খাঁচা

নাহার তৃণা

 

বারান্দা লাগোয়া যে ঘরটায় এখন তাকে পড়াচ্ছি সেখানে পড়তে বসবার বিশেষ একটা কারণ আছে। নইলে ডাইনিং টেবিলেই দিব্যি এতদিন পড়াশোনা চলছিল। সেরকম ব্যবস্থাই লুবনার আম্মু করেছিলেন। কিন্তু মেয়ের একগুঁয়ে বায়নার কাছে হার মানতে হয়েছে। ক্লাস সেভেনের ছাত্রী লুবনা সপ্তাহে পাঁচদিন পড়ে আমার কাছে। ইংলিশ মিডিয়াম পড়ুয়া এই বয়সি আর দশজনের তুলনায় ওর মধ্যে আলগা পাকামির জাঁক নেই একদম। স্বভাবটা বাচ্চাসুলভ এখনও। প্রায় যেটাকে ন্যাকাবোকা মনে হয় আমার। ওর এই বয়সটা আমিও পেরিয়েছি। ক্লাস সেভেন পর্যন্ত যাওয়া লাগেনি, তার বহু আগেই বুঝে গিয়েছিলাম জীবন গোলাপময় শয্যা নয়। একটি ছেলে আর মেয়ের মানসিক গড়ন এক হবে তার কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই যদিও। শৈশব চুরির ক্ষেত্রে অর্থ-বিত্তেরও হাত থাকে। তবুও মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে লুবনার কল্পিত পৃথিবীর বায়বীয় আস্তরণটা ছুঁড়েখুঁড়ে ওকে বাস্তব পৃথিবীর কঠিন মাটিতে নামিয়ে আনি। আকডুম বাকডুম কল্পনার কানাকড়ি মূল্য নেই জীবনের কঠিন বাস্তবতায়। মানুষের জীবন রূপকথার গল্পের এলসা কিংবা এ্যানির জীবন না, চাইলাম আর জাদুবলে ঘটিয়ে দিলাম অবিশ্বাস্য ঘটনা। কিন্তু মেয়েটা বড্ড সরল সোজা। আমার শক্ত শক্ত কথা ঠাহর করা ওর পক্ষে সম্ভব না। যখন বলি, চুপচাপ শোনে বটে, ওর পুতুল পুতুল মুখটা জুড়ে তখন কেমন একটা বিস্ময় ঝুলে থাকে। খুব মায়া হয়। কোথাও যেন পড়েছিলাম, কেউ যদি মিথ্যে কল্পনায় ডুবে থেকে আনন্দ পায় তার সে আনন্দ খুন করতে নেই। লুবনাকে ওর মতোই থাকতে দেই। মাসকাবারি মাইনে পাওয়া প্রাইভেট টিউটরের বেশি তো নই। আমি কে ওর কাল্পনিক পৃথিবীর স্বপ্নিল বুদবুদ ফাটিয়ে বাইরের পৃথিবীটা কতটা নোংরা আর নিষ্ঠুরতায় ভরা সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর! সময় হলে ও নিজেই হয়ত বুঝে নেবে। তারজন্য ওর নিস্পাপ মনে কোনও আঁচড় না পড়ে আমার শুধু ওটুকুই চাওয়া। মেয়েটার জন্য কোথাও একটা মায়া লুকিয়ে আছে মনের খাপে। সেটা আমার বোনটার কথা মনে করে কিনা জানি না। রুনুর কথা আমি কাউকে বলতে চাই না। খুব গোপনে আমি ওর স্মৃতিটুকু লালন করি।

