অর্থনৈতিক উদ্দীপক নাকি কর্পোরেট বেইল-আউট?

শঙ্খশুভ্র বিশ্বাস 

 


লেখক অর্থনীতির ছাত্র, ছাত্র আন্দোলনের কর্মী

 

 

 

 

করোনা ভাইরাসের আক্রমণের সামনে দাঁড়িয়ে সারা দেশে যাতায়াত সম্পূর্ণভাবে বন্ধ। দীর্ঘ লকডাউনের ফলে দৈনন্দিন জীবনে আলস্য ধরে গেছে আমাদের মত মধ্যবিত্তদের। “আমাদের মত” শব্দবন্ধটি ব্যবহার করলাম তাঁদের জন্য যাঁদের মাসের শেষে মাস-মাহিনা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ঢুকে যায় এবং তথাকথিত ব্যস্ত জীবনের কাছে লকডাউন নিতান্তই ছুটি। কিন্তু আমরা যারা সংখ্যালঘু, মুষ্টিমেয়, রবীন্দ্রনাথ থেকে ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো সব সম্পর্কে বিশেষ চিন্তাশীল মতামত দিতে পারদর্শী তাঁদের বাদ দিয়েও এক বিপুল অংশের মানুষ আমাদের চারপাশে প্রতিদিন বেঁচে আছেন কষ্ট করে, সংগ্রাম করে। তাঁদের জীবনের দুর্বিষহ চিত্র বহুদিন পর আমাদের সামনে এসেছে করোনার কৃপায়। এই সরকারের অপদার্থতা ও অসাড়তা বারবার প্রমাণ করেছে যে বর্তমান ব্যবস্থা সমাজের সকল স্তরের মানুষের মুখে খাদ্য তুলে দিতে তো পারবেই না, বরং তাদের শ্রম ও কষ্টার্জিত অর্থ আত্মসাৎ করে কিছু হাতে গোনা লোককে প্রতিদিন আরও বেশি ধনী করে তুলবে।

যাই হোক, আলস্যের প্রশ্নে ফিরে যাই। তা দীর্ঘ কর্মব্যস্ত জীবনের থেকে ছুটি পেয়ে আলস্যময় জীবনে ছোটবেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অতি-পরিচিত একটা খেলার কথা মনে পড়ছে; যার সঙ্গে বর্তমান সময়ের রাষ্ট্রনীতির অনেক মিল আছে। এই যেমন আমরা গোল করে বসতাম, আর রুমাল খুঁজতে হত এবং যার পেছনে রুমাল থাকত তাকে বুঝতে হত যে তার পেছনে রুমাল আছে ও সেটা নিয়ে চোরকে ছুঁয়ে দিতে হবে। এই রুমালচোর খেলার একটি বিশেষত্ব আছে— আমরা খেলার সময় জানি চোর কে, এবং চোর তার চুরির জিনিস লুকিয়ে রেখেছে জেনেও আমরা খেলছি কারণ এটাই খেলার নিয়ম। অর্থাৎ চুরি যদি বিশেষ আইন মেনে করা হয় তাহলে তা চুরি থাকে না।

আজকের দিনেও ঠিক সেভাবেই আমাদের সামনে আমাদের টাকা চুরি করে কিছু লোককে পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে আইন মেনে। এই চুরিকে ঢেকে রাখা হচ্ছে অর্থনীতির জটিল তথ্য, পরিভাষা ও রাজনৈতিক নেতাদের গালভরা বিশেষণের আড়ালে। চুরি হচ্ছে জেনেও আমরা কোনও কথা বলতে পারব না কারণ এটাই আইন। এই চুরির করার কারণ হিসেবে আবার খাড়া করা হচ্ছে যে— এতে গরীব মানুষের জীবনের মানোন্নয়ন ঘটবে, তাঁরা কাজ পাবেন, তাঁদের জীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনার জন্য যে ন্যূনতম টাকা প্রয়োজন তা তাঁরা উপার্জন করতে পারবেন— আর এভাবেই বর্তমান অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে মানুষ মুক্তি পাবে। এই যুক্তিকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে সামনে আনা হচ্ছে অর্থনীতির জটিল সমীকরণ ও বৈজ্ঞানিক পরিভাষা।

