ত্রিনয়নী কাশ্মির

সোনালী চক্রবর্তী

 

তিনজন নারী, তিনটি বাসস্থান, তিন প্রকৃতির জীবনযাত্রা, একটিমাত্র সূত্রে তিনজনের অবিচ্ছেদ্য গ্রন্থি— তিনজনই কাশ্মিরের ক্ষতগুলিকে তাদের কলমে কবিতায় রূপ দিয়ে চলেছেন।

সাইমা আফরিন বর্তমানে ভারতের ইংরাজি ভাষার তরুণ কবিদের মধ্যে অন্যতম ও অগ্রগণ্য। তিনি ‘নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর ডেপুটি সিটি এডিটরের পদে সম্প্রতি কর্মরত। ২০১৭ সালে তিনি ফিনল্যান্ডের “ভিলা সারকিয়া রাইটার্স রেসিডেন্সি” থেকে পুরস্কৃত হন যেখানে তিনি তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ “সিন অব সিমেন্টিক্স”-এর পাণ্ডুলিপির কাজ শেষ করেন। ২০১৯ সালে তিনি সৃষ্টিশীল সাহিত্যের চর্চার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কেন্ট ইউনিভার্সিটি  থেকে ‘চার্লস ওয়ালেস ইন্ডিয়া ট্রাস্ট ফেলোশিপ’ পেয়েছেন।

সুমাইয়া তেলি একজন কাশ্মিরী লেখক যিনি বর্তমানে বস্টনের বাসিন্দা। কাশ্মিরের ঐতিহ্যবাহী পোশাক লাল ফিরন পরিহিত ‘রেসিস্ট টু এক্সিস্ট’ পোস্টার হাতে তার প্রতিবাদ বিশ্বসাহিত্যে আন্দোলনের প্রতীক হিসাবে সম্প্রতি প্রভূত স্বীকৃতি অর্জন করেছে।

আশ্চর্যজনকভাবে প্রতিবাদী কলম জুজের রশিদা প্রসঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে কোনও সংবাদ পাওয়া যায় না। ২০১৪-র সেনা আক্রমণের পর তিনি কাশ্মির ত্যাগ করেন। শেষ সংবাদ পাওয়া অবধি তিনি অস্থায়ীভাবে লন্ডনের একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

তিনজনের একটি করে কবিতার অনুবাদ দিয়ে তাদের কাব্য প্রতিভার বিচার অবান্তর। শুধুমাত্র তাদের সঙ্গে পরিচয়ের স্বার্থে, তাদের প্রতিবাদী সৃষ্টিশৈলীকে সম্মান জ্ঞাপনে এই ‘ত্রিনয়নী কাশ্মির’-এর অবতারণা করা হল।

 

টেবিলক্লথ

সাইমা আফরিন

ইতিহাস কোনওদিন বৃদ্ধ হয় না,

সে তো সময়কে নিয়মিত পালিশ করতে থাকা একজন জহুরি মাত্র,

পাতলা কুয়াশায় সপসপে ভিজে যাওয়া স্বরবর্ণের ভাঁজগুলোকে খোলার আগে যে
দাগ ধরা কাচের ভিতর দিয়ে আলো ফেলে।

যে খুঁজে চলে সেই মুখগুলো, অন্ধকার যাদের একমাত্র দাবিদার,
কিছু শ্লোককে জ্বেলে নিয়ে যে দেখতে থাকে দুর্বল, বলিরেখাময় আঙুলগুলো কীভাবে সেলাই করে ফুটিয়ে তুলছে জীবন্ত ডেইজিদের।

গল্পরিফুর শিল্পকলা।

জালের ক্রোশেই
আর অন্তর্গত জাল,

কাঁটাতারের উপর ভেঙে পড়তে থাকা বিদীর্ণ কুয়াশা, চিড় খাওয়া চিনামাটির শৈশব,
ছোট্ট ছোট্ট পিঠেপুলির আখ্যান, জরাজীর্ণ পেয়ালাগুলোর বেড়ের ছাপ,
এইসব বুনে মেরামত করে দেওয়ার জন্য সে অতিরিক্ত বুড়ো।

মেয়েটি ঘুমন্ত ফুলগুলোকে জাগিয়ে তাদের নাম জিজ্ঞাসা করল…
তারা হৃদয় খুলে দেখিয়ে দিল উর্দু পত্রিকাটিকে,
সূঁচে ব্যস্ত হয়ে পড়তে পড়তে সে মেয়ে পশমি নৈঃশব্দ্যের মধ্যে গান গেয়ে উঠল;

আজ সন্ধ্যায়,
টেবিলক্লথের পাড়ের সেলাইগুলো রূপকথার ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে,
যেখানে সে থাকে, যেখানে আমরা সবাই থাকি,
সেই সব বিবৃতি যা আসলে আমরা নিজেরাই।

