আলেকজান্ডার

শৈলেন সরকার

 

স্কুলে আসার প্রথম দিনই নামটা পেয়ে গিয়েছিল ও। মানে, আমাদের ক্লাস এইটের আলেকজান্ডার। ওর আসল নাম কিন্তু শুরুতেই হারিয়ে গিয়েছিল। দেশ নাকি ছিল মালদা। মালদার হরিশ্চন্দ্রপুর বা ওইরকম কোনও গ্রামের কথা বলত। আমাদের কাছে তখন সে সব একেবারে অন্য কোনও জগৎ। যেন হাজার হাজার মাইল দূরের কোনও জায়গা। এখানে বলতে, আগরপাড়ায় ওর মামার বাড়িতে থেকেই নাকি ওর পড়াশোনা করতে আসা।

স্কুলের প্রথম দিনেই অমিতাভর সঙ্গে গণ্ডগোল বাধিয়ে বসল একটা। দোষের মধ্যে অমিতাভ ওর নাম জানতে চেয়েছিল, জিজ্ঞেস করেছিল, ‘নাম কিরে তোর?’ ব্যস, ফার্স্ট পিরিয়ডে অখিল স্যারের রোলকল হওয়ার পরপরই  উঠে দাঁড়িয়ে হাত তুলল ছেলেটি।

‘কী ব্যাপার?’
‘ও আমাকে অপমান করেছে স্যার।’
‘অপমান?’
‘হ্যাঁ, তুই করে ডেকেছে আমাকে।’

অখিলস্যার অবাক হলেন খুব। দাঁড়াতে বললেন অমিতাভকে। অমিতাভ নিজেও অবাক। এটা যে নালিশ করার মতো কিছু হতে পারে তা আমরা কেউ ভাবতেই পারিনি।

অমিতাভর কথা শুনে স্যার বললেন, ‘এক ক্লাসের ছেলেরা তো তুই বলেই ডাকবে একজন আর একজনকে, এতে— ।’

ছেলেটা বলল, “আমি তো নতুন, আমার সঙ্গে তো ‘তুমি’ করেই— ।”

স্যারের কথা ও মানবে না কিছুতেই। শেষ পর্যন্ত সেই বিখ্যাত উদাহরণ। ‘রাজার প্রতি রাজার ব্যবহার।’ ব্যস পরের পিরিয়ড থেকেই ওর নাম আলেকজান্ডার।

ওর মামার বাড়ি ছিল নিউ কলোনিতে। রেললাইনের পাশে বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা ঘর। আমাদের বড় স্কুল অর্থাৎ আগরপাড়া হাইস্কুলে ভর্তি হওয়ার বছরই দখল হল জায়গাটা। ট্রেন থেকে দেখা যেত। ফ্যাকটরির ভাঙা শেড একটা। রেললাইন বরাবর চওড়া খালের মত কিছু। বড় পুকুর দু-তিনটে। ওইসব পুকুর নাকি কোন যুগে ফ্যাকটরির জমি উঁচু করার জন্যই কাটা। অমিতাভর সঙ্গে সেই প্রথম দিনের গণ্ডগোলের পর থেকেই ওর আর বন্ধু তৈরি হয়নি কোনও। ওরকম একটা নালিশের পর থেকেই ওর সঙ্গে ভাব জমাতে উৎসাহই জাগেনি কারও।

সাইকেলেই স্কুলে আসতাম। আমি, অনিল, অমিতাভ। আসার পথে প্রায়ই দেখা হত রাস্তায়। বা, দেখা হত না বলে চোখে পড়ত বলাই ভাল। কাপড়ের একটা ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে হাঁটতে থাকা ওর শরীরটাকে প্রায়দিনই নিউ মেডিক্যাল স্টোর্সের সামনে চোখে পড়ত। আমিতাভ মাঝেমধ্যেই ওর গায়ের ওপরই চাপিয়ে দিত নিজের সাইকেলটাকে। একেবারে কাঁধের কাছে গিয়ে বেল মারত। প্রথম প্রথম ছেলেটা চমকে উঠত খুব। পরে যেন গা-সওয়া হয়ে গেল। মজার ব্যাপারটা হল, ও কিন্তু এসব নিয়ে নালিশ জানায়নি কোনও স্যারকে। কেবল ওকে পার করে পেছন ফিরলে ওর অসহায় তাকানো চোখে পড়ত।