লুবনা বেশ অবস্থাপন্ন ঘরের আদুরে মেয়ে। ওরা দু ভাইবোন। ভাইটা ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র। বাবা বিশাল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। আজ হংকং তো কাল প্যারিস ঘুরে বেড়ান। স্ত্রী আর সন্তানদের জন্য অঢেল অর্থের যোগান দেয়াটাকেই হয়ত তিনি কতর্ব্যের চূড়ান্ত ভাবেন। দু বছর ধরে লুবনাকে পড়াচ্ছি, একদিনও ওর বাবাকে সামনাসামনি দেখার সৌভাগ্য হয়নি। তার শ্যালকের সূত্রে নিযুক্ত হওয়া আমার মতো প্রায় অপরিচিত একজন তার মেয়েটাকে পড়াচ্ছে, সে কেমন চরিত্রের, আদৌ মেয়েটা আমার কাছে নিরাপদ কিনা, সেসব চিন্তা থেকেও তো যাচাই করে নেবার অজুহাতে আমাদের সাক্ষাত ঘটতে পারত। কিন্তু তেমনটা ঘটেনি আজ পর্যন্ত। এখান থেকে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চেষ্টা করি, সন্তান সম্পর্কে ভদ্রলোকের তেমন মাথাব্যথা নেই। কিংবা এমনটাও হতে পারে সামান্য একজন প্রাইভেট টিউটরের সঙ্গে পরিচয়ের কী আছে, তাই কোনও সৌজন্যবোধের ধার ধারেন না তিনি। আমার কেন জানি মনে হয় এই সংসারটা নিয়েও ভদ্রলোক খুব একটা মাথা ঘামান না। লুবনার আম্মুর বিষণ্ণ সুন্দর মুখটা আমাকে ওরকম ভাবতে বাধ্য করে। তাকে আমি কখনও সেভাবে হাসতে দেখি না। যদিও তাঁর মুখে সর্বক্ষণ একটুকরো হাসি ঝুলে থাকতে দেখা যায়, কিন্তু সে হাসি প্লাস্টিকের ফুলের মতো, সজীবতাহীন। মহিলার স্বভাবটা ভীষণ সিগ্ধ কোমল। কথাও বলেন নরম স্বরে। লুবনার আব্বুর কর্তৃত্বময় গলার বিপরীত একেবারে। লুবনার আব্বুকে স্বচক্ষে না দেখলেও তার গলা শোনার সৌভাগ্য হয়েছে। দেশে এবং বিশেষ করে বাড়িতে থাকলে তার তীব্র ঝাঁঝালো কণ্ঠস্বর শোনা যায় মাঝে মধ্যে। বাবাকে ওভাবে কথা বলতে শুনলে লুবনা কুটকুট করে হাসে। হাসি বড় সংক্রামক, প্রথম প্রথম আমিও হেসে ফেলতাম। এখন ঠোঁট চেপে ‘আহ্ হচ্ছে কি’ শাসনের ভঙ্গি করি। তাতে মেয়েটার হাসি মাত্রা ছাড়ায়। তটস্থ থাকতে হয়, মেয়ের হাসি শুনে কখন না জানি লুবনার আব্বু এসে জানতে চান ‘হোয়াটস সো ফানি?’ সেরকম হলে আমাকে ব্যাপক অস্বস্তিতে পড়তে হবে। কর্তৃত্বপরায়ণ মানুষ আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে। মাকে এড়িয়ে চলার পেছনে এটাও একটা কারণ। লুবনার আব্বুর কথার ভঙ্গি বলে দেয় মানুষটা সবাইকে হুকুম করতে পছন্দ করেন।

লুবনার এক দূরসম্পর্কের মামা রবিন আমার ক্লাসমেট হওয়ার সুবাদে এই টিউশনিটার হদিশ পাওয়া। আড্ডায় বসে কথায় কথায় রবিনকে একদিন বলেছিলাম নতুন টিউশনির খোঁজ থাকলে জানাতে। পুরনোটা পোষাচ্ছে না। ছাত্রী পড়াশোনায় লবডঙ্কা। সে তার সমস্ত মনোযোগ আর সময় সাজসজ্জা, নতুন নতুন ফ্যাশন আর হলিউড বলিউডের কেচ্ছাকাহিনিতে বিনিয়োগে অধিক উৎসাহী। তাছাড়া মেয়েটা ভারী ইঁচড়ে পাকা। পড়তে বসে এমন এমন প্রসঙ্গ তুলে বসত যে কান মাথা গরম হয়ে উঠত আমার। একটা রাম চটকোনা দিয়ে ওর পাকামি ভুলিয়ে দেবার অসম্ভব একটা ইচ্ছায় হাত নিশপিশ করত। পাঁচ মাসের ভোগান্তির ইতি টেনে ছাত্রীর বাবাকে পরীক্ষার পড়া তৈরির অজুহাত দেখিয়ে ওখান থেকে সরে এসেছি। এর আগেরজন পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল। হুট করে বিদেশ চলে গেল তারা। ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্রছাত্রী পড়ালে বেশি বেতন পাওয়া যায়। সঙ্গে বোনাস হিসেবে চায়ের সঙ্গে দারুণ দারুণ খানাখাদ্য। ছুটির দিন বাদে বাড়িতে আমি একবেলা খাই। হোস্টেল ডাইনিংয়ের সকাল- দুপুরের অখাদ্যের পর স্টুডেন্টের বাড়ির বিকেলের নিত্যনতুন মুখরোচক চা-নাস্তাটা সত্যিই উপভোগ্য। তবে খেতে দিলেই হামলে পড়ব সেরকম হ্যাংলা স্বভাবও আমার না। আগের স্টুডেন্টকে পড়াতে গিয়ে ভদ্রতা করে শুধু চায়ের কাপটাই তুলে নিতাম। লোভনীয় দামী খাবারগুলো ভুলেও ছুঁতাম না। হেলাফেলায় পাঠানো খাবার গলা দিয়ে নামে না। আমি বড় স্নেহের কাঙ্গাল। কেউ এসে যদি বলত একবার, খেয়ে নাও ভাই কিংবা বাবা। আমি ঠিক সোনামুখ করে খেয়ে নিতাম। কিন্তু সামান্য প্রাইভেট টিউটরকে সবাই ঠিক মানুষ হিসেবে গণ্য করেন না। এই অবহেলাটা আমাকে বেশ ভোগায়।

