মানুষ যখন মারা যায়, কোথায় যায় সেটা তো সঠিক কেউ জানি না। কিন্তু রয়ে যায় মানুষের মনে। যারা রয়ে গেল তাদের ভাবনায়। ছোট ছোট ছড়িয়ে থাকা টুকিটাকি, সারা জীবনের সংগ্রহ। মরে গিয়েও আরও কিছুদিন রয়ে যাওয়া। কিন্তু আমাদের এই যাওয়া, সবকিছু মিটিয়ে দিয়ে। কোনও কিছু থাকবে না পিছনে, কেউ থাকবে না মনে রাখার।

গলাটা পাকিয়ে উঠল মণীষার। দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে কোনওমতে বলল, আমরা তো একসঙ্গে থাকব বাবা, সেটা কিছু কম?

সুদর্শন দেওয়ালে হাত বোলালেন। মিয়োনো গোলাপি দেওয়াল জুড়ে রবীন্দ্রনাথের একটা বিশাল ছবি। দেওয়ালের রং নিয়ে একসময় কত আলোচনা। আভার মন রাখতে এই গোলাপি রং। ও শখ করে প্রিন্ট কিনে সাধন বাইন্ডার্সের থেকে বাঁধিয়ে এনেছিল। চল্লিশ বছর হবে এই ছবির বয়েস। এগুলোও তো কিছু রাখবে না আর। গলার মধ্যে শুকনো হাসলেন সুদর্শন। দেওয়াল থাকবে না, তার আবার ছবি!

মনে পড়ে সেই প্রথম বোনাসের টাকা দিয়ে জমি কিনেছিলেন। তারপর দেওয়াল তুলে এই ছাদের তলায় আসতে আরও তিন বছর। ভবেশের বয়স তখন ছয় আর বাণীর সবে দুই। জানো বউমা, যখন এলাম এই পাড়ায় কটাই বা বাড়ি ছিল তখন? শুধু আমরা আর গুরুপদ। একটা একটা করে বাড়ি গজাল, কত নতুন লোক, কতদিনের সম্পর্ক সব। শূন্য চোখে ফিরে তাকালেন সুদর্শন।

গড়তে কত সময় লাগে তাই না মা? কতগুলো বছর, কিন্তু ভেঙে গেল ঝুরঝুর করে। আটকানো গেল না।

নিজেকে সামলিয়ে খোলা স্যুটকেসে সুদর্শনের জামাকাপড় রাখছিল মণীষা। এই সবুজ পাঞ্জাবিটা নিই বাবা?

আমি কি আর ওইসব রং পরি এখন? আর এটা তো কোনওদিন পরেও দেখিনি।

জানি। মা কিনেছিল তোমার জন্য, শেষ পূজায়। তুমি তাই জমিয়ে রেখেছ। আমার ফেলে যেতে মন চাইছে না।

কিছুই তো থাকবে না মণীষা। এই বাড়িই থাকবে না, তোমার মায়ের কত স্মৃতিচিহ্ন রয়ে গেছে এই বাড়ির প্রতিটা দেওয়ালে। বলতে বলতে মনে পড়ল এই কমাস আগে শোওয়ার ঘরের দরজার পিছনে আভার কালো বর্ডার লাল টিপ খুঁজে পেয়েছিলেন একটা, এত বছর বাদে। ওখানেই রেখে দিয়েছেন, মাঝে মাঝে ছুঁয়ে দেখেন। সেসবই যদি চলে গেল, তাহলে আর একটা পাঞ্জাবিতে কী হবে?

যেটা আটকাতে পারব না, পারলাম না। তার জন্য যেটা নিতে পারি সেটা কেন ফেলে যাব বাবা? মণীষার অসীম ধৈর্য। জানে যে কোনও মুহূর্তে ভবেশ তাড়া লাগাবে। তবু যতটা সম্ভব সময় দেওয়ার চেষ্টা করছিল সুদর্শনকে। সোজা নয়, বুকের একটা একটা পাঁজর দিয়ে গড়ে তোলা এই ঘর সংসার পিছনে ফেলে চলে যাওয়া মুখের কথা নয়।

আচ্ছা তুমি ঠিক জানো, এই বাড়িটাকেও রাখবে না ওরা?