সুমনবাবু অঙ্ক করাতেন আমাদের। ভাল লোক ছিলেন খুব। এই একজনের ক্লাসের জন্য আমরা ছটফট করতাম। কোনও একটা অঙ্কের একেবারে বইয়ে-পড়া গোয়েন্দা গল্পের মতো জট ছাড়াতেন। নিজের থেকে কেউ কঠিন কোনও অঙ্ক পারলে পকেট থেকে লজেন্সও বের করতেন তার জন্য। এই সুমনবাবুর ক্লাসেই অমিতাভ একদিন বড় ভুল করে বসল একটা। নাম লেখার খাতায় গণ্ডগোল করা ছাত্রদের মধ্যে নাম ঢুকিয়ে দিল আলেকজান্ডারের। হ্যাঁ, নামের জায়গায় লিখে রাখল, আলেকজান্ডার। নাম পড়েই সুমনবাবু অবাক হলেন খুব। ‘কে, আলেকজান্ডার কে?’ সবাই চুপ। অমিতাভও। ফের ডাকলেন। ‘কী হল, এমন নাম আছে নাকি কারও? আলেকজান্ডার?’ এরপর ফিরে অমিতাভকেই ডাকলেন, জানতে চাইলেন, ‘কে আলেকজান্ডার?’ অমিতাভ বা সেই ছেলেটিকে নয়, গোটা ব্যাপারটা বলতে হল আমাকেই। ছেলেটির স্কুলে আসার সেই প্রথম দিনের বা সেই প্রথম পিরিয়ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ। সুমনবাবু ডাকলেন আলেকজান্ডারকে। ওকে দেখিয়ে পুরো ক্লাসকেই বকলেন খুব। অমিতাভকে একটু আলাদা করেই। আর ক্লাস শেষে পকেট থেকে লজেন্স বের করে আলেকজান্ডারের হাতের মুঠোয় ঢুকিয়ে দিলেন। জোর করেই। এরপর কিছুদিন ওই নামটা ক্লাসের কেউ ব্যবহার করেছে বলে মনে পড়ে না।