অর্থনীতিকে খুব মোটা দাগে দেখলে তার সারবক্তব্যকে এইভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়— অর্থনীতি হল সামাজিক সম্পদ ও উৎপাদনের মাধ্যমের বণ্টন। এই আলোকে সত্যিই কি বর্তমান সময়ে গরীব মানুষ কিছু পেলেন? নাকি গালভরা পরিভাষার আড়ালে আদতেই কিছু লোককে বড়লোক করে দেওয়া হল এই মহামারিকে ব্যবহার করে? গরীব মানুষকে প্রকৃত অর্থে আরও ঠেলে দেওয়া হল দারিদ্র্যের নিকষ কালো অন্ধকারে?

অপরিকল্পিত লকডাউনের ফলে আমরা দেখেছি সারিবদ্ধভাবে পরিযায়ী শ্রমিকদের হেঁটে আসার দৃশ্য। বাড়ির উদ্দেশ্যে পথ চলতে থাকা শ্রমিকরা কিলোমিটারের পর কিলোমিটার পথ হেঁটে ক্লান্ত। তাঁরা শ্রান্ত শরীরে রেললাইনে ঘুমিয়ে পড়ার পর শরীরগুলি ছিন্নভিন্ন করে ট্রেন চলে যাওয়ার ঘটনার সঙ্গে আমরা প্রত্যকেই পরিচিত হয়েছি। একের পর এক শ্রমিকের চাকরি চলে যাওয়ার খবর আমাদের কানে এসেছে, খাদ্য না পেয়ে মারা গিয়েছে একাধিক মানুষ। তাই দিনের শেষে প্রশ্ন ওঠে রাষ্ট্র কী করল এই মানুষগুলোর জন্য?

 

সরকারি প্যাকেজ

গরীব মানুষের সাহায্যার্থে শুভাকাঙ্ক্ষী সরকার ইতিমধ্যেই জনহিতকারী ২০ লক্ষ কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর কয়েকটি সিদ্ধান্ত হল: ১. কয়লা খনিগুলোর বেসরকারিকরণ করা ২. একাধিক সরকারি সংস্থাকে বেসরকারি সংস্থার হাতে জলের দরে তুলে দেওয়া, ৩. উৎপাদনের কাজ শুরু করার জন্য কম সুদে ঋণ দেওয়া, ৪. আগে থেকেই সঙ্কটে থাকা এনবিএফসিগুলোকে সঙ্কট থেকে বাঁচানোর জন্য আরও বেশি পরিমাণে ঋণ দিয়ে তাদের সঙ্কট থেকে উদ্ধার করার চেষ্টা করা। অর্থনীতির ভাষায় আমরা একে অর্থনৈতিক উদ্দীপক (Economic Stimulus) বলে থাকি। এই পদক্ষেপ গ্রহণের পেছনে যুক্তি কী? দক্ষিণপন্থী অর্থনীতিবিদদের মতে সস্তায় ঋণ দিলে পুঁজিপতিরা অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে বেরোতে ঋণ নেবে এবং এই ঋণের টাকা দিয়ে উৎপাদন শুরু করলে শ্রমিকরা আবার চাকরিতে যেতে শুরু করলে অর্থনীতির চাকা পুনরায় এগোতে শুরু করবে। এবং দেশ অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে মুক্তি পাবে। অর্থাৎ সোজা ভাষায় বললে বাজারে টাকা জোগান দিয়ে যাও যতক্ষণ না অর্থনীতি পুনরায় তার পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসে। কিন্তু আমার মতো অর্থনীতির ছাত্ররা, যারা এখনও চেষ্টা করছি বাস্তব অর্থনীতিকে বোঝার, তাদের কাছে এই অর্থনৈতিক উদ্দীপক সম্পর্কে প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ বাস্তবিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখতে পাচ্ছি যে সহজে ঋণ দেওয়া বা বেসরকারিকরণের মাধ্যমে অর্থনীতির সামগ্রিক উন্নয়ন হয় না। আসুন, বাস্তবের তথ্য দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি আসলে আমাদের চারপাশে কী হচ্ছে।

