লেনিনের সঙ্গে কিছুক্ষণ

অশোক মুখোপাধ্যায়

 



লেখক সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সায়েন্স অ্যান্ড সোসাইটি [সেস্টাস], কলকাতা-র সাধারণ সম্পাদক; বিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধকার

 

 

 

 

বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমি যদি লেনিনের ছাত্র হতে পারি …। আমার স্পর্ধা এইটুকুই। শুধু ২২ এপ্রিলে বা ২০ জানুয়ারিতে নয়, সারা বছর ধরে লেনিনের জীবনের এক একটা আলেখ্য হাতে নিয়ে দেখতে দেখতে যে চিন্তাটা প্রথমেই ধাক্কা দিতে থাকে, তা হল: কীভাবে এই মানুষটি দেশ থেকে অত দূরে নির্বাসিত অবস্থায় থেকে অত বড় এবং অত পশ্চাদপদ একটা দেশে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছিলেন।

বিপ্লব আসলে একটা নির্মাণ। সংগঠন গড়ে তোলা একটা আর্ট। শিল্প। চারুকলা। অন্য অনেক কাজের মধ্যে তাতে আছে একটি সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ; তা হচ্ছে হাতে আসা মানুষরূপী ভেজা মাটির ডেলা থেকে নতুন মানুষ, কর্মী সংগঠক নেতা বিপ্লবী তৈরি করা। যারা আবার তাদের নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে সেই একই কাজ করতে থাকবে।

এই শিল্প আবার ঘরে বসে থিতু হয়ে রং তুলি ব্যবহার করার জিনিস নয়। এই শিল্প হচ্ছে এক নিরন্তর নীরব সহযোগী কর্ম সম্পাদন। আন্দোলন, মিছিল, সভা, ইস্তাহার বিলি, পোস্টার লিখন, গোপন শেল্টারে খবর নিয়ে যাওয়া, সম্মেলনে বসে প্রবল তর্কবিতর্ক, বিভিন্ন প্রশ্ন নিয়ে স্টাডিক্লাস, কারখানায় ধর্মঘট পরিচালনা, জারের পুলিশ, কসাক অশ্বারোহী বাহিনীর আক্রমণের মোকাবিলা করা, গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যাওয়া, জেল ভেঙে পালানো— এমনিধারা হাজার রকমের ব্যস্ততার মধ্যেই যারা এল তাদের গুণগুলিকে বিকশিত করতে সাহায্য করা, ত্রুটিগুলোকে ধীরেসুস্থে মুছে ফেলা। কিংবা যারা নিকট সংস্পর্শে এল তাদের মধ্যে বিপ্লবী রাজনীতির মহত্বের দুটো বা তিনটে দিক উন্মোচন করে দেওয়া। সাহস এবং ভরসা জোগানো। আন্দোলনের মধ্যে জনশক্তির উদ্বোধন ঘটানো।

এইরকম ক্ষমতা থাকাটাই নেতৃত্বের গুণ। যাঁর এই গুণটি থাকে, তিনি শুধু এটুকুই করেন না, অসংখ্য মানুষকে পাল্টানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি আরও অনেক নেতা নির্মাণ করতে পারেন। অন্তত এই একজন পেরেছিলেন। আসুন, সেই পরিচিত মানুষের জীবনের কিছু বাস্তব দৃষ্টান্ত থেকে এই গুণটিকে চেনার চেষ্টা করি।

 

[]

প্রথমেই আলেক্সেই মাক্সিমোভিচ পেশকভ, অর্থাৎ, ম্যাক্সিম গোর্কির কথা ধরা যাক।

রুশ সমাজের একেবারে নীচের তলা থেকে এক পিতৃমাতৃহীন ভবঘুরে নিরক্ষর বালক হয়ে সমাজের বিভিন্ন দেওয়ালে ধাক্কা খেতে খেতে একদিন লেখক হয়ে ওঠা, আন্তন চেকভের স্নেহস্পর্শে ছোটগল্পের দুনিয়ায় সাড়া জাগানো মানুষটি যখন শ্রমিক আন্দোলনের অভিঘাতে একদিন প্রবাসে লেনিনের সংস্পর্শেও এলেন, আবিষ্কার করলেন তাঁর তুলনায় বয়সে এবং আকারে ছোট এক বিশাল মানুষকে।

কী অবলীলায় লেনিন তাঁকে বললেন, “আপনার গল্পগুলি আমি পড়েছি। প্রতিটি গল্প বিপুল সম্ভাবনাময়। রাশিয়ার সর্বহারাশ্রেণির পক্ষ থেকে আমি আপনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।”

গোর্কি স্বভাবতই হতবাক। আরএসডিএলপি-র অন্যতম কর্ণধার এই মানুষটি বিদেশের মাটিতে বসেও রাশিয়ার অখ্যাত প্রকাশকদের দ্বারা প্রকাশিত গল্পের বইও পড়েন? পড়ার সময় পান? বইগুলি পান কীভাবে? খবরই বা পান কোত্থেকে?

অন্য কথাগুলিও কানে বারবার বাজতে থাকে, বিপুল সম্ভাবনাময়। তার মানে কিছু তাতে এখনও নেই? যা থাকলে আরও ভালো হত? কিন্তু সাহস করে প্রশ্নগুলো আর করে উঠতে পারেন না।

লেনিন বলে চলেন, “আপনি আমার কথায় বিচলিত হবেন না। আমার কথাগুলি হয়ত উপদেশের মতো শোনাচ্ছে। আপনার কলম যে কী শক্তি ধরে আপনি এখনও বোধ হয় টের পাননি। আমি পেয়েছি। শুনুন— মালিকদের চরিত্র খারাপ আর শ্রমিক মানেই সে মদ খায় মাতলামি করে আর মা-বউকে ঠেঙায়, এমনটা করলে হবে না। একটা দুটো মালিক ভালো হতে পারে। তাতে শ্রেণিব্যবস্থার চরিত্র বদলায় না। আসলে এই মালিকি ব্যবস্থাটাকে খারাপ বলে দেখাতে হবে। চেনাতে হবে। পাদ্রি ভালো না খারাপ বড় কথা নয়, ধর্মটা খারাপ সেটা বলা চাই। শ্রমিকদের উত্তরণটা দেখান। ওদের ভেতর থেকেই বিপ্লবীরা উঠে আসছে। রুশি প্রলেতারিয়েত জাগছে …”

একজন যথার্থ প্রলেতারিয়েতসন্তান হিসাবে পেশকভও অনুভব করতে পারেন এই কথাটা। সারা ইউরোপের মধ্যে পেছনে পড়ে থাকা রুশ সর্বহারাশ্রেণিই সংগ্রামে এগিয়ে আছে। ওদেসা থেকে ব্লাদিভস্তক— এক পৃথিবী জুড়ে সেই স্পন্দন শোনা যাচ্ছে!

এরকম আড্ডার মধ্যেই কিছু আলোচনা চলতে চলতে কথায় কথায় একদিন “মা” উপন্যাসের বীজ অঙ্কুরিত হয়। লেখকের কাছে কাহিনি পরিকল্পনা শুনে লেনিন একেবারে শিশুর মতো উল্লাস করে ওঠেন, চমৎকার ভেবেছেন। কবের মধ্যে লিখে ফেলতে পারবেন বলে ভাবছেন? একটা ঝড় আসন্ন। পারবেন আপনি তার আগেই এই বইটা আমাদের হাতে তুলে দিতে?

ঝড় মানে রাশিয়ার মাটিতে যে বিপ্লবের প্রবল সম্ভাবনা এসে গিয়েছিল ১৯০৫ সালে। লেনিন স্বপ্ন দেখছিলেন জারতন্ত্রের পতনের। সেই সময় ওরকম একটা বিপ্লবের আবেদন সহ উপন্যাস যদি…

না, আলেক্সেই পারেননি সেই সময়ের মধ্যে লিখে উঠতে। ১৯০৭ সালে বেরোল “মা” উপন্যাস, আমেরিকার মাটি থেকে। উপন্যাসে যে শ্রমিক জাগরণের আবাহন ছিল, রাশিয়ার জমিতে তা তখন সাময়িকভাবে পরাস্ত হয়ে পিছু হঠেছে। সারা দেশ জুড়ে প্রবল প্রতিক্রিয়ার জোয়ার। আর গোর্কি তখন এক ঈশ্বরহীন খ্রিস্টীয় মুক্তির বাণী নিয়ে প্রচারে ব্যস্ত। মানব-ঈশ্বরের উপাসনার আহ্বান নিয়ে তিনি ঘুরছেন। গেওর্গি প্লেখানভ তাঁর শক্ত হাতে লেখনী তুলে এই সাহিত্যিককে লক্ষ্য করে আক্রমণ শানিয়ে বসলেন। হাজার হোক, গোর্কি হলেন লেনিনের বন্ধু, বলশেভিক শিবিরের লেখক। অতএব এ এক মস্ত সুযোগ গোর্কিরূপী শিখণ্ডীকে সামনে রেখে লেনিনের বিরুদ্ধেই যুক্তির ঝনঝনানি শোনানো।

কিন্তু লেনিন নির্বিকার। তিনি না প্লেখানভের সেই সমালোচনার জবাব দিচ্ছেন, না গোর্কির বিরুদ্ধে কলম তুলে নিচ্ছেন। অনেকেই অবাক। লেনিন তো এরকম নির্বিকারচিত্ত নন। ভুল করলে তিনি সকলের বিরুদ্ধেই প্রকাশ্যে যুক্তির ক্ষুরধার তরবারি চালান। মানুষকে ভালোবাসার প্রশ্নে, কাছে টেনে নেবার সময়, তিনি অপক্ষপাত, নির্বিচার। মতাদর্শের প্রশ্নে, সত্য মিথ্যা নির্ণয়ের প্রশ্নে, তত্ত্বের শুদ্ধতা রক্ষার প্রশ্নে, তিনি কঠোর পক্ষপাতী। বিপক্ষের উদ্দেশে শানিত যুক্তিশর নিক্ষেপে তিনি নির্মম লক্ষ্যভেদী। অথচ ম্যাক্সিম গোর্কির বেলায় তিনি এরকম শান্ত নিস্তব্ধ!