ছেলেটার আসলে কোনও ভূমিকাই ছিল না ক্লাসে। থার্ড বেঞ্চে বসত। বসেই থাকত চুপচাপ। রোগা আর কালো। একটা জামাকেই সারা সপ্তাহ ধরে পরে আসতে দেখতাম ওকে। জামায় লেগে থাকত কারও চুপিচুপি লাগিয়ে দেওয়া আচারের দাগ বা ছোটছোট অক্ষরে লিখে রাখা সেই নাম— আলেকজাণ্ডার। সেবার ইন্টার ক্লাস খেলায় গোলকিপার খেলতে রাজী হল না কেউ। আসলে গোলকিপার মানেই তো গোলপোস্টের নিচে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা, আর গোল খেলে গালি খাওয়া, সুতরাং—। গোলকিপারের আর উপরের ছেলেদের মতো সারাক্ষণ হুড়োহুড়ি করার মত সুযোগ কোথায়? উপরের ছেলেদের সারাক্ষণের সেই ধাক্কাধাক্কি, কাদামাঠে আছাড় খাওয়া বা হুল্লোর আর চিৎকারে গোলকিপারের ভাগ থাকে না কোনও। সেদিন আমিই ডাকলাম, বললাম, চার পিরিয়ডের পর বাড়ি যাবি না কিন্তু—। সুমনবাবুর ক্লাসে আমার বলা ‘আলেকজান্ডার’ নামের ইতিহাস শুনে স্যারের প্রতিক্রিয়ার ফলেই হয়তো আমাকে এই ক্লাসে ওর একমাত্র শুভাকাঙ্খী ভেবে থাকবে। এক আমি কিছু বললেই কথাটাতে ও যেন সত্যিকারের মনোযোগ দিত। আর এই আমি বলার জন্যই হয়তো ও রাজী হয়ে গেল গোলপোস্টের নীচে দাঁড়াতে। সেদিন ‘বি’ সেকশনের কাছে মাত্র এক গোলে হারতে হল আমাদের। আর পরদিনই বোর্ডে লেখা হয়ে গেল ‘আলেকজান্ডার দি গ্রেট’। কার লেখা ছিল কে জানে? তবে অমিতাভর নয়। আর যে-ই লিখুক, কেনই বা লিখবে না? কাদামাঠের খেলাই হচ্ছিল সেদিন। এদিক থেকে ওদিক স্রেফ জড়াজড়ি। জল আর কাদায় বলটাকে নিয়ে স্রেফ ধাক্কাধাক্কির খেলা। এ ধরনের খেলায় জমা জল আর কাদা ঠেলে বলটাকে গোলপোস্ট পর্যন্ত নেওয়াটাই কঠিন। আর তাই, আমাদের আলেকজান্ডারের বা বি সেকশনের গোলকিপারকে প্রায় বলই ধরতে হল না কোনও। কিন্তু সেই আলেকজান্ডারই নায়ক হয়ে উঠল শেষ মুহূর্তে। তখনও গোল হয়নি কোনও। খেলার শেষদিকে একেবারে হঠাৎ করে আসা একটা গড়ানো শট ধরে প্রথমে মাঠের ঘাসে, পরে গোলপোস্টের গায়ে ঘষে বলের গায়ে জমে থাকা কাদা তুলে তবে শট মারবে। গোলের বাঁশি বাজার পর আমরা হাসব না কাঁদব বুঝে উঠতে পারছি না। সবাই মিলে আমাকেই ধরল তখন। যাই হোক, ওর সেই আলেকজান্ডার নাম তখন থেকে একেবারে পাকাপাকিভাবে ফিরে আসল।

স্কুলের দু ধরনের ছেলের কথা মনে রাখে সবাই। এক যারা পড়াশোনায় ভাল, আর যারা শয়তানিতে। আলেকজান্ডারকে দুটোর কোনওটাতেই ফেলা যাবে না। পরপর চার-পাঁচ দিন স্কুলে না এলেও কেউ খেয়াল করত না। বড়জোর রোলকলের সময় ‘ইয়েস স্যার’ শুনে কোনও স্যার ওর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী ব্যাপার এতদিন—?’ ও উঠে দাঁড়াত, রোলকল শেষ না হওয়া অব্দি দাঁড়িয়েই থাকত, তারপর একসময় কখন যেন বসে পড়ত। ওর এই উঠে দাঁড়ানো, দাঁড়িয়ে থাকা বা বসে পড়া সম্ভবত স্যারও খেয়াল করতেন না। অমিতাভ বা আমি বা অন্য কেউ হলে স্যার ঠিক বলতেন কিছু। হয়তো বকাবকি করতেন, বা ভবিষ্যতের কথা তুলে সাবধান করতেন, বাবাকে স্কুলে ডাকার কথা বলে ভয় দেখাতেন। আলেকজান্ডারকে কখনও কোনও স্যারের বকার মুখে পড়তে দেখিনি। পড়ার জন্যও না। আসলে কোনও স্যার ওকে পড়াই ধরত না কোনও দিন।

অ্যানুয়াল পরীক্ষায় সেবার ফেল করল আলেকজান্ডার। আমাদের থেকে পেছনে পড়ে গেল। নাইনে পড়ার সময় কখনও হয়তো এইট সি-র বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতাম ওকে। চোখে চোখ পড়লে ও যেন কী করবে ঠিক বুঝেই উঠতে পারত না। তাকিয়েই থাকত কিছুক্ষণ।