না, সব মাটিতে মিশিয়ে দেবে।

কিন্তু কেন, এই বাড়িতে তো কিছু হয়নি। অসহায় প্রতিবাদে গুমড়ে উঠল সুদর্শনের গলা।

তাতে কী বাবা, ওরা সব ধসিয়ে দেবে। নতুন করে গড়বে সব আবার, অবশ্য যদি প্রয়োজন হয়।

প্রয়োজন তো হবেই। তোমরা ফিরে এসে থাকবে কোথায়? জমির দলিল নিয়ে যাচ্ছে তো খোকা?

আমরা কবে ফিরব তার তো কোনও ঠিক নেই বাবা, আদপেই কি আর ফিরব? নিজের অজান্তেই গলাটা কেঁপে উঠল মণীষার। বাড়ি, জমি, দলিল কদিন আগেও এর দাম ছিল। এখন কানাকড়িও নয়।

তাহলে ফিরব না? কথাটা নিজেকেই ফিসফিস করে বললেন সুদর্শন। এ কেমন চলে যাওয়া, ফেরার রাস্তা বন্ধ করতে করতে? আচ্ছা বউমা, বাণীদের কোন খবর পেয়েছ? ওরাও কি আমাদের সঙ্গেই যাবে? একই জায়গায়।

কী বলবে মণীষা? সে আর ভবেশ ছাড়া কেউ জানে না বাড়িতে। বাণীর মেয়ে তুলিও যে মারা গেছে। আহা রে, তুলিটা। তুপাইয়ের থেকে তিন বছরের বড়। সদ্য ফোঁটা ভোরের ফুল, ঝরে গেছে। দীর্ঘশ্বাস গোপন করল মণীষা। বাণীদের আর নেবে কী করে তাহলে? এই খবরটা অবশ্য সুদর্শনকে দেওয়া হয়নি। নাতনিকে বড় ভালবাসেন, দুঃসংবাদটা নিতে পারতেন না। কথা ঘুরিয়ে দিল মণীষা। কোনও খবর পাওয়া যাচ্ছে না বাবা। ফোনেও তো যোগাযোগ হচ্ছে না আজকাল। তাছাড়া আমরা যে জায়গা পেয়েছি সেটাও তো শেষ মুহূর্তে।

ভবেশ একবার বাণীদের কথা বলতে পারত ওদের। সবাই মিলে একসঙ্গে থাকতে পারলে যে কোন জায়গাকেই আবার ঘর বানিয়ে নেওয়া যায় মণীষা।

বলা কওয়াতে কিচ্ছু হয় না বাবা, ওদের হিসাবনিকাশ অন্য জায়গায়। মণীষা মনে মনে ভাবল, ওরা যদি জানত বাণীদের সঙ্গে আত্মীয়তা আছে নিত নাকি তাদের? ভবেশ কত জোগাড়যন্ত্র করে নিজেদের পরিবারের হিসেব থেকে বাণীদের বাদ দিইয়েছে। একবার যদি ওদের ডেটা কানেক্ট হয়ে যেত, তাহলে তালিকায় অনেক নিচে চলে আসত তাদের নাম। তারপর শুধু এখানে বসে মৃত্যুর অপেক্ষা। নিজের মা বাবার কী ব্যবস্থা হচ্ছে তাও তো এখনও জানে না মণীষা।

সুদর্শন বন্ধ জানালার কাছে গিয়ে কান খাড়া করল। কেমন একটা শব্দ আসছে না বউমা? কুকুরের ডাক? এমন একটানা?

মণীষা এগিয়ে এসে জানালাটা খুলে দিল। শুনতে শুনতেই ওর মুখটা শুকিয়ে গেল। পরমাদের বাড়ি থেকে আসছে এই আওয়াজ। কারও বুক ফেটে কান্নার আওয়াজ। পরমার শরীর ভাল যাচ্ছিল না, তাহলে কি—

কাঁদছে কেউ। এত জোরে জোরে?