না, অন্য সকলে আর গোর্কি এক নন। দ্বন্দ্বতত্ত্বের এ এক অমোঘ শিক্ষা। বিশেষ সমস্যার বিশেষ সমাধান। তালা অনুযায়ী চাবি। যারা সমাজের তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থান থেকে রাজনীতিতে উঠে এসেছেন, তাঁরা যেভাবে যে কোনও তর্কবিতর্ককে ব্যক্তিগত আবেগবর্জিতভাবে নিতে এবং মোকাবিলা করতে পারেন, গোর্কি তাঁর উঠে আসার বিশেষ ইতিহাসের কারণে তা নাও করতে পারেন। অতএব লেনিন প্রকাশ্য মঞ্চকে এড়িয়ে ব্যক্তিগত চিঠিতে তাঁর বিপ্র-মতামত এই সাহিত্যিককে জানান। গোর্কিও নিজেকে শুধরে নিতে থাকেন। মানব ঈশ্বর থেকে ঈশ্বরকে ধীরে ধীরে ছেঁটে ফেলেন। শ্রমিকশ্রেণিকেই আবার তিনি চালকের আসনে বসিয়ে দেন গোর্কির লেখার খাতায়। গোর্কি নাটক লেখেন “দুশমন”।

প্লেখানভের বিরুদ্ধেও তাঁর গোর্কি প্রশ্নে বলার কিছু নেই। কেন না, প্লেখানভ গোর্কির মতবাদিক অবস্থান সম্পর্কে ভুল কিছু বলেননি। অন্তর্লীন উদ্দেশ্য যাই হোক, সমালোচনাটা সঠিক। লেনিন আবার এমন ধরনের মানুষ নন যে গোর্কি যেহেতু “আমার” দলের লোক, অতএব তাঁর বিরুদ্ধে সঠিক সমালোচনার মধ্যেও ভুল ধরতে হবে! ওটা তাঁর ধাতে নেই।

বিপ্লবের পরে গোর্কির সঙ্গে বলশেভিকদের বড় ধরনের মতপার্থক্য হয়। তিনি প্রায় সোভিয়েতরাজের বিরোধী হয়ে ওঠেন। লেনিন সবাইকে ধৈর্য ধরতে বলেন। প্রতিবিপ্লবী দলের একজন মহিলা সদস্য ১৯২২ সালে এক প্রকাশ্য জনসভায় লেনিনের বুকে গুলি করে। সেই আঘাত লেনিন আর কাটিয়ে উঠতে পারলেন না। ১৯২৪ সালের ২০ জানুয়ারি তিনি সমাজতন্ত্র নির্মাণের স্বপ্ন অপূরিত রেখে চিরবিদায় নিয়ে চলে গেলেন। মৃত্যুর কদিন আগেও লেনিন পড়েছেন গোর্কির বই। গোর্কি তখন যক্ষ্মায় ভগ্নস্বাস্থ্য উদ্ধারে ইতালির কাপ্রিতে। লেনিন তাঁর শেষশয্যার পাশে দাঁড়ানো সবাইকে ১৯ জানুয়ারি সন্ধ্যায়ও বলেছেন, গোর্কি আমাদের ছিলেন, আমাদেরই আছেন। তিনি আবার ফিরে আসবেন।

লেনিনের মৃত্যুর কয়েক বছর পর গোর্কি সোভিয়েত ইউনিয়নে ফিরে আসেন এবং আমৃত্যু থেকে যান। সর্বহারা সমাজতান্ত্রিক সাহিত্য সৃষ্টির সংগঠন— সোভিয়েত লেখক সঙ্ঘ— গড়ে তোলেন এবং দুর্বল শরীরেও তার মূল কর্মকর্তা হিসাবে দায়িত্ব নেন। স্তালিনের সঙ্গে কতজনের বিরোধ হয়েছে। গোর্কির সঙ্গে বিরোধের সম্ভাবনা ছিল সবচাইতে বেশি। কিন্তু হয়নি। শুধু গোর্কিই মানিয়ে চলেছেন এমন নয়। স্তালিনও লেনিনের নির্দেশিকা এবং উদাহরণ মনে রেখে অত্যন্ত সতর্কভাবে গোর্কির সঙ্গে মিশেছেন এবং কাজ করেছেন।

লেনিন যে মানুষ চিনতে এবং গড়তে ভুল করেননি, মৃত্যুর আগের সন্ধ্যায়ও তার প্রমাণ রেখে যান।

 

[]

আসলে এরকম ক্ষমতা কোনও মানুষের এক দিনে গড়ে ওঠে না। সময় লাগে। অনুশীলন করতে হয়। ছোটখাট ঘটনার মধ্যে দিয়ে তার প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয়… সেমেস্টার পরীক্ষা হতে থাকে। তাতে পাশ করতে হয়। ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভের ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় হয়নি।

সেরকম কিছু ঘটনাও দেখে নিই।

ছাত্রজীবন থেকেই লেনিন নেতা হয়ে উঠেছেন। স্কুলজীবন থেকেই তিনি পড়াশুনোয় তুখোড়। বিভিন্ন ক্লাসের পরীক্ষায় অবিশ্বাস্য কৃতিত্ব দেখিয়ে সব বিষয়েই সর্বোচ্চ নম্বর দখলে রাখেন তিনি। ১৮৮৭ সালে কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়ার সময় ছাত্র আন্দোলন করতে গিয়ে জারের পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। তখন তাঁর বয়স ১৭। বিচারে শাস্তি হল দূরের এক গ্রামে নির্বাসন। স্থানীয় পুলিশের কাছে জেলা পুলিশের বড় অফিসার বার্তা পাঠাল, একে চোখে চোখে রাখবে। বয়স কম হলে কী হবে, ভয়ানক বিপজ্জনক।

লেনিন আর তাঁর এক বোন আন্না এক সঙ্গে থাকেন। তিনিও আন্দোলন করতে গিয়ে নির্বাসিত।

স্থানীয় পুলিশ কর্মী দুবভ এলেন এক দিন দুপুরে খোঁজখবর নিতে। লেনিন তখন বাইরে। সম্ভবত লুকিয়ে কাজানে গিয়েছিলেন খবরাখবর করতে। আন্না জানালেন, ভাই বাইরে গেছে স্কি করতে।

পুলিশকর্মীটি স্বাভাবিক সন্দেহপ্রবণ মন থেকে আন্দাজ করলেন, ভ্লাদিমির আসলে কোথায় এবং কী করতে গেছে। তিনি ভাবলেন, আজ ছেলেটি এলে তিনি ওর সঙ্গে এক বোঝাপড়া করে নেবেন। ওকে বুঝিয়ে দেবেন, তিনি সবই বুঝতে পারছেন। একবার জেলায় রিপোর্ট করে দিলে দুই ভাইবোনকে অনেক দূরে সাইবেরিয়ায় নির্বাসনে পাঠিয়ে দেবে।

কিছুক্ষণ পরেই লেনিনের প্রবেশ। ঠান্ডার মধ্যেও বেশ ঘামিয়ে গেছেন এবং হাতে স্কির সরঞ্জাম দেখে বোঝা যাচ্ছে, তিনি অনেকক্ষণ ধরে বরফের উপর ছোটাছুটি করেছেন।

দুবভ বললেন, কী, খবরাখবর নিয়ে এলেন বুঝি?

লেনিন আকাশ থেকে পড়লেন, খবর কোথায় পাব? সে তো আপনি যদি দেন, তাহলে পেতে পারি। এখানে এই অজ পাড়াগাঁয়ে আমাকে কে দেশের খবর দিতে আসবে? আর কেনই বা আসবে?

দুবভ বললেন, আমার কাছেই বা খবর কোথায়?

তারপর আরও এটা সেটা কথার পর লেনিন বললেন, দুপুরে এসেছেন যখন স্যর আমাদের সঙ্গেই খেয়ে যান। সামান্য যা আছে তাই ভাগ করে নেব’খন।

দুবভ মনে মনে খুশি হলেন। এই কমিউনিস্ট দুর্বৃত্তগুলো ভদ্রতা জানে বটে। মনও এদের বেশ বড় এবং উদার। নইলে জারের পুলিশকে কেউ কখনও খেতে বলে? নিজেরাই যেখানে খুব টান করে চালাতে বাধ্য হয়! বললেন, না, খাব না। খেয়েই এসেছি। একটু গল্প করতে এলাম। আমারও তো আপনাদের মতোই প্রায় নির্বাসন বলা যায়। সারা দিন কথা বলার মতো লোক কই?