পেটে ক্ষিদে চেপে রাখতে রাখতে ভালোই আলসার বাঁধিয়েছি। সহপাঠী ইসহাক এসব বিষয়ে একেবারে লাজলজ্জাহীন। তার কথা হলো “বস, যত পারবে সাঁটিয়ে নিবে। পেটে ক্ষিদে রেখে লজ্জা পায় নির্বোধেরা। দুনিয়া নির্বোধদের পুছে না। তবে শুধু ভালো ভালো খাওয়াই আমার টার্গেট না বৎস, তক্কে তক্কে আছি সেরকম শাঁসালো একটা ছাত্রী পেলে বড়শিতে গেঁথে ফেলব। তারপর রাজত্ব আর রাজকন্যা দুটোই আপসে আপ আমার হাতে।” ইসহাকের এমন কথাবার্তা শুনলে আমার মাথায় খুন চেপে যায়। বেখেয়ালে কারও পা মাড়িয়ে দেবার যন্ত্রণার মতো ইসহাকের কথাগুলো তীরের ফলা হয়ে বুকের ক্ষতটায় আঘাত করে। টুকরো স্মৃতির কোলাজ আটকে ফেলে আমাকে। বড় দুলাভাই, তার বন্ধু রফিক, রুনুকে পড়ানোর ছুতো… উফ! বাতাসের অভাবে ভেতরটা কেমন ছটফটিয়ে ওঠে। ইসহাককে এরপর থেকে আর সহ্য হত না। আগে যাদের পড়িয়েছি তারা বেশিরভাগই কলেজপড়ুয়া ছেলেমেয়ে। তাদের পড়িয়ে আনন্দ পাওয়া গেলেও তেমন পয়সা পাওয়া যেত না। পয়সার জন্যই তো বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়ানো। ভালো বেতনের জন্য ইংলিশ মিডিয়াম পড়ুয়াদের পড়াচ্ছি সত্যি কথা, তাই বলে নিজের নীতিবোধ জলাঞ্জলি দেবার মতো অতটা হীন নই।

লুবনারা বিত্তবান হলেও ওদের ব্যবহারে উন্নাসিকতা নেই বরং যথেষ্ট আন্তরিকতার ছোঁয়া পাওয়া যায়। ওর আব্বু বাদে এই পরিবারের তিনজন সদস্যই মানুষ হিসেবে আমাকে সম্মান দেখাতে কুণ্ঠা দেখাননি কখনও। ভাইটার সঙ্গে কম দেখা হয় যদিও। এই বয়সে যা হয়, নানামুখী ব্যস্ততায় সারাদিনই সে বাইরে থাকে। তবে যখন দেখা হয় অনেক কথা বলে। বোনের পড়াশোনার খোঁজখবর নেয়। নিজের বর্তমান ব্যস্ততা নিয়েও বলে। আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চায়। আমি উত্তরে শুধু হাসি। আমার হাসি ওকে মজা দেয় হয়ত। ওর ধারণা আমি কাজে বিশ্বাসী, কথায় না। ধারণাটা খুব একটা ভুল না অবশ্য। ছেলেটার সঙ্গে কথা বলতে আমার ভালো লাগে। ওর সুন্দর ঝকঝকে চোখজোড়ায় অসম্ভব মায়া। লুবনার চোখও অসম্ভব সুন্দর। দুজনই আম্মুর মতো হয়েছে দেখতে। লুবনার আব্বুর ছবি দেখেছি। লোকটার চোখেমুখে একধরনের নিষ্ঠুরতার জাল বিছানো। লুবনার আম্মু দেখতে ঠিক বার্বিডলের মতো। মেয়েটা মায়ের ছাঁচেই গড়া। সুন্দর মানুষ অহঙ্কারী হয়, কথাটা সর্বতোভাবে ঠিক নয়। গৃহকর্মীর হাতে চা নাস্তা নিয়ে নিজেও পিছু পিছু আসেন প্রায় প্রতিদিন। তাঁর আন্তরিক আপ্যায়ন ঠেলে দেয়া সম্ভব হয়নি কখনও। আক্ষরিক অর্থেই তাঁর এই উপস্থিতিটার জন্য আমি রোজ অপেক্ষায় থাকি।

