নকশালবাড়ির অন্য উত্তরাধিকার: বাংলাদেশের সিরাজ সিকদার

সৌমিত্র দস্তিদার

 



লেখক গদ্যকার, তথ্যচিত্রনির্মাতা

 

 

 

এবার যেন কিছুটা নীরবেই চলে গেল ২৫শে মে। অথচ ওই দিনটি দুনিয়ার রাজনীতির অভিধানে পাকাপাকিভাবে জায়গা করে নিয়েছে। নকশালবাড়ির কৃষক অভ্যুত্থান আপনি চান বা না চান কোনওভাবেই অস্বীকার করতে পারবেন না। তরাই-এর এক অখ্যাত জনপদে ২৫শে মে বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ আছড়ে পড়েছিল। কৃষকের স্বাধিকার আন্দোলন কীভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের ডাক দিয়ে শাসকদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল তা নিয়ে দেশে দেশে বিস্তর গবেষণার শেষ নেই।

নকশালবাড়ির রাজনীতির নানা প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা হোক। হওয়া দরকারও। কিন্তু কখনও কখনও একটু অবাক লাগে যখন দেখি এই আন্দোলন প্রতিবেশী বাংলাদেশকেও কতটা প্রভাবিত করেছিল তা নিয়ে এপারের প্রগতিশীল শিবিরের অদ্ভুত এক নীরবতা দেখে। হতে পারে দেশটা ছোট, তাই পশ্চিমবঙ্গের তাত্ত্বিকদের কাছে ওপারে কোথায় কী হয়েছে তা আদৌ মূলধারার বাংলাদেশের রাজনীতিকে কিছুমাত্র ধাক্কা দিতে পেরেছে কিনা তা নিয়ে সেরকম কোনও উৎসাহ নেই। এর পিছনে অবশ্য একধরনের আত্মম্ভরিতাও কাজ করতে পারে।

এই উচ্চবর্গের সুপ্রিমেসিই দুই বাংলার নকশাল রাজনীতিতেও অদৃশ্য এক পাঁচিল তুলে রেখেছে বছরের পর বছর। আমরা আমেরিকা ইংলন্ড ফ্রান্স জার্মানিতে বিপ্লবী রাজনীতি নিয়ে যত আলোচনা করি তার সিকিভাগও করি না ওপারের সিরাজ সিকদার, হক, তোহা, মতিন আলাউদ্দিনদের নিয়ে। এর আর একটা কারণ সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গের বাংলাদেশচর্চা ভীষণ রকম খণ্ডিত। ওপারের যে সমস্ত বুদ্ধিজীবীদের চোখ দিয়ে আমরা বাংলাদেশকে দেখি বা এপারে যারা বাংলাদেশ বিশেষজ্ঞ বলে পরিচিত তাদের দুপক্ষের বয়ানেই বাংলাদেশের সমাজ রাজনীতি দাঁড়িয়ে থাকে মোটের ওপর চারটি ঘটনার ওপর— ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের জন্ম ও শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যার মধ্যে দিয়ে সাম্প্রদায়িক শক্তির ফের মাথাচাড়া দেওয়া। ফলে আধুনিক বাংলাদেশের আপাত দ্বন্দ্ব একটাই— ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম সাম্প্রদায়িকতা। এর মাঝামাঝি কোনও ইতিহাস নেই। অন্তত সে ইতিহাসের পাঠ আমাদের খুব পরিচিত নয়।

অথচ মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরের বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনীতির উত্থান ও পতন আগে যেটুকু যা কানে আসত, ক্রমে ক্রমেই তা-ও কেমন যেন এপারের বাম পরিসর থেকেও অদৃশ্য হয়ে গেল। হারিয়ে গেল ১৯৫৭ সালের মওলানা ভাসানীর ঐতিহাসিক কাগমারি সন্মেলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রতিবাদে ঢাকায় ছাত্রদের উত্তাল হয়ে ওঠা, আয়ুব জমানার স্বৈরতন্ত্রী বুলেটের মুখে অকুতোভয় আসাদের শহিদ হওয়া কিম্বা তার অনেক আগে ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট দেশভাগের পর পরেই খুলনার শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকায় কমিউনিস্ট নেতা বিষ্টু চ্যাটার্জির নেতৃত্বে লাল পতাকার জয় ঘোষণা।

