অশনিসঙ্কেত — চতুর্থ বর্ষ, প্রথম যাত্রা

স্টেশন মাস্টার

 

লকডাউন ভাল না মন্দ, তাহার প্রয়োগ কতদূর নিয়ন্ত্রিত ও সুপরিকল্পিত হইলে তাহাতে দেশের ও দশের মঙ্গল, লকডাউনে দেশের প্রকৃতই উপকার হইতেছে কি না, ইত্যাকার অজস্র প্রশ্ন ও প্রতিপ্রশ্নের মধ্যেই গোটা দেশে লকডাউনের মেয়াদ পুনর্বার বর্ধিত হইল। তৃতীয় দফায় তাহা ১৭ মে পর্যন্ত প্রলম্বিত হইয়াছে। গত দুই দফার সহিত পার্থক্য বলিতে – এইবারের ঘোষণার মধ্যে নাটকীয়তার উপাদান প্রায় ছিলই না – নৃত্যগীতবাদ্যবর্তিকার পরিচিত উপচার ছাড়াই, প্রায় নৈর্ব্যক্তিক শীতলতার সহিত, বার্তাটি ঘোষিত হইয়াছে। এক হিসাবে, ইহাই কাঙ্ক্ষিত ছিল – সরকারের কাজ যে দেশবাসীকে বিনোদন উপহার দেওয়া নহে, তাহা, বিলম্বে হইলেও অনুধাবন করিয়া উঠিতে পারার জন্য বাহবা দিল্লীশ্বরের অবশ্যপ্রাপ্য। ঠিক একইরকম বাহবা প্রাপ্য কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রকের সচিব ও সরকারের মন্ত্রিবর্গের, যাঁহারা এই বার্তাটিও ঠারেঠোরে প্রচার করিতে ব্যস্ত রহিয়াছেন যে, দেশ করোনা-সংক্রমণের অন্ধকারতম পর্যায়টি দ্রুত অতিক্রম করিয়া আসিতেছে। অঙ্ক তাহা সমর্থন করিতেছে কি না, তাহা অবশ্য তর্কের বিষয়। পরন্তু, অঙ্ককে দিয়া আপনাপন সুবিধাজনক সত্যটি উচ্চারণ করাইয়া লইতে পারার পদ্ধতি রাশিবিজ্ঞানের অজানা নহে, বরঞ্চ অতিব্যবহৃত।

কিন্তু সে প্রতর্ক থাক। ঘটনা হইল, লকডাউনের মেয়াদ পুনর্বর্ধিত হইলেও তৃতীয় দফায় যে কিছুকিঞ্চিৎ ছাড় মিলিয়াছে তাহা দেশের থমকিয়া থাকা অর্থনীতির চাকাকে পুনর্বার গড়াইতে সাহায্য করিবে বলিয়া সরকার ও অর্থনীতিবিদগণ আশাপ্রকাশ করিয়াছেন। আশা যেহেতু প্রায় ভাইরাসের মতোই সংক্রামক – অতএব তাহা দ্রুত সংবাদবাহিত হইয়া জনগণের কাছে পঁহুছিয়া তাহাদিগকেও আশাবাদী করিয়া তুলিয়াছে। ইহারই পার্শ্বে অবশ্য সংযোজিত হইতে থাকিয়াছে আরও নানা দৃশ্যখণ্ড, যাহা ততদূর আশাব্যঞ্জক নহে – বস্তুত অত্যন্ত অস্বস্তিকর। সংবাদমাধ্যম দেখাইয়াছে, কর্মহীন মানুষের সারি স্রেফ ঘরে ফিরিবার তাগিদে, স্ত্রীপুত্রকন্যার হাত ধরিয়া খালি পেটে ক্রোশ-ক্রোশ পথ পাড়ি দিতে কীভাবে পথে নামিয়াছে… কীভাবে জামলো মকদমের মতো অসহায় এক শিশুশ্রমিক ঘরে ফিরিতে চাহিয়া পথেই প্রাণ হারাইয়াছে… কীভাবে অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত অসংখ্য ভুখা মানুষ আতঙ্কিত কণ্ঠে জানাইয়াছেন করোনায় না-মরিলেও তাঁহারা অচিরেই না-খাইয়া মরিবেন… কিন্তু, এতৎসত্ত্বেও, মানিতেই হইবে – লকডাউনের দফা-ওয়াড়ি প্রলম্বনপর্বে ভাগ্যবিধাতৃগণের স্তোকবাক্যে ভরসা রাখিয়া দেশের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মানুষ মনে-মনে আশাবাদী হইয়া উঠিয়াছেন, যাহা, অন্তত সরকারের পক্ষে অতীব স্বস্তিদায়ক।

