বিষে বিষে

স্বপন ভট্টাচার্য

 


লেখক মৌলানা আজাদ কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের ভূতপূর্ব প্রধান

 

 

 

 

সারা গিলবার্ট। কে বলুন তো সারা গিলবার্ট? ঠিক ধরেছেন ইনি হচ্ছেন লন্ডন স্কুল অফ হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন-এর ভ্যাকসিনোলজি বিভাগের সেই প্রফেসর তথা অন্যতম গবেষকপ্রধান যাঁদের দিকে চাতক পাখির মত তাকিয়ে রয়েছে সারা দুনিয়ার কোভিড জুজুর ভয়ে ভীত জনসাধারণ। এঁদের টিম রীতিমতো টিভি ক্যামেরার সামনে শিম্পাঞ্জির দেহ থেকে টানা নিরীহ কোরোনাভাইরাসের দ্রবণ স্বেচ্ছাগ্রাহী মানে ভলান্টিয়ারের দেহে ইনজেক্ট করে সবাইকে সাসপেন্স ধরে রাখতে বলছেন। সে কি এল— সে কি এল না? কোভিডের ভ্যাকসিন। ভ্যাকসিন জিনিসটার ইতিহাস রোমাঞ্চকর। সেটা নিয়ে দু এক কথা বলবার আগে স্মরণ করতেই হবে তাদের কথা যারা সেই প্রথম যুগ থেকে আধুনিককাল পর্যন্ত বেশ বড় সংখ্যায় প্রাণ দিয়েছে আজকে প্রাণরক্ষাকারী নানান টিকার জন্য স্বেচ্ছা বা স্বেচ্ছানিরপেক্ষ ভলান্টিয়ার হয়ে। সারা গিলবার্টের ভলান্টিয়াররা এখনও পর্যন্ত সবাই সুস্থ আছেন এবং ভবিষ্যতে বলতে পারবেন— সেই যে পৃথিবীতে এক অভাবনীয় সময় এসেছিল কুড়ি-কুড়ি সালে, তখন আমি মানবতার জন্য অন্তত এটুকু করতে পেরেছিলুম।

