শিরদাঁড়া সোজা এক মানুষ ছিলেন ঊষাদি

সুজয়প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

 




লেখক বাচিক শিল্পী ও অভিনেতা

 

 

 

ঊষা গাঙ্গুলির সঙ্গে আমার পরিচয় মায়ের সূত্র ধরে। উনি আমার মায়ের বন্ধু ছিলেন। মাকে খুব ভালোবাসতেন, সেই সূত্রে আমাকেও। মায়ের কাছে যখনই আসতেন, বা আমরা যেতাম, নাটকের কথা বলতেন। থিয়েটারের কথা বলতেন। বলতেন, এই নাটকটা দেখোনি, ওই নাটকটা? ঠিক আছে, টিকিট রাখা আছে। এভাবেই মানুষটার সঙ্গে আমার পরিচয়। প্রথম কবে শুরু হয়েছিল সেই আলাপ মনে নেই। তবে সবটুকুই মায়ের সঙ্গে বন্ধুত্বের সূত্র ধরেই। ওঁর থিয়েটারের সঙ্গে আমার একটু পর থেকে পরিচয়।

ঊষাদি ভারতীয় থিয়েটারের ইতিহাসে শিরদাঁড়া সোজা রাখার লেগ্যাসি তৈরি করে দিয়েছিলেন। নিজেও ছিলেন মেরুদণ্ড টানটান করা এক ব্যক্তিত্ব। নাটকের মধ্যে দিয়ে মেয়েদের কথা, নিপীড়িত শ্রেণি, অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষের কথা প্রবলভাবে এনেছেন। তাদের কথা ঊষা গাঙ্গুলির পর আর কে ভারতীয় থিয়েটারে এত ধারাবাহিকভাবে একটার পর একটা নাটকে তুলে ধরছেন, আমার অন্তত চোখে পড়ছে না। নাটকের মধ্যেও সাহসের কথা, শিরদাঁড়া টানটান করে হেঁটে যাওয়ার কথা বলেছেন। থিয়েটারে পুরুষতন্ত্রের দাপট ভেঙেছেন। যেভাবে হিন্দি থিয়েটারকে সেই পুরুষতন্ত্রের মধ্যে থেকেই তার বিরুদ্ধে লড়াই করে ভারতীয় শিল্প সংস্কৃতির মূল আঙিনায় তুলে এনেছেন, তার বিকল্প হয় না। এনেছেন মেয়েদের কথা। মনে পড়ছে তাঁর রঙ্গকর্মীর বিখ্যাত প্রোডাকশন ‘হাম মুখতারা’-র কথা। মুখতার মাই এবং তাঁর জীবনের সমস্ত অত্যাচারের কথা উঠে এসেছিল নাটকে।

মনে আছে, আমার একটা অনুষ্ঠানের স্মৃতি। কলকাতার প্রতি বছর ‘মনোলগ’ নামে একটা সোলো আর্ট ফেস্টিভ্যাল করি আমি। ঊষাদি জীবনে প্রথমবার সেখানে ‘রোজানা’ নামের একটি একক নাটকে অভিনয় করেন। অনবদ্য উপস্থাপনা ছিল সেটি। মঞ্চসজ্জাও ছিল দেখার মতো। করেছিলেন সঞ্চয়ন, অর্থাৎ সঞ্চয়ন ঘোষ। মনোলগের সেইসব স্মৃতি ভুলব না।

ঊষাদির থেকে কত কিছু শেখার আছে। নিয়মানুবর্তিতা। পরিমিতিবোধ। তাঁর কাজে, জীবনে একই মন্ত্র শিখিয়ে গেছেন তিনি। মানুষকে দৃঢ়, সোজা থাকতে বলেছেন। সেইসব শিক্ষা তার বন্ধু, সহকর্মী, অনুজদের মধ্যে সঞ্চারিত করে দিয়েছেন। আমৃত্যু।

কোন কোন কাজের কথা আলাদা করে বলব জানি না। ‘হাম মুখতারা’-র কথা বলেছিলাম আগেই। ‘কোর্ট মার্শাল’, ‘কাশীনামা’, ‘অন্তর্যাত্রা’, ‘হিম্মত মাই’, ‘মহাভোজ’, ‘রুদালি’— আরও অনেক কাজের কথা মনে পড়ছে। ‘খোঁজ’ বলে একটি একেবারে অন্য ধরনের কাজ করেছেন।

মানুষ ঊষাদি এত প্রাণবন্ত ছিলেন, কী বলব। যখনই যেতাম, সিঙারা খাওয়াতেন। শুধু আমাকে না, যিনি আসতেন দেখা করতে, তাঁকেই খাওয়াতেন। কোথা থেকে যে সেই সিঙারা আনতেন, কাউকে বলতেন না। কী যে অসামান্য খেতে, কী বলব। মানুষটার স্মৃতিচারণে সেইসব ছোট ছোট মজার, আনন্দের কথাগুলোও ভুলব না।

শেষ কথা হয়েছিল সপ্তাহ দুয়েক আগে। কেমন আছ, এইটুকুই কথা।

বছরটা ভালো যাচ্ছে না। ঊষাদি নেই। ইরফান চলে গেল। মন খারাপ খুব ….

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2454 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...