হ্যাঁ বাবা, মনে হচ্ছে মাসিমার গলা।

বিমল বিয়ে করে আসল, যেমন নিজে শান্ত, তেমনি ওর বউ শ্যামলী। কোনওদিন জোরে কথা বলতে শোনেনি কেউ। আমরা এই নিয়ে বিমলের সঙ্গে মজা করেছি। অথচ আজ দ্যাখো— সুদর্শনের না বলা শব্দগুলো হাওয়ায় হারিয়ে ঝুরঝুরিয়ে পড়ে গেল।

সময়, বাবা। বাঁচার লড়াই করতে করতে মানুষ নিজেকে কখন যেন হারিয়ে ফেলেছে, এতদিনের জমানো খোলস খুলে খুলে পড়ছে একেবারে। বলেই মণীষার মনে হল কোনটা খুলছে? সামাজিকতার খোলস না কি সভ্যতার অলঙ্কার?

হয়তো আমরা আমাদের সারল্য খুঁজে পাব আবার, পৃথিবীর সঙ্গে নতুন করে পুরনো যোগাযোগগুলো গড়ে তুলব। তাই না বলো? খুব আশা নিয়ে বউমার দিকে তাকালেন সুদর্শন। কোনওরকমভাবে একটা আশার যষ্টি খুঁজছিলেন যেন। নতুন পথে চলতে সুবিধা হবে। গলায় সেই দৃঢ়তা জুড়তে জুড়তে বললেন, এমনি এমনি তো কিছু হয় না, সব কিছুরই একটা কার্যকারণ থাকে। ধ্বংস না হলে সৃষ্টি কী করে হত বলো?

ছেলে ভুলানো গলায় বলল মণীষা, ঠিকই তো বলেছেন বাবা, শীতে পাতা না ঝড়লে বসন্তে নতুন মুকুল গজাবে কেন?

মণীষা! মণীষা!

ভবেশের গলা, এদিকেই আসছে। ওরা এসে যাচ্ছে, আর সময় নেই। বলতে বলতে ভবেশ ঘরে ঢুকে এল। বাবা কি তৈরি? এখুনি অ্যালার্ট মেসেজ এল, আর কয়েক মিনিটের মধ্যে আমাদের বাহন এসে যাবে। একি! বাবা এখনও তৈরি হওনি?

সতর্ক হল মণীষা। ভবেশের কাঁধে আলগা হাত ছোঁয়াল। লোকটা বড় অস্থির হয়ে আছে, কী বলতে কী বলে দেবে! এই তো বাবার দুটো জামাকাপড় ঢুকিয়ে নিচ্ছি। এক মিনিটে হয়ে যাবে।

লাভ নেই, সঙ্গে কিছু নিয়ে যাওয়া যাবে না। মেসেজে বলেছে, এখানকার কোনও জিনিস সঙ্গে নেওয়া যাবে না। একেবারে ঝাড়া হাত পা।

মানে? কোথায় যাচ্ছি, তার ঠিক নেই। জামাকাপড় সঙ্গে না থাকলে কীভাবে চলবে?

তুপাই এতক্ষণে লাফাতে লাফাতে এসে গেছে। দেখো না মাম্মা, বাবা কিছুতেই আমার কোনও গেমস নিতে দিচ্ছে না। বলছে আমাকে কোনও স্যুটকেস নিতে হবে না।

নিজের যখন উত্তর জানা নেই, তখন এতসব প্রশ্নের সামনে মাথা ঠিক রাখা যায় নাকি? খিঁচিয়ে উঠল ভবেশ। একি বেড়াতে যাচ্ছ না কি? সবাই নিজের নিজের স্যুটকেস গুছাচ্ছে! যত্তোসব! কিচ্ছু সঙ্গে যাবে না। এমনি খালি হাতে যেতে হবে, একদম।