 

সঙ্কটমোচনে সস্তার ঋণ

একটু পেছনে ফিরে দেখা যাক সস্তায় ঋণ দিয়ে আদতেও সাধারণ মানুষের লাভ হয়েছে কি? শেষ কয়েক বছরের তথ্যের দিকে ভাল করে তাকালে আমরা দেখব যে ২০১৪ সালের পর থেকে ভারতে প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে রেপো রেট (অর্থাৎ রিজার্ভ ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিতে গেলে ব্যাঙ্ককে যে টাকা সুদ দিতে হয়) কমানো হয়েছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নিজস্ব তথ্য পাঠকের কাছে বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে তুলবে।

সময়   সংশোধিত রেপো রেট (শতাংশের হিসাবে)
জানুয়ারি ২০১৪
জানুয়ারি ২০১৫ ৭.৭৫
মার্চ ২০১৫ ৭.৫
জুন ২০১৫ ৭.২৫
সেপ্টেম্বর ২০১৫ ৬.৭৫
এপ্রিল ২০১৬ ৬.৫
অক্টোবর ২০১৬ ৬.২৫
আগস্ট ২০১৭
জুন ২০১৮ ৬.২৫
আগস্ট ২০১৮ ৬.৫
ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ৬.২৫
এপ্রিল ২০১৯
জুন ২০১৯ ৫.৭৫
আগস্ট ২০১৯ ৫.৪
অক্টোবর ২০১৯ ৫.১৫

 

অর্থাৎ এই তথ্য থেকে পরিস্কার যে ২০১৪ সালে রেপো রেট যেখানে ছিল ৮ শতাংশ সেখানে ২০১৯ সালের শেষে এসে সেই পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫.১৫ শতাংশে। অর্থাৎ এই ৫ বছরের কিছু বেশি সময়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সুদ কমানোর মাধ্যমে বাজারে বিপুল পরিমাণ টাকার জোগান দিয়ে গেছে। তাহলে ২০ লক্ষ কোটি টাকা বাজারে জোগান দিয়ে উৎপাদন শুরু করে বাজারে চাহিদা বৃদ্ধির যুক্তিকে যদি সঠিক হিসেবে ধরে নিই তাহলে এই কয়েক বছরে চাহিদা ও উৎপাদন উভয়েরই বেড়ে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু বাস্তব তথ্য অন্য কথা বলছে। শেষ কয়েক বছরে বিপুল টাকা দেওয়া সত্ত্বেও উৎপাদন বাড়েনি।

ওপরের চিত্র থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি ভারতে দীর্ঘ সময় ধরে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়নি। এছাড়াও সরকারি সংস্থা NSSO এর তথ্য বলছে স্বাধীনতার পর প্রথমবার ২০১৪ সালের পর থেকে প্রথমবার ভারতে জনগণের ব্যয়ক্ষমতা বিপুল হারে হ্রাস পেয়েছে। ফলে এর থেকে পরিষ্কার যে বাজারে চাহিদাও হ্রাস পেয়েছে এবং বাজারে অতিরিক্ত উৎপাদনের সঙ্কট প্রতিদিন ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছিল শেষ কয়েক বছর ধরে।

আজকে করোনা পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে বাস্তবে কোনও পরিবর্তন ঘটেনি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী  দেখা যাচ্ছে এই বিপুল পরিমাণ টাকা দেওয়ার ঘোষণা এপ্রিল মাসে করা হলেও তার পর থেকে উৎপাদনে বিশেষ কিছু উন্নতি হয়নি। জানুয়ারি মাসে Manufacturing PMI যেখানে ছিল ৫৫.৩, এপ্রিল মাসে সেই সংখ্যা কমতে কমতে দাঁড়ায় মাত্র ২৭.৪-এ। মে মাসে এসেও এর কিছু বিশেষ উন্নতি ঘটেনি। নিচের চিত্রে জানুয়ারি ২০২০ থেকে শেষ কয়েক মাসের তথ্য দেওয়া হল।