মেরেকেটে আর তিন মাস। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পাট চুকেবুকে যাবে। একসময় স্বপ্ন দেখতাম অ্যাকাডেমিক লাইনে থাকব। রেজাল্টও বরাবর ভালোই হয়েছে। কিন্তু এক দৈবপাকে সব কেমন ছত্রখান হয়ে গেল। মানুষকে যদি তার ভবিষ্যৎ দেখবার সুযোগ দেয়া হত, তাহলে স্বপ্ন নামের সোনার হরিণের পেছনে অযথাই সময় অপচয় করা ঠিক হবে কি হবে না সে বিষয়ে আগেভাগে একটা সিদ্ধান্ত নেয়া যেত। হতাশা আর বিশ্বাসভঙ্গের আক্ষেপ থেকে এসব ভাবনার উদয় হলেও তাকে তাড়িয়ে দেবার জোর পাই না ভেতর থেকে। স্বার্থপর হতে পারলে চোখ উল্টে ঠিকই নিজের স্বপ্নপূরণের পথে হাঁটতাম হয়ত। রুনুর কথা ভেবে স্বপ্নটা হাত গলে পড়ে যেতে দিয়েছি। রুনুটাও শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখত।

মাস্টার্স শেষ হতে আর মাস তিনেক বাকি। কিন্তু ইতিমধ্যেই বাড়িতে চাকরি জোগাড়ের সুলুকসন্ধান নিয়ে মায়ের উৎপাত শুরু হয়ে গেছে। কার কাছে গেলে চাকরির ব্যাপারে সহযোগিতা পাওয়া যাবে রাতের খাবার টেবিলে প্রায় সেসব নিয়ে মা একতরফা আলাপ চালিয়ে যাচ্ছেন। মায়ের কোন ভাইয়ের ছেলের শ্বশুর কিংবা খালাতো বোনের মেয়েজামাই বিশাল চাকুরে, তারা সবাই পরীক্ষা দেয়া মাত্রই আমাকে চাকরির জোগান দিতে হন্যে হয়ে বসে আছেন, ইত্যাদি শুনতে শুনতে আমি ত্যক্তবিরক্ত। বড় দুলাভাইয়ের নিজের বিশাল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান কিংবা তার হোমড়া-চোমড়া ইয়ারদোস্তদের কথা মা ভুলেও উচ্চারণ করেন না। বিপদের সম্ভাবনা আঁচ করেই মা ওই প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান। আহা মা! আসল বিপদটা কেন আঁচ করতে ব্যর্থ হলে! নিজের সন্তানের ভালোমন্দটা কেন সময় থাকতে বুঝতে পারলে না? বুকের ভেতর পুষে রাখা তীব্র অভিমানটা উস্কে ওঠার ভয়ে আমি তাড়াহুড়ো করে খাওয়া শেষ করি। আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা যে সাধারণ চাকরিবাকরি করা না সেটা বলতে ইচ্ছে করে না মাকে। আমার সঙ্গে বাবাও চুপচাপ খাওয়ার টেবিলে উপস্থিত থাকেন।

বাবা সংসারের কোনও বিষয়ে নিজের মতামত সরবে জানান দেননি কখনও। কারণ দিয়েও যে লাভ হবে না সেটা হয়ত বুঝেছিলেন। রুনুর ঘটনার পর কথাবার্তাও বলেন না তেমন। ইশারা ইঙ্গিতে যতটা সম্ভব অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন। বাবার আচরণে মা মহাখাপ্পা হলেও আমার সমর্থন আছে। বাবার এই কথা বলতে না চাওয়াটা হয়ত মায়ের ভুলভাল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাঁর নীরব প্রতিবাদ। কারণ আমি এবং বাবা এখনও বিশ্বাস করি রুনুর ঘটনাটার সঙ্গে দুলাভাইয়ের হাত ছিল। আমার হম্বিতম্বিসর্বস্ব আর নিরেট মাথার মা বড় আপা আর দুলাভাইয়ের বানোয়াট কথায় বিশ্বাস করলেও আমাদের কথায় কখনও পাত্তা দেবার প্রয়োজন দেখাননি। দেখালে রুনুকে হারাতে হত না।

