ভারত ও ইন্ডিয়া- দেশ এবার স্পষ্ট দুভাগে ভাগ হতে চলেছে

সৌমিত্র দস্তিদার

 




লেখক তথ্যচিত্রনির্মাতা, গদ্যকার

 

 

ঘটনাচক্রে আমি এখন যেখানে থাকি তা কলকাতার বুকে নতুন গড়ে ওঠা এক উপনগরী। একদা এখানে ছিল অসংখ্য মাছের ভেড়ি, ধানের ক্ষেত, আর ছোট ছোট গ্রাম। জোতভীম, মহিষবাথান, থাকদেঁড়ে, হাতিপোতা, হাটগাছা— এরকম আরও কত কত নাম সেইসব গ্রামের। ওইসব গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ হয় মুসলিম নয় নিম্নবর্গের হিন্দু। গ্লোবাল অর্থনীতি যখন থেকে এ দেশকে পাল্টে দিতে লাগল, তখন থেকেই এ অঞ্চলের ভূগোল বদলে যেতে লাগল। বলা যায় বদলে দেওয়া হতে লাগল। নতুন অর্থনীতি যে উচ্চমধ্যবিত্তের জন্ম দিল, তাদের স্বার্থে তৎকালীন বাম সরকার জমি থেকে কৃষক উচ্ছেদ করে, কখনও সখনও নামমাত্র কিছু পয়সাকড়ি দিয়ে সে জমি বেসরকারি প্রমোটারদের হাতে তুলে দিলেন। ঝা-চকচকে এক নতুন টাউনশিপ গড়ে তুলতে। গড়ে উঠতে লাগল একের পর এক হাইরাইজ। ভেতরে সুইমিং পুল, ক্লাব, জিম কী নেই! সদরে প্রাইভেট কোম্পানির সুসজ্জিত সিকিউরিটি গার্ড, চারপাশে সিসিটিভি। এভাবেই জায়গায় জায়গায় গড়ে তোলা হল উচ্চবিত্ত ঘেটো। যাদের জমি থেকে তাড়িয়ে ওই আবাসন তৈরি হয়েছিল, বিপুল সম্ভ্রম আর কিছুটা ইর্ষা নিয়ে  তারা তাকিয়ে রইল আবাসনগুলোর দিকেই। জমি-হারানো কৃষক ও মাছ-ধরা জেলে বাধ্য হয়ে হটে যেতে গেল নিজের নিজের সাবেক পেশা থেকে। তাদের মেয়ে-বউরা অধিকাংশই আবাসনে ঢুকতে লাগল স্রেফ ঠিকে কাজের লোক হিসেবে।

আজ এই লকডাউনের সময় এহেন সামাজিক বৈষম্য খোলাখুলিভাবে সামনে চলে এসেছে। রাষ্ট্রীয় অনুশাসন মেনে আবাসন কর্তারা ফতোয়া দিয়েছেন যে কাজের লোক, কাগজবিক্রেতা, ধোপা, সবজিওয়ালা, মাছ বিক্রেতা কেউই এই ‘কঠিন পরিস্থিতিতে’ কোনওভাবেই আবাসনে ঢুকতে পারবে না। এখন যখন সমানে কোনও কোনও মহল সমস্বরে বলেই চলেছে এখন রাজনীতি করার সময় নেই, এখন শুধু হাতে হাত ধরে করোনা বিপদ থেকে বাঁচার কথা ভাবতে হবে। তারা বুঝতে পারছেন না বা বুঝতে চাইছেন না বিনা দ্বিধায় কারও রুজিরুটি বন্ধ করে দেওয়াও একটা রাজনীতি। যেসব পোঁ ধরা মধ্যবিত্ত সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি বিনা প্রশ্নে মেনে নিচ্ছেন, আসলে তারা প্রত্যেকেই ভাবের ঘরে চুরি করছেন। এক্ষেত্রে রাজনীতিটা আসলে দৃষ্টিভঙ্গির। বামপন্থী সরকার যখন নিউটাউন গড়ে তুলেছিল তখন তাদের সমর্থন ছিল স্বচ্ছল উচ্চবিত্তদের প্রতি। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে ছোট পুঁজির বদলে বামেরাও যেখানে মুৎসুদ্দি ফাটকা পুঁজির পক্ষ বেছে নেয়, সেখানে চরম দক্ষিণপন্থীরা রাজনীতির বাইরে গিয়ে দেশের কল্যাণের কথা চিন্তা করবে— এটা পুরোপুরি আকাশকুসুম।