১৯৬৭ সালে নকশালবাড়ির রাজনীতি ওপারেও বিপুল প্রভাব ফেলেছিল। শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লিগের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে সমান্তরাল সশস্ত্র সংগ্রামে যে অসংখ্য নকশাল তরুণদেরও বড় অবদান ছিল তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তাদের মত-পথ-রণনীতি বা রণকৌশল নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠতেই পারে, কিন্তু যেভাবে তাদের যাবতীয় ইতিহাস মুছে ফেলা হচ্ছে এবং সে কাজে এপারের তৃতীয় ধারার রাজনীতির ভূমিকাও বিস্ময়করভাবে নীরব, সেটা ইতিহাসের দিক দিয়ে দেখলে গর্হিত অপরাধ।

তেভাগা পরবর্তী সময়ে একমাত্র কৃষক সংগ্রাম হিসেবে নকশালবাড়িই ভারতীয় উপমহাদেশের দুই বাংলাকে উদ্দীপ্ত করতে পেরেছিল। এদেশের মাওবাদী রাজনীতির সূচনাপর্ব যদি অন্ধ্রপ্রদেশ বিহার পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা হয়, তাহলে ওপারে সে কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে নদীমাতৃক বরিশালের। বরিশাল চিরদিনই প্রগতি আন্দোলনের গড়। অবিভক্ত বাংলায় শিক্ষা সংস্কৃতিতে যে দুই জেলার অবদান বিরাট, তার একটা মেদিনীপুর হলে অন্যটা অবশ্যই বরিশাল। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসেও বরিশাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নাম। সেই লড়াই সংগ্রামের ঐতিহ্যের বরিশালেই তরুণ ইঞ্জিনিয়ার সিরাজ সিকদার গড়ে তুলেছিলেন ঘাঁটি এলাকা। পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী রুখতে ডাক দিয়েছিলেন দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা যুদ্ধের।

সিরাজ সিকদারের জন্ম ১৯৪৪ সালের ২৭শে অক্টোবর এক মধ্যবিত্ত পরিবারে। স্কুলজীবনে ছিলেন তুখোড় ছাত্র। ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি থেকে ভালো রেজাল্ট করে পাস করেন তিনি। ছাত্রজীবন থেকেই প্রগতিশীল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ষাট সত্তর দশকে যখন সারা দুনিয়া এক নতুন পথের খোঁজে রাস্তায় নেমেছে, তখন সিরাজ সিকদার তখনকার পুব বাংলায় ছাত্র ইউনিয়নের সহ সভাপতি। কিছুদিন চাকরি করার পরে তিনি সর্বক্ষণের বিপ্লবী রাজনীতিক হবার সিদ্ধান্ত নেন। বস্তুত ভারতের নকশাল আন্দোলনের প্রভাবেই ঢাকার মালিবাগে গড়ে তোলেন মাও সেতুং চিন্তাধারার গবেষণা কেন্দ্র। মালিবাগের ওই ছোট্ট স্ফুলিঙ্গই পরে অন্য ধারার এক বিপ্লবী রাজনীতি হয়ে গোটা পুব বাংলায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। বলা বাহুল্য, সিকদারের রাজনীতির পিছনে ছিল এশিয়া আফ্রিকা লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের জনগণের মতই মাও রাজনীতির বিপুল প্রভাব।

এই সিরাজ সিকদার বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিতর্কিত কিন্তু বর্ণময় চরিত্র। নকশালবাড়ির পরে পরেই সিরাজ সিকদার ১৯৬৮ সালের ৮ই জানুয়ারি প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন। সংগঠনের দলিল দেখলেই স্পষ্ট হয়ে যায় সিরাজ কী বলতে চাইছেন। ভূমিকায় লেখা আছে— মার্কসবাদ লেনিনবাদ এবং মাও সেতুং-এর চিন্তাধারা আমরা কীভাবে প্রয়োগ করব, আমাদের দেশের বিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে? মার্কসবাদ লেনিনবাদ ও মাও সেতুং-এর চিন্তাধারা হবে ‘তীর’ যা আমাদের নিক্ষেপ করতে হবে পূর্ব বাংলার বিপ্লবকে লক্ষ্য করে। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাকিস্তান মিলিটারির ক্র্যাকডাউনের পরেই সিরাজ সিকদার দলবল নিয়ে বরিশাল চলে যান। সেখানে পেয়ারাবাগানে গেরিলা ঘাঁটি গড়ে তোলেন। ততদিনে অবশ্য সিকদারের পার্টির নতুন নাম রাখা হয়েছে পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি। এটা ঠিক যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সর্বহারা পার্টির অতি বাম অ্যাডভেঞ্চার সামগ্রিকভাবে গণআন্দোলনের ক্ষতিও করেছে। তাও অস্বীকার করা যায় না যে সর্বহারা পার্টির নেতৃত্বে জনগণের একটা বড় অংশ ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে পুববাংলার নানা জায়গায় বিপ্লবী জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম গড়ে তুলেছিল।