তাহলে লাঞ্চের পরে আমাদের সঙ্গে বসে এক গ্লাস চা-ই না হয় খেয়ে যান (আসলে রুশিরা চা খায় না, পান করে। আমাদের ভাষার সীমাবদ্ধতার কারণে এইভাবে বলতে হল)!

তা পারি বটে। দুবভ বেশ ভালো করে গুছিয়ে চেয়ারে বসলেন। অনেকক্ষণ আড্ডা দেবার মেজাজে।

লেনিন এক ফাঁকে বললেন, পারি শহরে রাশিয়ান ছাত্ররা নাকি বিক্ষোভ করেছে! শুনেছেন কিছু? রাস্তায় বলাবলি করছিল লোকেরা।

না না। পাগল নাকি? দুবভ হেসে বললেন, বিদেশে বিক্ষোভ দেখালে ওরা সোজা ঘাড় ধরে ঘরে পাঠিয়ে দেবে। মহামান্য জার সমস্ত দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের জানিয়ে রেখেছেন।

লেনিনের দিদি আন্না বললেন, সব দেশ কি রাশিয়ার তালুবন্দি? জার বললেই বা ওরা শুনবে নাকি? ওদের দেশে বিক্ষোভ দেখানো তো বেআইনি নয়।

তা নয়, কিন্তু ফ্রান্সের বহুত পুঁজি রুশ ব্যাঙ্কে এবং কারখানায় খাটছে। ওরা জারকে সমীহ না করে পারে না। জারের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিলে ওরা সহ্য করবে না বলেই মনে হয়।

কিন্তু ভাবুন, একেবারে পাঁচশ ছাত্র রাস্তায় নেমে এল? কী ব্যাপক বিক্ষোভ ভাবা যায়? লেনিন বললেন।

দূর মশাই। দুবভ হালকা ধমকই দিলেন বলা যায়, অত রুশি ছাত্র প্যারিসে আছে নাকি? বড় জোর দেড়শ মতন হবে। ও এমন কিছু নয়। আপনাদের অবশ্য বিক্ষোভ পেলেই হল।

হ্যাঁ, আমরা সংখ্যাটাকে ধরছি না। আজ যদি দেড়শও হয়, আগামী দিনে পাঁচশ হতে সময় নেবে না। যেমন আমাদের দেশের ভেতরে, তেমনই ইউরোপের দেশে দেশে ছাত্রদের আন্দোলন বাড়তেই থাকবে। আজকের দেড়শই তখন পথ দেখাবে।

আপনি কীভাবে জানলেন? ছাত্ররা এগিয়ে আসছে?

লেনিন বললেন, কেন? এই যে আপনি বললেন?

আমি বললাম? কী বলেছি আমি?

লেনিন এক চোট হেসে নিলেন। খাওয়া শেষ করে থালাবাটিগুলো ধুয়ে দিলেন। তারপর তিনটে গ্লাসে চা ঢালতে ঢালতে বললেন, এইমাত্র আপনিই আমাকে জানালেন, পারিতে দেড়শ ছাত্র বিক্ষোভ দেখিয়েছে। আমি তো কিছুই জানতাম না। আন্দাজে বিক্ষোভের কথা বলেছিলাম। আর আন্দাজ করেই একটা সংখ্যাও বলে ফেলেছিলাম। আপনিই আমাকে শুধরে দিলেন। তথ্যটার জন্য ধন্যবাদ!

দুবভ বুঝলেন, তিনি একটু বোকা বনেছেন। সেটা চাপা দেবার জন্য বললেন, অ, এই কথা? তা ওটুকু খবর আপনাকে দেওয়াই যায়। নইলে আপনিই বা এই দূর দেশে থাকবেন কীভাবে?

বেশ বেশ, মাঝে মাঝে এরকম টুকরোটাকরা খবর তাহলে দিয়ে যাবেন স্যর।

দুবভ উঠতে উঠতে বললেন, আচ্ছা দেখা যাবে।

 

[]

ভ্লাদিমির তখনও সন্ত পিতর্সবুর্গের কাছে সুশন্সকি গ্রামেই নির্বাসিত। এক দিন বিকেলের দিকে ঘরে বসে তিনি পড়াশুনো করছিলেন। এমন সময় এক বয়স্ক মহিলা ঝড়ের মতো এসে ঢুকলেন। হাতে একটা ঝোলায় কিছু জিনিসপত্র রয়েছে।

আসতে পারি স্যর?

হ্যাঁ আসুন আসুন, বসুন এখানে। যুবক লেনিন (আসলে তখনও তিনি লেনিন হননি) একটা চেয়ার এগিয়ে দিলেন। জিগ্যেস করলেন, আপনার হাতে এটা কী?

মহিলা বললেন, তেমন কিছু নয় স্যর। কয়েকটা ডিম নিয়ে এলাম। আপনি নিশ্চয়ই এখানে ডিম পাচ্ছেন না।

পাচ্ছি, পাচ্ছি। যা খেতে লাগে আমাদের দুই ভাইবোনের সবই পেয়ে যাচ্ছি। আপনি এগুলো কষ্ট করে আনতে গেলেন কেন?

সামান্য কটা ডিমই তো স্যর। খাবেন কিন্তু!

তা না হয় খাব। লেনিন প্যাকেটটা জানালার তাকে রেখে দিয়ে এসে বললেন, আমাকে স্যর বলবেন না। আমার বয়স বেশ কম। তাছাড়া আমার আর স্যর হওয়া হবেও না। আমাকে কলেজ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে, জানেন হয়ত।

কিন্তু আমরা সকলেই জানি, আপনাকে ওরা যমের মতো ডরায়। আমাকেও একটু সাহায্য করতে হবে।

সাহায্য? আমি করব? আচ্ছা বলুন, যদি আমার দ্বারা কিছু করা সম্ভব হয় নিশ্চয়ই করব। কিছু লিখেটিখে দিতে হবে? কোনও দরখাস্ত?

না, না। আগে আমার সমস্যাটা শুনুন তো!

হ্যাঁ বলুন। একেবারে প্রথম থেকে। আমি কিছুই জানি না ধরে নিয়ে বলুন।

বলতেই তো এসেছি। আমি বিশ মাইল দূর থেকে হেঁটে আসছি। এই দেখুন আমার পায়ের অবস্থা। তিনি এক পায়ের ছেঁড়া জুতোর পাটি তুলে দেখালেন, সেখানে কতটা ধুলোকাদা লেগে আছে।

আপনি কি কাজান্সভো থেকে আসছেন?

না, তারই কাছে, ইদৎসঝা থেকে।

আচ্ছা আচ্ছা, বুঝতে পেরেছি।

চেনেন আপনি জায়গাটা? গেছেন কখনও ওখানে?

না, যাইনি। তবে জায়গাটার নাম শুনেছি। আচ্ছা, ওখানে অনেকগুলো বাড়িতে গত বছর আগুনে লেগেছিল না? আপনারও …?

মহিলা বললেন, না, আমার বাড়িটা বেঁচে গিয়েছিল। তবে তো আপনি চেনেন গ্রামটা। আমার নাম পেলাগেয়া নিকফরভনা। ওখানেই আমি ৎভাসিয়ার কাছ থেকে গত বছর একটা গরু কিনেছিলাম। পনের রুবল দাম ছিল। আমি ধারে নিয়েছিলাম। পরে দাম মিটিয়ে দিই।

ব্যস, তাহলে তো মিটেই গেল।

না স্যর, মেটেনি। ৎভাসিয়া এখন বলচ্ছে, আমি টাকা দিইনি। ও আমার থেকে এখনও টাকা পাবে।

সে কী? টাকা দিয়ে দেবার পরেও টাকা পাবে? কেন? এরকম করছে কেন?

আমার মেয়ের জন্য স্যর। ও ওর ছেলের সঙ্গে আমার মেয়ের বিয়ে দিতে চেয়েছিল। ঝুলোঝুলি করছিল। আমার মেয়ে না করে দিয়েছে। ওরা লোক ভালো নয় স্যর।

ও হো, সেই জন্য এখন রেগে গিয়ে আপনাদের উপর বদলা নিচ্ছে। খুব খারাপ তো!

সেটাই তো আপনাকে বলতে চাইছি স্যর। খুব খারাপ লোক ওরা। আমার খুব বিপদ। বলছে, থানায় যাবে। নালিশ করবে।

লেনিন বললেন, আপনি যে টাকা দিয়েছেন, কেউ সাক্ষী নেই?