বিজ্ঞানসম্মতভাবে এটাই স্বীকৃত হয়ে থাকে যে ১৭৯৫-তে এডওয়ার্ড জেনার সাহেব টিকাকরণের মাধ্যমে সংক্রামক রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে শরীরকে প্রতিরোধক্ষমতা দান করার কাজটি প্রথমবার সফলভাবে করেছিলেন। কিন্তু আমাদের প্রবাদ— বিষে বিষে বিষক্ষয়— আমার বিশ্বাস এর চেয়ে পুরনো, তাছাড়া এমন তথ্যের অভাব নেই, যা জানায় যে আমাদের প্রাচ্যের মানুষের মধ্যে বিষ দিয়ে বিষ মারার রেওয়াজ বহুদিন আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। চিনের ইতিহাস বলে, সম্রাট কাং সি (K’ang Hsi) সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে গুটি-বসন্ত থেকে সেরে উঠে তাঁর পুত্র কন্যাদের টিকাকরণ করেছিলেন নিজের শুকিয়ে যাওয়া ক্ষতর মামড়ি গুঁড়ো করে এক টিপ নস্যির মত নাকে টানিয়ে। তারা অন্তত গুটিবসন্তে কেউ মরেনি। চিনের লিখিত ইতিহাস বলে তাদের এ প্রথা ১০০০ সালেও প্রচলিত ছিল। কেউ কেউ মনে করেন প্রাচীন চিনা স্ক্রোল ইত্যাদি দেখে, যে এ প্রথা হয়ত খ্রিস্টপুর্ব ২০০ বছর বা তারও আগের সময়কার। শুধু নস্যির মত করে নয়, চামড়ায় আঁচড় দিয়ে গুটিবসন্তের পুঁজ রক্তে ঢুকিয়ে দেওয়া এবং সেই উপায়ে প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি করার নজিরও চিনের ইতিহাসে আছে। তবে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করার কারণ আছে যে,  তারও আগে থেকে মধ্যপ্রাচ্যে এবং এই ভারতে টিকাকরণের রেওয়াজ ছিল। আবু বকরের বিবরণ থেকে জানা যায় মিশরে হামের টিকা নেওয়ার চল ছিল যিশুর জন্মের নশো বছর আগে। ইতিহাসবিদদের মতে কপালে রাজপুরুষের টিকার মত জীবাণুর টিকা দেগে দেওয়ার চল ভারতে আরও প্রাচীন। রাজ আমলের ডাক্তার ড. অলিভার কোল্ট-এর কলকাতা থেকে লন্ডনে পাঠানো একটি রিপোর্ট আমাদের হাতে আছে— (An account of the diseases of Bengall’ Calcutta, dated February 10, 1731) তাতে তো সাহেব ‘টিকা’ (Tikah) শব্দটাই উল্লেখ করছেন। বলছেন— পূজাপাঠ করে বসন্তের দেবীকে তুষ্ট করে একটু পুঁজ আঁচড় কেটে শরীরে ঢুকিয়ে দেবার প্রথা ব্রাহ্মণদের মধ্যে তিনি দেখেছেন এই বঙ্গের কাশিমবাজারে। সুতরাং ওই ‘বিষে বিষে বিষক্ষয়’— না, ওই প্রবাদের জন্য অন্তত আমরা জেনার সাহেবকে কোনও রয়ালটি দেব না! গ্লিন দম্পতি— ইয়ান আর জেনিফার একটি সুখপাঠ্য বই লিখেছেন যার নাম ‘গুটিবসন্তের জীবন ও মৃত্যু’ (Ian Glynn and Jenifer Glynn: The Life and Death of Smallpox), তাতে কাং শির ১৬৬৯ সালের একটা চিঠির কথা আছে। মহারাজ বলছেন, এই পদ্ধতি অবলম্বন করে তিনি রাষ্ট্রের ‘মিলিয়নস অফ মেন’-এর প্রাণ বাঁচাতে পেরেছিলেন। তার মানে দাঁড়ায় এই যে  টিকাকরণ তখনকার চিনদেশে বেশ চালু প্রথা ছিল। শুধু চিন নয়, আফ্রিকাতেও এইভাবে বিষে বিষে বিষক্ষয় প্রথা চালু ছিল গণহারে। ১৭০৬ সালে বোস্টন শহরের একজন সাদা পাদ্রী গোছের লোক কটন ম্যাথার কী বলছেন শুনুন। তিনি বলছেন— ‘লিবিয়া থেকে কিনে আনা আমার দাস ওনেসিমাস, তার কপালে দেখি বসন্তের ক্ষত অথচ বাকি শরীরে আর কোনও চিহ্ন নেই।’ যে কোনও বসন্তে এটা খুব অস্বাভাবিক ব্যাপার। জিগ্যেস করে জানা গেল এ তো তাদের দেশে চালু প্রথা এবং ম্যাথারের হেফাজতে থাকা আরও অনেক দাসের কপালেই এই ক্ষত আছে। গুটিবসন্ত তখন মহা মারক। রাজ পরিবারের লোকেদের এতে পটাপট ইন্তেকাল হচ্ছে, কিন্তু এই দাসসকল, তারা সকলেই পরবর্তী জীবনে বসন্তমুক্ত থেকে গেছে। এই যে একজনের পক্সের ক্ষত থেকে পুঁজ রক্ত নিয়ে অন্যকে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দান করা— এই পদ্ধতিকে বলা হত ভ্যারিওলেশন (Variolation)। ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে বিশপ মেরিয়াস এ রোগের নাম দিয়েছিলেন ভ্যারিওলা। ভ্যারিওলা ল্যাটিন শব্দ, যার অর্থ গুটি বা গুটির মত দাগ। গুটিবসন্তের জীবাণু ভাইরাসের বিজ্ঞানসম্মত নাম তদনুসারে— ভ্যারিওলা মেজর।