বাবা বরাবরই শান্ত সুবোধ মানুষ। কীভাবে যে ইন্সুরেন্সের চাকরিটা এত বছর করছেন সেটা আমার কাছে বিরাট রহস্য। তাঁর চাকরিটা সোজা বাংলায় দালালি ছাড়া আর কি! সে কাজে হাত কচলে লোককে ইন্সুরেন্স গছাতে নানা কায়দাকলার সঙ্গে সঙ্গে চাপার জোরটাও তো দেখাতে হয়। বাবা সে কাজে দক্ষ, এটা ভাবতেই হাসি পায় আমার। অবশ্য কাজ দেখাতে না পারলে এতদিন বেতন দিয়ে অফিসই বা খামোখা তাঁকে রাখবে কেন! স্বীকার করে নিতে হয় বাবা লোক পটাতে ওস্তাদ। যিনি সংসার জীবনে তার সেই ভেলকিবাজিটা সযত্নে লুকিয়ে রাখেন।

আমরা তিন ভাইবোন। কলেজ পেরোবার আগেই বড় আপার বিয়ে হয়ে যায়। ব্যাপক সুন্দরী বড় আপাকে পাত্রপক্ষ কোনও এক বিয়ে বাড়িতে দেখেই পছন্দ করে বসে। প্রস্তাবটা পাওয়ার পর মায়ের যেন তর সইলো না। পাত্রের কোনও খোঁজখবর ছাড়াই বড় আপার বিয়ে নিয়ে মা কোমর বেঁধে নেমে পড়লেন। বাবার ইচ্ছা ছিল বড় আপা পড়াশোনাটা আগে শেষ করুক। নিজের খামতি আমাদের দিয়ে পূরণের একটা গোপন স্বপ্ন ছিল বাবার। যেটা পূরণে তাঁর চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। কিন্তু ওরকম বড়লোক বাড়ির প্রস্তাব পেয়ে মা-বড় আপা দুজনেরই বেহুঁশ অবস্থা। আমি তখন এসএসসির প্রস্তুতি নেয়ায় ব্যস্ত। খুব ভালো রেজাল্টের চিন্তা ছাড়া আমার তখন অন্য কোনও কিছু নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় ছিল না। বড় আপার মরিয়া হাবভাবে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, ওকে বুঝিয়েও লাভ হবে না। হলুদের দিন বরপক্ষের তুচ্ছতাচ্ছিল্য ব্যবহারে বুঝে নিয়েছিলাম ওদের সঙ্গে আমরা কখনও খাপ খাওয়াতে পারব না। রূপের জোরেই বড় আপা বড়লোক বাড়ির বউ হল, কিন্তু ঘর পেল কিনা সেটা নিয়ে আজও আমার ঘোরতর সন্দেহ আছে। জেদ করে বিয়ে করেছিল বলে নিজের অপূর্ণতা নিয়ে বড় আপা আমাদের কিচ্ছু বলতেও আসে না। ওর হয়ত ধারণা ওতে হেরে যাওয়ার গ্লানি থাকে। জয় পরাজয়ের নিক্তির নীচে বড় আপা তার কান্না লুকানোর খেলায় আজও ব্যতিব্যস্ত থাকে।

বড় দুলাভাইকে প্রথম থেকেই আমার পছন্দ হয়নি। লোকটার মধ্যে পছন্দ করার মতো কিস্যু পাইনি। অন্যকে ছোট করার মধ্যে তিনি একধরনের অসুস্থ আনন্দ খুঁজে পান। এটা বুঝে যাবার পর থেকেই আমি লোকটাকে এড়িয়ে চলি। তাছাড়া তার দেখনদারিটাও অসহ্য। টাকাপয়সা কিংবা দামী দামী গিফ্ট দিয়েও বেচারা আমাকে এবং বেশ অনেকটা সময় রুনুকেও দলে টানতে পারেননি। আমরা মনে হয় বাবার স্বভাব পেয়েছি। মায়ের স্বভাবটা পেলে বড় আপার মতো ঠিক ভেসে যেতাম। শেষ পর্যন্ত রুনু যে দুলাভাইয়ের ফাঁদে বোকার মতো পা দেবে ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি।

আমরা তিন ভাইবোন দেখতে শুনতে বেশ ভালো। মা বাবা দুজনের ভালো জিন দিয়ে গড়া আমরা তিনজন। দশজনের ভিড়ে আমাদের চট করে আলাদা করা যায়। অতি সাধারণ কাপড়েও আমরা আকর্ষণীয়ভাবে ফুটে থাকি। রুনুটা তিন ভাইবোনের মধ্যে সবচে সুন্দরী। ঠিক যেন বার্বি ডল একটা!

