এক জুতোচোর ও তার রুটি-ঘর

রুমুজ এ বেখুদি

 

তর্জমা: সুমিতা সরকার



রুমুজ এ বেখুদি কাশ্মিরের কবি, গল্পকার ও অনুবাদক হীনা খানের ছদ্মনাম। পেশাগত যোগ্যতায় ইঞ্জিনিয়ার, টেলিকম শিল্পে কর্মরত। উর্দু ও ইংরেজি ভাষায় লেখা শুরু করলেও তিনি ক্রমশ কাশ্মিরীকেই লেখার মাধ্যম করেছেন। 'There Were Sparrows' তাঁর প্রথম ইংরেজি উপন্যাসের নাম। রক্তাক্ত কাশ্মির ও তার মানুষজনের জীবনযাপন তাঁর লেখার উপজীব্য।

 

 

 

“আজকাল সন্ধেবেলা রুটি তৈরি করছ না কেন বলো তো? তোমার দোকানটা রাস্তার ধারে বলেই তো আমাদের সবার এখান থেকে রুটি কিনতে খুব সুবিধে হয়,” রোজকার এক খদ্দের বললেন ইয়ানা রুটিওয়ালিকে। চারিদিকে তখন টাটকা তাজা রুটির সুগন্ধ, মাটির উনুনটা থেকে পাকিয়ে পাকিয়ে উঠছে ধোঁয়ার কুণ্ডলী। রুটিগুলো গুনে গুনে খদ্দেরের বেতের বাস্কেটে তুলে দিতে দিতে মিষ্টি হেসে ইয়ানা উত্তর দিল, “শোনো বাছা, এইরকম একটা রুটির দোকান চালাতে শুধুমাত্র কাজে দড় হওয়াই যথেষ্ট নয়, সঙ্গে বেশ কিছু ভালো কর্মীরও প্রয়োজন। আর আমার পরিবারে? রাজা তো আর আমাকে সাহায্য করতে পারে না, আর শেহবা তো করতেই চায় না!” ইয়ানা তার রুটি বেলার টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। খদ্দের ভদ্রলোকটিকে যথেষ্ট বিচলিত মনে হল। তাছাড়া যেহেতু তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেখানে আরও কিছুক্ষণ থাকার, তাই সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, “রাজা কেন তোমাকে সাহায্য করতে পারে না সেটা তো সহজেই বোধগম্য; কিন্তু শেহবার সাহায্য না করার কোনও কারণ তো আমি খুঁজে পাচ্ছি না?”

ইতিমধ্যেই ইয়ানা রুটিওয়ালি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ময়দা ঠেসে তার থেকে ছোট ছোট লেচি পাকাতে। দুটো ছোট ছোট লেচি দুহাতে নিয়ে, দ্রুত তাতে ময়দার গুঁড়ো মাখিয়ে বেলতে বেলতে, ইয়ানা এক মুহূর্তও কাজ না থামিয়ে উত্তর দিল, “বাছা, ভাগ্য যদি আমার সহায় না হত, আর বেচারা অসহায় রাজার সঙ্গে তার এই মা যদি কঠিন মায়ার বাঁধনে বাঁধা না পড়ত, তাহলে আল্লা জানেন কবেই এই হাড়ভাঙা পরিশ্রম আমাকে শেষ করে দিত।”

