দশচক্র

দশচক্র

সৌগত ভট্টাচার্য

 

দশাবতার! না, ঈশ্বর নামক কোনও মহাশক্তিশালী অদৃশ্য ধারণার নয়, মানুষের। দশটি মুখ, মুখোশের আড়াল আরও উন্মুক্ত করে দিল যাদের অন্তরজগতের দুনিয়াটা। ঘরবন্দি গত একমাসে এভাবেই ছাদ, বারান্দা, জানলা, গেটের সামনে বিভিন্ন উঁকিঝুঁকি-সম্বল, নিরাপদ স্থির জীবনে যাঁদের ছায়া লেন্সে এসে আটকে গেল নানাভাবে। দৃশ্য জন্ম দিল যেসব টুকরো কথার, বাস্তব হয়তো তার চেয়ে অনেক বেশিই রূঢ়।

 

জীবন

শাদির সময় শেষ দেশে গেছিল রামপ্রতাপ। আর কখনও দেশের বাড়ি যাওয়া হয়ে ওঠেনি তাঁর। বরং দেশের থেকেই এক এক করে সবাই এখানে চলে এল। কদমগাছতলায় রিকশা স্ট্যান্ডে রামপ্রতাপই সবচেয়ে সিনিয়র রিকশাওয়ালা। সকালে কমলিকে নিয়ে রিকশা চাপিয়ে কদমগাছতলায় নিয়ে আসত রামপ্রতাপ। কমলি সারাদিন পর রামপ্রতাপের রিকশায় বাড়ি ফিরত। দূরের মানুষ ঝাপসা দেখে রামপ্রতাপ। পাড়ার কোনও সহৃদয় বাবু তাঁকে চশমা বানিয়ে দিয়েছিল। ধুতির পাড়ে চশমা মুছলে যদিও কিছুটা স্পষ্ট করে পৃথিবীকে দেখা যায় কিন্তু পা তো আর নড়ে না… পাশ দিয়ে যাওয়া বিলাসী টোটোর হাওয়া রামপ্রতাপের চোখে মুখে লাগে।

আটষট্টির বন্যার সময় জল এসেছিল ঘরের ভেতর। সেই বছরই ছোট ছেলে জীবনের জন্ম। জীবন মাস খানেক হল বাইরে কাজের থেকে ফিরেছে। মালিক কাজে রাখেনি। জীবন যখন কাজ কাম করত, কমলি মারা যাওয়ার পর রামপ্রসাদকে বলেছিল আর রিকশা চালাতে না। পরিযায়ী শ্রমিক জীবন দুই তিন হপ্তা ঘরে ফিরেছে।

রামপ্রতাপ আবার ওর রিকশা নিয়ে বেরিয়েছে।

মুখের সহস্র বলিরেখা দিয়ে সেই আটষট্টির রাতের মতোই বন্যার জল ঢুকছে। মাথার চুলের মতোই কদমগাছটা যেন শুধু জেগে আছে রাতের অন্ধকারে, যেখানে সারা হাতে উল্কি পরে কমলি বসে থাকত। রাতের অন্ধকারে বন্যার জল দেখা যায় না। চোখ বুজে আসে রামপ্রতাপের। একটা তিরিশ টাকার সস্তা মাস্ক এই বানের জল আটকাতে পারবে কি না রামপ্রতাপ জানে না।

শুধু জানে তিরিশ টাকা মানে তিনটে ভাড়া। সারা জীবন তো অপেক্ষাই করে গেল জীবনের বাপ! আবারও করবে। চোখ ঝাপসা হলেও স্বপ্ন আজও স্পষ্টই তো দ্যাখে রামপ্রতাপ!

 

আড়াল

পুলিশ বলেছে এখন কয়দিন দারু খেতে না, তাই গাঁজা নিয়ে ঘুরছে ছোটকা। লিনেনের একটা ঢোলা জামা কাঁধের থেকে নেমে যাচ্ছে। পুরানো জামাটা ভালোবেসে দিয়েছিল ভাটিখানার মালিক বাবলু। বাবলুর চেহারা বিরাট, ওর সাইজের জামা। রিকশার সিটের তলায় মাল সাপ্লাই করার জন্য ছোটকা বাবলুর প্রাইভেট রিকশা। মাল সাপ্লাই মানে ছোট শহরে দারু কিনতে লজ্জা পাওয়া ভদ্রলোকের জন্য হোম ডেলিভারির ব্যবস্থা। মাস খানেক হল দারুর সাপ্লাই নেই, ডেলিভারিও নেই। মুখে একটা হাসি ঝুলে থাকে তাঁর। গলার গামছাটাই তাঁর মাস্ক। ছোটকার ধারণা সে রিকশা না চালিয়ে গান গাইলে একদিন সে বিরাট গায়ক হত। একা হিন্দি গান গাইতে গাইতে হঠাৎ করে ফাঁকা হয়ে যাওয়া শহরে রিকশা চালায় ছোটকা। সামনে শুধু জনমানবহীন একটা পৃথিবী।