এমত পরিস্থিতিতে, মে সংখ্যার সম্পাদকীয় প্রস্তুত করিতে বসিবার ঠিক পূর্বেই নজরে পড়িল রাষ্ট্রপুঞ্জের এক সদ্যোপ্রকাশিত সমীক্ষা। রাষ্ট্রপুঞ্জের আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সাম্প্রতিকতম রিপোর্টে উঠিয়া আসিয়াছে, বিশ্বব্যাপী লকডাউনে কাজ হারাইতে পারেন অন্তত ১৬০ কোটি মানুষ, যাঁহাদের অধিকাংশই অসংগঠিত ক্ষেত্রের দিন-আনি-দিন-খাই শ্রমিক – যাঁহাদিগের ক্ষুন্নিবৃত্তি নির্ভর করে প্রতিদিনের শ্রমবিক্রয়লব্ধ উপার্জনের উপর – এবং পৃথিবীব্যাপী এই চাক্কাবন্ধের ঋতুতে যাহা পুরাপুরি বন্ধ, পুনরায় কবে চালু হইবে তাহাও অজানা।

রাষ্ট্রপুঞ্জের এই রিপোর্ট বলিতেছে, করোনাভাইরাসের প্রকোপ ছড়াইয়া পড়িবার পর প্রথম মাসেই সারা বিশ্বে অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের আয় কমিয়াছে প্রায় ৬০ শতাংশ। অঞ্চলভেদে ইহার মধ্যেও পার্থক্য রহিয়াছে। আইএলও-র হিসাবে আফ্রিকা ও আম্রিগা মহাদেশে অসংগঠিত ক্ষেত্রে আয় কমিয়াছে ৮০ শতাংশ, ইউরোপ ও মধ্য-এশিয়ায় ৭০ শতাংশ, এবং এশিয়ায় ২১ শতাংশের সামান্য বেশি। খুচরা ব্যবসা ও উৎপাদনক্ষেত্রে সারা বিশ্ব ভয়ঙ্কর লোকসানের মুখে পড়িতে চলিয়াছে বলিয়াও আশঙ্কা প্রকাশ করিয়াছে আইএলও। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও লকডাউনের জেরে প্রায় ৪৩ কোটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উৎপাদনসংস্থা ডুবিয়া যাইতে পারে।

আইএলও একা নহে, বস্তুত আরও অসংখ্য রিপোর্ট মিডিয়াবাহিত হইয়া প্রতিনিয়ত আমাদিগের নজরে আসিতেছে, যাহার প্রতিটিরই নির্গলিতার্থ প্রায় এক – করোনা-উত্তর যুগে অর্থনীতিক্ষেত্রে এক ভয়াবহ বিপর্যয় মানবসভ্যতাকে গ্রাস করিতে আসিতেছে, যাহার হাত হইতে ধনী-দরিদ্র কাহারও পরিত্রাণ নাই। কিন্তু, ধনীরা সেই বিপর্যয় কোনওমতে পার করিয়া উঠিতে পারিলেও নির্ধনদের পক্ষে তাহা মর্মান্তিক হইতে চলিয়াছে। বলা বাহুল্য, অর্থনীতির বিপদ সর্বগ্রাসী – সে কৃষি, কৃষিজ দ্রব্যের বণ্টন ও পরিবহনব্যবস্থাকেও ছাড়িয়া কথা বলিবে না। এবং তাহার ফলে, প্রায় নিশ্চিতভাবেই, সমূলে কুঠারাঘাত নামিয়া আসিবে বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তায়। তাহার ফল কত সুদূরপ্রসারী হইবে, ভাবিলেও শিহরিয়া উঠিতে হয়।

