আফসানা ও তার বন্ধুদের ভালো থাকার স্বার্থে যে লেখা আপনাকে পড়তেই হবে

চার নম্বর নিউজডেস্ক

 

ট্যাংরা খাল, রামনগর, হাজরা খাল, কুমারী, পাখিউরা, ছুটিপুর। ইছামতীর পাড় ধরে নদিয়ার হাঁসখালি ব্লকের ছোট-ছোট এই গ্রামগুলো একেবারে বাংলাদেশ বর্ডার-লাগোয়া। দিনরাত সেখানে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর টহল আর কড়া নজরদারি। যদি বহিরাগত হন, গ্রামে ঢুকতে হলে আপনাকে আধার কার্ড দেখিয়ে পারমিশন নিতে হবে। সন্ধে ছটার পর, এমনকী স্থানীয় মানুষেরও অনুমতি নেই গ্রামের বাইরে বেরোনোর। মূলত আদিবাসী এবং বেশ কিছু মুসলমান পরিবারের এই গ্রামগুলিতে, বুঝতেই পারছেন, জীবন সবসময় ঠিক স্বাভাবিক ছন্দে চলে না।

এই পাখিউরা গ্রামে থাকে আফসানা। বয়স ১৫ কিংবা ১৬। গ্রামের দিকে কে আর অত খেয়াল রাখে সঠিক বয়সের! বয়ঃসন্ধিকালে যখন প্রথমবার ঋতুস্রাব হল আফসানার, সে বুঝেই উঠতে পারেনি হঠাৎ এত রক্ত আসছে কোত্থেকে। তার বাড়ির কেউ কিছু বলে দেয়নি তাকে। এমনকী মা-ও না। বেখেয়ালে কোথাও কেটে গেল? কিন্তু তলপেটের যে কনকনে ব্যথাটা, সেটা তো ঠিক কেটে যাওয়ার ব্যথার মতো নয়। কেটে গেলে হাত-পা এত অবশ লাগবে কেন? চুপিচুপি বান্ধবীকে জিগ্যেস করে আফসানা, কী হল, কেনই বা হল এমন। বান্ধবীর কাছেই সে জানতে পারে, এখন থেকে প্রত্যেক মাসেই এমন রক্তপাত হবে তার শরীর থেকে। সেই রক্ত শুষে নিতে, ব্যবহার করতে হবে কাপড়। না, এর বেশি কোনও তথ্য তাকে দিতে পারেনি বান্ধবীটিও।

এদিকে আফসানা জানে না কীভাবে কাপড় ব্যবহার করতে হয় ঋতুস্রাবের সময়। ফলে, সে নষ্ট করে ফেলে বাড়ির কিছু বিছানার চাদর ও বালিশের ওয়াড়। মার খায় মায়ের কাছে। মরিয়া হয়ে আর এক বান্ধবীর কাছে যায় আফসানা, বিকল্প খুঁজতে। একে যন্ত্রণা, তার ওপর মারধোর, খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল সে। সেই বান্ধবীটির কাছে সে জানতে পারে স্যানিটারি ন্যাপকিনের কথা। আফসানা তার বান্ধবীকে বলে, তাকে কয়েকটা ন্যাপকিন দিতে। তা হলে বাড়ির চাদর, কাপড় কিছুই নষ্ট হবে না, মারও খেতে হবে না আর। বান্ধবীটি অবশ্য সাফ জানিয়ে দেয়, স্যানিটারি ন্যাপকিনের দাম অনেক, পাড়ার মেয়েদের বিনিপয়সায় বিলিয়ে বেড়ানোর জন্য শখ করে সে ন্যাপকিন কেনেনি।

হাঁসখালির এই গ্রামগুলোয় বড়জোর একটা বা দুটো মুদিখানায় পাওয়া যায় স্যানিটারি ন্যাপকিন। যেহেতু সহজলভ্য নয়, তাই দামও বেশি। সবচেয়ে কাছের যে গঞ্জ-শহর, যেখানে দোকানের সংখ্যা বেশি, কিন্তু যেতে-আসতে আটোভাড়া ৩০ টাকা। গ্রামের মেয়ে-বউরা ‘শরীর খারাপ’ নিয়ে কথা বলেন না। লজ্জায় মাথা কাটা যায় তাঁদের। কেউ কখনও তাঁদের বলে দেয়নি, মেয়েদের অত্যন্ত স্বাভাবিক এক শারীরিক প্রক্রিয়া এই ঋতুস্রাব। সুস্থতার লক্ষণ। উলটে তাঁরা জানেন, মাসিক হলে, তাঁরা অপবিত্র। পুজো করা, নামাজ পড়া বারণ, ওইসময়। অনেকের তো রান্নাঘরে ঢোকাও বারণ। এমন যেখানে পরিস্থিতি, মাসিকের স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে আলোচনার কথা তো সেখানে ভাবাই যায় না।