ছোটকার খুব হাসি পায়। মানুষকে দেখে। মুখোশ পরা মানুষগুলোকে দেখে। ছোটকার হাসি যেন থামতেই চায় না। সব শালার লুকনো মুখোশ এইবার সামনে এসে গেছে কেমন! ও কিরকম যেন টের পায় মুখোশ পরা মানুষগুলো তাঁর রিকশার সিটের নীচে গাদাগাদি করে ঘাপটি মেরে আছে। আর সে জনশূন্য এক শহরে গান গাইতে গাইতে রিকশা চালাচ্ছে, “মুসাফির হুঁ ইয়ারো…না ঘর হ্যায় না ঠিকানা…”

 

নিরাময়

খবরের শেষাংশ অংশ পাঁচের পাতায়। সেটাই খুঁজছিল সন্তোষ। অন্য খবরে চোখ পড়ে যাওয়ায় সেটাই পড়তে লাগল। সেখানে ছোট্ট করে লেখা আছে, এক রাজ্য সেলফির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। সম্পাদকীয়র পৃষ্ঠা কোনও কালেই পড়ে না সন্তোষ। সন্তোষ চশমাটা তুলে টুক করে নিজের রাশিফল দেখে নেয়। ঝাপসা দেখায় সেই রাশিফল। সিনেমার খবর তেমন কিছু নেই। কে বাসন মাঝছে কে নাচ করছে এই খবরে ভর্তি। পরিযায়ী শব্দটা সন্তোষের কাছে নতুন। তেমন অনেক নতুন শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে এই সময় সে। কিন্তু তাঁর ব্যস্তসমস্ত দৃষ্টি কী যে খুঁজে যাচ্ছে সন্তোষ নিজেও জানে না। বড় বিক্ষিপ্ত সে দৃষ্টি!

সকালে ঘুম থেকে উঠে খবরের কাগজে তন্নতন্ন করে কিছু একটা খুঁজে যাচ্ছে সন্তোষ। আসলে ব্যস্ত মুখে  নিজের ভেতরের গভীর একটা ক্ষতর নিরাময় ঔষধি খোঁজে সকাল বিকেলে। যে খবর পড়তে পড়তে হারিয়ে ফেলে মৃত্যুর সংখ্যা, লকডাউনের দিন সংখ্যা, কেন্দ্র রাজ্য গরমিল সংখ্যা! আবার সস্তার রিডিং গ্লাসটা চোখে তুলে নিয়ে দুই হাতকে যতদূর সম্ভব প্রসারিত করে গোটা পৃথিবীর সব খবর কে বুকে টেনে নিতে চায় সন্তোষ। সিনেমা ক্রিকেট রাশিফলের খবর বাদ দিয়ে হৃদয় নিরাময়ের খবর কোথায় প্রকাশিত হয়, কোন কাগজের কোন পাতায়!

 

আলো

একটা গোল ঝুড়ির মধ্যে সকালের সূর্যের যত রং আটানো সম্ভব সব কয়টি রং জড়ো করে সূর্য মাথায় নিয়ে হেঁটে আসে রাধা। সেই সকাল থেকে সূর্যের সঙ্গে দৌড়োদৌড়ি। ভেজা শাক পাতার জল গড়িয়ে পড়ে মুখ দিয়ে, মিশে যায় ঘামের সঙ্গে।

রাধার ডাক ম্লান হয়ে আসে ঘুম ভাঙা শহুরে পাড়ায়। শাকের মতোই তুচ্ছ যাপন রাধার। মাথার ওপর শাকের ঝুড়ি, সূর্য এসে ছোঁয় না তাঁর গাল, শুধু বোশেখের তাপ অনুভব করে। প্রতিটা গলির রেখাপথগুলো তাঁর মত নির্বাক হয়ে গেছে কিছুদিন হল। স্পর্শে ভয়ের চিহ্ন স্পষ্ট। তুচ্ছ শাকপাতার স্পর্শেও মানুষের ভয়।