অবশিষ্ট যা পড়ে থাকল, আমার এই জীবনও যার অংশ,
পুরোটাই মিথ্যে কাহিনি।

 

কূট কবিতাগুলো

সুমাইয়া তেলি

১|

প্রাচীন শহরের না বলা শতেক কাহিনি আর কাঁধের উপর আলগোছে ফেলে রাখা শালের সহজতায় যে মানুষগুলো জীবনকে বহন করে নিয়ে চলেছে তাদের থেকে শ্বাস টেনে টেনে ক্রমশ অবসন্ন হয়ে পড়তে থাকা আশার হৃদস্পন্দনের মত শ্রীনগর একটা সুঘ্রাণ,

চোখ বন্ধ করো,

তুমি কি ঋতু পরিবর্তনের গন্ধ পাচ্ছ?

শুভ্র নার্গিসের চপল চড়া সুর, কাঠবাদামের ফুল, মৌরি; সব কিছু গলে একাকার হয় এখানে উপড়ে নেওয়া কিসমিস আর পদ্মমধুর মধ্যে,

গোলাপী পশমিনা, জাফরান আর চেস্টনাট চুইয়ে নামা রস ডুবে যায় ওয়ালনাট বাকলের অন্ধকার প্রদেশে।

তুমি কখনও তুষারপাত শুঁকে দেখেছ?

জ্বলন্ত অঙ্গারের উষ্ণতায়, ভুট্টার কাণ্ডের পুড়ে যাওয়া দানায়, চিনারের পাতাগুলো থেকে ওঠা ধোঁয়ায় আর নোনতা সোডা মেশানো চায়ের অভ্রান্ত জমে ওঠায় যা থাকে।

কালি দিয়ে আঁকা গাছগুলোর চালচিত্রে উলের ফিরন পরা নারী-পুরুষেরা ঠিক যেন মথের মত দেখায়।

আর এই শহরের কোথাও একটা আমার বাড়ি,

সদ্য সন্ধ্যা একটা বিবাহ উৎসব শুরুর ঘোষণা দিল,

এসো, ভিতরে এসো, তুমি নিমন্ত্রিত:

ঠিক যেভাবে মুরগিগুলোকে দানা খাওয়ান, আমার ঠাকুমা এখন সস্তা লজেন্স, ভাজা মিষ্টি আর নতুন পয়সা ছুঁড়ছেন,

বাচ্চাগুলো প্রতিটা ক্যাচ ভীষণ দক্ষতায় লুফে নেওয়ার আনন্দে চীৎকার করে উঠছে।

একটা ঝিকমিক করা কনের মত পুরো বাড়িটা সেজে উঠেছে,

আমাদের দুই বোনকে হেনার গুঁড়ো দিয়ে হামানদিস্তায় মেহেন্দির লেইটা তৈরি করে রাখতে হবে,

ওটা পরে লাগবে…

ঢোল বাজিয়ে গভীর রাত অব্দি মেয়েরা পুরনো দিনের বিয়ের গান গাইছে

যখন রাতের করতলে চাঁদ একটা নতুন মুদ্রার মত ঝলসে উঠছে,

শীতের কনের হাতে হেনা এঁকে দিচ্ছে আগুনের রং।

 

২|

শ্রীনগর একটা বিস্মৃত সুগন্ধ,
বহু বছর আগেই প্রত্যাদেশ এখানে তার পথ হারিয়েছে।

চোখ বন্ধ করো,
তুমি কি ঋতু পরিবর্তনের গন্ধ পাচ্ছ?

শুভ্র নার্গিসের চপল চড়া সুর আর সদ্য খোঁড়া কবরের মাটি,
আমাদের গিলে উদরে রেখে দেয় সেই নিয়তি মাতৃকার অপেক্ষারত আলিঙ্গনের গন্ধ পাচ্ছ?

চিনারের পাতাগুলোর গনগনে লাল ছাই,
ভস্মীভূত বাড়িগুলোর ধোঁয়া,
তার ঘরটার ভাঙাচোরা ইট পাথরের উপরে বসা মেয়েটার স্থিরচিত্র দেখো
দেখতে পাচ্ছ?

তুমি সেখানে ছিলে না, কিন্তু সেদিন এমনকি তার সন্তানদের চীৎকারগুলোর গানও আগুনই গেয়েছিল।

তুমি আজ অব্দি কখনও জমে থাকা বরফের উপর রক্তের গন্ধ শুঁকেছ?