খদ্দের ভদ্রলোককে দেখে মনে হল যে তিনি মোটেও সন্তুষ্ট নন এই উত্তরে। প্রশ্নটি তিনি আবার করতে যাবেন, এমন সময় রাস্তা থেকে ভেসে এল বাচ্চাদের ইয়ার্কি–বিদ্রূপ-উল্লাসে ভরা এক বিকট চিৎকার। ইয়ানার হৃৎস্পন্দন মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। তার মনে পড়ে গেল আজকে যে ঘরে রাজা বাঁধন ছাড়াই শুয়ে আছে, সেই ঘরটা সে বাইরে থেকে বন্ধ করতে ভুলে গেছে। মুহূর্তের নিশ্চলতা ঝেড়ে ফেলে ঝড়ের গতিতে ইয়ানা ছুটে বেরোল দোকান থেকে, সম্ভবত তার খদ্দেরের ওপরেই সেটার দেখভাল ছেড়ে দিয়ে।  হ্যাঁ, তার আশঙ্কা ভুল নয়। রাজা রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে; তাকে ঘিরে আছে একপাল বাচ্চা। তারা তাকে খ্যাপাচ্ছে, উত্যক্ত করছে, চারদিক থেকে তাকে ধরে টানাটানি করছে। আর চরম আতঙ্কের দৃষ্টিতে রাজা তাকিয়ে আছে, ঠিক যেন একপাল বুনো কুকুরের চিৎকারের মাঝে একলা এক শিশু।

ইয়ানা তার দোকানের বাইরে জড়ো করা কাঠগুলো থেকে একটা তুলে নিল। তারপর কোনও অল্পবয়সী তরুণের মত তেজে তাড়া করে গেল ঐ উল্লাসমত্ত ছেলেদের দিকে। ছেলেরা পালিয়ে গেল। কিন্তু আতঙ্কিত স্তব্ধ রাজা এই মানসিক আঘাতে নিঃসাড় হয়ে পড়ে রইল তার ফিরান দিয়ে আধখানা মুখ ঢেকে। ইয়ানা তাকে জাপটে ধরে পাগলের মত চুমু খেতে লাগল আর একই সঙ্গে আহত বাঘিনীর মত গর্জন করতে লাগল, “যতসব ইবলিশের বাচ্চা! আর একবার যদি তোদের কাউকে আমার ছেলের আশেপাশে দেখি, তাহলে তোদের পাগুলোকে টুকরো টুকরো করে কেটে তোদের শয়তান বাবা-মাদের কাছে পাঠাব।”

এই সমস্ত কর্মকাণ্ডটি জানলা দিয়ে লক্ষ করছিল একটি বাচ্চার মা। সে এখন ইয়ানার কথায় ভীষণ আহত হওয়ার ভান করে দু হাত ছুঁড়তে ছুঁড়তে সমানভাবে চিৎকার করতে লাগল: “এই রুটিওয়ালি ইয়ানা, আমাদের বাচ্চাদের পেছনে পড়েছিস কেন? একে তো তুই তোর চল্লিশ বছরের দামড়া পাগল ছেলেটাকে চোখে চোখে রাখতে পারিস না! তার ওপর আবার ওকে কেন খ্যাপানো হয়েছে বলে আমাদের মাথায় উঠে নাচছিস? আরে তোর তো আমাদের কাছে কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত রে, যে আমরা তোর ছেলেকে এই পাড়ায় থাকতে দিয়েছি। নইলে কবেই তো ওর ঠাঁই হওয়া উচিত ছিল পাগলাগারদে। আমাদের বাচ্চারা ওকে দেখে ভয় পায়! ও ওদের জুতো চুরি করে! আস্ত একটা জুতোচোর কোথাকার!”

ইয়ানা এতক্ষণ ভয়ে-পাথর-হয়ে-যাওয়া রাজাকে সান্ত্বনা দিতে দিতে বাড়ির দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু সেকাজে বিফল হয়ে হতাশায় মহিলার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে যত জোরে পারে চিৎকার করে উঠল, “আমার রাজা তো শুধু মানসিক প্রতিবন্ধী, ওর বুদ্ধিটা শিশুর মত। আর তোরা? তোরা সক্কলে হলি পাগল, পুরোপুরি পাগল। আমার ছেলে যদি অতই ভয়ঙ্কর হয়, যদি জুতোচোরই হয়, তাহলে কীসের টানে ওর পায়ে পড়িস, তোর শাশুড়ির অত্যাচার বন্ধ করতে একটা মাদুলি তৈরি করে দেবার জন্য? প্রতি শুক্রবার ওকে খাওয়াসই বা কেন? আর কেনই বা রমজানের সময় নতুন জুতো উপহার দিস? যাতে ওকে দিয়ে তোর জন্য আরও বেশি প্রার্থনা করিয়ে নিতে পারিস, যাতে তোর সব পাপ ধুয়ে যায়, তাই না? ও পাগল নয়, তুই পাগল— তোরা সব্বাই পাগল।”