তবু বাড়িতে পঙ্গু স্বামী, ছেলের ইশকুল, মেয়ের মাধ্যমিক। রাধার মুখে পড়ন্ত বেলার সূর্যের ছায়া পড়ে। লতার সঙ্গে স্পর্শ পাতার সঙ্গে স্পর্শ ক্রমশ কমে যায় রাধার। সূর্যের সব রং ঝুড়িতে আঁটাতে পারলেও বিক্রি করতে পারে না  রাধা। আগের মতোই সকালে সূর্য ওঠে, গোল ঝুড়িটার একই মাপ। কমে যায় শুধু সবুজের কেনাকাটা। সূর্যের আলো ঝুড়ির ছায়া গ্রহণ হয়ে পড়ে রাধার গোল মুখে। ওর শাকান্নের সংসারে যেন রাহুর ছায়া না পড়ে… টলতে টলতে রাধার ছায়াটা মিলিয়ে যায় গলির বাঁকে।

 

বোঝা

পাঁচ ছয়টা ব্যাগ সাইকেলের হ্যান্ডেলে সেই কবে থেকে ঝুলে আছে। ব্যাগগুলোর সঙ্গে যৌবন চলে গেছে কবে জানতেও পারেননি নারায়ণ। পাড়ার মোড়ে বৃদ্ধ পাকুর গাছের তলায় বুড়ার চায়ের দোকান। তাঁর মুখের মত ভাঙাচোরা সাইকেলটাকে বৃদ্ধ গাছের হেলান দিয়ে রাখে নারায়ণ। বুড়ার দোকানের অর্ডার মত সাপ্লাই করে লোকাল বেকারির পাউরুটি বান বিস্কুট। বুড়াকে এককাপ দুধ-চা করতে বলে হিসেবের খাতায় টুকে নেয় জীবনের দেনাপাওনার হিসেব!

চায়ের কাপ নামিয়ে স্টেশন কলোনি বা বস্তি এলাকায় ফেরি করতে যেতে হয় নারায়ণকে। কিছু রাস্তার পাশের বাঁধা ধরা দোকান আছে সেখানে মাল সাপ্লাই দেয় সে। ভদ্রলোকের পাড়া ওর জিনিস খুব একটা পছন্দ করে না। কিন্তু বিক্রি হলে হাতেগরম পেমেন্ট। বস্তি কলোনি এলাকায় ঠিক উল্টো গল্প। ভাঙা প্যাডেলে পায়ের চাপ দেয় নারায়ণ। আজ যেন ভারী ব্যাগের জন্য হ্যান্ডেলটা বেশিই কাঁপছে নারায়ণের সাইকেলের। নাকি এই কাঁপুনিটা তাঁর নড়বড়ে বেঁচে থাকা!

নারায়ণ নিরাসক্ত তাকিয়ে থাকে সময়ের দিকে। চোখ শুধু টুকে রাখে বাতাসের গতিবিধি। অনিশ্চয়তার অন্য দিকে রুপো জমে চুলে। কিছু কি পিছু পড়ে রয়ে গেল, অজানিতে?

 

স্বপ্ন

চৈত্রের হওয়ায় উড়ে গিয়েছিল নিমন্ত্রণ লিপি স্টেশন কলোনির ঘরে ঘরে। একটা স্টিলের খাট আর দুটো ব্রোঞ্জের ওপর সোনার জল করা চুরি আর দুটো বালিশের সংসার পাতার দিন গুনছিল বৈশাখ মাস। তপ্ত বৈশাখ ছিল উষ্ণতার অপেক্ষায়। পারুলের রাত-ফোন পেয়েছিল নীরব সম্মতি।

ননীর সুজনদার বাচ্চাদের জামাকাপড়ের দোকান। ননী দীর্ঘদিন ধরে নানা সাইজের স্বপ্ন বেচে! মার্চের মাস মাইনে ধরিয়ে সুজনদা “আপাতত” আসতে না বলেছে ননীকে। ছোটদের জামাকাপড়ের দোকানের কর্মচারী ননীর চিনতে অসুবিধা হয়নি এক টুকরো রংবাহারি মুখোশের ভবিষ্যতের ধূসর রংটুকু। বায়না করা সামান্য গয়নার গোলাপি ক্যাশমেমো কালবৈশাখীর হাওয়ায় লাট খায়।