নকশালবাড়ির রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি ছিল দেশের বিপুল সংখ্যক কৃষক। কৃষি যে আন্দোলনের মুখ্য অন্তর্বস্তু তা যে পূর্ব বাংলার নদীমাতৃক কৃষিপ্রধান ভূমিকে উদ্দীপ্ত করবে তা অতি স্বাভাবিক। করেওছিল। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে তা প্রথম থেকেই বহুধাবিভক্ত হয়ে গেছিল। ভারতের সিপিআই (এম-এল)-এর পক্ষপাতিত্ব ছিল হক ও মহম্মদ তোহার ইপিসিপি (এম-এল)-এর দিকে। এই ইস্ট পাকিস্তান মার্কসবাদী লেনিনবাদী দলটি মুক্তিযুদ্ধকে মনে করেছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ, এই দুই কুকুরের কামড়াকামড়ি। মওলানা ভাসানী চিনপন্থী হলেও কোনও উপদলীয় ষড়যন্ত্রে তাঁর সায় ছিল না। মজা হচ্ছে সব বিপ্লবী গোষ্ঠীই পরস্পরের দিকে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি করলেও ভাসানীর সমর্থন নিজেদের দিকে আনতে সবাই ছিল সক্রিয়। খুলনা যশোর আরও কিছু জায়গায় হক তোহাদের কিছু প্রভাব থাকলেও তৃতীয় ধারার মূল শক্তি নিংসন্দেহে ছিল সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টি। ৭১ সালে বরিশালে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে যেটুকু যা লড়াই তা লড়েছিলেন ওই সর্বহারা গেরিলা বাহিনীই। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর আওয়ামী লিগের যোদ্ধারা ভারতের জওয়ানদের নিয়ে বরিশালে ঢুকেছিল। এরকম অনেক ঘটনা আছে যা আমাদের চেনা পাঠে পাওয়া যায় না।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেনা পাঠের যে চিত্রকল্প আমাদের বাংলাদেশ নিয়ে যে কোনও আলোচনাতেই অবধারিত উঠে আসে তা শেখ সাহেবের রেসকোর্স ময়দানে সেই ঐতিহাসিক ভাষণ— এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম…। আর মুক্তিবাহিনী বলতেই আমরা জানি আওয়ামী লিগের নিবেদিতপ্রাণ তরুণদের কথা। যারা ভারতের মাটিতে বাধ্য হয়ে চলে এসে এদেশের সেনাবাহিনীর কাছে ট্রেনিং নিয়ে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে জীবনপন লড়াই করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছেন। আমরা কিন্তু কোনওদিনই আওয়ামী লিগ ও তাদের মুক্তিবাহিনীর শ্রেণিচরিত্র নিয়ে রাজনৈতিক পরিসরেও সেভাবে আলোচনা করিনি। ফলে মুক্তিযুদ্ধ ও আওয়ামী লিগ মোটামুটি এদেশের বামপন্থী শিবিরেও সমার্থক শব্দ হয়ে গেছে।

ভালো করে বিশ্লেষণ করলেই স্পষ্ট হবে যে লিগের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর অধিকাংশই ছিলেন আর্বান এলিট পরিবারের তরুণেরা। ইদানিং অবশ্য বেশ কিছু ১৯৭১ সালের যুদ্ধে কৃষক ও অন্যান্য নিম্নবর্গের মানুষজনের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও তা খুবই কম। অথচ ওই গ্রামীণ সর্বহারাদের আত্মত্যাগ কিছু কম ছিল না। নদীমাতৃক পুববাংলায় মাঝিমাল্লা ও সাধারণ মানুষ কোণঠাসা করে দিয়েছিল পাকিস্তান বাহিনীকে। মার্চ মাসে পাক হামলার দু মাসের মধ্যেই বর্ষার সময়ে জঙ্গল, খাঁড়ি ও দুকুল উপচে পড়া নদীর অনুকূল পরিবেশে বাংলার চাষি-মজুরেরা নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছিল পাকিস্তানের ফৌজকে। তাদের মধ্যে লিগ সমর্থকদের পাশাপাশি বিভিন্ন বামপন্থী রাজনীতির লোকজন যে ছিলেন তা একটুআধটু খোঁজখবর নিলেই জানা যায়। সর্বহারা পার্টির কর্মী-সমর্থকদের অধিকাংশই দেশে থেকেই পাক সেনাদের সঙ্গে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন বিভিন্ন জেলায়। সর্বহারা পার্টির সঙ্গে গভীর যোগ ছিল গরীব শ্রমজীবী মানুষের। ফলে এখন যে সিনেমা-প্রবন্ধে মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে মধ্যবিত্ত বিপ্লবী কাহিনীর পাশাপাশি নতুন করে ভূমিপুত্রের বীরগাথা আলোচনায় আসছে সেখানে কোনও একমাত্রিক কীর্তি আখ্যান নয়, চর্চা হোক নির্মোহ ইতিহাসের। ভুল ঠিক অতিকথন সব নিয়েই নির্মিত হোক আড়ালে চলে যাওয়া নানা কথন।