এই আসন্ন বিপর্যয়ের সমান্তর ফলস্বরূপ আর কী কী ঘটিতে পারে? পুঁজিবাদ তাহার ক্ষত নিরাময়ের উদগ্রতায় শ্রমিকশ্রেণির উপর আরও উৎপীড়নশীল হইয়া উঠিবে কি? নাকি, পুঁজিবাদের এই ভুমিশয্যার মুহূর্তটিকে কাজে লাগাইয়া আরও একবার ফিরিয়া আসিতে পারে সমাজতন্ত্রের প্রতি আগ্রহ ও চর্চা? চাকুরিজীবী শহুরে মধ্যবিত্তশ্রেণি, যাঁহারা স্বভাবতই নিজের গৃহের চালে আগুন না-লাগিলে নড়িয়া বসেন না, তাঁহারা কি সেই নির্মম সময়েও সরকারি ডোল-ব্যবস্থার ভরসায় থাকিবেন? এই বিপন্নতার মধ্যে পরিবেশ রক্ষা-বিষয়ে আমাদিগের অন্তহীন অনাগ্রহ কি অন্তত খানিক প্রশমিত হইবে? আমরা কি একবার স্থির হইয়া ভাবিয়া দেখিতে চাহিব, পথ কী, বার্তা কী? ‘গান আইল্যান্ড’ উপন্যাসে শ্রী অমিতাভ ঘোষ মহাশয় যেরূপ দেখাইয়াছেন, আমরা কি অন্তত একবার স্মরণ করিতে চাহিব সেই অমোঘ মন্ত্র ‘Unde origo inde salus…’ – যাহা আমাদের ফিরিতে বলে উৎসের অভিমুখে, যাহারই মধ্যে নিহিত আছে সম্মুখের পথ?

চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের মে সংখ্যার বিষয়সূচি প্রস্তুত করিতে বসিয়া এই প্রশ্নগুলিই আমাদিগের ভাবনার কেন্দ্রে ছিল। ঋষিরা বলিয়াছেন, অতীতকে অনুধাবন করিয়া তাহার আলোকে বর্তমানকে পাঠ করিতে পারিলে ভবিষ্যতের পথটি প্রতীয়মান হয়। সেই অনুশাসন শিরোধার্য করিয়াই আমরা আসন্ন বিপর্যয়ের অশনিসঙ্কেতের কেন্দ্রস্থ সঙ্কেতটিকে সাধ্যানুসারে বুঝিতে চেষ্টা করিয়াছি। সেই প্রয়াসেরই ফল, আমাদিগের এই সংখ্যার রিজার্ভড বগি-র নিবন্ধগুচ্ছ। লিখিয়াছেন দেবল দেব, সৌমিত্র দস্তিদার, গৌতম সরকার, অর্ক দেব, শঙ্কর সান্যাল, সুশোভন ধরশতাব্দী দাশ। তৎসহ, রহিয়াছে একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার। প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা-স্তরে অতি দ্রুত সিদ্ধান্তগ্রহণ ও যৎপরোনাস্তি তৎপরতার সহিত করোনা-পরিস্থিতির মোকাবিলায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়া সারা বিশ্বের নজর কাড়িয়াছে দেশের যে রাজ্যটি, সেই কেরলের মুখ্যমন্ত্রী শ্রী পিনারাই বিজয়নের এই অতীব গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকারটি লইয়াছেন জয়ন্ত বসু