ননী সাইকেল ভর্তি সবজি নিয়ে বেড়িয়ে পরে পাড়ায় পাড়ায়। সকালে বৃষ্টির পর আবার ঝড়ের পূর্বাভাস লেখা থাকে একমাসে বয়স বেড়ে যাওয়া ননীর মুখে।

ননী ছোটদের জামাকাপড় বেচত বড়দের পৃথিবীতে। মেঘ জল হাওয়ার খবর ননী কখনও রাখেনি। সবচেয়ে ছোট বাচ্চার জামার থেকেও ছোট কাপড়ের একটা টুকরো মুখে বাঁধা পৃথিবী এখন। অন্যের ঘরে ঘরে শিশুদের পোশাক ফিরি করা ননীর নিজের ঘরে এক অদূর ভবিষতে জিরো সাইজের জামা বুকে নিয়ে ফেরার রাত-ফোনের স্বপ্নগুলোকে এলোমেলো করে দিল।

 

গন্ধ

শম্ভুর এই দিকের কাজ শেষ। গাড়ি আসার অপেক্ষা। মাল তুলে গাড়ির সঙ্গে চলে যাবে মাল আনলোড করতে। গাড়ি মানে জঞ্জাল ফেলার গাড়ি। পাড়ার জঞ্জালের সঙ্গে শম্ভু বিনোদকেও নিয়ে যায়। গাড়ি আসতে এখনও অনেক দেরি, ঘুম পায় ওদের।

জঞ্জালকে শক্ত হাতে ধরতে হয়, এটাই শিক্ষা। বাকি লেখাপড়া পড়ে থাকে দেশবন্ধু স্কুলের ক্লাস ফোরের নীতিশিক্ষা বইয়ে। আর কিছু খবরের কাগজে।

বিনোদের ঝিমুনি মুখটার মধ্যে ছেঁড়া স্বপ্ন স্পষ্ট দেখতে পায় শম্ভু। ঝিমুনি লাগলেই ট্রাক্টার আসার শব্দ পায়, কোনও গন্ধ পায় না। ঝিমুনির কি কোনও গন্ধ হয়!

শম্ভুর কাজ নোংরা তোলা, শক্ত হাতে। নোংরা তুলতে তুলতে শম্ভুর ক্লান্ত লাগে। মুখোশ দেখতে দেখতে শম্ভুর ক্লান্ত লাগে।

সব মুখোশ একদিন ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকবে রাস্তায় ঘাটে মাঠে বাজারে ডাস্টবিনে। সেইদিন শম্ভু একটা জুৎসই মুখোশ পড়ে শহরের সব মুখোশ পরিষ্কার করবে।

জঞ্জাল ফেলার গাড়ির পেছনে বসে সব মুখোশ ফেলে আসবে…

শম্ভুর বড্ড ক্লান্ত লাগে, বিনোদের ঘুম পায়…

 

গাছ

সেই কোন ছোটবেলা থেকে পাখির চোখে পৃথিবীকে দেখছে রবি। ওপর থেকে পৃথিবীকে বড় ক্ষুদ্র দেখায়। মাটিতে নেমে আসলেই আকাশ অনেক দূরে সরে যায়। আকাশ আর মাটির মাঝখানে রবি গাছেদের লোক।

কোন ছোটবেলায় বাপের সঙ্গে কাজে বেরোত রবি। বাপ গাছে উঠত ডাব পাড়ার জন্য। রবি মগডালের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত। সূর্য এসে পড়ত নারকেলের পাতায়। ডাবের কাঁদি নামলে গিঁট খুলে দিত সে।

নববর্ষে ডাবের চাহিদা তুঙ্গে থাকে প্রতিবার। এইবার আছড়ে পড়ে রাস্তায় গড়িয়ে যাওয়া ডাবের জলের থেকেও কম দামে বিক্রি হয়েছে ডাব।

রবি গাছকে জাপটে থাকা মানুষ। শুকনো ডাল কেটে সবুজ ডালের জন্য অপেক্ষা করে থাকা মানুষ। যত্নে লালনে ফলকে মাটি স্পর্শ করানোর মানুষ। রবি মুখোশ সরিয়ে নিয়ে ফের গাছের কাছে যায়। আকাশের কাছে যায়। আকাশ আর মাটির মাঝখানে হাইফেন হয়ে থাকা গাছটাকে জড়িয়ে থাকে সে হাসিমুখে আশায় ভরসায়, একদিন ফল পৃথিবীর মাটি আবার স্পর্শ করবেই।