লুবনার আম্মুকে যেদিন প্রথম দেখি বুকের ভেতরটা কেমন ছ্যাৎ করে উঠেছিল রুনুর কথা মনে করে। বিয়ের বছর না ঘুরতেই নানা অজুহাতে দুলাভাই ঘনঘন আমাদের বাড়ি আসা শুরু করেন। সঙ্গে থাকত রফিক নামের এক বন্ধু। পড়াশোনায় নাকি রফিকভাই ভীষণ তুখোড়। দুলাভাইয়ের ইচ্ছা এসএসসির প্রস্তুতিতে রুনু রফিক ভাইয়ের সাহায্য নিক। এভাবে যেচে আসা, তার উপর বিনাপয়সার এমন মহার্ঘ গাইড পেয়ে মা তো যথারীতি ভেসে গেলেন। রফিক লোকটাকে আমার কখনও সেরকম তুখোড় মনে হয়নি। অন্তত পড়াশোনার বিষয়ে। তবে লোকটা যে মহা ধড়িবাজ সেটা তার বলন-চলনেই টের পাওয়া যেত।

অল্প দিনে ধড়িবাজটা বুঝে গিয়েছিল রুনুর দুর্বলতা। রুনু পড়তে ভীষণ পছন্দ করত। ক্লাসের বইয়ের পাশাপাশি আউট বই পড়ার পোকা ছিল সে। বই কিনে পড়বার মতো অত সামর্থ আমাদের ছিল না। আমি প্রায় তাকে লাইব্রেরি থেকে পছন্দের বই এনে দিতাম। সে নিজেও সাধ্যমতো জোগাড় করত। রফিক লোকটা পড়া দেখানোর ছুতোয় আসতে শুরু করল। তবে খালি হাতে আসত না। দামী দামী বই উপহার দেয়া শুরু করে। রুনুটা কেমন নেশায় পড়ে গেল। এক সময় নিজস্ব একটা লাইব্রেরি করবে তাতে দুর্লভ সব বই থাকবে এমন বলা শুরু করল। আমি তখনও বুঝিনি আসল ঘটনা। এসএসসি-র মতো এইচএসসি-তে ভালো রেজাল্টের জন্য আমি তখন নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত। তবুও এক ফাঁকে রুনুকে সাবধান করতে ভুলিনি, “বেশি মাতিস না মনা। লোকটাকে আমার সুবিধার মনে হয় না।” শুনে রুনু খালি হাসত। রুনুর বুদ্ধির উপর আমার ভরসা ছিল।

বন্ধুদের রিডিং সার্কেলের পড়াশোনা শেষে একদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে শুনি রুনু দুলাভাই আর রফিক ভাইয়ের সঙ্গে দুপুরে খেয়েদেয়ে বাইরে বেরিয়েছে। এমন নাকি প্রায় যায়। শাহবাগ, বেলিরোড ইত্যাদি জায়গা থেকে গাদাগুচ্ছের বই কিনে আনে। মায়ের গদগদ হয়ে দেয়া তথ্যটা শুনে রাগে দুঃখে চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছিল। রুনু আমাকে এই ব্যাপারটা লুকাল কেন! সামনেই ওর এসএসসি পরীক্ষা, এখন এত আউট বইয়ের বা কী দরকার! তাও আবার ওই লোকটার সঙ্গে গেছে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও বড় আপাকে ফোন করলাম। ফোনটা রিং হয়ে হয়ে কেটে গেল। একটু পরে বড় আপাই ফোন দিল। হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে দুলাভাইয়ের গলা শুনে কেমন থমকে গেলাম। সেকি তার তো রুনুর সঙ্গে থাকবার কথা! বড় আপা বাথরুমে তাই ফোনটা ধরতে পারেনি, কি খবর মিস্টার সিরিয়াস? দুলাভাই আমাকে ওই নামে সম্বোধন করেন। আমি রসিকতায় পাত্তা না দিয়ে সরাসরি জানতে চাইলাম রুনু কি আপনাদের বাসায়? আকাশ থেকে পড়লেন তিনি। “সেকি! রুনু ওর বান্ধবী দোলার বাড়ি থেকে বাড়ি ফিরেনি এখনও? দেখো আড্ডা জমিয়েছে হয়ত। ফিরবে চিন্তার কিচ্ছু নেই। তোমার সবেতেই এত সিরিয়াসনেস কেন ভায়া!” আমার মুখের ভেতরে তেতো একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল। পেটের ভেতর গুড়গুড় শুরু হল। বেশি টেনশনে এমনটা হয় আমার। দোলার বাড়ি চিনি কিন্তু ওর টেলিফোন নাম্বার জানা নেই। মাকে জিজ্ঞেস করেও কাজ হল না। ঘড়ির কাঁটা সাতটা পেরিয়ে আটটায় পৌঁছালে বাবা আর আমি দোলাদের বাড়িতে গিয়ে জানলাম রুনু আজ কেন, গত দু সপ্তাহ দোলাদের বাড়িমুখো হয়নি। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল আমাদের। বাড়ি ফিরে আবার বড় আপাকে ফোন দিলাম, ঘড়িতে তখন সাড়ে দশটা। রুনু দুলাভাইয়ের সঙ্গে আছে এটা জেনে মা এতক্ষণ নিশ্চিত ছিলেন। দোলাদের বাড়ি থেকে ফিরে তাঁকে সবটা খুলে বলায় মায়ের টনক নড়ল। সে রাতে রুনু আর বাড়ি ফেরেনি। শুধু সে রাতেই না রুনু আর কখনও আমাদের কাছে ফিরে আসেনি। আজ প্রায় সাত বছর ওর কোনও খোঁজ নেই। দুলাভাইয়ের এক কথা, “নিশ্চয়ই রুনু পরিচিত কারও সঙ্গে পালিয়েছে।”