ইয়ানা টেনে হিঁচড়ে রাজাকে তার বাড়ির কাঠের গেটের ভেতর ঢোকাল। এই গেট দিয়ে গেলে তবে তার দুই কামরার বাড়ি, আর বাড়ির বাইরের দিকে রাস্তার ওপর তাদের প্রাচীন রুটি-ঘর। নিজের ঘরে পৌঁছে ইয়ানা নিঃশব্দে কাঁদতে কাঁদতে ছেলের মাথাটা কোলে নিয়ে আদর করতে লাগল। শ্রান্তকণ্ঠে বলে উঠল, “ওহ রাজা, রাজা, তুই কেন তোর বুড়ো মাকে এমন ঝামেলায় ফেলিস বাবা?”

“উম্‌ম্‌ আম্মি, আমার নতুন জুতো চাই। সব বাচ্চারা নতুন জুতো পেয়ে গেছে,” রাজা সরলভাবে ঘ্যানঘ্যান করতে লাগল।

ইয়ানা কোনও উত্তর দিল না। কারণ সে জানত কেবল জুতো, যে-কোনও ধরনের জুতো, রহস্যময়ভাবে মোহাবিষ্ট করে রেখেছে রাজাকে শিশুকাল থেকেই। আর সেই মোহ এতই জোরালো যে, তা এই চল্লিশ বছরের মানসিক প্রতিবন্ধীর ভেতর থেকে এক জুতোচোরকে বের করে এনেছে।

বাড়ির অন্য ঘরটায় অন্য এক ঘটনা ঘনীভূত হচ্ছিল। ইয়ানার ছোট ছেলে শেহবার মগজে বর্ষিত হচ্ছিল তার স্ত্রী রানির উপদেশবাণী— “তোমার মায়ের কাছে গিয়ে দোকানটা নিয়ে কথা পাড়ার এটা হচ্ছে একদম ঠিক সময়। এবারও যদি তুমি ওনাকে বোঝাতে না পারো, তবে আমি প্রতিজ্ঞা করছি যে সব জিনিসপত্র আর মেয়েকে নিয়ে রওনা দেব বাপের বাড়ি। আর কক্ষনও ফিরে আসব না। বুঝলে? আর কতদিনই বা তুমি এক বাড়ির চাকরের কাজ ছেড়ে অন্য বাড়িতে কাজে ঢুকবে? যেখানে আমাদের হাতেই আছে একটা আকাটা হীরে?”

“চিন্তা কোরো না। এবারে আর তোমায় আমি হতাশ করব না”— শেহবাকে বেশ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনে হল।

শেহবা যখন তার মায়ের ঘরে ঢুকল, রানি নিঃশব্দে দরজার পেছনে দাঁড়িয়ে রইল সেই গোপন কথোপকথন শোনার জন্য।

“আম্মি, রাজা এখন কেমন আছে? আর এই ছেলেপুলেগুলো এত খারাপভাবে মানুষ হচ্ছে যে বলার নয়। রাজা ভাইয়া, মিত্তি ভাই আমার, কেমন আছ তুমি? মা কি এর মধ্যে তোমায় নতুন কোনও জুতো কিনে দিয়েছে?” শেহবা কথা শুরু করল। কিন্তু ইয়ানা নিরাসক্ত আবেগহীন কণ্ঠে উত্তর দিল, “এই বাচ্চারা হয়তো ঠিকমতো মানুষ হচ্ছে না। তবে যখন কোনও ডাইনির অশুভ দৃষ্টি কারও ওপর এসে পড়ে, তখন সে ভালোভাবে মানুষ হয়েছে না খারাপভাবে মানুষ হয়েছে, তাতে কিছু এসে যায় না। সোজা কথায় এসো, তোমার বউ যেকথা বলার জন্য তোমাকে এখানে পাঠিয়েছে, তা চটপট উগড়ে দাও।”

