প্রসঙ্গ: অণুগল্পের সমালোচনা

বিলাল হোসেন

 



লেখক কবি, অণুগল্পকার। অণুগল্পের প্রচার ও প্রসার আন্দোলনে যুক্ত

 

 

অণুগল্প সম্পর্কে আমরা অনেকেই এমন আছি— পরামর্শ দেই, দৈনন্দিন সাধারণ কোনও গল্পের আলোচনায়। অণুগল্পের নানাদিক নিয়ে কখনও ভাসা ভাসা কখনওবা গভীরভাবেই কথা বলি। কথা বলার এই পর্যায়ে কখনও আন্তরিকতার সঙ্গে কখনওবা দায়সারাভাবেও পরামর্শ দেই— স্বীকার করি। অণুগল্পের বৈশিষ্ট্য বা অণুগল্পীয়বোধ থেকে আমরা যতটুকু শিখেছি, অর্জন করেছি বা আমাদের পর্যবেক্ষণের এন্টিনায় যে ছায়াটুকু ধরা পড়ে, তার সঙ্গে অধীতবিদ্যার মিক্সচারে বুদ্ধিজাত মন্তব্য করি। করতে বাধ্য হই। এই আলোচনা-পরামর্শ থেকে কয়েকটি ফলাফল আমাদের দৃষ্টিতে ধরা পড়ে। দেখতে পাই, অনেক লেখকই তার গল্পের আলোচনা থেকে ভালমন্দ নির্যাসটুকু নিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের লেখাকে পরিশীলিত করে এমন একটা উচ্চতায় নিয়ে যান— বাহবা দিতে বাধ্য হয় সবাই। তারা পরিবর্তন হবেন, পরিমার্জিত হবেন— এমন মানসিকতা নিয়ে লিখতে আসেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই পরিবর্তিত-পরিমার্জিত হয়েই লিখিত গল্পের আলোকচ্ছটায় আলোকিত করেন চারপাশ। ধীরে ধীরে তারা ছোট লেখক থেকে বড় লেখকে পরিণত হন। তাদের প্রকাশনা হয়। অণুগল্পের বই বের হয়। লিটল ম্যাগ সহ বিভিন্ন সাহিত্যপত্র তাদের অণুগল্প ছাপে। আবার একদল নতুন লেখকদের আগমন ঘটে অণুগল্পে। তাদের নিয়ে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে। নতুন থেকে নতুনতর লেখকের গল্প নিয়ে অণুগল্পলেখকরা নানা পরামর্শ দিয়ে দিয়ে অণুগল্পীয়বোধ লেখকের মধ্যে পুরে দিতে থাকেন। ছোটরা বড় হয়, বড়রা আরও বয়স্ক হয়ে ওঠেন।

এর ব্যতিক্রমও আছে। যেমন—

আমাদের অণুগল্প গ্রুপে/ আর্কাইভে কত ভাল ভাল অণুগল্প আছে, বইপত্র প্রকাশিত হয়েছে, ডকে আছে, ইবুক আছে। অণুগল্প বিষয়ক কত কত আলোচনা আছে। কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস কিছু কিছু লেখক সেসবের কিছুই পড়েননি বা পড়লেও গ্রহণ করেননি।

তারা আপন মনে লিখেই যাচ্ছেন, লিখেই যাচ্ছেন। তাদের লেখার মধ্যে অণুগল্প বিষয়ক কোনও লক্ষণই নাই। লেখাটাই তো মুখ্য না। অক্ষরে বর্ণে লেখাই যায়, লিপিবদ্ধ করাই যায়। তাই বলে আমি লিখতেই থাকব? যে লেখাটি তিন মাস আগে লিখেছি, আর এখন লিখছি যে লেখাটি— এই দুয়ের মধ্যে অবশ্যই অবশ্যই তফাত থাকবে। শব্দ বাক্য ঘটনার বয়ানে তফাত থাকবেই। কিন্তু কিছু লেখকের বেলায় কোনও পরিবর্তনই হচ্ছে না। মাঝেমধ্যেই ভাবি কেন এমন হচ্ছে—

তারা কি নিশ্চিত তাদের লেখা/ গদ্য ভাল হচ্ছে?
তারা কি নিশ্চিত তারা অণুগল্পের রসায়নটি বুঝে ফেলেছেন?
তারা কি নতুন টাইপের অণুগল্প হাজির করছেন?
তারা কি অণুগল্পের প্রচলিত ঘরানাটি পছন্দ করছেন না?

আমি ঠিক জানি না এর ভেতরের সংবাদ। কেন তাদের পরিবর্তন নাই। পরিবর্তন হয় না।

তাদের গল্পের মধ্যে অণুগল্পের তীক্ষ্ণতা নাই কেন? একটি অণুগল্প লিখতে গেলে যেসব করণকৌশল আমরা ব্যবহার করে একটি অণুগল্প দাঁড় করাই— আছে সেসব তাদের গল্পে?