দিনকে রাত করার উপমা পড়েছিলাম, দুলাভাই সেটা হাতেহাতে দেখিয়ে দিলেন। আমরা অথর্বের মতো কিছুই করতে পারলাম না। থানাপুলিশ করেও কোনও লাভ হল না। দুলাভাই তার অর্থ আর ক্ষমতা প্রয়োগ করে প্রমাণ করে দিলেন তার বন্ধু রফিক সেদিন আমাদের বাড়িতে এসেছিল ঠিকই, তারা এক সঙ্গে বেরিয়েও ছিলেন। কিন্তু পথেই রফিক নেমে গিয়েছিল। রুনু শাহবাগ থেকে কিছু বইপত্তর কেনার পর দোলার বাড়ি যাবে বললে, রুনুর অনুরোধেই তাকে কাছাকাছি বাসস্টপে নামিয়ে তিনি বাড়ি ফিরে যান। যদিও বড় আপা বন্ধু রফিকসহ দুলাভাইয়ের আমাদের বাড়িতে নিয়মিত আসার সবটা জানত না। সে অবশ্য নিজের সংসার বাঁচানোর স্বার্থপর চিন্তায় স্বামীর হ্যাঁ-তে তাল মিলিয়ে গেল সমানে। মা, আপা দুলাভাইয়ের কথায় আস্থা রাখলেও আমি আর বাবা কিছুতেই সেটা বিশ্বাস করিনি। আজও করি না। বড় আপার সঙ্গে আমার আর বাবার সম্পর্কটা আলগা হয়ে গেছে। বড় আপা দুলাভাই মাঝে মাঝে এ বাড়িতে আসে। আমরা তখন হয় বাইরে বেরিয়ে যাই কিংবা যার যার ঘরের দরজা আটকে বসে থাকি। মানুষ কতটা র্নিলজ্জ আর নির্মম হতে পারে বড় আপা দুলাভাই তার জলন্ত উদাহরণ। মাও কি সে দলের নন?

বছর পাঁচেক পর খবরের কাগজে রফিকের ছবিসহ তার কাণ্ডকীর্তির একটা খবর দৃষ্টিগোচর হওয়ার পর আমার বদ্ধমূল ধারণা হয় রুনুকেও রফিক দুবাই কিংবা ওরকম কোথাও বিক্রির জন্য পাচার করেছে। কিন্তু রফিক ফেরার থাকায় আর তথ্য প্রমাণের অভাবে আমাদের পক্ষে কিছুই করা সম্ভব হয় না। বইপাগল বুদ্ধিমতী বোনটা আমার চোখের পলকে কেমন নাই হয়ে গেল।

এত ঝড়ঝাপটার পরও ইন্টারমিডিয়েটে ভালোই রেজাল্ট করি। ততদিনে জীবনের স্বপ্নও দিক পরিবর্তন করে ফেলেছে। এখন বিসিএস দিয়ে ফরেন সার্ভিসে যোগ দেবার স্বপ্ন দেখছি। সে কারণেই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে পড়া। কে বলতে পারে হয়ত একদিন রুনুর খোঁজ পাওয়ার জন্য ক্ষমতা আর লোকবলের কমতি হবে না আমার।