বলতে হয় লেডি মন্টাগু-র কথাও। ইনি ছিলেন তুরস্কে ব্রিটিশ অ্যাম্বাসেডার লর্ড মন্টাগুর স্ত্রী। লর্ড সাহেব ১৭১৫-তে গুটিবসন্তে ‘ডিসফিগারড’ হয়েও প্রাণে বেঁচে যান। দেখে লেডি নিজের ছয় বছর বয়সী ছেলের জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন স্বাভাবিকভাবেই এবং লক্ষ করেন যে সে দেশের ‘নেটিব’দের খুব একটা গুটিবসন্ত হয় না। খোঁজ নিয়ে এও দেখেন যে একদল তুর্কি মহিলার পেশাই হল এইভাবে টিকাকরণ— ভ্যারিওলেশন। তো এই মহিলারা একটা ‘চিনেবাদামের খোল’ আর একটা ছুঁচ নিয়ে ঘুরে বেড়ায় পাড়ায় পাড়ায়। এই বাদামখোলে থাকে ‘বেস্ট কোয়ালিটি স্মল পক্স’। কাস্টমারকে ডেকে নিয়ে জিগ্যেস করে— কোন শিরায় বিষ নেবে বলো তো সোনা? জিগ্যেস করে, কেন না সেখানে একটা ক্ষত তো হবে! শিরাটায় ছুঁচ গেঁথে একটা পিনের মাথায় যতটুকু ধরে ততটুকু ‘বিষ’ তারা ঢেলে দেয় শরীরে। একটু জ্বর, একটু ক্ষত, ব্যস— সোনা ইমিউনড। এটা বছরে একবার করে করিয়ে রাখত তুরস্কের বহু সাধারণ মানুষ। লেডি বলছেন— আমার ছেলেটাকে করাতে চাই তো বটেই, আমি চাই ইংল্যান্ডেও এই প্রথা চালু হোক, অনেক লোক প্রাণে বাঁচবে। এটা ১৭১৫ খ্রিস্টাব্দের কথা। ১৭১৯-এ ফুটফুটে একটি মেয়েও জন্মাল লেডির। তখন তারা দেশে। সে মেয়ের যখন দু বছর বয়স তখন ইংল্যান্ডে প্রথম ভ্যারিওলেশন হল। যার হল সে হচ্ছে ওই দু বছর বয়সি শিশু। ২১ এপ্রিল ১৭২১ তারিখটি রোগ প্রতিরোধের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ, কেন না ওইদিন ডাক্তার চার্লস মেইটল্যান্ড নেটিবদের থেকে পাওয়া জ্ঞান আর টেকনিক সম্বল করে তাদের দেশের প্রথম টিকাকরণটি সম্পন্ন করেছিলেন। এডওয়ার্ড জেনার জন্মাবেন এরও আটাশ বছর পরে— ১৭৪৯-এ। টিকাকরণের ইতিহাসের পরের পর্বে তিনিই হয়ে উঠবেন মুখ্য চরিত্র।