না স্যর। তখন আমি ভাবিনি। শোধ করে দিলাম, সব চুকেবুকে গেল, এই ভেবেছি।

তাহলে তো আরও খারাপ, মিসেস নিকফরভনা।

স্যর, আপনি কিছু করুন।

আমি কী করব? লেনিন খুব অসহায়ের মতো বলেন, আমি একজন নির্বাসিত রাজবন্দি। আমার এখন কিছুই করার ক্ষমতা নেই। আমি এমনকি কোথাও গিয়ে কারও সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করতে পারব না।

আসলে আপনি কিছু করতে চাইছেন না। চাইলে আপনি ঘরে বসেই অনেক কিছু করে ফেলতে পারেন। ইভাশভের বেলায় যেমন করেছিলেন।

ইভাশভ? সে কে? আমি তার জন্য কী করেছিলাম? সত্যিই আমি কিছু করেছিলাম নাকি পেলাগেয়া? আমার মনে পড়ছে না।

ওর যখন কয়লা খনিতে চাকরি চলে গেল, এদিক ওদিক বহু ঘুরেও কিছু হচ্ছিল না, ও আপনার কাছে এসেছিল। আপনি ওকে এমন কিছু পরামর্শ দিয়েছিলেন, ওর চাকরি আবার হয়ে গেল।

ও, হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। ইভাশভ। খনির মজুর। এসেছিল বটে। কিছু একটা তুচ্ছ কারণে মালিক ওকে বসিয়ে দেয়। তবে সে এমন কিছুই না। আমি ওকে আইনের কিছু ধারা উপধারা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, মালিককে গিয়ে সেই কথাগুলো বলতে। থানাপুলিশ হলে ও কিন্তু বিপদে পড়ে যেতে পারে।

ঠিক ঠিক, সেটাই হয়েছিল। আমাকেও আপনি সেরকম কিছু পরামর্শ দিন না। যেটা গিয়ে ৎভাসিয়াকে বললেই ও ভয় পাবে।

বটে বটে! লেনিন মনে মনে হাসলেন, আমার আইনি পরামর্শকে সবাই এত ভয় পাচ্ছে? মহিলাকে উচ্চস্বরে বললেন, তাহলে তো আর কথাই নেই। আপনিও এসে গেলেন। আমি আপনাকেও আইনের দু একটা পরামর্শ দিয়ে রাখি। দরকার হলে…

ভ্লাদিমির মহিলাকে আইনের কথা দুচারটে বললেন। পেলাগেয়া নিকিফরভনার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে বললেন, কিন্তু জানেন স্যর, আপনাকে চুপি চুপি একটা খবর দিই। আসল কথা হচ্ছে, মালিকরা থানাপুলিশকে নয়, আইনের ধারা-ফারাকে নয়, ইভাশভ আপনার কাছে এসেছে শুনেই ভয় পেয়ে গিয়েছিল। ইভাশভ বলে তো, কেউ কিছু বদমাইসি করলেই শুধু একটিবার বলবে, আমি কিন্তু উলিয়ানভের কাছে চলে যাব। ব্যস, আর কিচ্ছুটি করতে সাহস পাবে না!

আমার কাছে এলেই হবে?

হ্যাঁ স্যর। তাহলেই হবে। আচ্ছা, শুভ সন্ধ্যা। আসি এখন।

মহিলা চলে গেলেন। মুখের ভাব দেখে মনে হল, মেঘ কেটে গেছে। ভরসা পেয়েছেন। টাকাটা দুবার দিতে হবে না। লেনিন মনে মনে আবৃত্তি করলেন সেই কথাটা। উলিয়ানভের কাছে যাব শুনলেই সম্পত্তিওয়ালাদের মধ্যে কেউ কেউ ভয় পাচ্ছে। ব্যাপারটা নেহাত মন্দ নয়। কিসান মজুরদের প্রতিরোধ আন্দোলনের সম্ভাবনা যে আমাকে বন্দি করে রেখেও খতম করা যায়নি, এটা তাহলে ওরা বুঝতে শুরু করেছে।

কেন যায়নি তা অবশ্য ওরা এখনও জানে না।

 

[]

আমাদের একালের অনেক বামপন্থী সার্বক্ষণিক কর্মী জেনে হয়ত দারুণ অনুপ্রাণিত বোধ করবেন যে ১৮৯০-এর দশকে রাশিয়ার বুকে নির্বাসন দণ্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে সামারায় এসে কমরেড লেনিন তাঁর ছাত্রজীবনের শেষ পর্বে অনেক দিন প্রাইভেট টুইশন করে নিজের এবং পরিবারের খরচ সামলেছেন। এবং সেই সব ছাত্র জোগাড় হত আবার রীতিমতো স্থানীয় সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে। ফলে এখন থেকে তাঁরা যখন হাতখরচা চালানোর জন্য ছাত্র পড়াতে যাবেন, খুব বেশি লজ্জাটজ্জা করবে না সেই কথা কাউকে বলতে। স্বয়ং লেনিন যেখানে…

জীবন এক অদ্ভুত শিক্ষাদাতা। আপনি এখন শুধু সেই দু চারজন ছাত্র এবং তাদের বাবা মায়ের কথা ভাবুন, ১৯১৭ সালের পর তাদের মনের ভাব কেমন হয়েছিল। মুখের মানচিত্রে হতভম্বভাবের একটা নাকি আন্তর্জাতিক মানবচরিত্র আছে!

আসলে ভ্লাদিমির তখন পয়সা যোগাড় করে প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে কাজান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনের একটা ডিগ্রি অর্জন করতে চাইছিলেন। এবং সেটা তাঁর পুরনো ব্যাচের ছাত্রদের সঙ্গে একই বছরে। ইতিমধ্যে আড়াই বছর তাঁর নির্বাসনে খরচ হয়ে গেছে। নিয়মিত ছাত্র হিসাবে পরীক্ষা দেবার সুযোগ তাঁকে জারের জমানা দেবে না। সুতরাং প্রাইভেটই সই। অবশ্য যদি সেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তরফে অনুমতি মেলে।

অনেক চিঠিচাপাটি চালাচালির পর শেষে অনুমতি মিলল। তিনি প্রস্তুতি নিতে লাগলেন।

পড়াশুনোর ব্যাপক চাপ। বাড়ির বাগানের এক কোণে একখানা ঝুপড়িতে তিনি “পড়ার ঘর” বানিয়ে নিলেন। সকালে চা জলখাবার খেয়ে সেখানে বই খাতা নিয়ে ঢুকতেন, আর একেবারে সন্ধেবেলায় ঘরে ফিরে আসতেন। মাঝখানে ভাইবোনদের কেউ একজন দুপুরের খাবার সেই ঝুপড়িতে পৌঁছে দিত।

কিন্তু সন্ধের দিকে সেই বাড়ির আশেপাশে কেউ এসে গেলে অবাক হয়ে যেত। ভেতরে তখন গলা ছেড়ে সঙ্গীতচর্চা চলছে। ভ্লাদিমির আর ওলগা— দুই ভাইবোনে মিলে বাড়ি মাথায় করে তুলেছে। কখনও তাঁরা গাইছেন ফ্রান্সের বিপ্লবের রণগীতি (Marseillaise) যা এক সামরিক ব্যান্ড সহ কুচকাওয়াজের মতোই গোটা বাড়িতে গমগম করছে। ওলগা আবার পিয়ানো বাজাতেন। ফলে সুরের মুর্ছনায় চতুর্দিকে যেন এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি হয়ে যেত। সেকালে এক রুশ কবি ইয়াৎসিকভ “সাঁতারু” নামে যে কবিতা লিখেছিলেন, তাকে “এসমুদ্র সাথীহীন” বলে এক মিষ্টি গানের বন্দিশে রূপান্তরিত করা হয়েছিল। গাইতে গাইতে যখন যখন তাঁরা নীচের (দুর্বল বঙ্গানুবাদে পড়াতে হচ্ছে বলে দুঃখিত) পংক্তিগুলোতে এসে পড়তেন, এক অন্য রকম অনুভূতি তাঁদের চোখে মুখে এবং কণ্ঠস্বরে ফুটে উঠত:

খরবায়ু বইছে সবেগে
আহ্বান করে সাহসীকে!
মাভৈঃ তুফান হোক জোর—
টেনে নিয়ে যাবে তরীটিকে।

ভ্লাদিমির মাঝে মাঝে বোনকে বলতেন বিশ্বের সমস্ত কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের প্রিয় “আন্তর্জাতিক সংহতি” (Internationale) গানটি ধরতে। ফরাসি থেকে রুশ ভাষায় গানের বাণীর তখনও অনুবাদ হয়নি। সুরও তখন অবধি খুব একটা কেউ ভালো করে জানত না। তাঁরা ভাইবোনে তাই মূল ফরাসি বয়ানেই (নীচের অক্ষম নিকট-অনুবাদে ভাববেন না) যতটা পারতেন আন্দাজে গানটি অনুশীলন করতেন।

জাগো অনশনবন্দি ওঠো রে যত
জগতের সকল ক্রীতদাস!
নিপীড়ণ হবে ন্যায়-বজ্রাহত—
শোনো মুক্ত দিনের আশ্বাস।।