বাইরে একটা অদ্ভুত ভোঁ বাজল।

এসে গেছে, এসে গেছে! ভবেশ একরকম টান মেরে দুজনকে দুইহাতে ধরল। মুখে বলল, বাবা আর দেরি কোরো না। চলো এবার।

ভবেশ আগে আগে চলল, পিছনে মণীষা। তারপর তুপাই। সব শেষে সুদর্শন। যেতে পা সরে না, আজকের যাওয়া যে একেবারে পিছনে না ফেরার যাওয়া।

বাগান পেরিয়ে সদর গেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল চার যাত্রী। বাইরে তাদের জন্য গাড়ি, অনেক লম্বা। অনেকটা এসি ট্যুরিস্ট কোচের মত। আবার একেবারে একরকমও নয়। দিন এখনও ফোটেনি, তাই স্পষ্ট নয়। একটা লম্বা কালো গাড়ি, কালো কাচ। সামনে দরজার সামনে একটা কেমন শুঁড় বের করা পাইপ।

গাড়ির সামনের কাচ একটু নেবে এল। একটা লোকের মাথা। ভাল করে দেখা যাচ্ছে না। শোনা গেল তার বজ্রগম্ভীর আওয়াজ। আপনাদের বলে দেওয়া হয়েছে সঙ্গে কিচ্ছু নেওয়া যাবে না।

থতমত খেয়ে গেল ভবেশ। হাতের এত কাছে এসে কোনও ভুলে এই সুযোগ যেন চলে না যায়। বুকের সব নিশ্বাস সঞ্চয় করা গলায় বলল, নিইনি তো, একদম খালি হাত। কিচ্ছুটি নেই সঙ্গে।

জামাকাপড় পরে আছেন কেন তাহলে? এখানকার কিচ্ছু সঙ্গে নেওয়া যাবে না। সব পিছনে ছেড়ে আসতে হবে।

থমকে গেল চারজনে। তা কী করে সম্ভব। হোক না এখনও অন্ধকার, তবু এই খোলা রাস্তায় কেমন করে জামাকাপড় ছেড়ে ফেলতে পারে তারা? সেটা তো অসম্ভব।

ভবেশ চেষ্টা করল, আমাদের জামাকাপড় পরিষ্কার, স্নান করে পড়েছি।

কিচ্ছু যায় আসে না। আমাদের সময় নেই, আসতে না হলে আমরা বেরিয়ে যাচ্ছি। কথার সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটা গর্জন করে উঠল।

ভবেশ পিছন ফিরে তাকাল। চোখ বলতে চাইল কিচ্ছু করার নেই। এটাই করতে হবে। মুখে বলল, তুপাই। জামাকাপড় খুলে গাড়িতে উঠে পড়ো।

না, আমি বড় হয়ে গেছি। আমি সবার সামনে নাঙ্গু পাঙ্গু হব না। তুপাই ঘাড় গোঁচ করে ডান হাতের আঙুলে মায়ের বাঁ হাতের তর্জনী জড়াল।