কারফিউ।
কালি দিয়ে আঁকা গাছগুলোর চালচিত্রে অবিকল মথের মত তারা লাইন করে দাঁড় করিয়ে দেয় উলের ফিরনে মোড়া বৃদ্ধ, যুবক, পুরুষ, মহিলা, বাচ্চা, শিশু সবাইকে।

আর এই শহরের কোথাও একটা আমার বাড়ি,
যেটা তারা খুঁজছে, ভাঙছে, ছিঁড়ছে, জ্বালাচ্ছে, পুড়াচ্ছে।

সদ্য সন্ধ্যা একটা অন্ত্যেস্টি শুরুর ঘোষণা দিল:
এসো, শবযাত্রায় যোগ দাও,
তুমি নিমন্ত্রিত, আমরা প্রত্যেকেই।

ছেলের লাশকে ভিজাবে বলে কোনও মা তার চোখে জল জমিয়ে রাখে না।
তোমাদের মৃত্যুর আগে নিজেদের চোখ বোজার প্রার্থনা আর কারাই বা করে?

ভেঙেচুরে যাওয়া সব কটা জানলার কাচ, গুঁড়ো হয়ে যাওয়া ইট পাথর নিয়ে বাড়িটা এখন ফোকলা দাঁতের কাষ্ঠ হাসি,
আমরা দুই বোন চা পরিবেশন করছি।

মানুষ গিলছে: জীবন টেনে নিয়ে চলেছে তার যাপন।
পরে, আমরা সবাই ঘুম নামে যাকে ডাকি, সেই মৃত্যু নামের পালাটায় অভিনয়ের জন্য ধড়াচূড়া পরে মহড়ায় নামব।

রাতের গভীরে ঘন মেঘগুলো একত্রিত হচ্ছে,
যেন একসঙ্গে কাঁদলেই যন্ত্রণা কমে যাবে।

তারা কি ভাবছে এই অঘোর বর্ষা তাদের হাত থেকে সব রক্ত ধুয়ে দেবে?
না
সমস্ত কিছুর সাক্ষ্য চাঁদ বহন করবে।

 

ক্ষমাপত্র

জুজার রশিদা

এখন সময় প্রত্যেকের পাপকে ক্ষমা করে দেওয়ার,
ক্ষমা করে দেওয়ার সেই অর্ধাংশকে যাদের জন্য আজ আমাদের এমন পরিণতি।

চলো একে অপরকে ক্ষমা করে দেওয়া যাক,
যেভাবে আমরা ক্ষমা করে দিতে অভ্যস্ত,
সেই সব সন্তান সন্ততিকে যারা নিজেদের পথে বাঁচতে চায়,
সমস্ত ভাই বোনদের যারা তুচ্ছ বিষয়ে আমাদের সঙ্গে লড়ে,
আমাদের বাবা মায়েদের যারা এখনও আমাদেরই স্বার্থে বিশ্বাস সংরক্ষিত করে।

পরস্পরের ভ্রান্তিগুলোকে ক্ষমা করে দেওয়া যাক,
যা আমাদের একে অপরের জন্য লালিত শ্রদ্ধাকে ধ্বংস করে ফেলেছিল,
ক্ষমা করা যাক একে অপরকে ক্রমে
গাঢ়তর অন্ধকারের দিকে এগিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে
প্রত্যেকের জঘন্য অপরাধ,
যেখানে একটি চোখ উপড়ে নেওয়ার উপহার ছিল অপর একটি শূন্য কোটর,
আর একটা দাঁতকে ক্ষিপ্র গতিতে অনুসরণ করে সংগ্রহ করে আনা হত পরবর্তীটি,
আর যেখানে ইতিহাসের গর্ভে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ার আতঙ্ক আমাদের গ্রাস করেছিল।

হয়ত এটাই সেই সময় যখন আমরা
সাময়িকভাবে আমাদের স্থানিক অবস্থানগুলোকে পরিবর্তিত করে দেখতে পারি,
আর বুঝতে চাইতে পারি নিজেদেরই জন্য,
ঠিক কাকে বলে,
একজন কাশ্মিরী হয়ে বাঁচা,
বা একজন পাকিস্তানি,
অথবা একজন ভারতীয়,
কিংবা কোনও চাইনিজ।

হয়ত এটাই সময়,
একে অপরের স্খলিত অহংকে যত্ন করে কুড়িয়ে নেওয়ার,
শিথিল হয়ে আসা ভ্রূপল্লবকে আদরে ভরিয়ে দেওয়ার,
আর অনন্তকাল ধরে আঘাত পেতে থাকা হৃদয়ের ক্ষতগুলোকে ভরাটের।

এটা সময় আমাদের শ্রোতা হওয়ার,
বাকিদের অনুচ্চারিত শব্দগুলোকে ধ্বনিত হতে দেওয়ার জন্য,
স্মৃতিচারণের দোহাই তুলে একে অপরের ভাঙাচোরা বাড়িগুলোতে
আমাদের পৌঁছানোর সময় এখন,
আর হয়ত সেটাই হতে পারে আমাদের প্রকৃত উদযাপন।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2454 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...