গিজগিজে মেদ, থকথকে শব্দের কাদা, অপ্রয়োজনীয় বাক্য, ভুল বাক্য, ইমেজ সৃষ্টিতে ব্যর্থ, ভোঁতা আখ্যাননির্ভর কিছুর গণচাষ হয় কেবল কোনও পরামর্শ না-নেয়া সেসব লেখকদের লেখা জুড়ে।

কোথায়— শুরুর ম্যাজিক?
কোথায়— রহস্যময়তা?
কোথায়— বহুস্বর?
কোথায়— উল্লম্ফন?
কোথায়— মহামুহূর্ত?
কোথায়— অভিঘাত?
কোথায়— ফ্রেমওয়ার্ক?
কোথায়? কোথায়? কোথায়?

কিছু নেই। কোথাও কিছু নেই।

অন্যদিকে, আবার এমনও হচ্ছে, অনেক আলোচক আলোচনায় আসছেন, আগ্রহ নিয়ে সময় দিচ্ছেন; আন্তরিকতার শেষ নাই সেইসব আলোচনায়। কিন্তু আলোচনায় এমন সব তথ্য আর তত্ত্ব দিচ্ছেন সেইসব নিয়েও কমবেশি বলার আছে। অনেক আলোচক এমনভাবে আলোচনায় এসেছেন, পরামর্শ উপদেশ দিচ্ছেন—গল্পলেখকরা সেসব গ্রহণ করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। নতুন লেখক মিসগাইডেড হবে।

আবার এমনও দেখা যায়, লিখতে লিখতে যেমন লেখক একইভাবে আমি মনে করি আলোচনা করতে করতে আলোচক। অণুগল্পের দুনিয়ায় লেখক যেমন দরকার একইভাবে আলোচকও দরকার। চাইছি, একটা আলোচক দল তৈরি হোক। পুরাতন অনেক আলোচক, যারা একসময় গল্পের ব্যবচ্ছেদ করতে ভালবাসতেন, তারা এসে দু-এক লাইনের মন্তব্য লিখেই পুলক অনুভব করেন। নতুন লেখকদের প্রতি তাদের তেমন পরামর্শ নেই। তারা মনে করেন— তাদের যা কিছু বলার, বলে দিয়েছেন যখন তারা প্রচুর আলোচনা করতেন। এখন নবীন লেখকদের জন্যে পুরনো কথা ঘাটতে ভাল লাগে না। তাদের এই বক্তব্য থেকে এই কথাই বোঝায়, তারা থেমে গেছেন। তাদের চিন্তাশক্তি রুদ্ধ হয়ে গেছে। অণুগল্প একটি নবীন ধারা, শীর্ণদেহে এগিয়ে যাচ্ছে বলিষ্ঠতার দিকে, সবরকমের সম্ভাবনা নিয়ে, নানা বাঁক নিচ্ছে, রং পালটাচ্ছে প্রতিদিন। অইসব আলোচকরা/ সমালোচকরা তার কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। এই রং, এই পরিবর্তন, এই সম্ভাবনা— সবকিছু থেকেই তারা পেছনে পড়ে আছেন। নবীন অণুগল্পকারদের জন্যে যে নবীন তথ্য দিয়ে এগিয়ে নিতে হবে— তারা ভুলে গেছেন। তাদের চিন্তাসূত্রটি ছিঁড়ে যাওয়াতে আর কিছুটা সময় ব্যয় হয়ে যাওয়াতে এক বদ্ধবিবরে আটকে গেছেন আলোচকরা।

আবার লক্ষ করা না গেলেও আমার অনুভবে ছুঁয়ে যাচ্ছে আরও কিছু বিষয়। আলোচকরা কি আলোচনা করাকে সময় নষ্ট বলে ভাবেন? হতে পারে। তবে এটা তাদের ভুল ভাবনা, সঙ্কীর্ণ ভাবনা। তাদের এই ভাবনার মূলে আছে অজ্ঞতা। একজন ভাল অণুগল্পকারই একজন ভাল আলোচক হতে পারেন। একজন অনুসন্ধানী আলোচক সারাজীবনে একটি অণুগল্প না লিখেও অণুগল্পকারের চেয়েও বেশি সম্মান মর্যাদা নিয়ে সাহিত্যে অবস্থান নিতে পারেন। অণুগল্প-সাহিত্যের এই প্রথম দশকে অণুগল্প নিয়ে যারা-ই কাজ করবে, যতটুকুই করুক— তারা সবাই ইতিহাসের অংশ হবেন। যারা ভাবেন আলোচনা/সমালোচনা করা একটি তুল্যমূল্যে হীন কাজ তাদের উদ্দেশ্যে অণুগল্পের অস্তিত্ব আছে— বই থেকে একটি অংশ তুলে ধরছি প্রাসঙ্গিক বলেই।

