যাবজ্জীবন প্রতিবাদ

সেমন্তী ঘোষ

 

 

সেমন্তী ঘোষ আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে বরিষ্ঠ সহকারী সম্পাদক। বিষয়, ইতিহাস। প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে টাফটস্ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক সুগত বসুর তত্ত্বাবধানে ১৯৯৯ সালে ডক্টরেট ডিগ্রি। প্রকাশিত গবেষণা, ডিফারেন্ট ন্যাশনালিজমস: বেঙ্গল, ১৯০৫-৪৭, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০১৭। বাংলা বই: দেশভাগ, স্মৃতি আর স্তব্ধতা (সম্পাদিত), গাঙচিল, ২০০৮; স্বজাতি স্বদেশের খোঁজে, দে’জ পাবলিশিং, ২০১২। সাংবাদিকতার জগতে লেখালেখির বিষয় ইতিহাস, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সমসাময়িক সমাজ ও সংস্কৃতি।

 

 

সতেরোটা বই লিখেছেন তিনি, তার সঙ্গে কয়েকশো কবিতা আর প্রবন্ধ। চলমান শতাব্দীর প্রায় অধিকাংশটাই তাঁকে কাটাতে হয়েছে জেলে।

উপরের দুটি বাক্যের মধ্যে যে একটা কার্যকারণ সম্পর্ক আছে, এ কথা বললে যেন বিশ্বাস হতে চায় না। কিন্তু ঘটনাটা যে একেবারেই তাই। ‘চিনের বিবেক’, ‘আমাদের এই সময়ের ম্যান্ডেলা’ বলা হয় যে লিউ জিয়াওবো-কে, চিনের সেই প্রতিবাদী লেখকের ক্ষেত্রে সত্যিই তো এমনটাই ঘটেছে। লেখালিখির মাধ্যমে চিনের বাকস্বাধীনতার দাবি তুলে গিয়েছেন তিনি— সমানে, নিরন্তর, প্রতিটি সুযোগে। তাই বার বার চিনা রাষ্ট্রের বিষনজরে পড়েছেন তিনি, গ্রেফতার হয়েছেন, বন্দি হয়েছেন। চতুর্থ বার যখন বন্দি হলেন, আর ছাড়া পেলেন না। শেষে অন্তরিন অবস্থাতেই, হাসপাতালে, স্বাধীনচেতা অবরুদ্ধ মানুষটি শেষ নিঃশ্বাস ফেললেন, সবে চলে-যাওয়া এই জুলাই-মাসে।

অন্তরিন অবস্থাতেই মৃত্যু হল তাঁর। তিনিই চিনের একমাত্র নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজেতা।

বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও এই শেষ দুটি বাক্যের মধ্যেও কিন্তু একেবারে সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক আছে। চিন দেশে বাক্-স্বাধীনতার দাবি উঠিয়েছিলেন, রাষ্ট্রীয় খবরদারির বিরুদ্ধে নানা মিটিং-মিছিলে পা মিলিয়েছিলেন, ১৯৮৯ সালে তিয়েন-আন-মেন স্কোয়্যারের ছাত্রদলের সঙ্গেও সে দিন দেখা গিয়েছিল তাঁকে। অবিশ্রান্ত এই প্রয়াসের স্বীকৃতি হিসাবে তাঁকে নোবেল কমিটি শান্তি পুরস্কার প্রদান করল ২০১০ সালে। ব্যস, অমনি যেন আগুনে ঘৃতাহুতি পড়ল। চিনের শাসক গোষ্ঠী ধরেই নিল, তিনি পশ্চিমি শক্তির দালাল। তাঁকে দিয়ে এই কাজ করানো হচ্ছে নিশ্চয়ই কোনও কিছুর বিনিময়ে, অন্তত নোবেল পুরস্কারের বিনিময়ে। বাইরের দুনিয়ায় যাতে চিনের সম্পর্কে কুখ্যাতি ছড়ানো হয়, সেই লক্ষ্যে কাজ করছেন লিউ জিয়াওবো। নোবেল পুরস্কারের ঘোষণাটা যখন প্রথম শোনা গেল, তখনও তিনি জেলেই। কিন্তু ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সম্ভবত তাঁর দেশের শাসকগোষ্ঠীর মানসজগতে নিশ্চিত হয়ে গেল একটা কথা: লিউ আর কোনও দিন ছাড়া পাবেন না। যেখানে তাঁকে রুদ্ধ করে রাখা হয়েছে, সেখানেই তিনি থেকে যাবেন আজীবন। কেননা তাঁর সম্পর্কে যে গভীর সন্দেহ এত দিন ভেতরে ভেতরে পোষণ করে এসেছে তাঁর রাষ্ট্রের শাসকদল, নোবেল শান্তি পুরস্কার যেন অলক্ষ্যেই সেই সন্দেহটা একশো ভাগ সমর্থন করে দিল! এত দিন চিনের চোখে, লিউ ছিলেন বিপজ্জনক রাষ্ট্রদ্রোহী। নোবেল-ঘটনার পর থেকে, চিনের চোখে, লিউ অত্যন্ত বিপজ্জনক আন্তর্জাতিক দালাল, চিনের মাটিতে তাঁকে বন্দি করে রাখা ছাড়া পথ নেই। সুতরাং লিউ-এর বন্দিত্ব রাতারাতি একটি স্থায়ী ঘটনায় পরিণত হল। নোবেল পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে তাঁর নামাঙ্কিত চেয়ারটা সে দিন ফাঁকা ছিল, সেই ছবি দেখে পৃথিবীর অনেক লোক কষ্ট পেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা হয়তো ভাল করে বুঝতে পারেননি যে, এর পর থেকে বাইরের জগতের কোনও চেয়ারেই আর লিউ বসবেন না, তাঁকে বসতে দেওয়া হবে না। নোবেল পুরস্কার তাঁর জন্য যাবজ্জীবন শাস্তির ফাঁসে পরিণত হয়েছে।