লকডাউন পরবর্তী সময়ে ভারতের রাজনীতি কী হবে বা কী হতে পারে তা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গেছে। ফলে পরে কী হবে তা নিয়ে জল্পনা না করে সোজা কথাটা সোজাভাবে বলা দরকার। যে ফ্যাসিবাদ নিয়ে আমরা অনেক বাগাড়ম্বর করে গেছি এতকাল, সে এখন ঘরের দরজায় কড়া নাড়ছে। আপনি নিশ্চিত জেনে রাখুন যে গণতন্ত্রের কোনও পরোয়া আর করবে না মোদি-অমিত শাহের সরকার। তথাকথিত বাকস্বাধীনতা, প্রচারমাধ্যম সংবিধানের রক্ষাকবচ— ওসব গালভরা শব্দগুলো ভুলে যান। আপনার সামনে এখন দুটো পথ— রাষ্ট্রের সন্ত্রাসকে সরাসরি সমর্থন করা অথবা তীব্র গণআন্দোলনের পথে যাওয়া।

আপনি নিশ্চয়ই মানবেন যে সব দেশের সরকারের মতই এ দেশের সরকারেরও একটা নির্দিষ্ট চরিত্র আছে। সেই চরিত্রের সংজ্ঞা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলতে থাকুক, কিন্তু এটা নিশ্চিত মেনে নেবেন যে আর যাই হোক ভারত রাষ্ট্র পুঁজির সেবাদাস ছাড়া অন্য কিছু নয়। সে কখনওই মানবিক দৃষ্টিতে দেশ, দেশের জনসাধারণকে দেখবে না। দেখলে স্বাধীনতার এতগুলো বছর পর ১৩০ কোটি জনসংখ্যার ভারতে গৃহহীনের সংখ্যা ৮৭ কোটি ছাড়িয়ে যেত না। লকডাউন এক ধরনের আশীর্বাদ নিয়ে এসেছে ভারতের বর্তমান শাসকদের কাছে। ফ্যাসিবাদের অন্যতম অস্ত্র মানুষের মনে ভয় ও আতঙ্ক তৈরির কাজে সে ইতিমধ্যেই একশো শতাংশ সফল। চারপাশে চেয়ে দেখুন অজানা আতঙ্কে নীল হয়ে আছে আপনার সহনাগরিকদের বড় অংশ। এ ভয় একদিকে মৃত্যুর। অন্যদিকে যে নিরাপত্তার ঘেরাটোপে সে এতদিন নিশ্চিন্তে ছিল তা ভেঙে যাবার আশঙ্কা।

