অন্তেবাসী — ১৩তম পর্ব

পীযূষ ভট্টাচার্য

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

যেখান থেকে শুরু করা যাক বেলুদি যেন অর্ধসমাপ্ত পৃথিবীর একটা অংশ। আর আমরা গভীর বিষণ্ণতার মধ্যে আবিষ্কার করেছিলাম যে, পৃথিবী এখনও সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যেই আছে। নতুন লেপতোষকের ওয়াড় কাচবার পর ডেটলজলে চুবিয়ে রাখা হয়েছিল বীজাণুমুক্ত করার জন্য— সেই গন্ধই যেন ক্রমশ বিস্তাররত বেলুদির কথা বলা থেমে যাওয়ার পর। যদিও স্টোভ দুটি সাঁইসাঁই শব্দ তুলে জ্বলছে— তা সত্ত্বেও ডেটলের গন্ধের কোনও ক্ষতিবৃদ্ধি না হয়ে দিব্বি স্যানিটোরিয়াম টাইপের পরিবেশ বজায় রাখছে। সবকিছুই যেন সামঞ্জস্যপূর্ণ! বেলুদির মধ্যে যে শয়তানের বাস সে কি চায় গভীরভাবে সকলকে আক্রান্ত করতে? সেদিন অবশ্য এসব বুঝে ওঠার বয়স হয়নি, কিন্তু এখন এ প্রশ্ন ফিসফিসিয়ে ওঠে সবসময়। কাকে তুমি বিশ্বাস করবে— ঈশ্বর না শয়তানকে? উত্তরহীন এই প্রশ্নে নিজেই দোদুল্যমান— কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে না পেরে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠি।

কেননা এ লেখার পরিণতি আমার জানা নেই। আতঙ্কের ভিতর ভালোবাসার একটা যুক্তি আছে বলেই এতদিন পর এসব নিয়ে লিখতে বসেছি। এঁরা জীবিত বা মৃত যে অবস্থাতেই থাকুন না, কোনওদিনই উপন্যাসের স্ব-কথন হয়ে উঠবার সম্ভাবনা না-থাকা সত্ত্বেও উত্তরাধিকার হিসেবে থেকে যাক। আমার নিজের ব্যক্তিগত মালিকানার অংশীদার তো এঁরাই।

আমার বোন যে ঘরে থাকি সে ঘরে ঘুমিয়ে। সাধারণত একবার ঘুমিয়ে পড়লে খিদে না পাওয়া পর্যন্ত ঘুমিয়েই থাকে, বিশেষ করে এই সময়টিতে। সেখান থেকে কান্না উঠে আসতেই বেলুদি বলে উঠল “যা তো বাচ্চু।” স্টোভের সাঁই সাঁই শব্দে মার কান অব্দি পৌঁছায়নি কান্নার শব্দ। কিন্তু এতসব হৈ-হট্টগোলের মধ্যে বেলুদি যে ঠিক কী করে শুনতে পেল, এটাই ছিল আশ্চর্যের বিষয়।

ঘরে ঢুকে দেখি ঘর অন্ধকার। যদিও ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে কান্না থেমে গেছে। কী করে যে শিশুও বুঝে যায় তার পরিচিতের পদধ্বনি। নাকি পরিচিতের পদচারণার মধ্যে যে ছন্দ ওঠে সেটিই তার কাছে মুখ্য? আসলে শিশুর শরীরে মাতৃদুগ্ধের টক গন্ধ থাকে, সেই গন্ধের প্রতি অন্ধকারের মধ্যেই এগিয়ে গেলাম। যদিও সব অন্ধকারের ধর্ম বোধহয় একপ্রকার নয়। এই অন্ধকার ততটা হিংস্র নয় কেননা বোনকে স্পর্শ করতেই আবার ঘুমিয়ে পড়ে।

ঘরের যে বাতিটি সবসময় জ্বলে তার উদ্দেশ্য হল বোন যাতে রাত্রে জেগে উঠলে আশ্বস্ত হয়, ‘আলো’ আছে। জানি না এইসব স্থির আলোকবিন্দু তার মস্তিষ্কে কী বার্তা পাঠায়। তবে লক্ষ করে দেখেছি কিছুক্ষণের জন্য হলেও সেই আলোর দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। আসলে এ ঘরের বাতিটা বাবলুই নিয়ে গেছে সিড়ি বেয়ে নামবার জন্য। ও গেছে নীচের দোকানে যা স্টেশন-চত্বর লাগোয়া— ওখানে কিশমিশ, কাজুবাদাম পাওয়া যায়। ঘরে যা ছিল তা বাবলুই সাবাড় করেছে, তা আমার জানা, কেননা মন ভালো থাকলে কোনও কোনও দিন আমাকে ভাগ দিত। মেজমামি চিৎকার করার আগেই এক দৌড়ে বেরিয়ে যায় ‘আনছি’ বলে। এবং তা বলেছিল এ ঘরে পৌঁছেই। আর বোনের ঘুম ভেঙে যায় এর ফলেই। আমি বোনকে স্পর্শ করে বসেই থাকলাম যতক্ষণ পর্যন্ত বাবলু না ফিরে আসে ততক্ষণ। তারপরেই যেন অন্ধকারের মধ্যে বসে থাকা থেকে মুক্তি!