এডওয়ার্ড জেনারের কথায় আসব কিন্তু তার আগে আমরা আর একবার স্মরণ করে নিতে চাই জীবাণু জগতের মেজর সাহেবকে— গুটিবসন্তের জীবাণু ভ্যারিওলা মেজর (Variola major)। খাতায় কলমে তিনি আজ অবলুপ্ত বলেই জানে গোটা বিশ্ব, যে জন্য বসন্তের টিকা নেওয়ার চল আর নেই। কিন্তু বহুদিন ধরে, প্রায় অনাদিকাল ধরেই, গুটিবসন্ত ছিল সারা পৃথিবীতে শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়া আনুষঙ্গিক অঙ্গহানি, অন্ধত্ব— এসব তো আছেই। যুদ্ধে জয়-পরাজয়ের ফয়সালা হয় কার সৈন্যবাহিনী সংক্রমণে কত কাবু হয়েছে তার উপর। এমনকি গুটিবসন্ত আস্ত একখানা দেশের জন্ম দিয়েছিল বলা যেতে পারে। জর্জ ওয়াশিংটনের কন্টিনেটাল সেনারা যখন উত্তর আমেরিকান কলোনিগুলোকে ব্রিটিশ শাসনমুক্ত করছিল তখন তাদের যত না সৈন্য যুদ্ধে মরছিল তার চেয়ে বেশি মরছিল বসন্তে। ব্রিটিশ সেনারা অধিকাংশই চালু পদ্ধতিতে টিকা নিয়ে অথবা আগেই বসন্ত হবার ফলে ততদিনে ইমিউনড। তথাপি আমেরিকা মুক্ত হল বা দখল যাই হয়ে থাকুক না কেন হল, এবং ওয়াশিংটনের সেনারা নজর দিল কুইবেকের দিকে। সেখানে গিয়ে তারা এতটাই কাবু হয়ে পড়ল গুটিবসন্তে যে পিছু হটে নায়াগ্রা পার হয়ে ফিরে এল তাদের দেশে যেটা আজকের যুক্তরাজ্য। কানাডা যে স্বাধীন দেশ হিসেবে মানচিত্রে রয়ে গেল তার প্রধান কারণ হল গুটিবসন্ত।