আমাদের স্কুলের নাম ছিল খুব। রেজাল্ট ভাল। স্কুল শুরুর সময়, সাইকেল বা রিকশার ভিড় পড়ে যেত। ছেলেরা, ওদের বাবা বা মায়েরা। ছুটির সময়ও। নিউ কলোনির সেই আলেকজান্ডার কীভাবে যে আমাদের স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল কে জানে? ট্রেনে করে কোথাও গেলে লাইনের পাশ বরাবর সেই খালের ওপারে বাঁশের বেড়ার ঘরগুলি চোখে পড়ত। পুকুর। পুকুরে দাপাদাপি করতে থাকা ছেলেমেয়েরা। আর ফ্যাকটরির পরিত্যক্ত আর ভাঙা শেডগুলিও। লাইনের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেমেয়েদের দেখলে আলেকজান্ডারের কথা মনে পড়ত।

এগারো ক্লাসে পড়ার সময়, দশক্লাস পর্যন্ত স্কুলজীবনটাকে ভুলেই গেছি বলতে গেলে। সকাল-বিকেল পড়তে যাচ্ছি প্রাইভেট টিচারদের কাছে। একদিন ফিজিক্সের অসীমবাবুর বাড়িতে পড়তে গেছি, দেখি ওঁর বাড়ির কাজের জন্য ভ্যানে সিমেন্ট এসেছে চার বস্তা। বাড়ির গেটে স্যার সেই ভ্যানওয়ালার সঙ্গে দরাদরি করছেন ভ্যানভাড়া নিয়ে। কাছাকাছি গিয়ে দেখি চেনা লাগছে ভ্যানওয়ালা ছেলেটিকে। বললাম, ‘আলেকজান্ডার না? এটা কি তোর? তুই কি ভ্যান চালাস এখন?’ ওর সঙ্গে কথা বলতে দেখে অসীমবাবু যেন ভরসা পেলেন খুব। আমাকে সালিশ মেনে বলে উঠলেন, ‘স্টেশন থেকে এইটুকু দশটাকা হয় কখনও বল?’ আলেকজান্ডার আর কোনও কথা বলেনি। যাওয়ার সময় শুধু আমার দিকে তাকিয়ে হাসল একটু।

অমিতাভ বা অনিলের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল অনেক দিন। অমিতাভ ফিজিক্স নিয়ে মৌলানা আজাদে আর অনিল কেমিস্ট্রি নিয়ে সুরেন্দ্রনাথে ভর্তি হল। আমি জয়েন্টে চান্স পেয়ে গেলাম। আর কিছুদিনের মধ্যেই হস্টেল জীবনের বন্ধুদের নিয়ে আলাদা একটা জগৎ তৈরি করে ফেললাম। ছুটিতে বাড়ি আসার সময় কারও সঙ্গে দেখা হয়ে যায় হঠাৎ। অমিতাভ, অনিল বা অন্য কেউ। এমনি এক বাড়ি ফেরার পথেই ফের আলেকজান্ডারের সঙ্গে দেখা। স্টেশনের চায়ের স্টল থেকে চা নেব একটা, সিগারেট কিনব। দেখি, রোগা আর কালো মত সেই ছেলেটা। এখন অবশ্য ছেলে নয় আর, আমার মতোই। বরং আমার চেয়ে বয়স্কই লাগছে একটু। ছেঁড়া গেঞ্জি, ময়লা ফুলপ্যান্ট একটা। না কাটা দাড়ি। তেল না দেওয়া চুল। চা করছে। খটাখট শব্দ হচ্ছে কাপের। বললাম, ‘কীরে আলেকজান্ডার, তুই এখানে?’ আমার মুখে অদ্ভুত ওই নাম শুনে দোকানের মালিক তাকিয়ে দেখল একবার। বলল, ‘আপনি চেনেন ওকে? ওর নাম আলেকজান্ডার নাকি?’ একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললাম, ‘ঠিক তা না, মানে—।’ আলেকজান্ডারকেও কেমন অসহায় লাগল খুব। ওর আসল নামটা মনে থাকলে আমি ভুলটা শুধরে নিতেও পারতাম ঠিক। আর দোকানের মালিকও কেমন সঙ্গে সঙ্গেই ধরে নিল নামটাকে। বলল, ‘ঠিকই বলেছেন, আলেকজান্ডারই, রেগুলার ওর জন্য কথা শুনতে হবে কাস্টমারের—। ছাড়ব বলেই তো ভাবছি, কোনও কম বয়সী ছেলে হাতে থাকলে বলবেন তো—।’