 

খিদে

স্টেশন মাঠের থেকে একদিন সূর্য গোধূলির সব রং কেড়ে নেয়। মাঠ বাতিলের পরোয়ানা পায় শান্তদের ফুটবল টিম! সূর্যাস্তের ছায়া হয়ে ঘরে ফেরে একলা বালকটিও। গোটা টিমকেই কে যেন লাল কার্ড দেখিয়েছে।

শান্ত আউট লাইন থেকে বল থ্রো করে কার পায়ে দিতে চেয়েছিল আর মনে নেই। সে মাস খানেক আগের ঘটনা। গোল বলটা স্টেশন মাঠের ঝিলে হারিয়ে গেছে সূর্য ডোবা সন্ধ্যায়। এখন শুধু কলোনি জুড়ে স্কুল থেকে দেওয়া সরকারি চাল ডালের হিসেব।

মিড ডে মিলের চাল শান্তর আনতে যাওয়া বারণ। বাপ কাজে গেছে, মা বাসাবাড়ি বাসন ধুতে, শান্ত না গেলে চাল উড়ো খই হয়ে আকাশে উড়বে। সে কথা শান্ত জানে।

বাড়ি থেকে স্কুলে গলি দিয়ে যেতে যেতে একটা ডাব পায় পায়ের সামনে। লাথি থুড়ি কিক দিয়ে ডজ ড্রিবল করে একা একা। তারপর সেই ডাবটিও একসময় মাঠের বাইরে যেতে চায়। শান্ত ডাবটিকে ধরে….

এবার শান্ত মাঠের আউট লাইন থেকে থ্রো করবে। কিন্তু কার পায়ে? কচি পাগুলো তো সেদিনের সূর্যাস্তের সঙ্গে ঘরে ঢুকে গেছে।

খুব খিদে পায় শান্তর। অস্থির একটা বল পাকস্থলীর মধ্যে ড্রপ খাচ্ছে টের পায়। আজ বুধবার মিড ডে মিলে আজ ডিম ভাত দিত স্কুলে। বলের মত একটা গোটা কুসুম। আহহ…!

 

বাতাস

বলাইয়ের বাড়ির টিভিতে শুধু দূরদর্শন দেখা যায়। বলাই বাকি খবর পায় হাওয়ার কাছে। একটু একটু করে সন্ধ্যার দুধ বাজার ফাঁকা হয়ে আসছিল প্রতিদিন, দুধ ভর্তি ক্যান নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল বলাই। প্রধানমন্ত্রী কী বলেছেন বলাই শোনেনি, শুধু ক্লান্ত শরীরে ঘুমের মধ্যে বাজি পোড়ার আওয়াজ পেয়েছিল। বাজি পোড়া ছাই বলাইয়ের গোয়াল ঘরের টিনের চালে জড়ো হয়েছিল।

মাসের জোগান বন্ধ করে সরল জলের মত হিসেব চুকিয়ে দেয় মানুষজন। কিন্তু বেয়াড়া বাতাস কানে কানে বলে যায় ভারী হয়ে যাওয়া বাতাসের খবর। তাতে মৃত্যুগন্ধ লেগে থাকে। বলাই ঘোষ টের পায় তার নোংরা জামার ভেতর। সে বাতাসে শ্বাস নেওয়া যায় না। দূরদর্শন শুধু রোদ জল বৃষ্টির খবর বলে নিয়মিত সময়ে। মুখে বাঁধা এক টুকরো ময়লা কাপড় নৈঃশব্দ বাড়িয়ে দেয়। সমস্ত শহরে কি শ্মশানের স্তব্ধতা?

বলাইয়ের দুধ-সাদা চুল, সাদা মাস্ক, নোংরা সাদা গেঞ্জি আর মুখের ফ্যাকাশে-সাদার ওপর ভারী হাওয়া লিখে দেয় অপ্রকাশিত সরকারি “শ্বেতপত্র”র একাংশ। বাকিটা অংশ একদিন দূরদর্শনের খবরে নিশ্চই বলবে, সেদিন বলাই ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে থাকবে। শ্বাসনালীতে তখন বাতাসের আনাগোনা দুর্মূল্য হয়ে উঠবে কি না, কে জানে!

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2615 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...