এই প্রেক্ষাপটে জেনারের জন্ম হল গ্লস্টারশায়ারের বার্কলেতে ১৭ মে, ১৭৪৯ তারিখে। বাবা ছিলেন পাদ্রি, তবে পাঁচ বছর বয়সের মধ্যেই বাপ-মা দুজনকে হারিয়েই এডওয়ার্ড অনাথ। তেরো বছর বয়সে অ্যাপ্রেনটিসশিপ শুরু করলেন ব্রিস্টলে এক ডাক্তারের কাছে। ডাক্তারি তখন এভাবেই শিখত লোকে। সে সময়ে গ্রামের দুধওয়ালিদের মধ্যে কাউকে কাউকে বলতে শোনেন, তাদের সুন্দর মুখে বসন্তের ক্ষত নাকি কোনওদিন হবে না, কারণ তাদের একবার হয়ে গিয়েছে দুধ দুইতে গিয়ে। দুধ দুইতে গিয়ে যে বসন্ত হয় সেটা অনেক নরমসরম রোগ। হাতে একটু গুটি, কয়েকদিনের জ্বর-জ্বারি, কিন্তু তেমন কোনও দাগ-টাগ ছাড়াই সেরে ওঠে তারা। এখানে আমি পাঠককে স্মরণ করিয়ে দেব আর একবার যে— টিকা অর্থাৎ ভ্যারিওলেশন সেই খ্রিস্টপূর্বকাল থেকেই হয়ে আসছে অসুস্থ মানুষের বসন্তক্ষত থেকে পুঁজ রক্ত সুস্থ মানুষের রক্তে মিশিয়ে দিয়ে। জেনার ভাবলেন, মানুষের বিষ মানুষকে না দিয়ে গরুর বিষ দিয়ে মানুষকে রোগমুক্ত করার কথা ভাবে না কেন কেউ? মানুষের বিষ মানুষে প্রয়োগ করে যেমন প্রতিরোধী হবার নজির আছে তেমন ৩-৪ শতাংশ মৃত্যুরও নজির আছে। তবে তখন তাঁর মাত্র তেরো বছর বয়স। তিনি তা সত্যিই করে দেখাবেন আরও বছর ত্রিশেক পরে, কিন্তু তিনিই যে প্রথম পথিক এই পথের তা বলা যাবে না নিশ্চিন্তে। ১৭৭৪ অর্থাৎ জেনারের টিকাকরণের বাইশ বছর আগে গোশালার গরুদের থেকে বসন্তরোগে আক্রান্ত হওয়া একজন ইংরেজ কৃষক, বেঞ্জামিন জেসটি (১৭৩৭-১৮১৬) তাঁর কাউন্টি শহর ডরসেটে একটা গুটিবসন্ত মহামারির মুখে একটা চান্স নিলেন নিজের বৌ-বাচ্চাদের বাঁচানোর জন্য। তাদের চামড়ায় ক্ষত করে গরুর গুটি থেকে পুঁজ নিয়ে ঢুকিয়ে দিলেন বেঞ্জামিন, এবং কি আশ্চর্য— তারা বসন্ত মুক্ত রয়ে গেল। অনেকদিন পরে, ১৭৮৯-তে তাঁর ছেলেমেয়ের শরীরে মানুষের গুটি থেকে নিয়ে বসন্তের মারক বীজাণু পরীক্ষামূলকভাবে ঢুকিয়ে তিনি এও দেখালেন যে— হ্যাঁ, তারা ইমিউনড, বসন্তের জীবাণু তাদের কোনও ক্ষতি করতে পারেনি বা বলা যায় তাদের শরীরে গিয়ে সে বস্তু নির্বিষ হয়ে পড়েছে। এডওয়ার্ড জেনারের টিকাকরণ এরও ছয় বছর পরে, তবু ভ্যাকসিনেশনের কৃতিত্ব যে বেঞ্জামিন যে পেলেন না তার কারণ তিনি সামান্য কৃষকমাত্র, চিকিৎসক বা বৈজ্ঞানিক নন। বিজ্ঞানের জগতের অতি পরিচিত আপ্তবাক্য হল— পাবলিশ অর পেরিশ, অর্থাৎ হয় নিজের অনুসন্ধান প্রকাশ করো অনতিবিলম্বে, অথবা সরে দাঁড়াও। জেনারের পাবলিশ করার পথ অবশ্য ফুল বেছানো বলা যায় না। প্রকৃতিপ্রেমিক এই মানুষটি চিকিৎসার সঙ্গে সঙ্গে গাছপালা, পশুপাখির স্বভাব নিয়ে, ধরন নিয়ে, ব্যবহার নিয়ে নোট রাখতেন। ১৭৮৮-তে তিনি পেপার লিখলেন পশুপাখির জগতে তাঁর প্রথম মৌলিক নিরীক্ষণ নিয়ে। কী জানেন সেটা? কোকিলের ডিম। কাকের বাসায় যে কোকিল ডিম পেড়ে পালায় এটা ছাপতে দিয়ে তিনি ব্রিটেনের ন্যাচারিলিস্টদের এতটাই হাসির পাত্র হয়েছিলেন যে, তাঁর ‘কাউপক্স’ দিয়ে ‘স্মল পক্স’ ভ্যাকসিনেশনের খবর তারা বহুদিন বিশ্বাসই করতে চায়নি। ভ্যাকসিনেশন কথাটার উৎসই হল গরু। গরুর ল্যাটিন বৈজ্ঞানিক নাম হল ভ্যাকা (Vacca), সেই থেকে কাউপক্সের জীবাণু ভাইরাসের নাম হল ভ্যাকসিনিয়া (Vaccinia) আর তা দিয়ে ইমিউনাইজেশন করার প্রোগ্রামের নাম ভ্যাকসিনেশন। আগেকার ভ্যারিওলেশন পদ্ধতি আর এই জেনার প্রবর্তিত ভ্যাকসিনেশন পদ্ধতির মধ্যে তফাৎটা কোথায় এটা বোঝা গেলে আমরা এটাও বুঝতে পারব যে করোনার টিকা বানাতে আমাদের এমন জীবাণু লাগবে যা করোনার মত, কিন্তু করোনা নয়। সারা গিলবার্টরা নিয়েছেন শিম্পাঞ্জির জীবাণু।