আপনি রাজনীতি না করলে কী হবে! রাজনীতি আপনাকে ছাড়বে না। কারণ রাজনীতি না করতে চাওয়াও তো চরম সুবিধেভোগী অবস্থান থেকে আসে। সারা দেশে যখন লকডাউন চলছে, সাধারণ মানুষ গৃহবন্দি, এই লকডাউনের সুযোগ নিয়েই নতুন নতুন কালো আইন বা আইনের প্রয়োগ এদেশের সবরকম বিরোধী কণ্ঠস্বর আটকে দিতে অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। কখনও শহুরে মাওবাদী তকমা দিয়ে, আবার কখনও অন্য অছিলায় জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বা জেএনইউয়ের ছাত্রনেতাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। চার্জশিট দায়ের করা হচ্ছে। নতুন ইউএপিএ আইন ব্রিটিশের কুখ্যাত রাওলাট আইনকেও বর্বরতায় পিছনে ফেলে দিচ্ছে। এই আইন আপনার বিরুদ্ধে কোনও সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই আপনাকে জেলে ঢোকাতে পারে। কুখ্যাত দিল্লি দাঙ্গায় সরাসরি যুক্ত বিজেপি নেতাদের কিছুমাত্র শাস্তি না দিয়ে একতরফাভাবে মিথ্যে মামলায় জড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে একের পর এক প্রতিবাদী নেতা ও কর্মীদের। আপনি সে সব জানতেও পারছেন না লকডাউনের বাজারে। কারণ এই সময় আপনাকে মিডিয়া দেখতে বাধ্য করছে সিনেমা সিরিয়ালের ‘তারকা’রা কীভাবে বাড়িতে বসে সাজগোজ করছেন, রান্না করছে বা গান গাইছেন, কে প্রধানমন্ত্রীর কথা মেনে সোশাল মিডিয়ায় নিজের যোগা ভিডিও আপলোড করছেন— এইসব। আমরা অধিকাংশ মানুষই এখন রাষ্ট্রের খেলার পুতুল। রাষ্ট্র যেমন যেমন নাচাচ্ছে আমরা তেমনই বিনা প্রশ্নে উদ্বাহু হয়ে নেত্য করছি জয় মোদিজির জয় বলে। তিনি হাততালি দিয়ে ঘণ্টা বাজিয়ে আলো জ্বেলে নাকি সংহতি জানাচ্ছেন করোনা-বিরোধী যুদ্ধের নায়কদের প্রতি। আমরাও দেখাদেখি হাততালি দিচ্ছি। তিনি প্রদীপ জ্বালাচ্ছেন, আমরাও তাই করছি। সব কিছু ছাপিয়ে  লকডাউনের মধ্যেই মহাসমারোহে নির্মিত হয়ে চলেছে এক ‘বীরের’ ভাবমূর্তি। তিনিই পারেন অন্ধকার থেকে জনগনকে আলোর পথে নিয়ে যেতে। লকডাউনের মেয়াদ ক্রমেই বাড়ছে। আরও বাড়তে পারে। প্রশ্ন উঠছে না এই দীর্ঘ সময়ে কেন ভারত যুদ্ধকালীন তৎপরতায় আধুনিক হাসপাতাল তৈরির কাজে সক্রিয় হচ্ছে না! প্রশ্ন উঠছে না কেন দেশের সমস্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে করোনা-রোধক পোশাক ও সরঞ্জাম এখনও পৌঁছে দেওয়া গেল না! প্রশ্ন উঠছে না কেন ভারতের স্বাস্থ্য বাজেট প্রতিবছর কমছে তো কমছেই! প্রশ্ন তোলাটাই রাজনীতি। প্রশ্ন তুলতে না দিয়ে বিরোধী স্বর, জনগণের কণ্ঠ পুলিশ মিলিটারি তাঁবেদার মিডিয়া দিয়ে আটকে রাখাটাও এর পালটা রাজনীতি। সুতরাং লকডাউনে দেশ বন্ধ থাকলেও রাজনীতি চলছেই। যে রাজনীতিতে গণতন্ত্রের বদলে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে স্বৈরতান্ত্রিক রাজনীতিকে।