চালাকি করে শেহবা মায়ের হাতটা নিজের হাতে নিয়ে নরম গলায় বলল, “আঃ মা, প্লিজ তোমার রাগারাগিটা শেষ করো। আমি তোমার আর রাজা ভাইয়ার কেবল ভালোই চাই। তুমি আমাকে সবসময় শত্রু ভাবো কেন বলো তো? বিশ্বাস করো, এই রুটি তৈরির ব্যবসা তুমি খুব বেশিদিন টেনে নিয়ে যেতে পারবে না। কিন্তু একবার যদি আমরা এটাকে একটা নতুন দোকানে পাল্টে দিতে পারি, তাহলে আমাদের দুঃখকষ্ট একেবারে শেষ না হলেও, খানিকটা তো কমবে?”

ইয়ানা তক্ষুনি নিজের হাতটা টেনে নিয়ে উত্তেজিতভাবে বলল, “তুই এতদিনের এই পুরনো রুটি–ঘরটাকে নতুন দোকানে বদলে দিবি? যাতে তুই আর তোর বউ আমাকে আর আমার অসহায় সরল ছেলেটাকে তাড়িয়ে দিতে পারিস? আমি বেঁচে থাকতে কখনও সেটা হতে দেব না।”

“আম্মি রানিকে কেন এর মধ্যে টেনে আনছ? এটা তো তোমার আর আমার মধ্যের ব্যাপার!” শেহবা বলল।

ইয়ানা আগের চেয়েও রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বলে চলল, “কেন বলব না, বল্‌ আমাকে? সে কোথাকার কোন্‌ লর্ড কার্জনের বেটি, যে মনে করে তোর এই পৈতৃক পেশাতে যোগ দেওয়াটা তেনার পক্ষে অসম্মানজনক! তাতেও যথেষ্ট হল না, তার ওপর তুইও নিজেকে একজন সুপারস্টার ভাবতে শুরু করে দিলি?”

মাকে বোঝাতে না পেরে শেহবা রেগেমেগে একটাও কথা না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে রানি গোপনে এই কথোপকথন পুরোটাই শুনেছিল। সে শেহবাকে থামিয়ে কথা বলতে চাইল। কিন্তু সেই মুহূর্তে শেহবার কথা বলার বা বাড়িতে থাকার কোনও মুডই ছিল না।

রানি তখন সিদ্ধান্ত নিল যে, এ ব্যাপারে এবার তার নিজেরই মাঠে নামার সময় এসেছে।

***

 

গতরাতে মায়ের সঙ্গে ঝগড়ার পরে শেহবা খুব রাত করে বাড়ি ফিরেছিল। ভেবেছিল পরের দিন বেশ বেলা করে উঠবে। কিন্তু সে সৌভাগ্য আর তার হল না। তার ঘুম ভেঙে গেল বাইরে থেকে আসা বিকট ঝগড়ার আওয়াজে। একইসঙ্গে ইয়ানা, রাজা, রানি ও তার তিন-বছুরে মেয়ের চিলচিৎকারে আধোজাগা শেহবার হৃৎস্পন্দন বুনো ঘোড়ার গতিকেও পাল্লা দিতে লাগল। বিছানা থেকে লাফিয়ে নামল সে।