লিউ মুক্তির কথা বলেছিলেন, মুক্ত গলায় বলেছিলেন। ভাবতে গিয়ে অবাক লাগে, কোনও রাষ্ট্রের কাছে এই মুক্তির কথা এত অগ্রহণযোগ্য, এত বিপজ্জনক ঠেকতে শুরু করতে পারে? কেন, কখন, কোন পরিস্থিতিতে এমন হয়? সম্ভবত, যখন কোনও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ অনুভব করে যে, তার নিজের মতটি ছাড়া আর কোনও মতকে সামনে আসতে দিলেই তার নিজের অস্তিত্ব সামগ্রিকভাবে বিপন্ন হবে, তখনই এমন একটা চরম পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। অর্থাৎ, নিরাপত্তাবোধের অভাব থেকে ভয় জন্ম নেয়, আর ভয় থেকেই আসে দমন, চূড়ান্ত দমন। যে কোনও উপায়ে চিনা কমিউনিস্ট পার্টির একটি স্তরের হাতে ক্ষমতা ধরে রাখতে হবে, রাশ এক বিন্দু আলগা করা যাবে না: এই হয়ে দাঁড়ায় লক্ষ্য। ১৯৮৯ সালে দেং জিয়াও পিং যখন অতি-সাধারণ ছাত্রছাত্রী লেখক-সাংবাদিক বিক্ষোভকারীদের দিকে মিলিটারি বাহিনীকে ট্যাঙ্ক-সহ মহাসমারোহে এগিয়ে যেতে বলেছিলেন, সে দিনই এই ভয়ের প্রকৃত চেহারাটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ভয় উত্তরোত্তর আরও বাড়তে থাকল অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। ১৯৯০-এর দশকে চিনের অর্থনীতির যে বিশাল বৃদ্ধি গোটা পৃথিবীকে চমকে দিল, সেটাই আবার অন্য দিক থেকে চিনা সমাজের পক্ষে কালনাগের ফাঁসের চেহারা নিল। কোনও ভাবেই আর ফাঁসের বাঁধন আলগা করা নয়— সামাজিক-অর্থনৈতিক ভাবে পরিপুষ্ট ও ক্ষমতাতুষ্ট নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত দাঁড়াল এমনই। প্রসঙ্গত, মনে রাখতে হবে যে, বাইরের দেশগুলোও কিন্তু ওই সময়ে চিনের এই মানবাধিকার দমনের ধরনধারন নিয়ে বিশেষ উচ্চবাচ্য করত না, কেননা, আহা নবৈশ্বর্যশালী চিন, তাকে কি চটাতে আছে! বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার কর্মীরা ব্যক্তিগতভাবে লিউ-র মুক্তির জন্য চিনের কাছে অনুরোধ পাঠলেন, কিন্তু রাষ্ট্রগতভাবে সে দিন কোনও দেশই চিনের মানবাধিকার দমন নিয়ে বেশি আলোচনায় রাজি ছিল না, কোনও পদক্ষেপ করতে প্রস্তুত ছিল না। ২০০৮ সালের বিশ্বজোড়া অর্থনীতির মন্দার সময় দেখা গেল, চিনের উপর এই দেশগুলির নির্ভরতা যেন আরওই বেড়ে গিয়েছে। অর্থাৎ আজ তাঁর মৃত্যুর পর যত দেশের যত অনুনাসিক ক্রন্দন, এমনকী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পেরও করুণ বার্তা বিতরণ, বিশ শতকের শেষে ও একুশ শতকের শুরুতে একটা দীর্ঘ সময় জুড়ে চিনের পরিস্থিতি নিয়ে কিন্তু সেই পশ্চিমি দেশগুলো সকলেই ছিল আশ্চর্য রকম চুপচাপ, উদাসীন। আজ লিউ-এর এই ভয়ঙ্কর ভবিতব্যতার পিছনে কি এত দিনের সেই আত্মবিস্মৃত নীরব বিশ্বজনমতেরও একটা দায়িত্ব নেই?