এবং এই রাজনীতি আদ্যন্ত প্রতিহিংসামূলক। না হলে সরকারের ভাষায় এই কঠিন সময়ে সিদ্ধার্থ বরদাজনের মতো সাংবাদিককে যোগী সরকারের পুলিশ মিথ্যে মামলায় হাজার মাইল দূরে আদালতে হাজিরা দেবার শমন জারি করত না। গোপীনাথ কান্নন হর্ষ মন্দর প্রশান্ত ভূষণদের মতো প্রাক্তন আইএএস থেকে কাশ্মিরের নামী অনামী সাংবাদিকদের ওপর নানাভাবে এই লকডাউনের মাঝেও চরম হেনস্থা করা হত না। আনন্দ তেলতুম্বড়ে গৌতম নওলাখা ওমর খালিদ— একের পর এক ঘটনায় শীতল সন্ত্রাস নামিয়ে আনা হচ্ছে প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে প্রশ্ন তোলা সমস্ত ব্যক্তি ও সংগঠনের ওপর। আমি বা আমরা কেউই আজ আর নিরাপদ নই মোদির ভারতে। লকডাউন হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছে স্বৈরতান্ত্রিক এই সরকারকে। যে কোনও প্রশ্ন তোলাকেই ভয় পাচ্ছে এই চরম দক্ষিণপন্থী সরকার। মানুষের মন অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়ে সে যে আইনরক্ষার নামে যাবতীয় গণতন্ত্রের স্বরকেই ধামাচাপা দিচ্ছে শুধু তাই-ই নয়, সে এর মধ্যেই কালাহান্ডির একাধিক প্রত্যন্ত গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে গ্রামবাসীদের বিতাড়িত করেছে কর্পোরেট ভেদান্তার অ্যালুমিনিয়াম কারখানায় অতিরিক্ত জমি দেবে বলে। সবকা সাথ সবকা বিকাশের নামে দলিত আদিবাসী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সন্ত্রাস নামিয়ে আনা হচ্ছে৷ যে বাবু ভদ্দরলোকেরা দিল্লির তবলিগ জামাত বা পশ্চিমবঙ্গে মুর্শিদাবাদ বা অন্য কোথাও শুধুমাত্র মসজিদের জমায়েতের ছবি তুলে তুলে ভিডিও ভাইরাল করে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষের জন্ম দিচ্ছেন, তারা খুঁজে দেখুন একই সময়ে সারা দেশে অন্যান্য ধর্মীয় জমায়েত কীরকম রমরম করে চলেছে! আসল প্রশ্নটা তাই হিন্দু মুসলমানের নয়। দ্বন্দ্ব আসলে জালিম ও মজলুমের। গরিব ও বড়লোকের। প্রশ্ন তুলুন দেশের গরিষ্ঠ সম্পত্তি মাত্র কয়েকজনের হাতে থাকে কোন যাদুমন্ত্রে! আমাদের নেকুপুষু সুশীল বুদ্ধিজীবীরা লকডাউনের সময় কত গান কবিতা লিখে ফেসবুকে পোস্ট করছেন, বুকে হাত দিয়ে বলুন তো কজন একবারও নিন্দে করেছেন দেশের বিশিষ্ট কবি ভারভারা রাও বা আশি শতাংশ প্রতিবন্ধী সাইবাবাকে দিনের পর দিন স্রেফ ভিন্ন মতের কারণে জেলবন্দি করে রাখা নিয়ে। আর আপনি মাতব্বর খুব উপদেশ দিচ্ছেন ঘরে থাকুন ঘরে থাকুন বলে। আপনি কোনওদিন জানতে চেয়েছেন দেশের সাতাশি শতাংশ মানুষ কীভাবে জীবন কাটায়? তাদের মধ্যে একটা বড় অংশের কাছে আদৌ ঘর বলে কিছু আছে কি না। যাদের আপনি ঘরে থাকতে বলছেন, কখনও ভেবে দেখেছেন গরমের দিনে সামান্য পানীয় জলের জন্য যেসব মা-বোনেরা রাত থাকতেই মাইলের পর মাইল হেঁটে অনেক দূরের নদী খুঁড়তে যান যদি একফোঁটা জল পাওয়া যায় এ আশায়, তাদের কাছে ঘর মানে কী? বস্তারের গ্রামে গ্রামে মাওবাদী ‘সন্ত্রাসের ঘটনা’ নিশ্চয়ই শুনেছেন মিডিয়ার দৌলতে ফলাও করে। কিন্তু সেখানে বৃষ্টির দিনে খাবারের জ্বালায় মা বাচ্চার কান্না থামাতে বাধ্য হয়ে মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে আলু বের করেন, আর সেই বিষাক্ত আলু খাওয়ামাত্র বাচ্চাটি কোলের মধ্যেই লুটিয়ে পড়ে, এ খবর কখনও শুনেছেন? আসলে কর্পোরেট মিডিয়া আর দেশের মান্যগণ্যরা যে ভারতকে আপনাকে দেখায় তার বাইরের বিপুল অভাবী ও প্রকৃত দেশটাকে আপনি আমি চিনি না। চিনতে চাইও না। আমি আপনি লকডাউন লকডাউন করে চেঁচাচ্ছি কেন জানেন! না গরিব মানুষকে ভালবেসে নয়। তাদের কাছ থেকে ভাইরাস যদি আমার মধ্যে ঢুকে পড়ে। আমি আসলে স্থিতাবস্থা চাই। ওই যে গরিব আইন না মেনে রাস্তায় হাঁটছে তাদের দিকে আঙুল তুলছি অভিযোগের। অথচ আমাদের দিকে আঙুল তোলার কথা তো তাদেরই। জমি উচ্ছেদ করা থেকে নদী বিক্রি, কোটি কোটি টাকা খরচ করে এমএলএ এমপি কেনাবেচা, এমন কোনও দুষ্কর্ম নেই আমাদের শাসকেরা করেননি। কই তখন তো আমরা প্রশ্ন তুলিনি। পুলিশ দিয়ে মেরেধরে যাদের আমরা ঘরে ঢোকাচ্ছি স্বাস্থ্যবিধি মানার দোহাই দিয়ে, এর আগে কোনওদিনই তাদের খোঁজ রেখেছি কি? আজ যে রাখছি তাও মোটেও তাদের ভালমন্দের কথা ভেবে নয়। আসলে নিজে যেন আক্রান্ত না হই সে কারণে। অবিবেচক করোনা এসে যে এই শ্রেণিনির্দিষ্ট পাঁচিলটি ভেঙে দিয়ে মুড়িমিছরি সব এক করে দিয়েছে, তা নিয়ে আমরা সকলেই বেশ বিড়ম্বিত। আসলে এতদিন ধরে আমাদের আইন আমাদের বিধিব্যবস্থা আমাদের প্রতিষ্ঠান, সর্বত্র আমি আমি আমি! আর এখন হাতজোড় করে বলতে হচ্ছে— বাপু হে এদেশটা তোমারও। সে মানবে কেন! না মানলেই সে দেশদ্রোহী আর আমরা দেশপ্রেমিক!