কবি টিএস এলিয়ট তাঁহার ‘পোড়ো জমি’-তে এপ্রিলকে নিষ্ঠুরতম মাস বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। হয়তো বা সেই পর্যবেক্ষণকে সঠিক প্রতিপন্ন করিতেই, গত মাসে আমাদিগকে ছাড়িয়া গিয়াছেন একাধিক বিশ্রুত ও কিংবদন্তিপ্রতিম ব্যক্তিত্ব। সে তালিকায় যেমন রহিয়াছেন ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম প্রাণপুরুষ চুনি গোস্বামী মহাশয়, তেমনই আছেন ভারতীয় সিনেমার দুই প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব – ঋষি কাপুর ও ইরফান খান, এবং আমাদিগের গ্রুপ থিয়েটারের অন্যতম প্রধান পুরোধা ঊষা গঙ্গোপাধ্যায়। আমাদের ‘স্মরণ’ বিভাগে এঁদের সকলের জন্য রহিল বিনম্র শ্রদ্ধা ও স্মৃতিতর্পণ। চুনি গোস্বামীকে নিয়া লিখিয়াছেন কলকাতা ময়দানের আরও এক খ্যাতনামা পুরুষ সমর (বদ্রু) ব্যানার্জি। ঋষি কাপুরের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করিয়াছেন চণ্ডী মুখোপাধ্যায়। ইরফান খানকে লইয়া দুইটি নিবন্ধ প্রস্তুত করিয়া দিয়াছেন সত্যব্রত ঘোষসন্দীপন গঙ্গোপাধ্যায়। ঊষা গাঙ্গুলিকে লইয়া লিখিয়াছেন খেয়ালি দস্তিদারসুজয়প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

এতদ্‌ব্যতীত, গল্প, অণুগল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, মুক্তগদ্য, স্টিম এঞ্জিন, অনুবাদ-সাহিত্য, ফটোফিচার, ধারাবাহিক রচনা ও উপন্যাস-সহ যাবতীয় নিয়মিত বিভাগ যথাযথ প্রকাশিত হইল। রহিল পরিবেশ সংক্রান্ত বিভাগ ‘সবুজ স্লিপার‘, ভ্রমণকাহিনির বিভাগ ‘ডিসট্যান্ট সিগনাল‘, পুস্তকালোচনার বিভাগ ‘হুইলার্স স্টল’, এবং শেষপাতে ‘ভাল খবর’।

সম্পাদকীয়-র একেবারে শেষে আসিয়া খেয়াল হইল, খানিক পূর্বে এলিয়টের ‘পোড়ো জমি’-র উল্লেখ করিয়াছিলাম। পাঠকের স্মরণে থাকিবে, সেখানে এপ্রিলকে নিষ্ঠুরতম মাস বলিয়া উল্লেখের পাশাপাশিই কবি শুনাইয়াছিলেন, সে বন্ধ্যা মাটিতে ফুটাইয়া তুলে লাইলাকগুচ্ছ। রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’-তেও আমরা দেখিয়াছি একখানি লাল করবীফুলের ডাঁটিকে অপ্রাণের আবর্জনার স্তূপ হইতে পরম স্পর্ধায় মাথা তুলিয়া আকাশকে আলিঙ্গন করিতে। মনে হইল, অশনিসঙ্কেতের এই অনিশ্চয়তার ঋতুতে, সেই লাইলাক ও রক্তকরবীর অন্তর্নিহিত বার্তাটিও ‘ফুটনোট’ হিসেবে সবিশেষ উল্লেখিত থাক। ওই রক্তকরবীটির পথেই মানুষের মুক্তির সন্ধান লিখা আছে, সেই অন্তিম সত্যটি যেন কেহ না-ভুলি।

ভাল থাকুন। বস্তুত, ‘ভাল থাকুন’ বলিবার ইহাই তো উপযুক্ততম সময়…

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2336 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...