তবে, সবচেয়ে বড় দায়িত্ব যার বা যাদের, সেটা পরিষ্কার করে আজ না বললেই নয়। একটি দমনমূলক স্বৈরাচারী রাষ্ট্রব্যবস্থা তার নিজের স্বার্থে চলবে, এটা ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু একুশ শতকে এসেও সেই রাষ্ট্রের দ্বারা শাসিত সমাজ— যে সমাজে রাজনৈতিক স্বাধীনতা কম থাকলেও অর্থনৈতিক বা সামাজিক সমৃদ্ধির তেমন অভাব নেই— তারা কী করে রাষ্ট্রের এই অসীম স্পর্ধিত স্বার্থ বছরের পর বছর, দশকের পর দশক মেনে নেয়, এটা একটা বিরাট প্রশ্ন। সে প্রশ্নের উত্তর চাওয়ার সময় এসেছে।

চিনা সমাজ কি জানে যে, লিউ জিয়াওবো-র ঘটনা ইতিহাসে তাদের দেশকে একটি প্রবল কুখ্যাত দৃষ্টান্তের সঙ্গে এক সারিতে বসিয়ে দিয়ে গিয়েছে? মানবাধিকারের দাবি তুলে রাষ্ট্রের বিরাগভাজন হওয়ার পর ঠিক একইভাবে আর একটি দেশের আর একটি মানুষ নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন, এবং ঠিক একইভাবে বন্দিত্বের কারণে তিনি সেই পুরস্কার গ্রহণ করতে সক্ষম হননি। ঠিক একইভাবে জেলে বন্দি থাকার সময়ই তাঁরও মৃত্যু ঘটেছিল। মানুষটির নাম কার্ল ফন অসিতস্কি, জার্মান নাগরিক, বিদ্রোহী নাগরিক, নাৎসি সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের বার্তা ছড়িয়েছিলেন, কলম ধরেছিলেন, ১৯৩৮ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। জার্মানির সেই অসিতস্কির নামের সঙ্গে চিনের লিউ-এর নাম জড়িয়ে গেল, নাৎসি জার্মানির সঙ্গে জড়িয়ে গেল সমাজতন্ত্রী পিপলস রিপাবলিক অব চায়নার নামটিও। এই ঐতিহাসিক কলঙ্কের যথার্থ অর্থ যে ঠিক কী, সেটা হয়তো এখনও চিনের সমাজের কাছে স্পষ্ট নয়। মৌখিকভাবে হলেও যে দেশ নিজেকে সমাজতন্ত্রী বলে দাবি করে, নিজের সঙ্গে এই জঘন্য মানবাধিকার হননকাণ্ডকে যুক্ত করে যে কত নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত সে স্থাপন করে গেল, তার মূল্যায়নও হয়তো এখন হবে না, ভবিষ্যতের অপেক্ষায় থাকতে হবে। কেবল একটি কথা এই প্রসঙ্গে না বলে উপায় নেই। এই কলঙ্ক কেবল চিনা রাষ্ট্রের কলঙ্ক নয়। এই কলঙ্ক চিনা সমাজেরও। যে নাগরিক সমাজ চুপ করে অনাচারী স্বৈরাচারী রাষ্ট্রকে মেনে নেয়, কোনও বড় মাপের আন্দোলন তৈরি করে এত সাহসী বিবেকবান মানবাধিকার কর্মীদের বাঁচাতে এগিয়ে আসে না, যে সমাজ তার মৌন-সম্মতি দিয়ে অহরহ এত অনাচার, এত দমন-পীড়ন ঘটে যেতে দেয়— ইতিহাসের বিচার কিন্তু তাকে ছেড়ে দেবে না। আজও যদি নিশ্চুপতা ও নিস্পৃহতা দিয়ে একটি ভয়াবহ রাষ্ট্রিক আদর্শকে তাঁরা এভাবে সমর্থন করে যান, তাঁদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেই সেই অপরাধের মূল্য ধরে দিতে হবে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1907 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. শিবব্রতবাবুর অন্য সব কথাই মেনে নিলাম। লিউয়ের প্রতিবাদ একদেশদর্শী, নোবেল শান্তি রাজনৈতিক পুরস্কার, সব ঠিক। কিন্তু তার জন্য তাকে বন্দী করে রাখতে হবে, এটা কোন যুক্তিতে সমর্থনযোগ্য?

আপনার মতামত...