এছাড়াও সরকারি সংস্থা সেন্টার ফর মনিটারিং ইন্ডিয়ান ইকোনমির তথ্য বলছে জুন মাসের শেষ সময় পর্যন্ত দেশে চাকরি নেই এরকম মানুষ ছিলেন ১৩ শতাংশেরও বেশি। ফলে এর থেকে আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারি যে বাস্তবে মানুষের হাতে টাকা যেমন পৌঁছায়নি তেমনই বাস্তবে চাহিদাও বৃদ্ধি পায়নি।

তাহলে এই যে বিপুল পরিমাণ টাকা সরকার ঘোষণা করল, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক রেপো রেটের পরিমাণ শেষ ১০ বছরে সব থেকে কম অর্থাৎ ৪ শতাংশে কমিয়ে আনল, তাহলে এই টাকা যদি উৎপাদন শুরু করতে ব্যবহার না হয় তাহলে কোথায় গেল?

 

ফাটকাবাজারে ঋণের টাকা

এই টাকার বেশিরভাগ পরিমাণ পুঁজিপতিরা হয় নতুন করে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করেছে নয়তো শেয়ার বাঁজারে যে বিপুল ধ্বস নেমেছিল ২০২০ সালের মার্চ মাসে তাকে সামাল দিতে নিজেদের শেয়ার নিজেরাই পুনরায় কিনেছে। করোনার সময়কালে সরকার এই পুনরায় শেয়ার ক্রয়কে শুল্কবিহীন করে দেওয়ায় একাধিক কোম্পানি তাদের নিজেদের শেয়ার পুনরায় কিনে শেয়ারের চাহিদা বাড়ানোর মাধ্যমে শেয়ার বাজারে নিজেদের কোম্পানির সম্পত্তি বাড়িয়ে নিয়েছে। এর প্রমাণস্বরূপ বলা যায়, অর্থনৈতিক উদ্দীপক উৎপাদনের বৃদ্ধি ঘটাতে না পারলেও মার্চ মাসের ১৭ তারিখ থেকে আজ পর্যন্ত শেয়ার বাজারে প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি দেখা গেছে কারণ এই বিপুল অর্থ তারা শেয়ার বাজারে লাগিয়েছিল ফাটকা খেলে নিজেদের সম্পত্তির পরিমাণ পুনরায় বাড়িয়ে নিতে। এছাড়াও বিভিন্ন অনৈতিক অনুমতিপ্রদানের মাধ্যমে সরকার সাহায্য করেছে পুঁজিপতিদের পুনরায় ফাটকা খেলতে। যেমন রিলায়েন্স ইতিমধ্যেই নিজেকে সম্পূর্ণ ঋণমুক্ত বলে ঘোষণা করেছে। অনেক অর্থনীতিবিদ বলছেন যে এর কারণ সরকারের বিপুল অর্থসাহায্য এবং এর ফলে শুরু হওয়া উৎপাদন। তবে এক্ষেত্রে এটা পরিষ্কার যে তারা বাস্তববিমুখ। কারণ বাজার থেকে টাকা তোলার জন্যে প্রতি ১৫ শেয়ারে ১টি শেয়ার বিনামূল্যে দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি রিলায়েন্স দিয়েছিল তার ফল হিসেবে রিলায়েন্সের শেয়ারের এই দরবৃদ্ধি। উদাহরণস্বরূপ ধরে নেওয়া যাক কোন বড় পুঁজির মালিক বা সংস্থা রিলায়েন্সের থেকে ১০ লক্ষ শেয়ার কিনছে। সেক্ষেত্রে সেই সংস্থা বা ব্যক্তি বিনামূল্যে ৬৬,৬৬৭টি শেয়ার পাচ্ছেন। অর্থাৎ ৬৬,৬৬৭টি শেয়ার তাঁর প্রাথমিক লাভ, এবং তারপর এই শেয়ারের দামবৃদ্ধি মালিক বা সংস্থার কাছে উপরি লাভ। ফলে সহজে লাভ করার জন্য বিপুল পরিমাণ টাকা রিলায়েন্স-এর শেয়ার কিনতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। যার ফলস্বরূপ রিলায়েন্স এই পরিমাণ অর্থ উপার্জন করেছে। এর সঙ্গে বাস্তবে উৎপাদন বা চাহিদার কোনও সম্পর্ক নেই।