ইচ্ছা করছিল ছেলেটাকে ঠাস করে একটা চড় কষায়। কিন্তু রাগ চেপে রেখে, ভবেশ নিজের জামার বোতাম খুলতে শুরু করল। জামা, প্যান্ট, গেঞ্জি, জাঙ্গিয়া একে একে সব। আর পিছন ফিরে তাকানোর উপায় নেই। তার দেখাদেখি আর সবাই জামাকাপড় ছেড়ে এসে যাবে, এই ভরসায় নতুন পৃথিবীর বাহনের দরজার দিকে এগিয়ে গেল ভবেশ। ভবেশ দরজায় হাত রাখতেই সেই শুঁড়ের মত পাইপটা ফোঁস আওয়াজ করে একটু নিচে নেবে এল। ভিতর থেকে বেরিয়ে এল গরম ভেজা হাওয়া। ভবেশের সারা শরীর স্টিম বাথ করিয়ে শুঁড় আবার নিজের জায়গায় ফিরতেই দরজা সাঁট করে খুলে গেল। যেমন খুলেছিল, তেমনি বন্ধ হয়ে গেল ভবেশের পিছনে। ভিতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার, আর কে কে আছে এখুনি বোঝার উপায় নেই। হয়তো একটু পরে চোখ সয়ে গেলে দেখা যাবে। কিন্তু দেখতে চাইছিলও না ভবেশ। এই অন্ধকার তার নগ্নতার আড়াল হয়ে থাকুক। সামনে একটা সিটে বিপ বিপ শব্দ তুলে একটা গাঢ় লাল আলো জ্বলে উঠেই নিভে গেল। ক্ষণিকের সেই আলোতেই নিজের বসার জায়গা বুঝে বসে পড়ল ভবেশ। দেখতে পাচ্ছিল না ভালো। ভিতরটা এমন নিস্তব্ধ যে চারপাশে নিশ্বাসের ওঠাপড়া স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। বুঝল আরও অনেক যাত্রী আছে।

আওয়াজ পেল দরজা খোলার, কেউ ঢুকল। বোধহয় তুপাই।

তুপাইয়ের পরে মণীষা।

মণীষার পিছনে সুদর্শন।

গাড়ি গতি পেল। এগিয়ে চলল কোনও অজানা গন্তব্যে।

কতদূর জানা নেই।

কোথায় জানা নেই।

এখন শুধু অপেক্ষা।

আর এক জীবনের।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2331 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

  1. ব্যক্তিগতভাবে মনে হয় একটা সংকটকালে বসে যে শিল্পকর্ম তাতে সম্ভবত সংকট টাই বেশি ধরা পড়ে, শিল্প নয়। একটা দূরত্ব প্রয়োজন সম্ভববতঃ। এই গল্পটি পড়ে মত বদলেছি তা নয়। তবে , সংকটের পাশাপাশি গল্পটি বলা হয়েছে চমৎকার। কোনো সন্দেহ নেই এতে।
    জ্যোতির্ময়ী দেবীর একটি গল্প মনে পড়ে- দেশভাগের সময়, দাংগা চলছে-পূর্ববঙ্গ থেকে ট্রাকে চড়ে পালিয়ে আসবে একটি পরিবার- ট্রাক আসবে নির্দিষ্ট সময়ে, দেরি না করে উঠে পড়তে হবে; ছোটো মেয়েটির মা শেষ মুহূর্তে গয়নার বাক্স আনতে গিয়ে আটকে পড়েছিল- পরিবারের বাকি সবাই সীমানা পেরিয়ে চলে গেল তাকে ফেলেই-পরবর্তীকালে মেয়েটি যখন তরুণী তখন কলকাতার রাস্তায় এক ভিখারিনীকে দেখে রাতে হঠাৎ তার মার মুখ মনে পড়ে যায়-্পরদিন সে রাস্তায় গিয়ে সেই ভিখারিনীকে আর খুঁজে পায় না। ছোটোবেলায় পড়া-কথনে সামান্য ভুল হলেও হতে পারে।

    মহাসংকটের অভ্যন্তরে তথাকথিত ছোটো সংকট আরো ভয়ংকরভাবে আসতে পারত এই ছোটো গল্পে- আসি আসি করেও এল না।

    • মতামত শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ।
      একটা কথা ভেবে দেখার – সামনের দিকে তাকিয়ে লেখা আর পিছন ফিরে দেখার মধ্যে তফাত থাকবে। তারা এমনিতেই আলাদা গল্প হবে, আলাদা অবস্থান।
      প্রতিটা গল্পেই বিভিন্ন সম্ভাবনা থাকে। যেমন এই গল্পে সুদর্শন যদি র‍য়ে যেতো, তাহলে কি হত। সেকি পিছনে থেকে গিয়ে অন্য মাত্রা দিত। আমার মনে হয় তাহলে সেটা অন্য গল্প হত, যেটা এই গল্পের মূল ভাবনা নয়।

আপনার মতামত...