“এসো, এসে নিজের চোখে দেখো তোমার বদমাশ পাগল দাদাটা আমার এই সরল ফুলের মত মেয়েটার কী অবস্থা করতে যাচ্ছিল! ওকে উনুনের মধ্যে ঠেলে ফেলে দিচ্ছিল!! আমাদের জন্য এই রুটি-ঘরটাই হল একটা অভিশাপ! আমি যদি ঠিক সময়ে এসে না পৌঁছতাম, আমরা দুজনে এতক্ষণে পুড়ে ছাই হয়ে যেতাম।” বুক চাপড়াতে চাপড়াতে রানি কেঁদে চলল, যাতে আধো ঘুমন্ত হতভম্ব শেহবার মনে কোনও প্রতিক্রিয়া ঘটে।

রানির কথায়, এই ঘটনা ঘটেছিল যখন ইয়ানা পোড়া কয়লা আর ছাই ফেলতে কাছেই আস্তাকুঁড়ে গিয়েছিল। ইয়ানা হিংস্রভাবে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে রানির সঙ্গে তুমুল গালিগালাজে মত্ত হয়ে উঠেছিল। রাজা ভয়ার্ত দৃষ্টিতে সবকিছু দেখছিল, বুকে তার একজোড়া জুতো শক্ত করে আঁকড়ে ধরা, ক্রমশ সে লুকোতে চেষ্টা করছিল মায়ের পেছনে।

শেহবা বুঝে উঠতে পারছিল না কী করবে, কিন্তু একসময় সে বউ ও মেয়েকে একপাশে ঠেলে সরিয়ে দিল। তারপর রাজার হাত থেকে একপাটি জুতো ছিনিয়ে নিয়ে কোনও কিছু না ভেবেই নিষ্ঠুরের মত রাজাকে মারতে লাগল। মেরেই চলল, যতক্ষণ না নিজে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ইয়ানার সাহস ও শারীরিক ক্ষমতা দুই-ই তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করল। রাজাকে বাঁচাতে গিয়ে সেও শেহবার ক্রোধের আগুনে ঝলসে গেল। এক অসহায় দুর্বল মানুষের মত সে কেবল প্রার্থনা করে যেতে লাগল যাতে নিজে থেকেই শেহবার এই ক্রোধ নির্বাপিত হয়।

***

 

সকালের এই নাটকীয় ঘটনার পর থেকে সন্ধে পর্যন্ত এক অদ্ভুত প্রশান্তি ছেয়ে রইল ইয়ানার বাড়িতে। মনে হচ্ছিল যেন পৃথিবী থেকে সমস্ত দুঃখকষ্ট দূর হয়ে গেছে, আর মানবজাতি পরিত্রাণ লাভ করেছে। হ্যাঁ, পাপ থেকে পরিত্রাণ লাভ। সম্ভবত এই পরিত্রাণের অনুভূতিই শেহবাকে বাধ্য করল রাজার ঘরের হুড়কোটা খুলতে, তার পায়ে বেঁধে রাখা দড়িটা খুলে দিতে, এবং আহত রাজাকে বুঝিয়ে ছোট ভাইয়ের কথা শোনাতে। শেহবা ভালো করেই জানত এই সময় ইয়ানা ওষুধের দোকানে গেছে।

“রাজা ভাইয়া, আমার দিকে তাকাও, আমি খুব দুঃখিত,” শেহবা দুই হাতের তালুতে রাজার মুখটা তুলে ধরল। রাজা তার মুখ সরিয়ে নিতে চাইছিল, কিন্তু সাহস করল না। সে কাঁদতে চাইল, কিন্তু পারল না। রাজা শুধু চাইছিল সেখান থেকে পালিয়ে যেতে।

“আমি জানি আমি খুব খারাপ। তোমাকে মেরেছি আমি। কিন্তু প্রতিজ্ঞা করছি, এই সবকিছুর আমি ক্ষতিপূরণ দেব।” মনে হচ্ছিল শেহবা যেন রাজার সঙ্গে নয়, নিজের সঙ্গে কথা বলছে। তার উত্তরে রাজা এক শূন্যদৃষ্টিতে চেয়ে রইল। একমাত্র তখনই রাজার শূন্যদৃষ্টিতে একটু বদল এল, যখন শেহবা বলল, “চলো তোমাকে দরগায় নিয়ে যাই। আমি তোমাকে অনেকগুলো জুতো কিনে দেব আর আমরা মুচমুচে আলুভাজা খাব।”