অবশ্য সবসময়ই আলোর জন্য কাঙাল থাকতেই হবে তা নিজের মধ্যে সেদিনও ছিল না— আর আজও নেই। তবে৷ আলোকে অস্বীকার করার জন্য অন্ধকারের এই স্থাপত্যকে প্রশ্রয় দিচ্ছি তা কিন্তু নয়৷ মনে হয় এও এক ধরনের অপেক্ষা।

নৃত্যরত আলোকবিন্দুই যেন অন্ধকার পাহাড়ের বুকে একমাত্র নক্ষত্র। এখান থেকে আকাশ দেখা যায় না। পাহাড়েই দৃষ্টি আটকে যায়। যখন চতুর্দিকে অন্ধকার পাহাড় ও আকাশ একাকার তখন এই আলোকবিন্দু ভাসতে ভাসতে ঘরের মধ্যে স্থির হয়ে গেল।

চমকে উঠে দেখলাম কোনও আলোছায়ার খেলা নেই, ঘর আলোময়৷

আসলে বাবলুর কিশমিশ আর কাজুবাদামে মুখ ভর্তি। সেজন্য কথা না বলে এক দৌড়ে ভেতরে ঢুকে ফিরে এসে পকেট থেকে বের করে আমাকে একটু দিল। “তুই কিছু বলিসনি তো? বললে অবশ্য বলে দিতাম আমি একা খেয়েছি নাকি, তোকেও ভাগ দিয়েছি—”

বাবলুর সঙ্গে রান্নাঘর থেকে ঘিয়ে ভাজা সুজির আঘ্রাণ এ ঘরে চলে এল। দিদি ফুলমাসির কাছে সুজির পায়েস খেতে চেয়েছে। কিশমিশ আর কাজুবাদাম যে নেই, বাবলুর চেয়ে বেশি কেউ জানে না। সম্পূর্ণটা মুখে পুরে বলি, “তুই তো ধরা পড়ে গেলি!”

এতক্ষণে বাবলু বুঝতে পেরে হেসে উঠে আমাকে আর কটা দিল। কিন্তু ফুলমাসি আর বেলুদি যে মুচকি হেসেছিল তা জানাতে ভুলল না।

বাড়ি সুগন্ধে ভরপুর হয়ে উঠতেই বাবলু আবার বাড়ির ভেতরে চলে গেল। আসলে বেলুদি স্যানিটোরিয়ামে থাকবার সময়কালে খাওয়াদাওয়া তেমন জুতসই ছিল না। বেলুদির রক্তবমি সকলকে অসহায় করে রেখেছিল। সেই রক্তদাগ নিজেকেও আক্রান্ত করেছিল। সেইসময় এই রক্তই আমাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে— সেজন্য খুব একা একা লাগত। যাদের সঙ্গে সেই বয়স অব্দি পৌঁছে গিয়েছি, তাদের কাউকে খুঁজে পেলে ভালো হত। নির্গত রক্তের সম্পর্কে কিছু একটা বলা যেত। মাকে যে বলব তারও উপায় নেই। ঠোঁটে তর্জনী তুলে বুঝিয়ে দেবে— চুপ! চুপ থাকতেই হবে কেননা আমরা আশ্রিত। বেলুদির রাজরোগ জানা সত্ত্বেও এখানে এসেছি। উপায় ছিল না বলেই আসা। দেশভাগ যেন এমন এক প্রক্রিয়ার কথা বলে যা সবসময়েই আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার। মা নিজেকে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে।

তখন বুঝতাম না এখন বুঝি, এর জন্য আমরা নিজেদেরকেই দোষারোপ করি। যদিও সমস্ত ঘটনার সঙ্গে আমাদের সংঘর্ষ চলতেই থাকে— আজও চলছে।