দেশপ্রেমী বনাম দেশদ্রোহীর ন্যারেটিভ সুকৌশলে বোনা হচ্ছে দেশজুড়ে। নিজে যেহেতু সিনেমার লোক তাই ইমেজ রাজনীতি কিছুটা হলেও বুঝতে পারি। এই যে চিফ অব স্টাফ বিপিন রাওয়াতের নেতৃত্বে ভারতের সেনা জওয়ানেরা বিভিন্ন হসপিটালের মাথায় ফুল ছেটাচ্ছেন তার পিছনে আসল মতলবটা কী তা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রাক্তন সেনাকর্তারাও প্রশ্ন তুলেছেন। এইসব টোকেনিজমের বা দেখনদারির জন্য সরকারি খরচ আদৌ যুক্তিযুক্ত কিনা বা করোনা মোকাবেলায় প্রকৃত অগ্রাধিকারগুলি ঠিকঠাক চিহ্নিত হচ্ছে কিনা— সে সব বাদ দিলেও প্রশ্ন উঠবেই যে জনমনে এই অন্ধকার সময়ে মিলিটারির প্রতি শ্রদ্ধামিশ্রিত ভয়ের চিত্রকল্প চারিয়ে দেওয়া হচ্ছে কিনা! মনে রাখবেন এই বিপিন রাওয়াত-ই আমাদের দেশের ইতিহাসের প্রথম সেনানায়ক যিনি পদে থাকা অবস্থায় এনআরসি-ক্যা নিয়ে সরকারের পাশে দাঁড়িয়ে সরাসরি রাজনীতি করেছিলেন। মনে রাখতে হবে মিলিটারি যখন সরকারের চিয়ারলিডারের কাজ করছে তখন, তার কিছুদিন আগেই সেনা অফিসার এনএস বল ক্যানসারে মারা যাবার পরে তাঁকে শেষ দেখার জন্য মা বাবার করুণ আবেদন নিয়ম নেই বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল সেনা কর্তৃপক্ষ। এতই নাকি প্রোটোকলের কড়াকড়ি ভারতীয় সেনায়। অথচ সামান্য বিশেষ বিমানের ব্যবস্থা করলেই মা বাবা মৃত্যুপথযাত্রী ছেলেকে দেখতে পারতেন। আসলে ভারত এই অন্ধকার সময়ে দাঁড়িয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় অতীব শক্তিশালী দেশ হয়ে উঠতে চাইছে। সিলভেস্টার স্ট্যালোনের জন র‍্যাম্বোর ভারতীয় ভাষ্য নির্মাণে অধিক সক্রিয় ভারত এখন যথাযথ করোনা মোকাবিলা না করে আমেরিকার সঙ্গে মিলিয়ন ডলারের সামরিক চুক্তি করতে বেশি ব্যস্ত। শোনা যাচ্ছে প্রতিবেশী দেশ, বিশেষ করে বাংলাদেশে সে নাকি এই বিষাদকালে সেনা রপ্তানিতে আগ্রহী।