জেনারের গল্প শেষ করা দরকার। জেনার দেখতে পান তাঁর পরিচিত এক দুধওয়ালি সারা নেল্মস (Sarah Nelms) হাতে পক্সের ক্ষত নিয়ে ঘুরছে দিব্যি, তেমন ঝামেলা নেই। জেনার আট বছরের শিশু জেমস ফিপসকে (James Phipps) চেয়ে নিলেন তার মায়ের কাছ থেকে ভলান্টিয়ার হিসাবে। ১৭ মে, ১৭৯৬। সারার ক্ষত থেকে বীজ নিয়ে জেমসের শরীরে ঢুকিয়ে দিলেন তিনি। বাচ্চাটার জ্বর এল সামান্য। আট দিনের মাথায় তার শীত করতে লাগল খুব, খেতে চাইছে না— সবার মন খারাপ হয়ে গেল। জেনার হতাশ। নবম দিন। ঘুম ভেঙে উঠে জেমস বলল— ক্ষিদে পেয়েছে, খেতে দাও। জ্বরও নেই, সুস্থ সে পুরোপুরি। জুলাই মাসে আর একবার জেমসের টিকাকরণ হল। এবার মানুষের গুটিবসন্তের বীজ দিয়ে। জেমসের শরীরে কোনও গুটি বেরোল না। বেঞ্জামিন জেসটির পদ্ধতি একেবারে হুবহু, তফাত শুধু দুজনের বিষয়টা নিয়ে এগোনোয়। জেনার তাঁর অভিজ্ঞতা লিখে পাঠালেন রয়্যাল সোসাইটিতে ১৭৯৭-তে। সেটা পত্রপাঠ প্রত্যাখ্যাত হল, কিন্তু উনি থামলেন না। নিজের উদ্যোগে তিন খণ্ডের একটা বুকলেট ছাপিয়ে বিলি করলেন লন্ডনে। হলে কী হবে, তিন মাসে একটা ভলান্টিয়ার পেলেন না লন্ডন শহরে। সেখানকার দু-একজন ডাক্তারকে কাউপক্সের জীবাণু দিয়ে ফিরে এলেন জেনার। তাঁরা একটি দুটি করে শুরু করছিলেন ঠিকই, কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম প্রহরের মধ্যেই ভ্যাকসিনেশন পৌঁছে গেল ইওরোপের সব প্রান্তে এবং অতলান্তিক পার হয়ে আমেরিকায়। কমজোরি জীবাণু ব্যবহার করে কোনও ভয়ঙ্কর জীবাণুকে ফনা নামিয়ে রাখতে বাধ্য করার এই যে পদ্ধতি তা যদি বিশ্ব স্বাস্থ্যব্যবস্থার অপরিহার্য অঙ্গ না হত তা হলে নিশ্চিতভাবে বলা যায় এ দুনিয়ার জনসংখ্যা আজকের দিনে যেখানে দাঁড়িয়ে তার তুলনায় এক চতুর্থাংশ বা তার চেয়েও কম হত। হত অবশ্য ঘরে ঘরে শিশুমৃত্যুর বিনিময়ে। র‍্যাবিস, পোলিও, মাম্পস, রুবেলা, হেপাটাইটিস, এইচআইভি কত মানবপ্রেমী ভাইরাসের কথা বলব বলুন তো! তবে হ্যাঁ, এটা বলতে ভুলে গেছি যে, বেঞ্জামিন জেসটির বৌ ডরসেটে তার স্বামীর মৃত্যুর পরে শ্বেতপাথরের স্মৃতিস্তম্ভে খোদাই করে দিয়েছিল যে বাক্য, তার অর্থ করলে দাঁড়ায়— এখানে শুয়ে আছেন সেই মানুষ যিনি বসন্ত রোগ নির্মূল করার কাজে জ্ঞানত পথিকৃৎ।

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2454 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

  1. যে ম্যাষ্টর অবৈজ্ঞানিক কে বিজ্ঞান বিষয়ক কোন ঘটনার ইতিহাস এমন গল্পের ছলে বোঝাতে পারে তাকে আমার কোটি কোটি নমস্কার।

আপনার মতামত...