টিউশনি করে বেতন ভালোই পাই। প্রতি মাসের বেতনের অর্ধেক টাকায় বই কিনি। দেশবিদেশের দুর্লভ বই কেনাটা এখন আমার নেশা। ইতিমধ্যে একটা সেল্ফ ভরে গেছে প্রায়। রুনুর ঘরটা লাইব্রেরি করেছি।

এ ঘরের সব কটা সেল্ফ জুড়ে খালি বই থাকবে। রুনুটা যদি হঠাৎ একদিন ফিরে আসে, ঘরভর্তি বই দেখে কেমন খুশি হবে সেটা কল্পনায় ভাবতে আমার খুব ভালো লাগে। বলা যায় এই ভাবনাটাই আমাকে শক্তি যোগায়। বারবার ভেঙে পড়তে পড়তেও আমাকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করে আমার হারিয়ে যাওয়া বইপাগল বোন রুনু!

পড়তে বসে আজকাল বড্ড ছটফট করে লুবনা। আজকে যেন একটু বেশিই। বারান্দা লাগোয়া ঘরটায় পড়তে বসবার কারণটা এতদিনে পরিষ্কার হয়ে গেছে আমার কাছে। কিছুদিন ধরে লুবনা পাখি পুষছে। বারান্দার এক কোণে একটা খাঁচায় দুটি মুনিয়া পাখি রাখা আছে। পড়া ফেলে বার বার উঠে গিয়ে তাদের দেখার আহ্লাদি বায়না ধরে মেয়েটা। আমি মুখ শক্ত করে বাধা দেই। মুনিয়া দুটোকে দেখলে আমার মন ভীষণ খারাপ হয়ে যায়। খালি মনে হয় দুটো মুখোশধারী নোংরা মানুষের কারসাজিতে আমার বোন রুনু আজ পৃথিবীর কোথায় কোন খাঁচায় না জানি আটকে আছে। অন্যদিন শুধু বিরক্তি দেখাই। আজ আর কিছুতেই নিজেকে ধরে রাখা সম্ভব হল না। দুম করে বলে বসলাম, “আচ্ছা লুবনা, তোমাকে ধরে নিয়ে গিয়ে যদি কেউ খাঁচায় আটকে রাখে তোমার কেমন লাগবে?” লুবনা একটু অবাক হয়ে বলল, “আমি কি পাখি নাকি টিচার, যে আমাকে খাঁচায় আটকে রাখবে কেউ? তাছাড়া মুনিয়া দুটোকে আমি কত্ত আদর করি। কত্ত কিছু খেতে দেই!”

এই অবুঝ বালিকাকে কীভাবে বোঝানো সম্ভব “পৃথিবীটাই একটা বিশাল খাঁচা বিশেষ। তারই খোপে খোপে আমরা নিজেরাও আরো অনেক খাঁচা তৈরি করি। ছল ছুতো করে অন্যকে বন্দি করি, করতে চাই। খাঁচাটা সোনার হলেও সেটা কখনও মুক্ত জীবনের আনন্দ দেয় না মেয়ে।”

খেয়াল করিনি কখন ট্রে হাতে গৃহকর্মীর পেছন পেছন লুবনার আম্মু এসে দাঁড়িয়েছেন। কেমন কান্নাভেজা একটা গলায় তিনি বলে উঠলেন, “কী চমৎকার বললে ভাই। খাঁচা সোনার হলেও স্বাধীন জীবনের আনন্দ তাতে থাকে না! আমরা সবাই আসলে একেকটা স্বার্থবাদী খাঁচায় বন্দি!”

আমি একটু চমকে ঘুরে তাকালাম তার দিকে। জল টলটলে চোখ জোড়ায় খুব প্রিয় কারও ছায়া দেখতে পেলাম!

 

 

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2454 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. খুবই ভাল লাগল। কাপড় বোনার মতো করে শব্দ দিয়ে ধীরে ধীরে– । শুধু লুবনার আম্মুর মুখ দিয়ে চারটে বাক্যে গল্পের মূল কথাটা ওভাবে বিরাট করে না বলে ছোট একটা দুটো কথায় ছেড়ে দিলে ভাল হত। কষ্টটা পাঠকের বুকেই রিনরিন করত। আবার বলছি, অবশ্যই ভাল গল্প।

আপনার মতামত...