এমন একটা পরিবেশে বড় হওয়া আফসানার মনে ঋতুস্রাবের বিষয়ে ভীতি তৈরি হওয়া তাই নিতান্তই স্বাভাবিক ছিল। ভয়ের চোটে তার রাতের ঘুম চলে গেল। পরের মাসের তারিখ যত এগিয়ে আসতে লাগল, দুশ্চিন্তাতেই আধমরা হয়ে পড়ল সে। আল্লাকে ডেকে বললে, তিনি কি পারবেন না এই ভয়ঙ্কর অসুখ পুরোপুরি সারিয়ে দিতে?… আফসানার পক্ষে এই মানসিক চাপ সহ্য করা দিন-দিন কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছিল।

এরই মধ্যে, ২০২০-র একেবারে শুরুর দিকে কয়েকজন তরুণ-তরুণী মিলে কাজ শুরু করে তাদের এবং আশপাশের কয়েকটি গ্রামে। লক্ষ্য— মেয়েদের ঋতুস্রাবের বিষয়টিকে স্বাভাবিক আলোচনার মধ্যে নিয়ে আসা। কীভাবে? শ্রীমা মহিলা সমিতি-র একটি উদ্যোগ হল, মাসিক নিয়ে নিয়মিত সচেতনতা ক্যাম্প আয়োজন করে বিনামূল্যে এই গ্রামগুলিতে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ করা, এবং মাসিক সম্বন্ধে এই গ্রামের মহিলা ও মেয়েদের সঠিক তথ্য দেওয়া। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, কাপড় ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি এবং স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি নিয়েও নিয়মিত চর্চা করা। যেহেতু এই বৈঠকে গ্রামের মেয়েরা সহজে আসতে চায় না, ভয় পায়, লজ্জা পায়— তাই এই সমিতির প্রতিশ্রুতি, যাঁরা বৈঠকে আসবেন তাঁদের কাউকেই খালি হাতে ফেরানো হবে না। দেওয়া হবে স্যানিটারি ন্যাপকিনের প্যাকেট।

সমিতির এক সদস্যের কথায়, “আমরা মূলত কিশোরীদের নিয়ে কাজ করি। তবে এই গ্রামগুলিতে কিছু সদ্যবিবাহিতাও রয়েছেন যাঁদের বয়স ২৪-২৫-এর আশপাশে। তাঁরা বৈঠকে এলে, আমরা তাঁদেরও ফেরাই না। পরের প্রজন্মকে শিক্ষিত করে তোলার জন্য এটা খুব দরকার।”

“যেদিন থেকে দেখলাম যে, এই গ্রামগুলির মহিলা এবং মেয়েদের হাতে স্যানিটারি ন্যাপকিন পৌঁছে দেওয়ার কেউ নেই, তখনই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, এই কাজটা আমাদের করতেই হবে। তবে আমরা পরিবেশ নিয়ে খুব সচেতন। তাই আমরা এঁদের বারবার ব্যবহার করা যায়, এমন সুতির ন্যাপকিন দিই। আমাদের পরের পদক্ষেপ হিসেবে, এই ছটি গ্রামের ১২ জন মেয়েকে নিয়ে আমরা এই সুতির ন্যাপকিন তৈরি করার উদ্যোগ নিতে চাই। যাতে সরবরাহে কখনও খামতি না-আসে,” জানালেন শ্রীমা-র এক সদস্য।

এর বাইরেও আরও নানা পরিকল্পনা রয়েছে ওঁদের। নদিয়া জেলার ২০টি স্কুলের ১৪০০টি কিশোরীকে ঋতুস্রাব এবং মাসিকের স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে সচেতন করার একটি কার্যক্রম ওঁরা গ্রহণ করতে চলেছেন শিগগিরই। পৌঁছে দেওয়া হবে সুতির স্যানিটারি ন্যাপকিন, যা তারা নিজেরাই পরিষ্কার করে নিয়ে বারবার ব্যবহার করতে পারে। এইভাবেই, ঋতুস্রাব নিয়ে চলতি ধারণাগুলি বদলে দিতে চায় শ্রীমা পিরিয়ড প্রোজেক্ট। বুঝিয়ে দিতে চায়, মাসিক নিয়ে আলোচনা নিষিদ্ধ নয়, বরং তা স্বাভাবিক স্বাস্থ্য আলোচনারই একটি অঙ্গ।

একই সঙ্গে ওঁরা জানিয়েছেন, এই উদ্যোগের রূপায়ণে কিছু আর্থিক সাহায্যের প্রয়োজন। যাতে কাজ আটকে না-যায়, যাতে আমফানের প্রকোপে বিপর্যস্ত কিশোরীদের জীবনে একটু স্বস্তি এনে দেওয়ার এই পরিকল্পনা মুখ থুবড়ে না-পড়ে।

আপনি যদি ওঁদের পাশে দাঁড়াতে চান, এই লিঙ্কটিতে ক্লিক করুন – https://milaap.org/fundraisers/support-women-3?utm_source=shorturl

আফসানা এখন আর মাসিকে ভয় পায় না। আসুন চেষ্টা করি, আফসানার অন্যান্য বন্ধুর জীবনেও এই ভয়টা যাতে কোনওদিন ফিরে না-আসে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2454 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...