যাই হোক এই তথ্য-বিশ্লেষণ দিয়ে এতটুকু পরিষ্কার করা যায় যে এই ২০ লক্ষ কোটি টাকার প্যাকেজ আদতে জনগণের নামে দেওয়া একটি অর্থনৈতিক ভাঁওতা যা আদতে বড়লোকদেরই আরও বড়লোক করেছে। কিন্তু একটি প্রবন্ধ তখনই সম্পূর্ণ হয় যখন সমস্ত প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়। উপরের বিশ্লেষণ থেকে এখনও দুটো প্রশ্নের উত্তর বাকি। ১. কেন শেষ কিছু বছর ধরে উৎপাদন কমছিল? ২. যদি উৎপাদন কমতেই থাকে তাহলে হঠাৎ আজ করোনার নামে এই বিপুল প্যাকেজ সরকার ঘোষণা করতে গেল কেন? করোনা উঠলে ধীরে ধীরে আবার উৎপাদন বাড়ত। তাহলে এই হঠকারিতা কেন?

 

কল্পকাগুজে পুঁজির রমরমা

এই দুটি প্রশ্নের উত্তর আদতে একটি। অর্থনীতিতে আজকের সঙ্কট বেশ কিছু বছর ধরে অর্থনীতির জটিল জগতের নীচে বেড়ে উঠছিল। এর কারণ বুঝতে পারলে এই বিপুল ছাড় দেওয়ার উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়ে যাবে। শেষ কিছু বছর ধরে পুঁজিবাদ সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে। পুঁজিবাদ এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যা সবসময় চেষ্টা করে তার মুনাফাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে এবং মুনাফাই একমাত্র এই ব্যবস্থাটিকে টিকিয়ে রাখতে পারে। শেষ কয়েক বছর ধরে মুনাফার হার কমতে শুরু করে। অর্থাৎ পূর্বে উৎপাদনে বিনিয়োগ করে যে হারে মুনাফা করা যেত সেই হার কমে যাছিল। ২০১৯ সালে সেই হার গত ১৫ বছরে সর্বনিম্ন জায়গায় পৌঁছায়। তাই এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতেই ২০১৪ সালের পর থেকে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক নির্দিষ্ট সময়ের ব্যাবধানে রেপো রেট কমিয়েছে, যাতে টাকার পরিমাণ বাজারে সমান থাকে। কিন্তু উৎপাদনে সেই পরিমাণ মুনাফা না হলে কী করে মুনাফা অর্জন করবে পুঁজিপতিরা? তারা বাস্তব উৎপাদনে বিনিয়োগের পরিবর্তে শেয়ার মার্কেটে  ফাটকাবাজির মাধ্যমে তাদের লাভের পরিমাণ ধরে রাখার চেষ্টা করছিল। পূর্বে উল্লিখিত চিত্রে আমরা দেখতে পাচ্ছি, ২০১৬ সালের নভেম্বর থেকে ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসের মধ্যে উৎপাদনের বৃদ্ধির হার কমেছে, সেখানে প্রায় এই সাড়ে তিন বছরের কম সময়ে শেয়ার বাজারের সূচক বেড়েছে ১৫,০০০ পয়েন্টের বেশি। এই বৃদ্ধি প্রমাণ করে বাস্তবে বিনিয়োগ না হলেও শেয়ার মার্কেটে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করা হচ্ছিল। এর ফলে ভারতের অর্থনীতিতে বাস্তব পুঁজির সঙ্গে কল্পকাগুজে পুঁজির (fictitious capital) মধ্যের পার্থক্য দিন দিন বেড়ে চলছিল। ফলে এই অর্থনীতির বুদবুদ যেকোনও দিন ফেটে যাওয়া ছিল শুধু মাত্র সময়ের অপেক্ষা।