ওই শেষ, পরের বার বাড়ি ফেরার সময় আর দেখতে পাইনি আলেকজান্ডারকে।

 

দিন আসে, দিন চলেও যায়। আমার সেই স্কুলজীবন এখন অনেক দূরের। এমনকী হস্টেলের সেই বন্ধুরাও এখন কে কোথায় কে জানে? সেই অমিতাভ বা অনিলের কথা একেকদিন মনে পড়ে। মেয়েরা কোনও দিন আমার স্কুলজীবন নিয়ে জানতে চায়। আমাদের সময় এত পড়া ছিল কিনা, স্কুলের অ্যাটেনডেন্স বা ওদের দিদিমণিদের মতো করে মাস্টারমশাইদের শাসন? ওরা জানতে চাইবে আমার মা-বাবাকে নিয়েও। ওদের ভাব আমার সঙ্গেই। অফিসের ব্যস্ততার জন্য যদিও খুব বেশি সময় ওরা আমার কাছ থেকে পায় না। তবু, আমি চেষ্টা করি খুব। ওদের আব্দার, বায়নাক্কা এমনকী বকাবকির জন্যই যেন জীবনটা সুন্দর হয়ে ওঠে।

আমার এক শ্যালিকার বিয়ের জন্য রুইয়া যেতে হল। একটু গ্রামের দিকে। সবাইকে নিয়েই। আর এর জন্য সময় বের করতে অফিসে নাকানি-চোবানি খেতে হল খুব। এক মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির ম্যানেজমেন্টের লোক বলে কথা। কোম্পানির গাড়ি নিলেও ফ্ল্যাটটা ছেড়ে দিয়েছি। শহরের বদ্ধ জায়গা থেকে শহরতলির একটু খোলামেলা জায়গাই পছন্দসই আমার। মেয়েদেরও। আর এই মেয়েদের চাপে আমার স্ত্রীকেও শেষ পর্যন্ত শহরতলির জীবনটাকে মেনে নিতে হল। বাড়ির সামনে পুকুর, গাছপালা, একটু দূরের রাস্তা, অস্পষ্ট হর্ন।