ও হ্যাঁ, অন্য প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে জানিয়ে দিই, ১৮৯১ সালে লেনিন সন্ত পিতর্সবুর্গে গিয়ে পরীক্ষায় বসলেন। বসন্ত ও শরৎ কালে দুই দফায়। আর সেই পুরনো অভ্যাসে যথারীতি সমস্ত বিষয়েই সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে আইনে স্নাতক শংসাপত্র হাসিল করে নিলেন! শংসাপত্রটি তাঁর পরবর্তী জীবনে আর বেশি দিন কাজে লাগেনি। ১৮৯২-৯৩ সালে তিনি কুড়িবারের মতো সামারা আদালতে প্রধানত গরিব শ্রমিক ও চাষির হয়ে মামলা লড়েছেন। কিন্তু সেই ধামাভরা নম্বরের মালিকানা তাঁকে অনেক দুরূহ জায়গায় সহজ প্রবেশাধিকার দিয়েছে। আজ অবশ্য আমাদের আর সেই সব কৃতিত্বের কথাও মনে রাখতে হয় না। লেনিনের নাম উচ্চারণ করলে যে মানুষটির ছবি, যে চরিত্রের আভাস সামনে চলে আসে, তাতে এই সব আটপৌরে গেরস্ত সাদামাটা জিনিসগুলোর আর কোনও দরকার হয় না।

অচিরেই তার ইঙ্গিত পাওয়া গেল।

আইনের পরীক্ষা দিয়েই ভ্লাদিমির সন্ত পিতর্সবুর্গের আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মার্ক্সীয় মতবাদের অনুগামী রাজনৈতিক পাঠচক্রগুলির সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। সামারায় এক নির্বাসন প্রত্যাবৃত বিপ্লবী তাঁকে ওখানকার দু চারজনের নাম ঠিকানা দিয়েছিলেন। সেই সব ধরে তিনি একজন একজন করে সাবধানে খুঁজে বের করলেন। তখনকার গোপনীয়তার মধ্যে এরকম ডেরা বা ব্যক্তির খোঁজাখুঁজি করা খুব বিপজ্জনক ছিল উভয়পক্ষের জন্যই। চারদিকে জারের পুলিশের চর ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাই অত্যন্ত সাবধানে তাঁকে এগোতে হয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে কিছু কিছু মার্ক্সীয় সাহিত্য সংগ্রহ করে নিয়ে এলেন সামারায় কাজে লাগানোর জন্য।

রাশিয়ার মাটিতে নারদনিক (জনগণের বন্ধু) নামক একটি সংগঠন ছিল যারা ১৮৬০-এর দশক থেকে জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল। তার সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় জারের পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর অফিসারদের উপর আক্রমণ চালিয়ে হত্যা করত, বিভিন্ন সরকারি অফিসে আক্রমণ চালাত। লেনিনের বড়দা, আলেক্সান্দার উলিয়ানভও ১৮৮৭ সালে স্বয়ং জার হত্যার ব্যর্থ প্রচেষ্টায় ধরা পড়ে ফাঁসির দড়িতে বীরের মতো মৃত্যু বরণ করেন। লেনিন তাঁর দাদার বিপ্লবী স্পৃহা আত্মীকরণ করে নিয়েছিলেন, কিন্তু পথটাকে পরিত্যাগ করেছিলেন। তাঁর দিদি আন্নাও সেই প্রচেষ্টার সঙ্গে জড়িত ছিলেন সন্দেহে সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত হন। পরে বয়স ইত্যাদির কারণে তাঁকেও লেনিনের সঙ্গেই কাজানের কাছে এক গ্রামে পাঠানো হয়।

তিনি যখন সামারায় কাজ শুরু করেছেন, চারপাশে তখন নারদনিকদের মধ্যে বেঁচে থাকা, জেল ফেরত অনেকেই ছিলেন, যাঁরা সন্ত্রাসবাদী পথ থেকে সরে এসে এক ধরনের উদারনৈতিক আইনি সমালোচকের ভূমিকা পালন করছিলেন। এঁরা সকলেই ছিলেন প্রবল মার্ক্সবাদ বিরোধী। রাশিয়ায় শ্রমিকশ্রেণির স্বল্পতা দেখিয়ে দাবি করতেন, সর্বহারা শ্রমিকশ্রেণি নয়, কৃষকদের নেতৃত্বেই রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র আসবে। এঁদের অনেকের লেখাপত্রের প্রভাব পড়ত জনসাধারণের উপর।

ভ্লাদিমির এঁদের অনেককেই শ্রদ্ধা করতেন তাঁদের আগেকার সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং বীরত্বের জন্য। এঁরাও কেউ কেউ এই বাইশ তেইশ বছরের যুবককে দেখে খুব আশ্চর্য এবং অনুপ্রাণিত হলেন। কথা শোনে বেশি, বলে খুব কম কথা; কিন্তু যখন বলে সমস্ত চোখমুখ এবং শরীর যেন এক সঙ্গে কোরাসে কথা বলতে থাকে। কী দৃঢ় প্রত্যয়! কী গভীর জ্ঞান! আশেপাশের এলাকা সম্পর্কে কী অদ্ভুত তথ্য সংগ্রহ! বিরুদ্ধ মত হাসি মুখে সহ্য এমনকি গ্রাহ্য করারও কী সহজ দক্ষতা! সমাজবিজ্ঞানের যুক্তিতর্কে একরকম জ্যামিতিক কুশলতা যেন ফুটে বেরোতে থাকে।

এই যেমন, সামারার নিকলাই ফেদসিয়েভ ছিলেন একজন প্রবীণ বিপ্লবী। সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের জেরে দীর্ঘ দিন তিনি সাইবেরিয়ায় নির্বাসন ভোগ করে এসেছেন। শরীর স্বাস্থ্য সব ভেঙে গেছে। তিনি ভ্লাদিমিরের সঙ্গে কথা বলে বেশ খুশি হলেন। উপরোক্ত সব গুণ লক্ষ করেই অল্প দিনের মধ্যে এই যুবকের ভক্ত হয়ে উঠলেন। তাঁর ভেতরে সমাজ পরিবর্তনের যে উদ্দীপনাটা তখন নিবু নিবু হয়ে আসছিল, ভ্লাদিমির এসে যেন আবার সেটাকে দপ করে জ্বালিয়ে দিয়েছে। তার সঙ্গে তর্ক করেন আর যুক্তিতে হেরে গিয়ে আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন।

তার মানে তুমি বলছ, গ্রামসমাজ (village commune) বৈপ্লবিক পরিবর্তনে কোনও কাজে আসবে না?

একেবারে আসবে না তা নয়, চাষিদের মধ্যে কাজ করতে গেলে হয়ত আমরা কিছু সুবিধা পাব এর মধ্য দিয়ে। কিন্তু গ্রাম সমাজ থেকেই সরাসরি সমাজতন্ত্রে পৌঁছে যাব— এমনটা হবে না।

তোমাদের মার্ক্স এঙ্গেল্‌স দুজনেই তো এই গ্রামসমাজ সম্পর্কে খুব উচ্ছ্বসিত ছিলেন। নিশ্চয়ই জানো?

জানি। কিন্তু মার্ক্স এই গ্রামসমাজের বর্তমান অবস্থাটা তো আর দেখে যাননি। আর এঙ্গেল্‌স তো জানেন ভেরা জাসুলিচকে কী বলেছেন তাঁর চিঠিতে। ডাস কাপিটাল দিয়ে রাশিয়াকে বিশ্লেষণ করলে হবে না। ডাস কাপিটালের বিশ্লেষণ পদ্ধতি প্রয়োগ করে রাশিয়াকে বুঝতে হবে। সেইভাবে দেখলে আমরা বুঝতে পারব, গ্রামসমাজ আজ আর এক অখণ্ড সত্তা নেই। এর মধ্যে এক দিকে এক ক্ষুদ্র ধনী কৃষক, কুলাক সম্প্রদায় তৈরি হয়েছে। যারাও শেষ বিচারে কৃষকের শ্রম শোষণ করেই বাঁচে। অপর দিকে রয়েছে এক বিরাট সংখ্যক সর্বহারা, আধা সর্বহারা চাষি— যাদের হাতে জমি বা কৃষির হাতিয়ার প্রায় নেই বললেই চলে।

তা অবশ্য তুমি ঠিকই বলেছ। আশ্চর্য, আমরা গ্রামে থেকেও এই সহজ জিনিসটা এত দিন দেখতে পাইনি।

ভ্লাদিমির চোখ দুটি কুঁচকে হেসে বললেন, আপনাদের এত আবেগ এই গ্রামসমাজ নিয়ে, সেটাই আপনাদের অন্ধ করে রেখেছে। ১৮৬১ সালের ভূমিদাস প্রথা বাতিল আইন চালু হওয়ার পর থেকে রুশি সমাজে অনেক কিছু বদলে যেতে শুরু করেছে।

ফেদসিয়েভ বললেন, আচ্ছা আমি একটা সভা ডেকে দিচ্ছি। তুমি তোমার কথাগুলো সকলের সামনে বলো। দেখি কজনকে দলে টানতে পারো। আমাকে তুমি পেয়ে গেছ ধরে নিতে পারো।