একটি অণুগল্প লেখার কৌশল, এর কাঠামো, গদ্যশৈলী সহ লেখকের অনুভবের কাছাকাছি গিয়ে এর ভেতরগত যে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে সব কিছু এই সমালোচকের দৃষ্টির ভেতরে থাকে। তিনি আলো ফেলে ফেলে দেখে নেন গল্পের আনাচেকানাচে লেখক কীসব ইন্দ্রজালের ফাঁদ পেতে রেখে পাঠকদের আটকে রাখার ব্যবস্থা করেছেন। তিনি দেখেন ফাঁদ-পাতা এই গল্পের শব্দে-পংক্তিতে কতটুকু কৌশলের আধার পাঠকদের জন্যে দিয়ে রেখেছে। সমালোচক হচ্ছেন এই কৌশল-আবিষ্কারক।

গল্পকার তাঁর গল্পে একটি নদীর ধারা বইয়ে দেন, এই ধারাটি ক্রমে ক্রমে পাঠকদের ভেতরে প্রবাহিত হয়—এই ধারাটি হল— রসের ধারা। সাধারণ পাঠক বুঝতেই পারেন না, কোন রসে তিনি সিক্ত হয়েছেন। এটি জানেন— সমালোচক। সমালোচক-ই প্রকৃত রসজ্ঞ। তিনি রসের পরিচয় পান, একে পান করেন এবং সাধারণ পাঠকের কাছে সে রসের ধারাটিকে নিয়ে যান। রসিক সমালোচক না থাকলে সাহিত্য রসের অধিকাংশ ধারাই অনাবিষ্কৃত থাকত। ধারা শুকিয়ে মরে যেত, লুপ্ত হয়ে যেত। সমালোচক হচ্ছেন লেখক-পাঠকের মধ্যে সম্পর্কস্থাপনকারী— সেতু বিশেষ। আর এই কারণেই লেখকেরা সাহিত্য সমালোচকদের এত বেশি কদর করেন।

কেউ কেউ বলেছেন— সমালোচকের কাজ এক হিসেবে রস স্রষ্টার চেয়েও বড়। লেখকেরা লেখেন একটা ভাবের আবেশে। তিনি ধ্যান করেন, ধ্যানস্থ অবস্থায় যা কিছু পেয়ে যান— সেটিই লিখে থাকেন। কবি লেখকদের আহরিত সেসব পংক্তি, বাক্যবন্ধ অনেক সময়ই দুর্বোধ্য আর রহস্য ঘেরা হয়ে থাকে। সৃষ্টির সেইসব মূল্যবান হীরক জ্যোতিকে অন্ধকারময় গুহার কন্দর থেকে মুক্তি দেন একজন সমালোচক। সমালোচক রসের মুক্তিদাতা।

একজন সমালোচক সমালোচনার মধ্যেই বাঁচেন। সেক্ষেত্রে সমালোচনা হচ্ছে তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন। সাহিত্য-রসকে কেন্দ্র করে, বা সাহিত্য রসকে ‘বিষয়বস্তু’ করে তাঁর এই কর্মকাণ্ড তাঁকেই মহৎ করে তোলে। সাহিত্য রস-ই হচ্ছে তাঁর আরাধ্য। তাই তাঁকে একে চিনতে হয়। এই চিনতে পারার মধ্যেই তাঁর সাহিত্যিক বিজয়।

অণুগল্পের বিকাশ এবং প্রচারের ক্ষেত্রে যেমন শক্তিশালী অণুগল্পকারের অভাব রয়েছে, আমি বলতে চাচ্ছি এই স্বল্প মুহূর্তে যে পরিমাণ লেখক আছেন— বেশ আছেন; কিন্তু অণুগল্পের ধারণা এবং এর স্বাতন্ত্র্য সম্পর্কিত স্পষ্ট ধারণা না থাকাতে বিশুদ্ধ অণুগল্পকার এখনও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিশুদ্ধ অণুগল্পকার কাকে বলে এই নিশ্চয়তাকাল এখনও সামনে আসেনি তাই বলা যাচ্ছে না অনেক কিছুই। অনেক কিছু লেখা হচ্ছে অণুগল্পের নামে— ধরে নিতে হবে এটাই এখন পর্যন্ত সাফল্যমণ্ডিত কথা— যা কিছুদিন আগেও ছিল না।

অণুগল্পের বিকাশ প্রসারে এই মুহূর্তে একদল সমালোচকের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, যাঁরা অণুগল্পের ধ্যানধারণাকে, এর বৈশিষ্ট্য, এর উপাদান, এর কাঠামো সবকিছু বর্তমান অণুগল্পকারদের লিখিত গল্প থেকে চয়ন করে উদ্ভাসিত করবেন জনসম্মুখে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2336 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...