হঠাৎ করে রাজা যেন সম্পূর্ণ অন্য এক মানুষে পরিণত হল। তার এতক্ষণের প্রাণহীন চোখদুটো নতুন জুতোর উল্লেখে ঝলমল করে উঠল। নিজেকে জয়ী অনুভব করে শেহবা রাজার হাতটা পাকড়ে ধরল। দুজনেই বেরিয়ে গেল। তখন বিকেল পাঁচটা।

শেহবা ফিরে এল রাত নটায়। রানি তার দিকে প্রশ্নবাণ ছোঁড়ার আগেই শেহবা অনুরোধ করল, “প্লিজ আমার মাথায় শক্ত করে একটা রুমাল বেঁধে দাও। ভয়ঙ্কর মাথাব্যথা করছে। একটু ঘুমোতে চাই।” কয়েক মিনিট পরেই শেহবার নাক ডাকতে শুরু করল। সে নাক ডাকছিল শীতঘুমে থাকা ভালুকের মত। কিন্তু এবারেও তার কপালে শান্তির ঘুম ছিল না।

“শেহবা, শেহবা, রানি, রানি, শেহবা, ওঠ্‌ বাবা, দরজা খোল্‌, খোল্‌ লক্ষ্মীটি”— ইয়ানা একনাগাড়ে দরজায় ধাক্কা দিয়ে চলল আর তার ক্লান্ত ভাঙাগলায় সাহায্য চাইতে লাগল।

রানি ওঠবার কোনও চিহ্নই দেখাল না, বরং শেহবাকে দরজা খুলতে বলল। শেহবা বেশ অনেকটা সময় নিয়ে ধীরেসুস্থে শান্তভাবে দরজাটা খুলল, “হলটা কী?”

“আমি… আমি ওষুধের দোকানে গিয়েছিলাম। রাজা… রাজা… আমি তো দরজা বন্ধ করেই গিয়েছিলাম!” ইয়ানাকে তার আসল বয়সের চেয়ে ত্রিশ বছর বেশি বয়স্কা মনে হচ্ছিল। ভেঙে পড়ে তোতলাতে তোতলাতে জনা বলে চলল, “রাজা ঘরে নেই। আমি ওকে সর্বত্র খুঁজেছি। তুই কি ওকে কোথাও দেখেছিস?”

শেহবা উত্তর দিতে একটু সময় নিল, “না, দেখিনি। এখন আমাদের একটু শান্তিতে ঘুমোতে দাও দেখি!” শেহবা মায়ের মুখের ওপর দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিল।

***

 

পরের দিন সকাল। এ সকালে কোথাও কোনও টাটকা তাজা সেঁকা রুটির সুঘ্রাণ নেই, রুটি-ঘর থেকে পাকিয়ে পাকিয়ে নেচে নেচে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলীও বেরোচ্ছে না। আর অবশ্যই সেখানে পাখির-মত-কিচিরমিচির-করা ইয়ানা রুটিওয়ালিও অনুপস্থিত।

শেহবার ঘুম ভাঙল তার মেয়ের কান্নায়। রানি যখন মেয়ের জন্য খাবার তৈরিতে ব্যস্ত হল, শেহবা মেয়েকে ভোলাতে লাগল নিজের তৈরি এক ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে, “ও আমার সোনা মুন্নি, কাঁদছ কেন তুমি? তোমার বাবা তোমাকে উপহার দেবে এক নতুন জুতোর দোকান।”

মুন্নি খিলখিলিয়ে হাসতে শুরু করল।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2454 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...