২০২০ সালে মার্চ মাসে করোনার ফলে লকডাউন শুরু হলে এই বুদবুদ ফেটে যায়। ফেব্রুয়ারি ১৭ তারিখ থেকে মার্চের ১৭ তারিখের মধ্যে শেয়ার মার্কেট থেকে ২৫.৫ শতাংশ সম্পত্তি অর্থনীতির জটিল জালে অদৃশ্য হয়ে যায়। যার পরিমাণ প্রায় ৪২ লক্ষ কোটি টাকা। অর্থাৎ আমাদের রাজকোষ ঘাটতির (ফিসক্যাল ডেফিসিট) প্রায় ৬০০ শতাংশ বেশি। ফলে এই সময় সমস্ত কোম্পানির সম্পত্তি বিপুল পরিমাণে হ্রাস পায় এবং লকডাউনের ফলে বাস্তবিক চাহিদা তলানিতে নেমে যায়। পরিণামস্বরূপ সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা শেষ ৪০ বছরের সব থেকে ভয়ানক অর্থনৈতিক মন্দার সম্মুখীন হয়। এমতাবস্থায় সরকার এই বিপুল অর্থ সাহায্য না করলে সমগ্র পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটাই সঙ্কটের মুখে পড়তে পারত। বাস্তবে উৎপাদন করে এই বিপুল সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব ছিল না। সেইজন্যই বিপুল পরিমাণ টাকা বাজারে জোগান দেওয়ার ব্যবস্থা করা হল। যাতে পুঁজিপতিরা সহজে শেয়ারবাজারে ফাটকাবাজি করে নিজের সম্পত্তি পুনরায় বাড়িয়ে নিতে পারে।

এছাড়াও এক বিপুল পরিমাণ বেসরকারিকরণের ফিরিস্তি আমাদের সামনে আসে। এর একমাত্র কারণ ছিল এই লাভজনক সংস্থাগুলি প্রায় জলের দরে পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দিলে তাদের যে সঙ্কট শেষ কয়েক বছর ধরে তাড়া করে বেড়াচ্ছে তা থেকে সাময়িক মুক্তি দেওয়া যাবে।

শেষে শুধু এটুকুই বলার যে আজকের অর্থনৈতিক সঙ্কটের সময় সরকারের এই উদ্দীপক প্রদান কোনও নতুন ঘটনা নয়। ১৯৩০ সালের বিখ্যাত অর্থনৈতিক মন্দা থেকে শুরু আজ অবধি সব সঙ্কটেই সব দেশের সব সরকার এই একই কাজ করে এসেছে এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে।  পুঁজিবাদ তাঁর জন্মলগ্ন থেকেই একের পর এক সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছে এবং সাময়িক সমাধানের মাধ্যমে সঙ্কট থেকে মুক্তি পেয়েছে। আজকের অর্থনৈতিক মন্দা কোনও বিক্ষিপ্ত ঘটনা নয়। ফলে এটিকে পুঁজিবাদের ইতিহাসে একটি নতুন সঙ্কটময় অধ্যায় বলা যেতে পারে মাত্র। এই সঙ্কটও আদতে এই ব্যবস্থারই সঙ্কট। ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় আজকের সঙ্কট থেকে মুক্তি পেলেও এই ব্যবস্থা আবার কয়েক বছর পরে সঙ্কটে পড়বে। তাই এই অসাম্যে ভরা ত্রুটিপূর্ণ সমাজব্যবস্থা যা সব মানুষের মুখের ভাত নিশ্চিত করতে পারে না, তার অপসারণ কোনও শখের তত্ত্বায়ন নয় বরং অবশ্যম্ভাবী সামাজিক কর্তব্য।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2511 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...