টিটাগড় স্টেশনের কাছে দাঁড়িয়ে পড়তে হল। ট্রেন আসছে কোনও— লেভেল ক্রসিং হয়তো অনেকক্ষণ ধরেই আটকে আছে। আমাদের সামনে অন্তত সাত-আটটি গাড়ি। ট্রাক-বাস-অটো। স্ত্রীর পীড়াপীড়িতে একটু আগেই বেরিয়েছি বাড়ি থেকে। রোদ এখনও যথেষ্ট। ওরা কোনও ড্রিঙ্কস বা ডাব খাবে কিনা জিজ্ঞেস করে, একটা সিগারেট ধরাব বলে গাড়ি থেকে নেমেছি। দেখি, রাস্তার পাশে ছোট ভিড় একটা। একটা লোক চিৎকার করে বলছে কীসব। ফাঁক পেয়ে মজা দেখব বলে দাঁড়াতেই দেখি ম্যাজিক দেখাচ্ছে লোকটা। পাশে ব্যাগ। হয়তো  ওষুধপত্র বিক্রি করবে কোনও। একটা পয়সা ভ্যানিশের ম্যাজিক দেখাতে গিয়ে লোকটা আটকে গেল একেবারে। হাতের তালুতে পয়সা আটকাবার কায়দা হয়তো শেখেনি ঠিকঠাক। পয়সাটা মাটিতে পড়ে গেছে। দর্শকদের মধ্যে একটু হাসি, একটু বিদ্রূপের মধ্যে দিয়ে লোকটা ফের চেষ্টা শুরু করল নতুন করে। ফের, ফের দেখে ফেলল সবাই। মাটিতে গড়িয়ে পড়ল পয়সাটি। দু টাকার কয়েনই হবে। যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গি করে মাটিতে পেতে রাখা প্লাস্টিক পেপারের ওপর থেকে এক প্যাকেট তাস তুলে নিল লোকটি। প্রথম খেলার ব্যর্থতার পর লোকজন প্রায় নেই বললেই চলে। বড়জোর চার-পাঁচ। ট্রেনের শব্দ শুনে পেছন ফিরে একটি ট্রেন চলে যেতে দেখে ভাবলাম, যাক, এবার তাহলে—। না, লেভেল ক্রসিং খোলার নামগন্ধ নেই কোনও। তার মানে ফের কোনও দিক থেকে ট্রেন আসছে অন্য। অর্থাৎ আরও দু-চার মিনিট। এবার সত্যি রাগ উঠছে খুব। আমি নাহয় বাইরে দাঁড়িয়ে হাওয়া খাচ্ছি, ওদিকে আমার স্ত্রী বা মেয়েরা—।

লোকটি এবার ওর হাত থেকে তাস টানতে বলল একজনকে। অর্থাৎ কার্ড মার্কিং। এরপর শাফলিং এবং সেই তাসটিকে ফের তাসের ভিড়ে ঢুকিয়ে দিতে বলা। এবার শাফলিং-এর পর শাফলিং করে সব তাসের ভিড় থেকে লোকটির তুলে নেওয়া তাসটিকেই ফের বের করে দেখানো। না, হল না। ভুল তাস, ভুল। যে দু-চারজন দাঁড়িয়ে ছিল এতক্ষণ, তারাও হাঁটা দিল এবার। ফের ট্রেন আসছে একটা। আর ট্রেনটা চলে যেতেই এতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িগুলির ইঞ্জিন সাড়া তুলল। হাতের সিগারেটটা ফেলে নিজেদের গাড়ির দিকে এগোতে গিয়ে কী মনে হল পেছন ফিরে তাকালাম একবার। মাটিতে পেতে রাখা প্লাস্টিক পেপারটা ভাঁজ করে ব্যাগটাকে তুলে নিচ্ছে লোকটা। হাঁটা শুরু করেছে। হাঁটাটা চেনা লাগছে না? ‘আলেকজান্ডার, এই আলেকজান্ডার—।’

পেছনের গাড়িগুলি আটকে আছে আমার গাড়ির জন্য। হর্ন দিচ্ছে।

ডাক শুনে থামল লোকটা। পেছন ফিরে তাকাল একবার। চিনতে পারল যেন। হাসল মনে হল না? বললাম, আলেক—।

মেয়ে ডাকছে চিৎকার করে। আমাকেও স্টার্ট দিতে হল। অনেকটা জায়গাই ফাঁকা এখন। সামনের গাড়িগুলি এগিয়ে গেছে আগেই। দুপাশে ফাঁকা মাঠ, পুকুর। এক্সিলেটরে চাপ দিই। দিতেই থাকি। হু-হু হাওয়া ঢুকতে থাকে। স্ত্রী বলে ওঠে, ‘কী হল?’

জবাব দেওয়ার মত আমার কাছে অবশ্য কথা থাকে না কোনও।

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2511 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

আপনার মতামত...