সিরাজ সিকদারের লেখা থেকে একটা জিনিস স্পষ্ট যে বরিশালের যে পেয়ারাবাগান ছিল পাকিস্তান আর্মির ক্র্যাকডাউনের পরবর্তী সময়ে বামপন্থী গেরিলাদের দুর্গ। পেয়ারাবাগান থেকে বরিশালে পাক বাহিনী ঢোকার পরে তাদের ও স্থানীয় রাজাকারদের বিধ্বংসী হামলার মুখে পালাতে হয়। কিন্তু গেরিলা যুদ্ধ চলতেই থাকে। পেয়ারাবাগানের স্ফুলিঙ্গ ক্রমেই দাবানল হয়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। গৌরনদী, মাদারীপুর, মঠবেড়িয়া, খেপুপাড়া, পাথরঘাটা, পাদ্রীশিবপুর, ঢাকা জেলার মুন্সিগঞ্জ, সাভার, নরসিংদী, টাঙ্গাইল, পাবনা, ফরিদপুর, খুলনার বিস্তীর্ণ এলাকায়।

সিরাজ সিকদারের শ্লোগান ছিল জয় পূর্ববাংলা। ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানের মধ্যে একধরনের বৃহত্তর বঙ্গের ছায়া দেখতে পেতেন সর্বহারা পার্টি। এ যেন ভারতীয় সম্প্রসারণ চক্রের পুববাংলাকে উপনিবেশ বানানোর ষড়যন্ত্র। যা বানচাল করতে সিরাজ সিকদার ডাক দিয়েছিলেন নয়া গণতান্ত্রিক স্বাধীন সার্বভৌম পুববাংলা গড়ে তোলার। তার এই স্বপ্ন কল্পনা যে মুখ থুবড়ে পড়েছিল তা আজ ইতিহাস। কিন্তু নতুন এক স্বপ্ন যে সিরাজ সিকদার দেখেছিলেন ও দেখিয়েছিলেন তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

ভারতের নকশালপন্থী বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে অনেক সাদৃশ্য আছে বাংলাদেশের নকশাল ধারার। বিশেষ করে মাওবাদী রাজনীতির। একটা জায়গায় অমিল বেশ চোখে পড়ে। ভারতে নকশালপন্থীরা আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ এই দুই শত্রুর প্রধানতম কে তা নিয়ে যখন পাতার পর পাতা লিখে চলেছেন তখন বাংলাদেশের সব গোষ্ঠীর পত্রিকায় দুই শত্রুর পাশাপাশি সমানভাবে কঠোর নিন্দে করা হচ্ছে ‘ভারতীয় সম্প্রসারণবাদী’-দেরও।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরেও সিরাজ সিকদার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও এদেশের মাওবাদীদের জনযুদ্ধের ডাকের কপিবুক অনুসরণ করে বাংলাদেশেও বিপ্লবী সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তোলার কাছে আত্মনিয়োগ করেন। সংঘাত তীব্র হয় বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসীন আওয়ামী লিগের সঙ্গে। ১৯৭৫ সালে সিরাজ সিকদার চট্টগ্রামে ধরা পড়েন। একদিন বাদে জেলবন্দি অবস্থায় তাঁর মৃত্যুর খবর আসে। হত্যাকাণ্ডের পরে সরকারের তরফে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়— পালাতে গিয়ে নিহত হয়েছেন সিরাজ সিকদার। অনেকেই অবশ্য বলেন স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনৈতিক ব্যক্তির ছদ্ম বা ফেক এনকাউন্টারে মৃত্যু ওই প্রথম।

প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসচর্চার চেনা ছক যতই অবজ্ঞা করুক না কেন, সিরাজ সিকদার ও তাঁর চিন্তাবিশ্ব নকশালবাড়ির প্রত্যক্ষ উত্তরাধিকার হিসেবে বাংলাদেশের অতিবাম আন্দোলনের ধারায় আজও বেঁচে আছে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2454 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...