অচিরেই সামারায় একটা পাঠচক্র গড়ে উঠল। ১৮৯২ সাল।

লেনিন সেখানে প্রথমেই একটা বক্তৃতা দিলেন এই বিষয়ে: “গ্রামসমাজ— এর ভবিষ্যৎ এবং বিপ্লবের পথ”। তিনি মিখাইলভস্কি, ভরন্তসভ, ইউৎশাকভ— প্রমুখ নারদনিক তাত্ত্বিকদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে আরও কিছু আলোচনা করলেন। মার্ক্সের “দর্শনের দারিদ্র্য” বইটির উপর পর্যালোচনা করে দেখালেন, অর্থনৈতিক মতামত সমাজের উপর চাপিয়ে দিলে হবে না, সমাজবাস্তবতাকেই বিদ্যমান অর্থনীতি রাজনীতি দিয়ে বুঝতে হবে। তিনি কমিউনিস্ট ইস্তাহার রুশ ভাষায় অনুবাদ করে সবাইকে পড়ালেন।

কাজ এগোতে থাকল। নারদনিকদের অনেকেই মার্ক্সবাদ গ্রহণ করে ভ্লাদিমিরের চার পাশে জড়ো হতে লাগলেন।

পরে সেই পাঠচক্র মার্ক্সীয় অনুশীলন কেন্দ্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করল। লেনিন সেখানে মার্ক্সের পুঁজি, এঙ্গেল্‌সের ইংল্যান্ডে শ্রমিক শ্রেণির অবস্থাঅ্যান্টিড্যুরিং, প্লেখানভের কিছু তাত্ত্বিক রচনা, ইত্যাদি আরও যা কিছু মার্ক্সবাদী সাহিত্য পাওয়া গেল, সেই সব বইপত্রের বক্তব্য নিয়ে আলোচনা করতে লাগলেন। এই সময় তিনি ভরন্তশভের রাশিয়ায় পুঁজিবাদের নিয়তি বইটার উপরে একটা প্রবন্ধ লিখে তা নিয়েও চর্চা চালালেন। সেই প্রবন্ধটিই হয়ত লেনিনের পরবর্তী বিখ্যাত রচনা রাশিয়ায় পুঁজিবাদের বিকাশ (১৮৯৯) বইটার ভিত্তি হিসাবে কাজ করেছিল।

এত সব সুখবরের মধ্যেও আমাদের জন্য দুঃসংবাদ একটাই। লেনিনের সেই সব প্রথম যুগের রচনার পাণ্ডুলিপিগুলো চিরকালের জন্য হারিয়ে গেছে। কোনওটাই আজ অবধি খুঁজে পাওয়া যায়নি।

তবে এগুলোই শেষ নয়। লেনিনের আরও অনেক রচনারই পাণ্ডুলিপি হারিয়ে গেছে। পলাতক ও প্রবাসী জীবনে তিনি নিজেও সব কিছু গুছিয়ে রক্ষা করতে পারেননি। অন্যরাও করে উঠতে পারেনি।

অবশ্য উনিশ শতকের সেই শেষ দশকে কে আর জানত, এই ভ্লাদিমির একদিন ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন হবেন! তাঁর প্রতিটি কথাই একদিন সারা বিশ্বের মানুষের কাছে অমূল্য বাণীর মর্যাদা পাবে!!

 

[]

আলেক্সান্দ্রিয়ার মাটিতে আড়াই হাজার বছর আগে উচ্চারিত বিখ্যাত বিজ্ঞানী আরকিমেদিসের একটি প্রখ্যাত বচন: “আমাকে একটু দাঁড়ানোর জায়গা দাও; আমি গোটা পৃথিবীকে উলটে দেব।” তেইশ বছর বয়সী ভ্লাদিমির সেই উক্তির অনুসরণে তখন কারও সঙ্গে দেখা হলেই বলছেন, “আমাদের বিপ্লবীদের একটি সংগঠন দাও, আমরা সারা রাশিয়াকে উলটে দেব।”

সংগঠন সংগঠন সংগঠন। শুধু বই পড়াশুনা নয়। নিছক আলাপ আলোচনা নয়। স্বতস্ফূর্ত মিছিল আর প্রতিবাদও নয়। সে সব আগে থেকে কিছু না কিছু তো ছিলই। সেগুলোকে পুনর্গঠিত করার পর সামারা এবং সন্ত পিতর্সবুর্গে লেনিন কয়েকটা মার্ক্সীয় পাঠচক্র গড়ে তুললেন। এবং তিনি চাইলেন, এই গ্রুপগুলির মধ্যে একটা স্থায়ী দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকরী সংযোগ গড়ে তুলতে। তিনি নিজেও বুঝেছেন, যাদেরই সম্ভব বোঝাতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন, সচেতন এবং সংগঠিত হতে হবে। প্রতিটি প্রতিবাদ আন্দোলনের জন্য আগে থেকে অনেক কিছু ভেবে নিতে হবে।

মানুষটা প্রথম থেকেই অন্যরকম। সামারার পাঠচক্রের একজন সদস্য, লালায়ন্তস, অনেক পরে তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন: এক দিকে সারল্য, চৌখস বুদ্ধি, জীবনের স্পন্দন, আর অন্য দিকে তীক্ষ্ণ মর্যাদাবোধ, গভীর জ্ঞান, যুক্তি তর্কে প্রবল আগ্রহ, স্পষ্ট বিচার এবং নিখুঁত সংজ্ঞা নির্ধারণের ক্ষমতা সেদিনকার সেই ২৩ বছর বয়স্ক যুবকের একেবারে চোখেমুখে ফেটে পড়ছিল।

রাশিয়ার কৃষকদের সম্পর্কে নানারকম তথ্য সংগ্রহ করে ১৮৯৩ সালের বসন্তে তিনি লিখলেন একটি প্রবন্ধ— “কৃষকদের জীবনে নতুন অর্থনৈতিক ঘটনাবলি”। নারদনিকদের তত্ত্বকে নস্যাৎ করে দিয়ে তিনি দেখালেন, কৃষিতে পুঁজিবাদ হু-হু করে ঢুকে পড়েছে। চাষের আধুনিক যন্ত্রপাতি আসেনি ঠিকই, পুরনো সেই ঘোড়ায় লাঙল জুতেই সামন্ত যুগের কায়দাতেই চাষ হচ্ছে ঠিকই। হাতে হাতে কাস্তে দিয়েই ফসল কাটা হচ্ছে। সেও ঠিক। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে উৎপাদন সম্পর্ক পালটে যাচ্ছে, উৎপাদনের উদ্দেশ্য বদলে গেছে। ফসল বিক্রি করে মুনাফা লুটবার প্রবণতা বাড়ছে। বাইরে জারতন্ত্রের শাসনে জমিদারদের দাপট আছে বলে কুলাকদের, ধনী চাষিদের, তোমরা আলাদা করে চিনতে পারছ না। উপর থেকে দেখে ভাবছ, সামন্ততন্ত্র জবরদস্ত টিকে আছে। উপরে জমিদার আর নীচে প্রজা। না, কৃষি উৎপাদনের চরিত্র গ্রামাঞ্চলে আমূল পরিবর্তন হয়ে গেছে।কুলাকদের অধীনে চাষ করতে এসে চাষিরা আর তাদের খাজনা দেয় না, তারা নাম মাত্র মজুরির বিনিময়ে গায়েগতরে খেটে (শ্রম বিক্রি করে) উৎপাদন করে দেয়। নারদনিকরা কৃষক আর গ্রাম সমাজের নামে বিভোর হয়ে আছে বলে এই নতুন ঘটনাবলি দেখতে পারছে না।

একজন কমরেড প্রশ্ন করলেন, কিন্তু কৃষিতে পুঁজিবাদ আসছে সামন্ততন্ত্রের তুলনায় কোনও রকম প্রযুক্তিগত উন্নতি ছাড়াই? এটা কি মার্ক্সবাদী সমাজ-বিশ্লেষণের বিরুদ্ধে যাচ্ছে না?

না, লেনিন দেখালেন, আমাদের দেশে ধনতন্ত্রের বিকাশ হচ্ছে জারতন্ত্রের ছত্রছায়ায়। আপনাদের এই দুটো জিনিসকে মিলিয়ে বুঝতে হবে। ফলে স্বাধীন ধনতন্ত্রের আওতায় কৃষি যেভাবে বিকশিত হতে পারত, এখানে তা হচ্ছে না। আর ঠিক এই জন্যই এখানে জমিতে পুঁজির প্রবেশ বুঝতে অসুবিধা হয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে জারের শাসন যতটা পড়ছে, পুঁজির অপ্রতিরোধ্য গতিতে বিকাশ সেই অনুপাতে দেখতে পাচ্ছি কম।

শ্রমিকশ্রেণি এখানে বিপ্লবের প্রশ্নে কৃষকদের সঙ্গে মৈত্রীর ক্ষেত্রে কীভাবে এগোবে? শুধু গরিব চাষিদের সঙ্গে নিয়ে?

না, উলিয়ানভ বলেন, আমাদের দেশে বিপ্লবটা করতে হবে দুটো পর্যায়ে। জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সমগ্র কৃষক আমাদের মিত্র শক্তি। কুলাকরাও সেই অবধি আমাদের সঙ্গী। তাদের সঙ্গে জোট বেঁধেই আমাদের কাজ করতে হবে।

তাহলে নারদনিকদের সঙ্গে আমাদের কৌশলের তফাত কোথায় হচ্ছে?