এইসময় মেজমাসি গলা তুলে আমাকে ডাক দিল। বাবলু যে কোন সময় উঠে গেছে বুঝতেই পারিনি।

সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল এত সুস্বাদু সুজির পায়েস এর আগে খাইনি। যদি খেয়েও থাকি মনে রাখার মতন বয়স ছিল না তখন। বাবলু অবশ্য ওখানেই আছে আরেকবার পাওয়ার আশায়। মা অবশ্য দেবেও— আমাকে পাত্র ধরিয়ে বলেছিল “বোনের পাশে বসে খা।”

সে আদেশ অমান্য না করে চলেও এসেছিলাম। খাওয়া শেষ হতেই শূন্য পাত্রের দিকে তাকিয়ে হঠাৎই মনে হয়েছিল এমন সুস্বাদু সুজি খাওয়ার ইচ্ছেটা বেলুদির নিজস্ব চাহিদা না বেলুদির শরীরে রাজবেশে বাসা বেঁধে আছে সেই শয়তানের। আসলে সেদিন আমি প্রবেশ করতে চাইছিলাম সুস্থ বেলুদির আর তার ভেতরে থাকা শয়তান রাজার মধ্যে সুস্বাদু খাবারের স্বাদ স্বাদ নিয়ে তৈরি হওয়া এক দোলায়মানতায়। শেষ পর্যন্ত সবকিছুকে বাতিল করে এক অনিশ্চয়তার মধ্যে চলে যেতে যেতে বিষণ্ণতার জালে জড়িয়ে গিয়েছিলাম বলে আজও মনে হয়। পৃথিবী সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াতেই আছে।

বোন জেগে উঠতেই মা গরম দুধের বাটি নিয়ে ঘরে এল। জেগে উঠে বোন কেঁদে ওঠেনি, তবু মা কী করে টের পেয়ে যায় এখন এই সময়েই ঘুম ভাঙবে। ঝিনুক দিয়ে বোনকে দুধ খাইয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হেসে ওঠে মা। এই হেসে ওঠার অর্থই হল, তুইও এই কাঁসার ঝিনুক দিয়ে দুধ খেয়েছিস ছোটবেলায়।

ভাবতে আশ্চর্য লাগে আমার ভাইবোনেরা, পরবর্তীতে আমার দুই মেয়ে, তাদের ঘরে নাতনি-নাতি– এই আশ্চর্য ঝিনুক দিয়ে ছোটবেলায় দুধ খেয়েছে। এখন অবশ্য সেটা ছোট মেয়ের হেফাজতে। নিজে অবশ্য জানি না এই ঝিনুকটি আমাদের কোন কুল থেকে পাওয়া– মাতৃকুল না পিতৃকুল। সে প্রশ্নের মীমাংসার জন্য আজ আর কেউ নেই।

বোনকে দুধ খাইয়ে ফিরে যাওয়ার সময় সুজির পায়েস খাবার বাটিটা হাতে নিয়ে বলে “তুই নিশ্চয়ই বাটি চেটেছিস। এত পরিষ্কার! ভালো হয়েছিল, তাই না?”

কোনও কথা বলতে পারিনি। মনে হচ্ছে জীবনে প্রথমবার খেলাম।

চলেই যাচ্ছিল, কী মনে করে আবার ফিরে এসে বলল, “রাতে খিচুড়ি আর ডিম-কষা। মুরগির ডিম কিন্তু…”
–পাপ হবে না?
–আমিও তো খাব। বাড়িশুদ্ধ লোক খাচ্ছে, ওদের পাপ হচ্ছে না?

এখন হলে ‘পাপপুণ্য কি দেখা যায়?’ এই প্রশ্নই করতাম। এ এক অদ্ভুত তাড়না। সেদিন অবশ্য চুপ করে বসে থাকতে দেখে মা বলে উঠেছিল “একটাই হাঁসের ডিম আছে— ওটা মেজদির জন্য।”

এ-বাড়িতে হাঁসের ডিম আসে শিলিগুড়ি থেকে। মেজমাসি, মা আর আমার জন্য। আজকে তার ব্যতিক্রম ঘটতে চলেছে। মেনে নিতে হচ্ছে। সংস্কারকে উপেক্ষা করে জীবনের যে পাঠ সূচিত, তাকে কোনওভাবেই অস্বীকার করার উপায় থাকে না বলেই কী সেদিন চুপ করেছিলাম!

মা শুধু বলে গিয়েছিল কলকাতায় ফিরে গঙ্গায় ডুব দিয়ে নিলে সব পাপের খণ্ডন হয়ে যাবে।

 

এরপর আগামী সংখ্যায়

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2681 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...