মোদ্দা কথা, যে দেশ অশ্লীলভাবে দেশের বিরাট সংখ্যক মানুষকে বছরের পর বছর ধরে দরিদ্রসীমার নীচে রেখে দেয়, কোথাও বিরুদ্ধ মত শুনতে পেলেই তাকে পায়ে পিষে মারে, সে যদি হঠাৎ জনগণের বন্ধু সাজে, তখন তাকে আর বিশ্বাস করা যায় না। এই রাজনীতিটা আমাদের বুঝতে হবে। একদিকে রাষ্ট্র। আইন। আদালত। মিডিয়া। মিলিটারি। অন্যদিকে কোটি কোটি জনগণ। লকডাউনের কালে স্বৈরতান্ত্রিক প্রকাশ যেটুকু যা আমরা দেখতে পাচ্ছি তা হিমশৈলের চূড়ামাত্র। লকডাউন কেটে গেলেই এদের রাজনীতি ভয়ঙ্কর চেহারা নেবে। গণতন্ত্রের এই নড়বড়ে কাঠামোটাও আর থাকবে না। তখন একদিকে রাষ্ট্র ও তার তাঁবেদার সুবিধেভোগী শ্রেণি ও অন্যদিকে হাজার কোটি নিরন্ন, বুভুক্ষু জনতা। লকডাউন-পরবর্তী ভারতবর্ষের এই অনিবার্য পরিণতি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2615 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

4 Comments

  1. ঝাঁঝালো ও জোরালো লেখা। কিন্তু এতেও কি টনক নড়বে গণতন্ত্রের মাস্কধারী একনায়কতন্ত্রের ধারক-বাহকদের?

  2. অনেকটাই সত্য তবে হয়তো একটু বেশী আবেগপ্রবণ যা এই সময়ের ও পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে স্বাভাবিক। লড়াই তো করতেই হবে তবে সেটা গণতান্ত্রিক উপায়ে। সর্বপ্রথম বিরোধী দলগুলির অকর্মণ্য বস্তাপচা মুখগুলিকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নুতন প্রজন্মের নেতাদের প্রতিষ্ঠিত করতে হবে যারা এই আন্দোলনকে জনগণের কাছে নিয়ে যেতে সক্ষম। এই আন্দোলনকে হতে হবে সম্পূর্ণ অহিংস। প্রশাসনিক আঘাত আসবেই কিন্তু যত আঘাত আসবে আন্দোলন তত দৃঢ় ও সংহত হবে। শর্তসাপেক্ষ সমর্থন রইলো।

    • Rajnitir shob theke Boro bhuktobhugi holo prokriti. Bisleshoney kothao prokritir durobosthar katha phutey uthlona. Sheta ki bhaber gharey churi noi? Protita jeeb jontu, jara vote ditey parena ba kintey parena, tader kono odhikar nei? Shustho howar ba shustho thakar? Prokriti nijey k shustho korey tulbei. Agey ba porey. Ozone hole bunjey geche. Akash batash pollution mukta. Etar mullyo koto? Ek jhatkai coronar kalyaney prithibi kotota shustho aar unnoto hoichey eto alpa shomoi? Ei mullayon k korbey? Khub shombhoboto rajnitir pratham path holo odurodarshi howa. Dan bam nirbishehey. Prokritir kachey Modi, Mao, Marx shobai arthaheen.

  3. লেখক সাহসীকতার সাথে আমাদের দেশের বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা এবং হিটলারী শাসন ব্যবস্থার শঠিক বিশ্লেষণ আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। এই পরিস্থিতিতে আমাদের সচেতনতাই একমাত্র দেশকে বাঁচাতে পারে।

আপনার মতামত...