তফাত হচ্ছে এই জায়গায় যে ওরা এই প্রথম পর্যায়ের কাজটাকে দ্বিতীয় পর্যায় পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে চাইছে। জার শাসনের মধ্যেই যে পুঁজিবাদ গড়ে উঠছে, জারের পতন হলেই তাদের বিরুদ্ধেও লড়তে হবে। সেই কৌশলও এখন থেকেই ঠিক করে রাখতে হবে। সমাজতন্ত্রের জন্য লড়াইতে সমগ্র কৃষকশ্রেণি বলে কিছু আর থাকবে না। তখন কুলাকদের বিরুদ্ধেও লড়তে হবে। এটা ওরা ভাবতে পারছে না। মার্ক্সবাদকে অস্বীকার করার ফলে ওরা এই বিকাশমান বাস্তবতা বুঝে উঠতে পারছে না।

এরকম তর্ক চলছে তো চলছেই।

সে চলুক। তার মধ্যেই একটা সুখবর এখনই দিয়ে রাখি। ১৮৯৩ সালের এই রচনাটা রুশ বিপ্লবের সমস্ত ঝড়ঝাপটা সহ্য করেও আজ অবধি টিকে গেছে। এখন পর্যন্ত পাওয়া এটাই কমরেড লেনিনের আদিমতম তত্ত্বগত রচনা।

সামারা থেকে লেনিন তখন সমগ্র ভলগা অঞ্চলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সারাতভ, কাজান, ভলগা শহরে ঘুরে ঘুরে লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করছেন। গ্রুপ তৈরি করছেন। সংগঠন বানাচ্ছেন। অন্যদের শেখাচ্ছেন সংগঠন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা এবং কায়দা। এই সময় লেনিন ফেদসিয়েভের থেকে একটা লেখা এবং একটি পত্র পেলেন। নিকলাই তখন আবার জেলে।

তিনি লিখেছেন, ভ্লাদিমির, তোমার কাজের ক্ষেত্র অনেক বড়। তুমি সামারা ছেড়ে বেরিয়ে পড়ো। ওরা তোমাকেও সন্দেহ করছে, তোমার কাজকর্মের তথ্য খুঁজছে। যে কোনও দিন ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে।

ভ্লাদিমির বুঝলেন, তাঁকে এবার সামারা থেকে গা ঢাকা দিতে হবে। সন্ত পিতর্সবুর্গ এক বড় শিল্পাঞ্চল। শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে কাজ করতে হলে সেখানে অফুরন্ত সুযোগ। আবার আত্মগোপন করে কাজ করাও তুলনায় সহজ। তিনি এবার সেই দিকে চললেন।

নিকলাইয়ের কথা তিনি ভুলতে পারছেন না। বহু কাল পরে তিনি লিখেছিলেন, “সেই সময়ে ভলগা অঞ্চলে এবং মধ্য রাশিয়ার কোনও জায়গায় ফেদসিয়েভ এক বিরাট ভূমিকা পালন করেছিলেন; মূলত এই অসাধারণ প্রতিভাধর এবং অসাধারণ বিপ্লবীর সুবাদেই নারদনিক মতবাদ থেকে মার্ক্সবাদের দিকে ঝুঁকে পড়া সম্ভব হয়েছিল।”

বড় মনের মানুষদের স্বভাব এরকই হয়। ছোটখাট সাহায্য যাঁদের কাছে পেয়েছেন, তাঁদের কথাও কখনও ভুলতে পারেন না, স্বীকৃতি দিয়ে যান, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন অকুণ্ঠ চিত্তে। তাঁরা জানেন, এরকম অনেক ফেদসিয়েভ পাশে থেকে হাত বাড়িয়ে দেয় বলেই একজন উলিয়ানভ কালক্রমে এক দিন লেনিন হয়ে ওঠে।

 

[]

আবারও ম্যাক্সিম গোর্কির অভিজ্ঞতা। তবে এবার আর তাঁর নিজের কোনও সমস্যা নিয়ে নয়। এবারের কথকতার কেন্দ্রবিন্দু দলের কয়েকজন নেতার মধ্যেকার দর্শনগত মতপার্থক্যের সমস্যা।

১৯০৮ সালের এপ্রিল মাস। লেনিন তখন জেনেভায় প্রবাসী জীবন যাপন করছেন, গোর্কি ইতালির কাপ্রিতে এসেছেন স্বাস্থ্য উদ্ধারে। শরীর তাঁর বরাবরই খারাপ। বাল্য বয়সের অনাহার অর্ধাহারের প্রভাব। বুকের ভেতরে ফুসফুসে যক্ষ্মার ব্যাকটিরিয়া বাসা বেঁধে আছে। রাশিয়ার ঠান্ডা তাঁর সয় না। কাশি লেগেই থাকে, গলা দিয়ে রক্ত পড়ে।

পেশকভ তখন খুব চিন্তিত। রাশিয়ার সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক লেবার পার্টির বলশেভিক গ্রুপের কয়েকজন বড় নেতার সঙ্গে লেনিনের প্রবল মতবিরোধ চলছে। বিশেষ করে আলেক্সান্দার বোগদানভ। একজন মেধাবী চিকিৎসক। বহু বিষয়ে পণ্ডিত। দর্শনে ব্যাপক যাতায়াত। তখনই তাঁর খান চারেক মোটা মোটা বই বেরিয়ে গেছে। আর সেই সব পড়েই লেনিনের মাথা গরম হয়ে আছে। গোর্কি গত পাঁচ ছ বছরে লেনিনকে এরকম রাগারাগি করতে কখনও দেখেননি। তাঁর স্বভাবই খুব হাসিখুশি। কোনও কারণে উত্তেজিত হলে বা রেগে গেলেও আবার একটা হাসি ঠিক বের করে আনতে পারেন। চোখ ছোট করে কুঁচকে সেই হাসি এখন, কিছুদিন হল, তাঁর মুখে ঠিক ফুটছে না। গোর্কির দুশ্চিন্তা হচ্ছে।

বলেওছেন তিনি লেনিনকে। অত শুদ্ধবাদী হওয়ার কী আছে? আপনার সঙ্গে মতে না মিললেই বা কী? না হয় ওনারা মাখ দর্শনের চর্চাই করলেন। তাতে রাজনীতি তো আর পাল্টে যাচ্ছে না?

লেনিন বলেছেন, না, কমরেড আলেক্সান্দার মাখ নিয়ে মাতামাতি করলে আমার কিছুই বলার থাকত না। কিন্তু উনি সেখানেই থামছেন না। উনি এবং বাকিরা মিলে এর সঙ্গে মার্ক্সবাদকে মেলাতে চাইছেন। সেটাতে আমার আপত্তি। একে আপনি আমার শুদ্ধবাদী ছুৎমার্গ বলে বিদ্রূপ করতে পারেন। কিন্তু শুদ্ধতা রক্ষা করতে না পারলে বৈজ্ঞানিক হাতিয়ার হিসাবে মার্ক্সবাদ আমাদের কোনও কাজেই লাগবে না।

বেশ তো, বলুন ওনাকে সেটা।

বলেছি, আলেক্সান্দার তো একা নয়, একটা বিরাট গ্যাং তৈরি হয়েছে রাশিয়ার মার্ক্সবাদী বুদ্ধিজীবী লেখকদের মধ্যে। আমাদের শিবিরের বোগদানভ ছাড়াও আছেন বারম্যান, ওদিকে প্লেখানভের শিবিরেও কয়েকজন আছেন, ইউস্কেভিচ, ভ্যালেন্তিনভ, প্রমুখ। সবাই মিলে কোমর বেঁধে নেমেছে মার্ক্সবাদকে কলুষিত করতে। বোগদানভ তাঁদের সকলের ক্যাপ্টেন।

আপনি লিখুন মার্ক্সবাদের সপক্ষে। আপনার কলম তো কেউ আটকে রাখেনি।

হ্যাঁ লেখা হবে। দর্শন আমি সেরকম বুঝি না। কমরেড প্লেখানভের সঙ্গে বার্নে আমার মাঝে এক দিন কথা হয়েছে। মার্ক্সবাদী দর্শনের মূল কথাগুলো তুলে ধরে উনিই এই বিষয়ে তর্ক চালাবেন।

প্লেখানভের উপর আপনি ভরসা করেন? কদিন আগেও তো একটা লেখায় দেখলাম, ওনাকে তুলোধোনা করেছেন। শ্রমিক অভ্যুত্থানের প্রশ্নে দ্বিধাদ্বন্দ্বের জন্য।

তা করেছি। লেনিন বললেন, আবারও দরকার হলে করব। কিন্তু তাই বলে ওনার গুণটাকে অস্বীকার করার প্রশ্ন ওঠে না। মার্ক্স এঙ্গেল্‌সের মূল দার্শনিক তত্ত্বটা তিনি বেশ ভালোই বোঝেন। অন্তত, আমার চাইতে বেশি। আমরা খুব ভাগ্যবান যে এই ডামাডোলে উনিও মাখের চিন্তাধারাকে মার্ক্সের মতবাদের সঙ্গে মিলিয়ে কোনও খিচুরি পরিবেশন করতে যাননি। হ্যাঁ, আপনি ঠিকই ধরেছেন। আমি গেওর্গির উপর ভরসা রাখছি। দেখা যাক না কী হয়।

গোর্কি বুঝলেন, ১৯০৫-এর ঝোড়ো বিপ্লবী অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পর রাশিয়ায় যে প্রতিক্রিয়ার জোয়ার চলছে, তাতে লেনিন খুব চিন্তিত। সেই অবস্থায় মতাদর্শগত অবস্থানে এতটুকু বিচ্যুতি তিনি বরদাস্ত করতে রাজি নন। গোর্কি অবশ্য তখন সেই সব চুলচেরা তত্ত্বগত বিচার বিশ্লেষণে তেমন কোন আগ্রহ পাচ্ছিলেন না। লেনিনের তরফে সবটাই বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছিল তাঁর কাছে। বোগদানভ একজন খুব মেধাবী ব্যক্তিত্ব। এই দুজনের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়ে গেলে দলের পক্ষে সেটা খুব খারাপ হবে। কিন্তু দুজনেই তাঁরা যেরকম এককাট্টা হয়ে উঠেছেন যাঁর যাঁর মতবাদের প্রশ্নে, তাতে তাঁদের মধ্যে ঐক্য স্থাপন করা বেশ দুরূহ কাজ! তথাপি তিনি একবার লেনিন এবং বোগদানভকে তাঁর কাপ্রির বাড়িতে আমন্ত্রণ জানালেন। দু চার দিন এসে থেকে দুজনে সামনাসামনি বসে আলোচনা করে ঝামেলা মিটিয়ে নিন। যদি সম্ভব হয়।

সে ওঁরা এলেন। প্রবাসী জীবনে রুশ ভাষায় সারা দিন আড্ডা মারতে আর কিছু ভালোমন্দ খেতে কারই বা খারাপ লাগে!

কদিন ইতালির সেই বাড়িতে যেন ঝড় বয়ে গেল। কী তর্ক কী বিবাদ! কেউ পিছু হঠতে রাজি নন। একজন টেবিল চাপড়ান তো অন্য জন দুম করে জানালার কাচের পাল্লা হাট করে খুলে দেন! সে এক তিন দিবসীয় ধুন্ধুমার কাণ্ড।

বোগদানভের মনে হচ্ছে, মাখ মানেই আধুনিক বিজ্ঞানের একেবারে টাটকা টোটকা। তাকে মার্ক্সবাদের সঙ্গে মেশালে মার্ক্সবাদ স্বাদে গন্ধে একেবারে আধুনিক হয়ে উঠবে। তার তাত্ত্বিক শরীর থেকে উনিশ শতকের গ্রাম্য পোশাক খুলে যাবে। হেগেলের দ্বন্দ্বের তত্ত্বটত্ত্ব যত্ত সব উদ্ভট জিনিস। একশ বছরের পুরনো। বস্তুর ধারণাও অভিজ্ঞতার বাইরের জিনিস। প্রত্যক্ষই সব। যা চোখে দেখিনি, কানে শুনিনি, তাকে কেন বিশ্বাস করব? অভিজ্ঞতার বাইরের জিনিস মানেই তা অধিবিদ্যা। জ্ঞানের অতীত সিদ্ধান্ত। সংবেদনের থেকেই জ্ঞানের শুরু।

আলেক্সেইয়ের কানে ঠক ঠক করে হাতুড়ির বাড়ি পড়ে যেন।

ওদিকে লেনিনও কম যান না! প্রত্যক্ষই সব? রাষ্ট্রকে আপনি চোখে দেখতে পান? কানে শুনতে পান? জার আছে, পুলিশ আছে, কসাক বাহিনী আছে, জেলখানা আছে, সাইবেরিয়া আছে বলে আপনি প্রত্যক্ষভাবে জানতে পারেন। তার মধ্যে রাষ্ট্রকে কোথায় পাচ্ছেন? সেটা একটা ধারণা। সিদ্ধ ধারণা। মানেন তো সেটা। কিন্তু প্রত্যক্ষ থেকে, বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই প্রাপ্ত ধারণা। প্রত্যক্ষে আপনি সমাজতন্ত্র কোথায় পাবেন? তা বলে রাষ্ট্র ধারণা ছেড়ে দেবেন? সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য বর্জন করবেন? বস্তু নেই বলবেন? না, সংবেদন নয়, বস্তু থেকে জ্ঞানের সূচনা। সংবেদন হচ্ছে মস্তিষ্কের কাছে বস্তুর সংবাদবাহক। জ্ঞানের উৎস নয়, উপায়। মাখের মতোই আপনারাও জ্ঞানের উৎস আর উপায়ের প্রশ্নকে মিলিয়ে দিচ্ছেন! ইত্যাদি।

দুম দাম ঠকাস ঠকাস!

ম্যাক্সিম গোর্কি ভাবেন, এদের মধ্যে বোধহয় আর আপস মীমাংসা হবে না। একই দলেই বা এনারা দুজন থাকবেন কীভাবে? কোথায় জারের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, তা নয়। কটা কেতাবি শব্দের জন্য দুজনে ঝগড়া করে যাচ্ছেন! সংবেদনশীল মনটা তাঁর ভারি হয়ে যায়। বাইরে থেকে ঘুরে আসেন। ঈষদুষ্ণ খোলা হাওয়ায় মাথা একটু হাল্কা করে সন্ধে নামার আগে ঘরে ঢোকেন। আর ঘরে ঢুকেই…

ঘরের ভেতরে পা দিয়ে তিনি যা দেখেন, তাতে দারুণ চমকে ওঠেন।

কে বলবে, এই দুটো মানুষ একটু আগেও তুমুল বিতণ্ডা করছিলেন? তিন দিন ধরে প্রায় ঝগড়াই করে গেছেন? এখন দুজনে মন দিয়ে দাবা খেলছেন। লেনিনের কোলে আবার গোর্কির বাসার এক নাদুসনুদুস বেড়াল। আরামে ঘরঘর করছে। হেগেলীয় দ্বন্দ্বতত্ত্বের বিপরীতের ঐক্য যেন একেবারে দৃষ্টিগোচর প্রত্যক্ষ হয়ে ফুটে রয়েছে। গোর্কি খুব নিশ্চিন্ত বোধ করলেন। যাক, তাহলে একটা বোঝাপড়া হয়েছে আপাতত দুজনের মধ্যে। ভালো হল। এই দুই যুযুধান নেতা এবার এক সঙ্গে হাতধরাধরি করে কাজ করতে পারবেন।

পর দিন সকালে চায়ের আসরে সেই কথাই তিনি বললেন লেনিনকে।

লেনিন হা হা হা করে প্রচণ্ড জোরে হেসে উঠলেন। আপনি এরকম ভেবেছেন বুঝি! ভুল ভাবছেন কমরেড পেশকভ। আমাদের মধ্যে চিন্তার জায়গায় সম্পূর্ণ ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছে। দর্শনের জগতে আমরা এখন থেকে দুই বিপরীত পক্ষ। ওদের মাখ আর পোয়াঁকারের দার্শনিক পচা পাঁক থেকে আমাদের মার্ক্সবাদকে বাঁচাতেই হবে। না, আর কোনও সমঝোতা নয়!

তাহলে কাল বিকেলে যে …

দাবা খেলছিলাম? আবার হেসে ফেললেন কমরেড লেনিন। দাবাতেও তো আমরা দুই পক্ষই ছিলাম। হা হা হা। আপনি বোধহয় বুঝতে পারেননি।

সত্যিই আমি বুঝতে পারছি না। আপনি আর আলেক্সি যেভাবে গভীর মন দিয়ে দাবার চাল দিচ্ছিলেন, কে বলবে আপনাদের মধ্যে এত বিরোধ?

নাঃ, আপনিও দেখছি দ্বন্দ্বতত্ত্ব মানতে পারছেন না। মার্ক্সবাদের মৌলিক সূত্রগুলিকে রক্ষার প্রশ্নে আমরা দুজনে এখন পরস্পরের ভয়ানক বিরোধী। আবার জারের শাসন উৎখাত করার জায়গায় আমাদের মধ্যে সখ্যতা অটুট।

গোর্কি আনমনেই যেন ঘাড় নাড়লেন।

আর একটা কথা কমরেড আলেক্সেই। লেনিন বললেন, মতাদর্শগত বিভেদ আর ব্যক্তিগত শত্রুতা এক জিনিস নয়। সেটা কখনও ভুলে যাবেন না। বিপ্লবী আন্দোলনে কত লোক আসবে। সকলে বাকি সকলের সঙ্গে সমস্ত ব্যাপারে একমত হবে নাকি? আর তা যদি না হয়, তাহলেই আমরা যে যার শত্রু হয়ে যাব? মুখ দেখাদেখি বন্ধ করে দেব? বিপ্লবীদের দায়িত্ব অনেক বড় হয়। অসংখ্য সম্পর্কের জন্য অনেকটা জায়গা সেখানে ছেড়ে রাখতে হয়!

গোর্কি নিজেও এই মানুষটির হৃদয়ের প্রশস্ততা পরে অনেকবার অনুভব করেছেন।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2454 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...